আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঢাকায় দিনরাত

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মারুফ রায়হান

শিল্পীর প্রস্থানের পর

প্রথম সপ্তাহ

উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের সভায় আলোকিত মঞ্চে দীর্ঘ বক্তৃতা শেষ করে নিজ আসনে ফিরে গেলেন চিত্রকর। পরবর্তী বক্তার পালা এবার। মাইক্রোফোনের সামনে তিনি এলেনও। কিন্তু তাঁকে থামিয়ে দিলেন শিল্পী, এসে দাঁড়ালেন ফের ডায়াসের সামনে। বললেন, ‘আমার আর একটা কথা আছে...।’ কথাটি বলা হলো না তাঁর, ঢলে পড়লেন মঞ্চে। চোখের সামনে এ দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কী থাকে উপায়। যেন মুহূর্তে মৃত্যুর শিকার হলেন কাইয়ুম চৌধুরী। চকিতে মনে পড়ে গেল জাতীয় কবিতা উৎসবের দ্বিতীয় আয়োজনের দ্বিতীয় দিবসটির কথা। ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে’ শীর্ষক ব্যঙ্গচিত্রটি এঁকে দর্শক সারিতে সবেমাত্র বসেছেন পটুয়া কামরুল হাসান। কিছুক্ষণের ভেতর চেয়ারে অচেতন হয়ে পড়লেন। আমরা ধরাধরি করে তাঁকে গাড়িতে উঠিয়ে হাসপাতালে নিলাম। আর ফেরা হলো না কামরুল হাসানের। দুই শিল্পীর দুটি মৃত্যু হলো শিল্প সভায়Ñ কবিতা আর গানের জলসায়; অনেকে বলবেন এ মৃত্যু আশ্চর্য শৈল্পিক!

ঢাকার প্রধান প্রধান সব জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতার প্রচ্ছদ হয়ে এলেন এবার স্বয়ং শিল্পী। এর আগে কত শতবার তাঁরই আঁকা চিত্রকর্ম দিয়ে সে সব সাহিত্য পাতার প্রচ্ছদ শোভিত হয়েছে। সমাজে মৌলিক অবদান রাখতে হলে মৌলিক প্রতিভার প্রয়োজন পড়ে; সৌভাগ্যের বরপুত্রও হতে হয়। বাংলাদেশের গ্রন্থ প্রকাশনায়, শুধু গ্রন্থের কথাই বা বলি কেনÑ সাহিত্য পত্রিকা, স্মরণিকা, সাময়িকপত্রসহ বিবিধ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদশিল্প রচনার পথিকৃৎ বলতে হবে কাইয়ুম চৌধুরীকে। কত সংবাদপত্র, কত সাময়িকীর নামলিপি অঙ্কনও (মাস্টহেড ডিজাইন) যে সুসম্পন্ন হয়েছে তাঁর হাতে। এমনকি অধুনা অনলাইনভিত্তিক পত্রিকার নামলিপি অঙ্কনের ক্ষেত্রেও তিনি অনাগ্রহ দেখাননি তার প্রমাণ আমি নিজেই। দুই রঙে দেশের প্রথম অনলাইন সাহিত্য মাসিক ‘বাংলামাটি’র লোগো করে দেন তিনি। শিল্পীর প্রস্থানের পর দেশের সংবাদপত্র ও সাময়িকী ভুবন অকৃপণভাবে তাঁর প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। এটা যে কোন কবির জন্যই খুবই কষ্টের যে, আগামীতে ‘কালি ও কলম’ সাহিত্য পত্রিকার কবিতা অলঙ্করণ আর পাব না তাঁর কাছ থেকে। আশা করি এ গুণী শিল্পীকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হবে। সেই সঙ্গে জরুরী হলো শিল্পীর যাবতীয় রচনা ও সাক্ষাতকারকে মলাটবন্দী করা। প্রায় একযুগ আগে তাঁর জীবনী গ্রন্থনা করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। শিল্পী নিজে আত্মজীবনী লিখে না যাওয়ায় হয়ত এটা হয়ে যেতে পারে তাঁর একমাত্র জীবনকথা। শিল্পীর জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়েও অনেক অজানা কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনার জন্য এ ধরনের প্রামাণ্যচিত্র সহায়ক হতে পারে। শিল্পীর সমীপে আমাদের সম্মিলিত সশ্র্রদ্ধ অভিবাদন তখনই সার্থক হবে যখন আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিল্পীর সামগ্রিক অর্জনের সারাৎ-সার সংরক্ষণ করতে সমর্থ হব।

এশীয় শিল্পের

বর্ণাঢ্য সমাহার

মাসব্যাপী দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী শুরু হয়েছে গত সপ্তাহে। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার চার-চারটি প্রশস্ত ফ্লোরের বিস্তৃত গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে স্বাগতিক বাংলাদেশসহ এশিয়ার বত্রিশটি দেশের বিচিত্র শিল্পকর্ম। একে বলতে পারি আন্তর্জাতিক রং ও রেখার উৎসব। তবে এ মহাপ্রদর্শনীতে কেবল রং ও রেখার কারুকাজ রয়েছে, তা নয়। আছে সিমেন্ট ও ধাতু নির্মিত ভাস্কর্য; বহুধর্মী ইনসটলেশন বা স্থাপনা শিল্পকলা এবং ভিডিও আর্ট। এ সবই স্ব স্ব দেশের সর্বসাম্প্রতিক শিল্প-উৎকর্ষের উজ্জ্বল উদাহরণ। ৩২ দেশের ১০৪ শিল্পীর ২০৪টি শিল্পকর্ম কি একদিনে দেখে ফেলা যায়? না, যায় না। প্রথম দিন শুধু চোখ দিয়ে ছুঁয়ে যাওয়া। চোখ মেলে দেখার জন্য যেতে হবে বার বার। বিশেষ করে ঢাকাসহ দেশের সব চারুকলা শিল্প-প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য এই শিল্প অবলোকন, তার শিল্প সুধার অবগাহন অত্যাবশ্যক বলে মনে করি। দলে দলে শিল্প-শিক্ষার্থীরা আসুন শিল্পরসিকদের পাশাপাশি। কারও মনে যদি এমন ধারণা থাকে যে, এশীয় কেন সব দেশের সেরা শিল্পকর্ম ইন্টারনেটের কল্যাণে কম্পিউটারের বা মোবাইল ফোনের ক্ষুদ্র পর্দায় তো দেখে নেয়া যায়, প্রদর্শনীতে যাওয়ার কী দরকার? তাহলে বড় ভুল হবে। ছবির ছবি দেখা আর আসল দর্শনের মধ্যে রয়েছে প্রচুর ব্যবধান। এই দূরত্ব ঘোচাতে না পারলে প্রকৃত রূপমাধুরী ধরা দেবে না। এশিয়ায় এত দেশ থাকতে আমাদের দেশেই বসছে দু’বছর পর পর শিল্পকলা মেলাÑএর শতভাগ সুবিধা নিতে পিছপা হব কেন? এর আয়োজন করতে পারা এবং ৩২ বছর ধরে তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কি মুখের কথা!

একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর তখন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক। মূলত দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর সূচনা তাঁরই হাতে। সবিস্তারে ইতিহাস তুলে ধরলেন তিনি আমাদের জানার আগ্রহ দেখে। বললেন, ‘১৯৮০ সালে জাপানে ফুকুওকা মিউজিয়ামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো এশীয় শিল্পীদের। এটা ওরা চার বছর পরপর করত। প্রদর্শনীর আগে সব দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা হয়। সরকার থেকে আমাকে বলা হলো ওই সভায় অংশগ্রহণ করার জন্য। আমি জাপানে গেলাম। বাংলাদেশ থেকে শিল্পীরা যাবে, কতগুলো ছবি নেয়া হবে, কিভাবে প্যাকিং হবে। যাবতীয় বিষয় আলোচনা করে দেশে ফিরে এলাম। ইতোমধ্যে আমরা শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে এশিয়ান আর্ট বিয়েনালের প্রপোজাল পাঠিয়েছি মিনিস্ট্রিতে। সেটার অনুমোদনও পাওয়া গেছে। অন্য এক সিনিয়র শিল্পীকেই জাপানে পাঠানোর পরিকল্পনা করলাম। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আমাকেই যেতে বলা হলো। কারণ আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী কিভাবে অনুষ্ঠিত হয় তার যাবতীয় কর্মকা- আমার জেনে আসা ভাল। তাহলে ঢাকায় এশিয়ান দ্বিবার্ষিক শিল্প প্রদর্শনী আয়োজন করতে সুবিধা হবে। সে সময় বহু শিল্পীই বাংলাদেশের নাম পর্যন্ত জানেন না। কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের খবর জানেন। তবে অভিজ্ঞতাহীন এরকম একটি নতুন দেশ কিভাবে আন্তর্জাতিক একটি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে সফল হবেÑ এটা তারা বুঝে উঠতে পারছিল না। তাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করত। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার মতো কিছু কিছু দেশ সরকারীভাবে আমাদের না বলে দিল। তারা আসবে না এশিয়ান বিয়েনালে। জাপানে গিয়ে আমি বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করতে শুরু করলাম এশিয়ান বিয়েনালের জন্য। আমার রুমে দু’একজন করে শিল্পীকে ডেকে আনতাম। তাদের সঙ্গে পানাহার করে গল্পগুজবের মধ্য দিয়ে এশিয়ান বিয়েনালের কথাটা পারতাম। তখন পর্যন্ত এশিয়ার কোন দেশেই দ্বিবার্ষিক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়নি। এখনও হয় না। বাংলাদেশই প্রথম শুরু করেছিল।

জাপানে মুকতার আপিন নামে এক ইন্দোনেশীয়র সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি বেশ দৃঢ় ভূমিকা নিলেন। তিনি বললেন, সরকার যদি সম্মতি নাও দেয় আমরা শিল্পীরা বাংলাদেশে ছবি পাঠাব তোমাদের বিয়েনালে। তোমাদের দেশের শিল্পীরা ভাল কাজ করছেন। মালয়েশিয়ার এক শিল্পী ও শিল্পকলার শিক্ষকও অনুরূপ মত দিলেন। ইন্টারন্যাশনাল এ্যাসোসিয়েশন অব আর্টের রিপ্রেজেন্টেটিভ থাকলেও আমি তখনও সদস্যপদ লাভ করিনি। ইন্দোনেশিয়া থেকে ২০টা ছবি পাঠাল এক প্রতিনিধিসহ। মালয়েশিয়া থেকে প্রিন্ট পাঠাল। সব মিলিয়ে পনেরোটা দেশ অংশগ্রহণ করেছিল। এই সাফল্য বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের জন্য বাঁক ফেরা বা টার্নিং পয়েন্ট বলা যেতে পারে। নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে আমাদের দেশে শিল্পীরা বিদেশী শিল্পী ও শিল্প প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সুযোগ পেলেন। ফলে শিল্পের বিশ্বদরজা খুলে গেল। শিল্পীদের ভেতর মিথস্ক্রিয়া ঘটল। এ থেকে প্রভাবিতও হলেন আমাদের শিল্পীরা। তাদের কাজের ভেতর এক ধরনের পরিবর্তনও সাধিত হলো। বাইরের অরিজিনাল কাজ দেখার সুযোগ তো এর আগে হয়নি। তার আঙ্গিক, কলাকৌশল ও সংগঠন সম্পর্কে এখানকার শিল্পীদের স্পষ্ট ধারণা হলো। এভাবে আমাদের শিল্পীরা উপকৃত হয়েছিলেন, যা আমাদের শিল্পকলারই অগ্রযাত্রা। আমার ব্যক্তিগত শিল্পকর্ম সৃষ্টির বাইরে যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প সংক্রান্ত কাজ থেকে থাকে, তবে সেটা হলো বাংলাদেশে এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীর সূচনা করা। ১৯৯১ সালে পঞ্চম এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন সুসম্পন্ন করার পর আমি শিল্পকলা একাডেমি থেকে অবসর গ্রহণ করি।

বিয়েনাল এক্সিবিশন করতে গিয়ে বহুবার আমি জাপান, ফিলিপিন্স, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও চীনে গেছি। এ সব দেশের শিল্পীদের কাজ সংগ্রহ করেছি। এ দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের বিয়েনাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে যে এমন একটা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী হতে পারেÑ এটা প্রথমদিকে অনেকেই বিশ্বাস করত না, বহু দেশও সন্দেহ প্রকাশ করত। আমরা সাফল্যের সঙ্গে বিয়েনাল করার পর নেপাল থেকে এসেছিলেন শিল্পী লেইন সিঙ বান্ডেল। তিনি বিয়েনালের বিচারকম-লীর একজন ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, তুমি বাদ্যের সঠিক তারে ঘা দিয়েছ। বাংলাদেশ সম্পর্কে আমাদের নেতিবাচক ধারণা ছিলÑ বন্যা, মহামারীর দেশটি পরসাহায্য নির্ভরশীল। তুমি তোমার দেশের এমন একটি দিক তুলে ধরলে যেখানে বাংলাদেশের সাহায্য চাইতে হয় না, সে সাহায্য দিতে পারে। তোমাদের শিল্প অনেক উন্নত হয়েছে।

আসন্ন বিজয় দিবস

বিলবোর্ডে শ্রদ্ধা

গত সপ্তাহের লেখায় ডিসেম্বর আসার আগেই ঢাকার রাজপথে এক পতাকা বিক্রেতার কথা উঠে এসেছিল। বিজয় দিবস আসতে বেশি বাকি নেই। ইতোমধ্যে ঢাকার সব প্রধান সড়কেই কেবল নয়, অলিতে গলিতে পতাকা বিক্রেতার উপস্থিতি লক্ষণীয়। লাল-সবুজের সমারোহ চোখে পড়ার মতোই। পতাকা উড়বে পতপত, আমরা আনন্দ পাব। গর্বিত হব। এই গৌরব ধারণ এবং গৌরবের ধারাবাহিকতা রক্ষাই বড় কথা। তা না হলে পতাকাপ্রিয়তা এক দিনের ফ্যাশনে পরিণত হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল ভুটান। সেই ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিন তোবগে ঢাকায় এলেন বিজয়ের মাসে। ঢাকার ভিআইপি সড়কে বাংলাদেশের লাল-সবুজের সঙ্গে উড়ল ভুটানের হলুদ-কমলার উচ্ছ্বাস।

বিজয় দিবসকে সামনে রেখে ঢাকার রাস্তায় খুব কমসংখ্যক হলেও বিলবোর্ড স্থাপন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। এ জন্য তারা ধন্যবাদ পাবে। তবে একটি কথা বলতেই হবে। যারা উত্তর থেকে দক্ষিণমুখো রাস্তা ব্যবহার করবেন তাদেরই এ বিলবোর্ড নজরে পড়বে। কারণ বিপরীত দিকে রয়েছে অন্য বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড। সিটি কর্পোরেশন চাইলে কি উল্টোদিকের বিলবোর্ডটিও ব্যবহার করতে পারত না? এতে শ্রদ্ধা প্রকাশ আংশিক বা খ-িত হয়ে পড়ে কিনা সেটাও বিবেচ্য। তাছাড়া শহীদদের সালাম জানানোতে গদ্যকথা ব্যবহার না করে গানের অংশ বা কবিতার চরণ উদ্ধৃত করা হলে তা আরও আবেদন জাগাতে পারত। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’, কিংবা ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো/এমন করে আকুল হয়ে আমায় কেন ডাকো’ অথবা ‘স্বাধীনতা তুমি/রবিঠাকুরের অজর কবিতা অবিনাশী গান/স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল/ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ/সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা’Ñ এই পঙ্ক্তিগুলোর নিচে ছোট করে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা’ লেখা থাকলে পথচারীর হৃদয়ে একাত্তরের আলো জ্বালানো সহজ হতো বলে আমার বিশ্বাস।

ছুটির বিকেলে

সরগরম বঙ্গবাজারে

আগামী তিন মাস বঙ্গবাজার ঘুমোবে না। কথাটা একটু খোলাসা করে বলি। শীত মৌসুমের এই তিন মাস বঙ্গবাজার সপ্তাহে সাত দিনই খোলা। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে এর বিকিকিনি। ঢাকা মহানগরীর মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত শ্রেণীর লাখো মানুষের শীত নিবারণীর জন্য গরম পোশাক-আশাক কেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সুলভ মূল্যের এ মার্কেটটির অবস্থান গুলিস্তানের কাছে ফুলবাড়ীয়া এলাকায়। মাজারের পশ্চিম পাশে সিটি কর্পোরেশনের ভবন ছাড়িয়ে আরও সামনে এ মার্কেট। এদিক দিয়ে গেলে অবশ্য একটু ধোঁকায় পড়তে হয়। প্রথমে পড়বে মহানগর কমপ্লেক্স নামে ফিনলে এক মার্কেট। এটিকেও বহুজন, এমনকি খোদ এই মার্কেটের দোকানদাররা বঙ্গবাজার হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালান। এই মহানগর মার্কেটের পাশে রয়েছে আরেকটি মার্কেট, তারপর গিয়ে বঙ্গবাজার। অবশ্য হাইকোর্ট থেকে দক্ষিণের রাস্তায় ঢুকে ফজলুল হক হল ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলে প্রথমে পড়বে বঙ্গবাজার। মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনেÑ শঙ্খ ঘোষের কবিতার লাইনটি সত্য হয়ে উঠেছেÑ‘বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স ব্যবসায়ী সমিতি’ নামফলকটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির প্রচারপত্র বা পোস্টারের নিচে চাপা পড়ে গেছে। পাঠক, জেনে অবাক হবেন এই তিনতলা মার্কেটটি টিনশেডের। নিচতলা ও দোতলার ছাদ কাঠের। মাঝে মাঝে জালি দেয়া ক্ষুদ্র কাঠামো দিয়ে ওপরে চলাচলকারী লোকজন নজরে আসবে। সাড়ে তিন হাত বাই আড়াই হাত মাপের প্রতিটি দোকানেরই স্বতন্ত্র নাম রয়েছে। দোকানের সামনে প্রতিটি দোকানিই একটি করে বেঞ্চ রেখে দোকানের আয়তন বাড়িয়েছেন। তিনটে করে টিউবলাইট এক বা একাধিক বৈদ্যুতিক পাখা রয়েছে দোকানগুলোয়। পুরনো ঢাকার গলির মতোই অজস্র সরু পথ। অনেক জায়গাতেই খদ্দেররা একই সঙ্গে দু’মুখো চলাচল করতে পারবেন না স্বচ্ছন্দে। একজন সরে দাঁড়ালে অপরজন মুভ করতে পারবেন। এইটুকুন দোকানের সর্বনিম্ন ভাড়া সাত হাজার টাকা। আর যদি আয়তকার ক্ষেত্রের মতো দোকানের দু’পাশে চলতি পথ থাকলে তার ভাড়া দশ হাজার টাকা। পঁচিশ থেকে চল্লিশ লাখ পর্যন্ত একেকটি দোকানের মূল্য। তিন ফ্লোর মিলিয়ে রয়েছে সাড়ে তিন হাজার দোকান। জেনে আরও অবাক হবেন এই বঙ্গবাজারেই রয়েছে অলিখিত চারটি ভাগ : ক) বঙ্গবাজার, খ) গুলিস্তান, গ) মহানগর এবং ৪) আদর্শ। প্রধানত গার্মেন্টসের শীতের কাপড়ের বিপণি কেন্দ্র হলেও ঘরের তৈজসপত্র ও রান্নাঘরের জন্য ব্যবহৃত নানা আইটেম বিক্রি হয়। শর্টপ্যান্ট, ট্রাউজার, থ্রি কোয়ার্টার, সোয়েটার, মাফলার, টুপি সব মিলবে এখানে সুলভে। বিদেশে রফতানিযোগ্য কাপড়ে অতি ক্ষুদ্র ত্রুটি ধরা পড়লে তা বাতিলের খাতায় চলে গিয়ে মাঝপথে ঘুরে ঠাঁই নেয় এই বঙ্গবাজারে। গুলশান-বনানীর অভিজাত শপিংমলে যে ট্রাউজার পাঁচ হাজার টাকা, এই বঙ্গবাজারে অবিকল এইরকম দেখতে সেটা কিনে নেয়া যাবে পাঁচ শ’ টাকায়। অবশ্য এখানে একটু দর কষাকষি না করলে ঠকে যেতে হবে। গরম কাপড়ের পাইকারি ও খুচরা বিকিকিনির এই বঙ্গবাজারে ছুটির বিকেলে ছাত্রদের ভিড় তেমন দেখিনি। বরং পরিবারপরিজন নিয়ে ক্রেতারা এসেছিলেন বেশি। অনেক পুরুষ ক্রেতাকেই দেখলাম অবলীলায় গায়ের জামা খুলে ফেলে শার্ট বা ইনার সোয়েটার পরছেন। ভাগ্যিস কেউ অন্য কোন বস্ত্রের জন্য ওপেন ট্রায়াল দেয়ার কসরত করেননি!

কথা বললাম ‘মায়ের দোয়া গার্মেন্টস’-এর রবিউলের সঙ্গে। আগে রবিউল অন্যের দোকানে চাকরি করতেন, এখন নিজেই দোকান মালিক। সদ্য বিয়ে করেছেন। যদিও আগামী তিন মাস তাঁর দেশের বাড়িতে (নোয়াখালী) নববধূর কাছে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়Ñস্যার এই তিন মাসই তো আমরা বেচাকেনা করি, বাকি নয় মাস মাছি মারি। গরমকালে আপনি কি এই দোজখের মধ্যে ঢুকবেন? হ্যাঁ, তীব্র গরম বোঝাতে দোজখের তুলনা দিতে পছন্দ করেন বাঙালীরা। ডিসেম্বরের ঠা-াতেই বঙ্গবাজারের ভেতরে বেশ গরমই লাগল। মাথার ওপরে যদিও ফ্যান ঘুরছে।

নতুন একটা কানাঘুষা শুনলাম। বঙ্গবাজার ভেঙ্গে ফেলা হবে। পাঁচতলাবিশিষ্ট আধুনিক মার্কেট তৈরি করা হবে এখানে। কাজ শুরু হবে শীত মৌসুম শেষ হলেই। স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যে এরই ভেতর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে কে কয়টি দোকান নিজের দখলে নেবেন।

চার ভেন্যুতে

চলচ্চিত্র উৎসব

শীতের শুরুতে ঢাকা এখন আন্তর্জাতিক উৎসবের নগরী। দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর কথা আগেই বলেছি। দ্বিতীয় যে আন্তর্জাতিক উৎসবের কথা বলব সেটি চলচ্চিত্রের। যদিও নির্দিষ্ট সময়দৈর্ঘ্যে মাপা বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা নয়, এই উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে স্বল্প বা মুক্ত দৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র। আর বাণিজ্যের জন্য নয়, বোধের রাজ্যে নাড়া দেয়ার আকাক্সক্ষা থেকেই এ উৎসব। ত্রয়োদশতম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসবটির এবারের সেøাগান ‘মুক্ত ছবি, মুক্ত প্রকাশ।’ ৪০ দেশের দুই শ’র বেশি ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে উৎসবের চারটি ভেন্যুতে। যদিও পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরকে বলা যেতে পারে উৎসবের মূল প্রাঙ্গণ। উৎসব কার্যালয় ও তথ্যকেন্দ্রসহ কিছু স্টল স্থাপিত হয়েছে এখানে। শনিবার সন্ধ্যায় গিয়ে জানলাম বিকেলের প্রদর্শনী যথাসময়ে শুরু হয়ে গেছে। প্রায় দুই শ’র মতো দর্শক টিকেট কেটে ঢুকেছেন শওকত ওসমান মিলনায়তনে। সদ্যপ্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর প্রতিকৃতি শোভা পাচ্ছে প্রাঙ্গণে একটু খোলা জায়গায়। বিপরীত পাশে উৎসবের আমেজ। উৎসব কমিটির গোলাকার কার্যালয়ে ওই সময়ে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করলেন উৎসব কমিটির সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। তরুণ সিনেমাকর্মীদের সঙ্গে জরুরী আলাপে মত্ত হলেন। ঠিক ওই সময়টি পাবলিক লাইব্রেরির লাগোয়া জাতীয় জাদুঘরের নিচতলায় বেগম সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে চলছে সেমিনার। চলচ্চিত্রবোদ্ধা মুহম্মদ খসরু বসে আছেন। কবি গোলাম মোস্তফার দুই নাতনি, প্রবীণ দুই লেখক ফরিদা মজিদ ও ফাহমিদা মজিদ উৎসব কার্যালয়ে ঢুকেছেন। একটু পরই দেখা গেল তরুণ চলচ্চিত্রকার ফারজানা ববিকে হল থেকে বেরিয়ে আসতে। একাত্তরের তিন নির্যাতিত নারীকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘বিষকাঁটা’ কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রদর্শিত হবে, জানা গেল। উপস্থিত সবাইকে ছবিটি দেখার আমন্ত্রণ জানালেন তিনি। এরই মধ্যে এসে উপস্থিত হলেন ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার শ্যাম বেনেগাল। একটু সাড়া পড়ে গেল। নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও মুহম্মদ খসরু তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন। পরিচয় পর্বের শুরুতেই মুহম্মদ খসরু দাদা সাহেব ফালকের প্রসঙ্গ তুললেন। শ্যাম বেনেগাল দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছেন। মিশুক ভদ্রলোক তিনি। অল্পক্ষণের মধ্যেই আসর জমিয়ে তুললেন। একটি অনলাইন পত্রিকার তরুণ নারী সাংবাদিক দাঁড়িয়ে আছেন শ্যাম বেনেগালের সাক্ষাতকার নেবেন বলে। মিলনায়তনের সামনে একটা মঞ্চের মতো করা হয়েছে, সেখানে তিনটে সোফা। সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো শ্যাম বেনেগালকে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মুহুর্মুহু ঝলকানি। টিভি ক্যামেরাও অন হয়ে গেছে। এখানেই খানিকক্ষণ বাদে হবে সংবাদ সম্মেলন। ইতোমধ্যে সন্ধ্যা গড়িয়েছে। আজকের শেষ প্রদর্শনী শুরুর সময় এসে গেল। কার্যালয়ের সামনে দেখা গেল লাইন দাঁড়িয়ে গেছে টিকেট প্রত্যাশীদের।

চলচ্চিত্র উৎসবটি শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার।

ঢাকায় অতিথি

জিয়া হায়দার রহমান

ইংরেজী ভাষায় সাহিত্যচর্চা করছেন মূলত এমন বাংলাদেশী লেখকদের বার্ষিক অনুষ্ঠান ‘হে উৎসব’ উপলক্ষেই তাঁর ঢাকায় আসা গত মাসে অথচ সেই উৎসবে ঠিক স্বস্তি পাননি তিনি। তাঁর ভাষায় এটি এলিটদের উৎসব। চমকপ্রদ সব কথা বলে ইতোমধ্যেই দেশের পাঠকদের মনে কৌতূহল জাগিয়েছেনÑ তিনি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জিয়া হায়দার রহমান; যাঁর একমাত্র ফিকশন ‘ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো’ এরই মধ্যে পশ্চিমে সাড়া ফেলে দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নোটস অব এ্যা নেটিভ সান’ শীর্ষক আয়োজনে এই লেখক কথা বলবেন এবং আগ্রহীদের জিজ্ঞাসার জবাব দেবেনÑ ফেসবুকে এমন একটা অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বিশ্বসাহিত্য বিষয়ক প্রাবন্ধিক মাসরুর আরেফিন। বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে এই লেখককে পরিচয় করানোর কৃতিত্ব অনেকখানি তাঁর। সকাল দশটার বেশ আগেই সোশ্যাল সায়েন্স বিল্ডিংয়ে চলে এসেছিলেন জিয়া হায়দার রহমান, পথ চিনিয়ে হলরুমে নিয়ে গেলেন তাঁকে একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ইংরেজীর শিক্ষক নাহিদ কায়সার। বলাবাহুল্য ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্র-শিক্ষকদের প্রাধান্য ছিল ওই অনুষ্ঠানে।

অনুষ্ঠানে উপন্যাস থেকে অংশবিশেষ পাঠ করেন জিয়া। নিজের লেখালেখি, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথাও বলেছেন তিনি প্রসঙ্গক্রমে। কায়সার হক, ফকরুল আলম- ঢাবির দুই শিক্ষক-লেখক ছাড়াও অনেকেই তাঁকে প্রশ্ন করেন। পশ্চিমা বিশ্ব, এমনকি তিনি যেখানে বাস করেন সেই লন্ডনেও বিদেশীরা এবং তরুণ প্রজন্মের বাংলাদেশীরাও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে তেমন জানেনই না- এটা তাঁর কাছে তাৎপর্যপূর্ণ প্রপঞ্চ বলে মনে হয়। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি এখানে নতুন আইডিয়া কিভাবে উপেক্ষিত থেকে যায় সেটার দিকেই বার বার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য বেশ আলোচিত হয়েছে এবং সেই আলোচনার ঢেউ ফেসবুকেও আছড়ে পড়েছে।

৭ ডিসেম্বর, ২০১৪

marufraihan71@gmail.com

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০১৪

০৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: