আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

৬ বছরেও কাজ শুরু হয়নি ॥ চ্যালেঞ্জের শেষ নেই ॥ র‌্যাপিড ট্রানজিট!

প্রকাশিত : ১০ ডিসেম্বর ২০১৪
৬ বছরেও কাজ শুরু হয়নি ॥ চ্যালেঞ্জের শেষ নেই ॥ র‌্যাপিড ট্রানজিট!
  • ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থ সংস্থান ও রাস্তার স্বল্পতাই প্রধান সমস্যা
  • এশিয়ার ১ দেশের ৩৭ সিটিতে এ ব্যবস্থা চালু আছে
  • এ প্রকল্পের সুবিধা পাবে রাজধানীর ২ লাখ মানুষ, বাস আসবে দুই মিনিট পর পর

রাজন ভট্টাচার্য ॥ রাজধানীর যানজট নিরসনে বহুল প্রতীক্ষিত দ্রুত গতির বাসের আলাদা লেন (বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-বিআরটি) প্রকল্প এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রায় ছয় বছরেও প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু সম্ভব হয়নি। দায়িত্বশীলরা বলছেন, প্রায় চার বছর আগে সমীক্ষার কাজ শেষ হলেও অর্থের সংস্থান হয়নি। এজন্য কাজ শুরুতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে ৪০ কিলোমিটার এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে রাজধানীর প্রায় ২০ লাখ মানুষ সেবার আওতায় আসবে। এজন্য প্রয়োজন প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। প্রায় ৪০ মিনিটে গাজীপুর থেকে সদরঘাট পর্যন্ত আসা সম্ভব হবে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২০১৮ সালে শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এশিয়ার ১০টি দেশের ৩৭টি সিটিতে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানিকে এই প্রকল্পে বাস পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ মনে করছেন। একদিকে ভূমি অধিগ্রহণ। আর্থিক সংস্থান। অন্যদিকে বিআরটি মধ্য দিয়ে সড়কে সকল রুটের বাস চলাচল নিশ্চিত করা যাবে না। রাস্তা প্রশস্ত না করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে অন্যান্য পরিবহন চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হতে পারে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তো আছেই। এই প্রেক্ষাপটে নগর বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, চ্যালেঞ্জ অনেক থাকলেও জনবহুল এই নগরীর মানুষের চলাচলে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে যে কোন মূল্যে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবার আগে জরুরী। কারণ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণ গুরুত্বপূর্ণ অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ থমকে আছে। ব্যক্তিগত লাভের কারণে দীর্ঘ দিনেও তা সুরাহা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া বিআরটির একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেই রাজধানীর যানজট নিরসন হবে না। প্রকল্পটি ঢাকার-আশপাশের জেলা-উপজেলা পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরামর্শ নগর বিশেষজ্ঞদের।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট নগর পরিকল্পবিদ ড. নুরুল ইসলাম নাজেম জনকণ্ঠকে বলেন, গাজীপুর থেকে- কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাজধানীর যানজট সমস্যার সমাধান হবে না। এটা সত্য ও বাস্তব। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, যানজট নিরসনে বিআরটি প্রকল্পটি আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ, সাভার, বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে মাওয়া ঘাট পর্যন্ত এই রুট সম্প্রসারণ করা গেলে সুফল মিলবে। সম্ভব হলে এই প্রকল্পটি ময়মনসিংহ-নরসিংদীসহ আশপাশের জেলাসমূহ পর্যন্ত নেয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমান নকশা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সাময়িক কিছু সুবিধা বাড়বে। সীমিত আকারে হলেও সর্বোপরি কিছু র‌্যাপিড ট্রানজিটের ব্যবস্থা হবে। ঢাকা পূর্ব-পশ্চিম এলাকায় রাস্তা না বাড়ালে যানজট সমস্যার সমাধান হবে না। তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনার অভাবে ঢাকার চার ভাগের মধ্যে এক ভাগের বেশি রাস্তা ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু নিউইয়র্কে ছোট রাস্তা হলেও ওয়ানওয়ে করা আছে। সেখানে ব্যবস্থাপনা ভাল থাকায় চলচলে সমস্যা নেই। আমাদের দেশের রাস্তা দখলমুক্ত করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে কোন সমস্যা হবে না বলেও মনে করেন তিনি। তবে যথাসময়ে কাজ শেষ করার ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ এই বিশেষজ্ঞের।

রাজধানীর যানজট নিরসনে গাজীপুরের শিববাড়ি থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। এই রুট দিয়ে গাজীপুর থেকে সদরঘাট হয়ে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্প পর্যন্ত অল্প সময়ে পৌঁছানো যাবে। নির্ধারিত লেনে বিআরটির ১৮ মি. দৈর্ঘ্যরে আর্টিকুলেটেড বাসে ২৩ কিলোমিটার বেগে চলা উভয় দিক থেকে ঘণ্টায় ২০ হাজার যাত্রী পরিবহন করবে।

রাজধানীর যানজট সমস্যা সমাধানে স্ট্রেটেজিট ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) প্রণয়ন করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে। এই পরিকল্পনায় ২০০৫ সালে তিনটি মেট্রো রেল ও তিনটি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছিল। রাজনৈতিক বাস্তবতা, আর্থিক যোগান না হওয়া, সরকারের আন্তরিকতার অভাবসহ নানা কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিক এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আলোর মুখ দেখেনি। ফলে অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থাগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো করে রাজধানীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। তবে, প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে, মূল সড়কের মধ্যে একটি পৃথক লেনে গণপরিবহন (বাস) চলাচল করবে। সাধারণ পরিবহন চলাচল করবে পৃথক লেন ধরে। প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দ্রুত চলাচল নিশ্চিত করতে আন্ডারপ্লান, ফ্লাইওভার নির্মাণসহ ইন্টারসেকশনগুলোতে নেয়া হচ্ছে বিশেষ পদক্ষেপ।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নগরীতে যানজট কমবে। পরিবহন সেক্টরে ফিরে আসবে শৃঙ্খলা। সময় বাঁচবে। নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত হবে। পরিবেশ উন্নতসহ যাত্রীদের বাসে ওঠা সহজ হবে। বিশ্বের জনবহুল বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে ২০ কিলোমিটার করে পুরো প্রকল্পটি দুটি ভাগে বিভক্ত। একটি এয়ারপোর্ট রেলওয়ে স্টেশন থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত অপরটি এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও প্রথমবারের মতো মানসম্মত পরিবহন সেবা নিয়ে এ প্রকল্প চালু করা হবে। বিআরটির মাধ্যমে গণপরিবহনের জন্য আলাদা সংরক্ষিত লেন থাকবে। ব্যয় হবে দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা। প্রতি দুই মিনিট পর পর বাস আসবে।

গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোঃ আফিল উদ্দিন বলেন, এডিবি, ফ্রান্স ও জিএফ এর অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। বিআরটি বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দ্রুত মানুষ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন। ফলে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ছেড়ে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহী হবে। রাস্তার মাঝখানে স্টেশন হবে। ২০টি ইন্টারসেকশন ফ্লাইওভার ও দুটি ইউট্রান থাকবে। ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বাস পরিচালনা করবে। তিনি জানান, প্রকল্পটি এক ডিসেম্বর ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন ২০১৭ সালে শেষ হবে। প্রকল্পের সঙ্গে ১৪১টি রাস্তার উন্নয়ন হবে। প্রকল্পের রাস্তার মধ্যে অনুমোদনহীন মার্কেট উচ্ছেদ করে ১০টি পৃথক মার্কেটে ভাসমান ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন করার কথা জানান তিনি।

থাকছে ৩২ স্টেশন ॥ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিমানবন্দর থেকে ঝিলমিল (কেরানীগঞ্জ) পর্যন্ত বিআরটি রুটের দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ দশমিক চার কিলোমিটার। প্রকল্পের একটি অংশে ১৬টি স্টেশনের মধ্যে রয়েছে-এয়ারপোর্ট রেলওয়ে স্টেশন, খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, আর্মি স্টেডিয়াম, কাকলি, আমতলি, মহাখালী বাস টার্মিনাল, বিজিপ্রেস, হাতিরঝিল, বেইলি রোড, কাকরাইল, পল্টন, ফুলবাড়িয়া, নয়াবাজার, কদমতলী সার্কেল হয়ে ঝিলমিল প্রকল্পে গিয়ে শেষ হবে। বাস ডিপো থাকবে একটি। ফ্লাইওভার থাকছে দুটি। ১৮ মিটার দীর্ঘ আর্টিকুলেটেড বাসে যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা প্রায় ১৪০ জন। আন্ডারপাসের সংখ্যা থাকছে ৩০টি। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এই প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে ডিজাইনের অর্থ পাওয়া গেছে। ডিজাইন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণ কাজ শুরু হবে না। বাকি অর্থও পাওয়া যাবে না। এজন্য এক বছর সময় লাগবে। এডিবিসহ একাধিক বিদেশী প্রতিষ্ঠান বিআরটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করবে। এছাড়া অপর অংশে থাকছে আরও ১৬টি স্টেশন।

সম্প্রতি প্রকল্পের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনময় সভায় ডিটিসিএ’র নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ কায়কোবাদ হোসেন বলেন, ছয় জুলাই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অনুুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এসটিপিতে সুপারিশ ছাড়া নগরীতে কোন উন্নয়ন প্রকল্পে বাস্তবায়ন করা যাবে না। অন্য কোন সংস্থা করতে চাইলে ডিটিসিএ’র অনুমোদন লাগবে। বিআরটি হলো এসটিপির মেগা প্রকল্পের একটি। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে এক সময়ে ঢাকা শহরকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও জরুরী বলে মনে করেন তিনি।

প্রকল্পের সমীক্ষা শেষ। ডিজাইনের কাজ চলমান। এ কথা জানিয়ে ডিটিসিএ বিআরটি-এয়ারপোর্ট-কেরানীগঞ্জ প্রকল্পের প্রকল্প আনিসুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক নিরাপত্তা এখনও নিশ্চিত হয়নি। বিশ্বব্যাংক টাকা দেয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই ও সমীক্ষা করছে। আমাদের টার্গেট ২০১৬ সালের মধ্যে কাজ শুরু হবে। তবে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে কাজ শুরুর কথা জানান তিনি।

বিশাল এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় গুলোর মধ্যে রয়েছে- ভূমি অধিগ্রহণ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নগর উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত ২১টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়, রাস্তা প্রশস্ত করণ, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সহযোগিতা প্রভৃতি।

নগর পরিকল্পবীদরা আরো বলছেন, যানজটের কারণে বছরে লাখ-লাখ কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে। রাস্তায় দুর্ভোগের শেষ নেই। আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে বিপুল পরিমান। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে মেট্রো রেলেও কাজ শুরুর পাশাপাশি বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন তারা।

প্রকাশিত : ১০ ডিসেম্বর ২০১৪

১০/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: