আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চাই পরিচ্ছন্ন ঢাকা

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৪
চাই পরিচ্ছন্ন ঢাকা
  • রেজাউল করিম খোকন

বাংলাদেশে নগরায়ন সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুশৃঙ্খলভাবে না হওয়ায় এলোমেলো, বিক্ষিপ্তভাবে চলছে পুরো ব্যাপারটি। একথা না মেনে উপায় নেই যে, নগরায়নের ফলে আমাদের সমাজব্যবস্থায় অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রামীণ আবহ থেকে বেরিয়ে উন্নত জীবনযাপন প্রক্রিয়ার মধ্যে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে নগরায়ন। নগরায়নের ফলে অনেক সুযোগের সৃষ্টি হলেও তা বহু সমস্যার সৃষ্টি করেছে। পরিবেশ দূষণ, নাগরিক সেবার অনুপস্থিতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং অপরাধের বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। নগরায়নের ফলে যে সুযোগগুলো সৃষ্টি হয়েছে তা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক চর্চাসহ অন্যান্য অনেক নাগরিক সুবিধা। নগরায়ন না হলে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সামাজিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। উন্নত এবং আধুনিক সময়ের উপযোগী সামাজিক কাঠামো গড়তে নগরায়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও আমাদের এখানে এর মন্দ প্রভাবগুলো নানাভাবে পীড়া দিচ্ছে নগরবাসীকে। বিশেষ করে অপরিকল্পিত নগরায়ন ক্ষেত্র বিশেষে নগরীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে দিনে দিনে। এখানে প্রভাবশালী, বিত্তশালী, রাজনৈতিক শক্তিধর ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থ সংরক্ষণের কারণে জনস্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ব্যক্তি বিশেষের প্রয়োজনটাকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার কারণে সমগ্রের উপকারে আসে তেমন কর্মকা- পরিচালিত হয় খুবই কম। ধনাঢ্য, উচ্চবিত্তরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করে তেমন অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোতে উন্নত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হলেও মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, দরিদ্র শ্রেণী বসবাস করে অনেকটাই অবহেলিতভাবে। নগরে সকল শ্রেণীর মানুষের উপকারে আসবে তেমন পন্থা অবলম্বনে নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় না, স্রেফ পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এখন বাংলাদেশে নগরমুখী গ্রামীণ মানুষের স্রোত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শহরে গেলে কোন না কোন উপায়ে অর্থ উপার্জন করা যায়। গ্রামে দরিদ্রতার কশাঘাতে জর্জরিত হয়ে অপেক্ষাকৃত নিশ্চিত এবং সমৃদ্ধ জীবনযাপনের স্বপ্নে বিভোর নারী পুরুষের দলে দলে শহরে পাড়ি দেয়ার প্রবণতা আজকের নতুন বিষয় নয়। নদীভাঙ্গন, বন্যা, খরা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিঃস্ব, বিপর্যস্ত, সহায়সম্বলহীন নারী-পুরুষের নগরযাত্রা দিনে দিনে বেড়েছে। তাদের বসবাসের জন্য গড়ে উঠছে অগনিত বস্তি। অনেকে বস্তিতেও ঠাঁই পাচ্ছে না। তারা যত্রতত্র ফুটপাথে, দোকানের ও অফিসের বারান্দায়, রেলস্টেশনের প্ল্যাটফরমে, লঞ্চঘাটে, বাসটার্মিনালে, পার্কে মানবেতরভাবে জীবনযাপন করছে। ঠিকানাহীন মানুষ নগরায়নের অভিশাপ হিসেবে দিনে দিনে এক ধরনের জঞ্জাল হিসেবে অস্বস্তি বাড়িয়ে তুলছে। নগরজীবনে প্রতিদিন নানা বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে উন্নতজীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে গ্রাম ছেড়ে আসা দরিদ্র অসহায় নারী-পুরুষ।

নগরজীবনে প্রাত্যহিক অনেক সমস্যার মধ্যে অসহনীয় যানজট, গণপরিবহন সংকট দিনে দিনে আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। প্রতিদিন ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামার পর পরিবহন সংকটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। বাস, রিক্সা, সিএনজির জন্য অস্থিরভাবে ছুটোছুটি করেন অফিসগামী নারী-পুরুষ যাত্রী। একটি বাস এলে তাতে চড়তে একসঙ্গে অনেকেই প্রতিযোগিতায় নামে। যারা প্রতিযোগিতা করে জিততে পারে তারাই বাসে চড়ার সুযোগ পায়। নারী যাত্রীদের ভোগান্তির মাত্রা আরও বেশি। তারা পুরুষদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির লড়াইয়ে পেরে ওঠে না প্রায় সময়ে। সিএনজি অটোরিক্সা পাওয়া গেলেও সেটা যেতে রাজি হয় না অধিকাংশ সময়ে। মিটারের বদলে সিএনজি চালকের দাবি অনুযায়ী কয়েকগুণ বেশি ভাড়া গুণতে হয় যাত্রীদের। যানজটের কারণে নগরবাসীকে প্রতিদিন অনেকটা মূল্যবান সময় রাস্তায় অপচয় করতে হয়। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরে যানজট সুস্থ সুন্দর নিশ্চিত স্বস্তিদায়ক জীবনযাপনে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। যানজটের কারণে সব শ্রেণীর নাগরিককে অসহায়ভাবে রাস্তায় পড়ে থাকতে হচ্ছে প্রতিদিন। এ ভয়াবহ নাগরিক অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তার কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

নগরজীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা প্রয়োজনীয় সংখ্যক গণশৌচাগারের অভাব। এই সমস্যাটি নাগরিকদের প্রতিদিনই চরম অস্বস্তিতে ফেলছে। জনসংখ্যার দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম জনবহুল শহর। বন্দর নগরী চট্টগ্রামও এই সময়ে দ্রুত বিকাশিত হচ্ছে। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নানাবিধ প্রয়োজনে ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় এক কোটি মানুষ বাসা থেকে বের হয়। অধিকাংশ মানুষেরই মলমূত্র ত্যাগের জন্য শৌচাগার প্রয়োজন। কিন্তু এখানে চাহিদার তুলনায় শৌচাগারের সংখ্যা খুবই কম। যেগুলো রয়েছে সেগুলোর অবস্থাও খুব খারাপ। অধিকাংশই ব্যবহার অনুপযোগী। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার পাবলিক টয়লেটগুলোর বেহাল অবস্থা তুলে ধরতে একটি ফটোগ্রাফিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। যেখানে ফুটে উঠেছে ঢাকার গণশৌচাগার বা পাবলিক টয়লেটের বেহাল দশা। ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ গণশৌচাগার ব্যবহারের কথা চিন্তা করতে পারে না। ফলে মানুষ বেশি সময় ধরে প্রস্রাব, পায়খানা আটকে রেখে কিডনিজনিত রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নারী, প্রতিবন্ধীদের শৌচাগার ব্যবহারে আলাদা ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। যে কারণে ঢাকা শহরে অধিকাংশ নারী কম পানি পান করেন। ফলে তাঁরা পানি স্বল্পতাজনিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। এছাড়া গরিব মানুষ, বিশেষ করে বস্তিবাসী, হকার, রিকশাচালক, ভিক্ষুক ও ভাসমান মানুষ- যারা বেশিরভাগ সময় বাইরে অবস্থান করেন, এই মহানগরীতে তাদের শৌচাগার ব্যবহারের কোন ব্যবস্থাই নেই। ফলে বাধ্য হয়ে তারা ফুটপাতের পাশে, পার্কে, লেকে, সড়কের পাশে বিভিন্ন উন্মুক্ত জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করছে। এতে একদিকে শহরের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ঢাকার কোন কোন জায়গায় কয়েকটি গণশৌচাগার রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন এগুলো বাণিজ্যিকভাবে লিজ দেয়ায় ব্যবহারকারীদের ৫-১০ টাকা খরচ করতে হয়, যা দরিদ্র মানুষের পক্ষে দেয়া অসম্ভব। ফলে তারা উন্মুক্ত জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করে নিত্য শহরের পরিবেশ এবং সৌন্দর্যহানি করছে। ঢাকা শহরে বর্তমানে ৬৯টি গণশৌচাগার রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এ বিষয়ে যথাসম্ভব মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

মডেল: ফাহিম

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৪

০৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: