আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

উন্নত চিকিৎসা, তবে শয্যা সঙ্কটে নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৪

নিখিল মানখিন ॥ রোগীশয্যা সঙ্কট রয়েছে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে। প্রতিদিন মাত্র ৫ থেকে ৮ জন রোগীকে ভর্তি করাতে পারছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শয্যার সিরিয়াল পেতে রোগীদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। স্ট্রোকসহ স্নায়ু সমস্যায় আক্রান্তদের চিকিৎসা দীর্ঘদিনের হওয়ায় রোগী ছাড় দেয়ার হারও কম। গড়ে ১ জন রোগীকে ১২ দিন হাসপাতালে অবস্থান করতে হয়। তবে স্বল্প খরচে স্নায়ু রোগের সেবা পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। ব্রেইন স্ট্রোক রোগীদের উন্নত চিকিৎসাদানে দেশের প্রথম এই অত্যাধুনিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে সরকার। এই হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও প্রশিক্ষিত কর্মচারীদের সঙ্কটও লক্ষ্য করা গেছে। হাসপাতালের পুরো ক্যাম্পাস বেশ পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, গত ২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩শ’ বেডের ধারণক্ষমতা এই হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। বর্তমানে হাসপাতালে চালু আছে এক শ’ বেড। বহির্বিভাগে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত রোগী দেখা হচ্ছে। প্রতিদিন ৩শ’ থেকে ৪শ’ রোগী সেবা নিচ্ছে বহির্বিভাগে। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ জন রোগী ভর্তিযোগ্য হয়ে থাকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেন, নামমাত্র ফি দিয়ে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় এই প্রতিষ্ঠানে। অপেক্ষাকৃত কম খরচে রোগ নির্ণয় ও সুচিকিৎসা পাওয়ায় প্রতিদিন রোগীদের ভিড় লেগেই আছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার শ’ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। সেবার মান উন্নয়নে নেয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা। পরিবেশন করা হচ্ছে উন্নতমানের খাবার। পরিবেশ রাখা হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। দালাল নির্মূলে বসানো হয়েছে সিসি টিভি ক্যামেরা। অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ও যথাযথ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলে স্বাস্থ্যসেবা বিশ্বমানের পর্যায়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিবেশ বেশ পরিচ্ছন্ন। দীর্ঘদিন ধরে প্রচ- মাথা ব্যথায় ভুগছিলেন টাঙ্গাইলের মধুপুর থানাধীন কাকরাইট গ্রামের বাসিন্দা মোঃ ইউসুফ (৪১)। তিনি একজন রিক্সাচালক। পরিবার নিয়ে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডের পাশে টিনশেড বাসায় থাকেন। এই হাসপাতালে বিশ টাকার টিকেট দিয়ে তিনি স্নায়ু বিশেষজ্ঞদের চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। গত ১০ দিন আগে আরেকবার এসেছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো হাসপাতালে এসেছেন। তিনি মাইগ্রেন সমস্যায় আক্রান্ত বলে নিশ্চিত করেছেন চিকিৎসকরা। স্বল্প খরচে নিজের শারীরিক অবস্থা জানতে পেরে খুশি হয়েছেন মোঃ ইউসুফ। কারণ, তাঁর মাথা ব্যথা নিয়ে লোকজনের বিভিন্ন কথা শুনে তিনি বেশ আতঙ্কে ছিলেন। হাসপাতালের ৫ম তলা। যেখানে পুরুষদের ইউনিট। প্রবেশ পথে নিরাপত্তারক্ষী সেলিম। গেট পাশ ছাড়া কেউ অবাধে প্রবেশ করার সুযোগ পাচ্ছে না। দেখে মনে হচ্ছে এটা কোন প্রাইভেট হাসপাতাল। ২নং ইউনিটে ১২ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন মৌলভীবাজারের আকরাম হোসেন (৪৫)। ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। তাঁর স্ত্রী ফরিদা বেগম জানান, তাঁদের আর্থিক অবস্থা ভাল না। বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর বিষয়টি ভাবতেই পারেন না। রোগীকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করানো হয়েছিল। লোকজনের পরামর্শে পরবর্তীতে এই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। মেডিক্যাল পরীক্ষা ও উচ্চমূল্যের কিছু প্রকারের ওষুধের পেছনে টাকা দিতে হলেও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা বেশ সন্তোষজনক। হাসপাতালের পরিবেশও ভাল বলে জানান ফরিদা বেগম। স্ট্রোকের শিকার হয়ে একটি হাত ও একটি পা অবশ হয়ে গেছে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলাধীন মল্লিকবাড়ী গ্রামের সিরাজুল ইসলামের (৫৫)। গত ৯ দিন ধরে এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। শারীরিক অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। কিন্তু চিকিৎসকদের সর্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে থাকার সুযোগ পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সিরাজুল ইসলাম। ১৪ দিন ধরে চিকিৎসাধীন আছেন রামপুরাবাসী বিনা সরকার (৫১)। তাঁর মেয়ে শুভা জনকণ্ঠকে জানান, ভর্তির পর থেকে রোগীর অবস্থার দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। ভর্তি ফি বাবদ ১০ দিনের জন্য তাঁদের কাছ থেকে ২২৫০ টাকা নেয়া হয়েছে। হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে ৫ হাজারের বেশি টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান শুভা। হাসপাতালের বিনা ভাড়ার রোগী শয্যাও রয়েছে। রোগীদের বিছানা, খাট, মেট্রেসসহ পুরো ওয়ার্ডজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চিকিৎসাধীন রোগী হাতেম আলী জানান, অনেক কষ্টে হাসপাতালের সিট পেয়েছি। এখানে চিকিৎসক ও নার্সদের সময় মতো পাওয়া যায়। তবে হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধ পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেন হাতেম আলী। সরেজমিন ঘুরে আরও দেখা গেছে, হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীরা চিকিৎসার জন্য টিকিট কেটে বসে আছে। চিকিৎসকের কাছে একজন চিকিৎসা নেয়ার পর আর একজন প্রবেশ করছেন। রোগীর সঙ্গে একজনের বেশি থাকতে পারছে না। স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা। তাঁরা জানান, এম. আর মেশিন, সিটি স্ক্যান, এনসিভিইএমজি মেশিন, নিউরো-ইনটার ভেনসনসহ আরও আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডাঃ এম এস জহিরুল হক চৌধুরী জানান, ব্রেন এং মেরুদ-ে অপারেশনের গাইড লাইন, রোগী হাসপাতালের আসার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রোকজনিত রোগ নির্ণয়ের জন্য এম. আর মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে রোগীর খরচ পড়বে তিন হাজার টাকা। এই এম. আর মেশিন উপমহাদেশে আছে মাত্র দুইটি। একটা বাংলাদেশে আর একটা ভারতে। অল্প খরচে সিটি স্ক্যান করা হচ্ছে। খরচ পড়ে দুই হাজার টাকা। প্রাইভেট হাসপাতালে খরচ পড়ে সাত হাজার টাকা। নার্ভ এবং মাংসের রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে এনসিভিইএমজি মেশিন। যাতে খরচ পড়ছে সাত শ’ টাকা। স্ট্রোক, ব্রেইন টিউমার, মৃগী রোগ, মাথা ব্যথা, মাংস শুকিয়ে যাওয়া, মাথার আঘাত প্রভৃতি চিকিৎসা হচ্ছে এই হাসপাতালে। স্ট্রোক সম্পর্কে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডাঃ এম এস জহিরুল হক চৌধুরী আরও জানান, স্ট্রোক হচ্ছে মস্তিষ্কের একটি রোগ। এতে রক্তনালির জটিলতার কারণে হঠাৎ করে মস্তিষ্কের একাংশ কার্যকারিতা হারায়। তিনি আরও বলেন, দেশে হাজারে ৫ থেকে ১২ জন স্ট্রোকের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। হঠাৎ শরীরের একাংশ অবশ বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা ও বমি করা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বলতে না পারা এসব হচ্ছে রোগীর প্রধান লক্ষণ। এসব লক্ষণ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে জরুরীভিত্তিতে হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডাঃ জহির। তিনি আরও বলেন, সব স্ট্রোক রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, খিচুনি, অচেতন রোগী, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস থাকলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন। সময় মতো চিকিৎসা পেলে ৩০ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। এর প্রতিরোধ সম্পর্কে তিনি বলেন, রক্তের চর্বি, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বর্জন, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন ঠিক রাখা, প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ শাকসবজি, সতেজ ফলমূল খাওয়ার মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো যায়। ডাঃ এম এস জহিরুল হক চৌধুরী আরও জানান, নামমাত্র খরচে এ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকেন রোগীরা। স্ট্রোকসহ স্নায়ুর বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্তদের চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে থাকে। এ রোগের চিকিৎসাও অনেকটা স্পর্শকাতর। এ হাসপাতালের মতো দেশের অন্য কোন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে স্বল্প খরচে এ রোগের চিকিৎসা দিতে পারবে না বলে দাবি করেন ডাঃ এম এস জহিরুল হক চৌধুরী।

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৪

০৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: