কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রেলে পণ্য পরিবহনে কনটেনার কর্পোরেশন হচ্ছে

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • বর্তমান পদ্ধতিতে ক্রমেই পণ্য পরিবহন কমছে
  • লাভের মুখ দেখতে পারছে না রেলওয়ে

মশিউর রহমান খান ॥ রেলপথে পণ্য পরিবহনে গতি বাড়াতে ও রেলপথকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পৃথক কনটেইনার কর্পোরেশন গঠনের চিন্তা করছে সরকার। রেলওয়ে সংস্কারের অংশ হিসেবে কনটেনার সার্ভিসকে কর্পোরেশনে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই কোম্পানি আইনের অধীনে কর্পোরেশন গঠনের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) রেলের আয় বাড়ানো ও রেলপথকে লাভজনক রুট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পৃথক কনটেনার কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে। কোম্পানি আইনের অধীনে কর্পোরেশন গঠনে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, রেলের উন্নয়নে সংস্থাটির ঋণ পাওয়ার জন্যও বাধ্যতামূলকভাবে এ সংক্রান্ত শর্তজুড়ে দেয়ায় সরকার পৃথক কনটেনার কর্পোরেশন গঠনের উদ্যোগ হাতে নিয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এ কর্পোরেশনের মূল কাজ হবে, দেশের বিভিন্ন স্থানে আইসিডি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, কনটেনার পরিবহনে সক্ষমতা বাড়ানো, ছোট আমদানিকারকদের রেলপথে পণ্য পরিবহনে সহায়তা দেয়া, আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের সমন্বয় ও ব্যয় কমিয়ে আনা, ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কনটেনার পরিবহনে প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া নির্ধারণ, ট্রান্স-এশিয়ান রেলরুটে পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা, দেশী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করা। এছাড়া রেলপথের সকল কন্টেইনার পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা করা ও দেশ ও দেশের বাইরে থেকে আনা কন্টেইনারগুলো বর্তমানের চেয়ে আরও দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করা। রেলপথে পণ্য, বিশেষত কন্টেইনার পরিবহন বৃদ্ধির মাধ্যমে রেলওয়ের আয় বাড়াতে এ কর্পোরেশন কাজ করবে। পাশপাশি কর্পোরেশনের অধীনেই রেলওয়ের সব বিদ্যমান ও ভবিষ্যতে নির্মিতব্য অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপো (আইসিডি) পরিচালিত হবে। কন্টেইনার সেবা সম্প্রসারণের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন আইসিডি নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কাজ করবে।

সূত্র জানায়, পৃথক কন্টেইনার কর্পোরেশন গঠনে এরই মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), এফবিসিসিআই, বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্টদের মতামতও নেয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কন্টেইনার সার্ভিস কর্পোরেশন গঠনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। জানা গেছে, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র কোম্পানি হিসেবে এটি কাজ করবে, এর পরিচালনায় পৃথক পর্ষদ থাকবে।

রেল সূূত্রে আনা গেছে, যাত্রীবাহী ট্রেনের চেয়ে কন্টেইনারবাহী ট্রেনের লাভ রুটভেদে ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি হলেও বর্তমান পদ্ধতিতে কন্টেইনার পরিবহনে লাভ করতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেলপথে পণ্য পরিবহন প্রতিবছর ক্রমেই কমছে। প্রকৃতপক্ষে মূলত অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সময়ক্ষেপণ, পণ্যবাহী ট্রেনের অপ্রতুলতা ও ইঞ্জিন সংকটের কারণে সড়ক নির্ভর হচ্ছে আমদানি-রফতানি কন্টেইনার পরিবহন। রেলপথে কন্টেইনারের মাধ্যমে সময়মতো পণ্য পরিবহন করতে না পারাসহ নানা কারণে আমদানি-রফতানি কন্টেইনারের মাত্র ৫ শতাংশ এখন রেলপথে পরিবহন করা হয়। ফলে লাভজনক এ খাত থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয়ও অনেক কমছে। এ অবস্থায় রেলপথে পণ্য পরিবহন বাড়াতে ও গতি ফিরিয়ে আনতে পৃথক কন্টেইনার কর্পোরেশন করা হচ্ছে।

রেলওয়ের তথ্য মতে, কয়েক বছর আগেও প্রতিদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ১০টি কন্টেইনারবাহী ট্রেন চলাচল করত, এখন যা এখন কমে ৪টিতে এসে পৌঁছেছে। এজন্য রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীবাহী ট্রেনের বেশি চলাচলের কারণেই নাকি তারা মালবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না বলে দাবি করে আসছে।

এক হিসেবে দেখা গেছে শুধুমাত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে কন্টেইনারবাহী একটি ট্রেন থেকে আয় হয় যাত্রীবাহী ট্রেনের প্রায় ৪ গুণ। একটি কন্টেইনারবাহী ট্রেন থেকে রেলওয়ের ৬ লাখ টাকা আয় ও ৪ লাখ টাকা মুনাফা হয়। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেস থেকে আয় হয় মাত্র দেড় লাখ টাকা। এরপরও এক ট্রিপে লোকসান হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। এ অবস্থায় পৃথক কন্টেইনার কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করতে ও সার্বিক অর্থনীতি জোরদারকরণে এ কর্পোরেশন স্থাপন করা প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানি-রফতানি বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি-রফতানি পণ্য ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে চলাচল করে, যার ৯৫ শতাংশই সড়ক নির্ভর। আগামীতে আমদানি-রফতানি আরও বাড়লে শুধু সড়কপথে এ চাপ সামলানো যাবে না। ফলে রেলপথে কন্টেইনার পরিবহন বাড়াতে বিশেভাবে জোর দিতে হবে। এজন্য এখনই পৃথক কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা জরুরী হয়ে পড়েছে। প্রস্তাবে রেলপথনির্ভর কন্টেইনার সেবার সম্প্রসারণে বিশ্বের কয়েকটি দেশের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ এক্ষেত্রে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের চায়না রেল কন্টেইনার ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন, ভারতের কন্টেইনার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া, যুক্তরাজ্যের ফ্রেইটলাইনারস’ ইন ইউনাইটেড কিংডম, জামার্নের ট্রান্সফ্রেচট, সুইজারল্যান্ডের ইন্টার-কন্টেইনারস, যুক্তরাষ্ট্রের মেজর রেল-রোড সিস্টেম উল্লেখযোগ্য। যারা কন্টেইনার পরিবহনে ইতোমধ্যেই আলাদা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যা লাভের মুখ দেখেছে।

জানা গেছে, স্বল্প ও দীর্ঘ এ ২ মেয়াদি কাজ করবে এ কর্পোরেশন। স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে কমলাপুর আইসিডি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা এবং গাজীপুরের ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার কাজ করবে। আর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে মংলাবন্দরের কাছে আইসিডি উন্নয়ন, ভারত, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তানের সঙ্গে শিপমেন্ট সংযোগ স্থাপন, আখাউড়া হয়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন ও মিয়ানমারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে কাজ করবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মোঃ তাফাজ্জল হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, কন্টেইনার কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রেলপথে পণ্য পরিবহন বর্তমানের তুলনায় অনেক বাড়বে। এটি হবে বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি কর্পোরেশন। যেটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করবে। রেলপথে পণ্য পরিবহন বাড়াতে ও রেলপথকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে এটি কাজ করবে।

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০১৪

০৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: