মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

দশ মাসে প্রায় ৪ হাজার নারী নির্যাতনের শিকার

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • বেগম রোকেয়ার প্রয়াণের ৮ বছর পরেও যে কাহিনী শেষ হয়নি ॥

সুমি খান ॥ আজ ৯ ডিসেম্বর, বেগম রোকেয়া দিবস। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩২ সালের একই দিনে তিনি প্রয়াত হন। নারীমুক্তি আন্দোলন বেগবান করার দৃপ্ত শপথে নানা কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে বরাবরের মতো সারাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর ১০ মাসে ৩ হাজার ৯শ’ ৮ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২৫ নবেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ ঘোষিত নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ২০১৪ পালিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারীর বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ভিত্তিতে পরিচালিত এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে, শতবছর পার করেও বেগম রোকেয়ার নির্দেশিত পথে এগুচ্ছে কি এ সমাজ এবং এ সমাজের মানুষেরা?

বেগম রোকেয়ার প্রয়াণের আশি বছর পেরুলেও এদেশে এখনও কন্যাশিশু এবং নারীরা বর্বরোচিতভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। দেশের ১৩টি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ একটি জরিপ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বহুমাত্রিক উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও সারাদেশে নির্যাতন, বেআইনী ফতোয়া, সংখ্যালঘু নির্যাতন বেড়েই চলেছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৭শ’ ৭২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশী নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪৮ জন। বেআইনী ফতোয়ার ঘটনা ঘটেছে ২৩টি। ৭৮ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ১শ’ ৫০ নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ৯৩ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে, ১শ’ ১ জন শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে। ৩৫ জন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসিডদগ্ধের শিকার হয়েছে ৪৮ জন, এর মধ্যে এসিডদগ্ধের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। অগ্নিদগ্ধ হয়েছে ৪৪ জন, এর মধ্যে মারা গেছে ২৯ জন। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১শ’ ৩টি। ২৬ জন নারী ও শিশু পাচার হয়েছে। এর মধ্যে পতিতালয়ে বিক্রি করা হয়েছে ১৭ জনকে। ৭শ’ ৮০ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩শ’ ৭৫ জন নারী, এর মধ্যে ২শ’ ২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। নরসিংদীর বেলাবোতে মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় মাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। রংপুরে গীর্জার সেবিকাদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। টাঙ্গাইলের মীর্জাপুরে মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।

তবে এই নির্মমতার মাঝেও সমাজ বাস্তবতায় আশা জাগায় ২০১৩ সালের আলোচিত একটি বর্বরতার শিকার আদুরীর সুস্থতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। ১০ বছরের আদুরী। পটুয়াখালীর এক প্রত্যন্ত গ্রামের ১১ ভাইবোনের পিতৃহীন সংসারের নবম সন্তান আদুরী। বড় দুই বোন রাজধানীতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে। আদুরীকেও তাদের মা সেই কাজে যুক্ত করে দিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। বর্বর নির্যাতনের নিয়মিত শিকার হতে হতো আদুরীকে। ছোট্ট আদুরীর ছোট্ট জীবনে প্রথম গৃহপরিচারিকার জীবন। দিন রাত গাধার খাটুনি খাটতে হতো, কখনো না খেয়ে, কখনো উচ্ছিষ্ট খাবার আধা পেটা খেয়ে দিন কাটতো এই শিশুটির। ছোট্ট শিশুটির দুঃখপীড়িত জীবনেও ছোট্ট একটা সাধ জাগল, কানে দুল পরবে। ছোট্ট প্রজাপতির মতো মনে দুঃখবেদনা কী আর স্থায়ী বাসা বাঁধতে পারে? দুঃসহ পরিস্থিতিতেও তাই কেন যেন কানে একটা ছোট্ট দুল পরতে ইচ্ছে হলো। গৃহকর্ত্রীর কন্যাদের কানের দুল দেখে আদুরীর শখ হয়েছিল দুল পরার। আর তাই তাদের কানের দুল নিয়ে আদুরী কানে পরে ছোট্ট সাধ মেটাচ্ছিল। সেটাই হলো আদুরীর কাল। ধরা পড়ে গেল আদুরী। ব্যস, আর যায় কোথায়! শুরু হলো বর্বর নির্যাতন। গরম খুন্তি দিয়ে আদুরীর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছ্যাঁকা দেয়া হলো। ইস্ত্রি গরম করে পিঠে ছ্যাঁকা দেয়া হলো। আর প্রচ- মারধর। গৃহকর্ত্রীর দুই কন্যা ব্লেড দিয়ে রক্তাক্ত করেছে শিশু আদুরীর সারা শরীর। কঙ্কালসার শিশুটি দীর্ঘকালের অভুক্ত তা স্পষ্ট বোঝা যায় পাঁজরের হাড়গুলো দেখে। শরীরে দগদগে ক্ষত, মাথায় খাবলা খাবলা চুল উঠে গেছে। প্রথম দেখে যে কেউ ভাবতে পারে মানসিকভাবে অপ্রকৃতস্থ শিশু। এর পরের ইতিহাস সকলের জানা।

‘মরে গেছি ভেবে আমাকে ফেলে দিয়েছে আন্টি (গৃহকর্র্ত্রী নদী)’ এ কথাটি হাসপাতালের বেডে শুয়ে বলেছিল ১০ বছরের শিশু আদুরী। আদুরীর সমস্ত শরীর জুড়ে তখন দগদগে পোড়া ক্ষত, ঠোঁট ফুটো হয়ে গেছে গরম খুন্তির ছ্যাঁকায়, ব্লেডের কাটাকুটি শরীরজুড়ে। ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে বারিধারা ও ডিওএইচএস তেলের ডিপোর মাঝামাঝি রেল লাইন সংলগ্ন একটি ডাস্টবিনের পাশ থেকে আদুরীকে মৃতপ্রায় অবস্থায উদ্ধার করেন লিলি আক্তার। আদুরীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোড়া ও নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। এরপর মৃতপ্রায় কঙ্কালরসার মেয়েটিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আদুরী তার জবানবন্দিতে বলেছে, ‘ক্রীতদাসীর মতো জীবন ছিল তার। কারণে-অকারণে হাতে ইস্ত্রির ছ্যাঁকা দিতো নদী। আদুরীর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্লেড দিয়ে নির্মমভাবে ছিঁড়ে দেয়া হতো। এর সঙ্গে ছিল লাঠি দিয়ে পিটুনি। রাতে ও ভাত খেতে দেয়া হতো না। বাঁচিয়ে রাখার জন্যে শুকনো মুড়ি দেয়া হতো আদুরীকে। ঘুমানোর অনেক জায়গা থাকলেও তার ঠাঁই হতো ব্যালকনিতে। ঘটনার ২ মাস আগে আদুরীর মা সাফিয়া বেগম অভাবের তাড়নায় একটু নিরাপদ এবং স্বাভাবিক জীবনের আশায় আদুরীকে সেই বাসায় রেখে গিয়েছিল। আদরীর গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী। পাঁচ ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে সে নবম। ভাই সোহেল, দোয়েল, পান্না পটুয়াখালী নদীতে মাছ ধরে সংসারের ঘানি টানে। বড় বোন তানিয়া, সোনিয়াও ঢাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করে। আদুরীর বাবা বেঁচে নেই।

গৃহপরিচারিকা আদুরীকে দাসযুগের ক্রীতদাসদের মতো ‘কাজের মেয়ে’ মনে করে নির্মম নির্যাতন করতেন গৃহকর্ত্রী। নওরীন জাহান নদী কিভাবে আদুরীকে গরম খুন্তি ও ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতেন এবং সামান্য অপরাধে কিভাবে লাঠিপেটা করতেন নিজেই তার বর্ণনা দেন মহানগর মুখ্য আদালতে। ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ পরে ঢাকা মেডিক্যালে আদুরীর চিকিৎসার তত্ত্বাবধান করেন। শিশু নির্যাতনের অপরাধে গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদীকে গ্রেফতার করা হয়। নির্যাতনকারী গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় মহানগর মুখ্য আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ নূরু মিয়ার কাছে যে জবানবন্দী দেন, তা শুনে অনেকেই শিউরে উঠেছেন।

ডিএমপি পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদ ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারকে বিষয়টি জানানোর পর তাৎক্ষণিকভাবে এই ডিভিশনের ‘কুইক রেসপন্স টিম’ আদুরী সম্পর্কে সকল তথ্য সংগ্রহ করাসহ এই সেন্টার তার সার্বিক দায়িত্বভার গ্রহণ করে। ২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পল্লবী থানায় মামলা রুজু হওয়ার পর মামলাটি ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট এ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে পাঠানো হয়। এই ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে দ্রুত মামলার তদন্ত কাজ শেষ করে চার্জশীট দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের ৪ নবেম্বর ডিএমপি কমিশনারের উপস্থিতিতে আদুরীকে তার মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএমপির পক্ষ থেকে পুলিশ কমিশনার আদুরীকে ৫টি রিকশা দেন। অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মারুফ হোসেনের প্রবাসী স্বজনের পক্ষ থেকে ৭৬ হাজার টাকা এবং মারুফ হোসেন ব্যক্তিগতভাবে ২৫ হাজার টাকাসহ আদুরীকে ১ লাখ ১ হাজার টাকা নগদ দেয়া হয়েছে বলে ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট এ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে জানানো হয়। আদুরীর নির্যাতনের মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। আদুরীর মতো অনেক সন্তান এভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নির্যাতন প্রতিরোধে অনেক সংস্থা কাজ করলেও আইনের সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে নির্যাতন এখনো প্রতিরোধ সম্ভব হয়নি বললেন বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন্স নেটওয়ার্কের সভাপতি মিলি বিশ্বাস।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ এবং নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নারীর ক্ষমতায়ন। এর নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবি এবং বাস্তবতার নিরিখে প্রণীত আইনসমূহ। এর মধ্যে রয়েছে যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০; পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫,; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত) ২০০৩; পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০, মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২, হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন ২০১২, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩, ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন ২০১৪ মহান জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে।

তবে নারী আন্দোলনের সংগঠক এবং বিশ্লেষকেরা মনে করেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সংস্থা নারীবান্ধব না হবার কারণে অপরাধীরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। মহান জাতীয় সংসদে পাস করা আইনের পাশাপাশি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ২০০৯ সালের ১৪ মে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলে উত্ত্যক্তকরণ, যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন রোধের লক্ষ্যে অভিযোগ কমিটি গঠন ও কমিটির কার্যক্রমসহ রায়ের আলোকে পৃথক পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের সুপারিশসহ দিক নির্দেশনা প্রদান পূর্বক নির্দেশাবলী রায় দিয়েছে। এছাড়া ২০১১ সালের ১২ মে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ একটি রায়ে ঘোষণা করেন বেআইনী ফতোয়ার মাধ্যমে বিচার বহির্ভূত শাস্তি প্রদানকে আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ও বেআইনী। এ রায় বাস্তবায়নে সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের কোন উদ্যোগ এখনও দেখা যায়নি। এসব আইন কার্যকর না হবার কারণে তরুণ সমাজও সচেতন নয়।

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০১৪

০৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: