কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তরুণরা উদ্বুদ্ধ হোক দেশপ্রেমে

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৪
তরুণরা উদ্বুদ্ধ হোক দেশপ্রেমে

জননী-জন্মভূমি স্বর্গাদপী গরীয়সী-এই লাইনটির মাঝেই নিহিত দেশপ্রেমের মাহাত্ম্য। দেশপ্রেম একটি আদর্শিক বিষয়। দেশপ্রেমের চেতনার গভীরতাই একটি জাতিকে উন্নতির শিখরে, কল্যাণের পথে নিয়ে যেতে পারে। দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘদিন যাবত আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দী ছিলাম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বরে মুখরিত হয়েছিল এই ভূণ্ডখণ্ড। দেশপ্রেমের চেতনায় জনগণ শুরু করেছিল সংগ্রাম। রক্তাক্ত সংগ্রাম। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ভূখ- ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার করালগ্রাস থেকে মুক্তি পেলেও শুরু হয় নতুন ঔপনিবেশিকতা। পাকিস্তানী শাসকদের অত্যাচার-নিপীড়ন-শোষণ-বর্বরতা। কিন্তু এই ভূখণ্ডের মানুষের রক্ত সংগ্রামের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের। তাই তারা এ ঘৃণ্য পশুদের অত্যাচার মেনে নেয়নি। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ২৬ মার্চ গভীর রাতে অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করে। হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা শুরু করে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নেয়। এ অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে লাখো জনতা শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ। মা ও মাটিকে রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মানুষরা ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রু হননের খেলায়। নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার মানসিকতা নিয়ে দেশ রক্ষায় হাতে তুলে নেয় অস্ত্র। প্রবল বিক্রম আর শৌর্যের প্রমাণ রাখে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। রণাঙ্গনে একে একে শত্রু বধ হতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুসেনাদের ঘায়েল করতে সক্ষম হয়েছিল, কারণ তাদের মাঝে ছিল দেশপ্রেমের চেতনা। দীর্ঘ ৯ মাস রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানী বর্বরদের পরাজিত করে আমাদের যোদ্ধারা। ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকেই একে একে বিভিন্ন জায়গা থেকে পাকিস্তানী সৈন্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের দেয়াল ভাঙতে না পেরে পালাতে শুরু করে। ১৬ ডিসেম্বর তারা চূড়ান্তভাবে পরাজয় বরণ করে নেয়। জেনারেল নিয়াজী ৯০ হাজার সৈন্য নিয়ে রেসকোর্সের ময়দানে আত্মসমর্পণ করেন। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের আত্মত্যাগ, দেশপ্রেমের চেতনার মধ্য দিয়ে সমুন্নত করে আমাদের পবিত্র জাতীয় পতাকাকে। তাই ডিসেম্বর আমাদের আনন্দের মাস। বিজয়ের মাস। এই মাস বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযোদ্ধাদের দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের কথা। দেশপ্রেমের মহিলা কীর্তন করে এই মাস।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলেও সত্য যে, বিজয়ের এত বছর পরও আমরা তেমনভাবে উন্নতি লাভ করতে পারেনি। সারাদেশে বিরাজ করছে অরাজকতা। চারদিকে শুধু খুন-খারাপী, চুরি-ছিনতাই, হাঙ্গামা। দুর্নীতির কালো চাদরে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে দেশ। এভাবে চলতে থাকলে খাদের অতলগহ্বরে নিমজ্জিত হয়ে যাবে আমাদের এ দেশ। এত অরাজকতার পেছনে অন্যতম কারণ আমাদের মাঝে এখন আর সেই দেশপ্রেমের চেতনা কাজ করে না। ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক চিন্তা আমাদের মহান বিজয়ের মাহাত্ম্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। হেনরি কিসিঞ্জার এ দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে বলে গিয়েছিলেন। আমরা সেই ঝুড়ির তলা এখনও ঠিক করতে তো পারিইনি, বরং ঝুড়ির অন্যান্য দেয়ালগুলোও ভেঙ্গে পড়ার পথে। হেনরি কিসিঞ্জারের কথাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য চাই দেশপ্রেম। আজকের যুবক-তরুণরাই পারে দেশ যে অন্ধকার খাদের দিকে যাচ্ছে তার থেকে তুলে আনতে। আর এর জন্য তাদের মাঝে বিস্তার করতে হবে দেশাত্মবোধ। অনুপ্রাণিত করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়।

প্রতিবছরই ডিসেম্বরে সারাদেশে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। চারদিকে জাতীয় পতাকা ছেয়ে যায়। আয়োজিত হয় নানা-অনুষ্ঠান। তুলে ধরা হয় মুক্তিযুদ্ধের মাহাত্ম্য। তরুণরা নেয় দৃপ্ত শপথ। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়েই পালিত হয় আমাদের বিজয় উৎসব। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেম এর পরপরই কেন যেন উভে যায়। যদি না যেত, তাহলে দেশে সর্বক্ষেত্রে অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করত না। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে হলেও তরুণদের উপলব্ধি করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের মাহাত্ম্য, দেশপ্রেমের মাহাত্ম্য। শুধু উপলব্ধি করলেই হবে না, একে ধারণ করতে হবে, লালন করতে হবে। আজকের তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনের রাষ্ট্রচালক, কর্ণধার। তাই এদের মাঝে দেশাত্মবোধের বীজ বপন করতেই হবে। জননী ও জন্মভূমি যে স্বর্গ হতেও মহান-এ বোধ তাদের মাঝে সৃষ্টি করতে হবে। ব্যক্তি স্বার্থকেন্দ্রিকতার থেকেও যে দেশপ্রেম অনেক গুরুত্বপূর্ণ এ ধারণা তাদের মাঝে বদ্ধমূল করে দিতে হবে। এ দায়িত্ব আমাদের সবারই। আর তরুণদের বিজয় মাসে শুধু অনুষ্ঠান পালন করলেই হবে না। তাদের নিজেদেরও উপলব্ধি করতে হবে মহান বিজয় উৎসবের মহিমা। বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য ব্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশ রক্ষার কাজে। এ শিক্ষা তরুণদের নিতে হবে। সংগ্রামের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয় বিজয়-এই শিক্ষাও তরুণদের নিতে হবে। তরুণরা যদি মহান বিজয় দিবসের শিক্ষা নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে পারে তবে দেশের অরাজক অবস্থা কেটে যাবে। কেননা তারা দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, সংগ্রাম করবে। দেশের জন্য নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করবে। একটা পর্যায়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর যেভাবে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল মুক্তিযোদ্ধারা, ঠিক সেইভাবেই আজকের তরুণরা দেশের জন্য আরেকটি বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হবে। আর সেটি হচ্ছে বিদ্যমান অরাজক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে জয়। এ বিজয়ের মাসে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের কল্যাণে রুখে দাঁড়াবে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কাজ করবে দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য এটাই হোক তরুণ প্রজন্মের দৃপ্ত শপথ। শপথ বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়েই আজকের তরুণরা দেশকে নিয়ে যাবে উন্নতির শিখরে-এটাই তাদের কাছে সবার প্রত্যাশা।

ছবি: কেবি সোহাগ

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৪

০৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: