কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পণ্যমূল্য উৎপাদক পর্যায়ে নিশ্চিত করা জরুরী

প্রকাশিত : ৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • এম এ খালেক

আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগের ঘটনা। মানিকগঞ্জের নিকটবর্তী গ্রাম বেতিলায় একজন কৃষক তাঁর প্রায় ২ বিঘা জমিতে উন্নত জাতের বেগুনের চারা রোপণ করেন। প্রচুর বেগুন উৎপাদিত হয়। দুই বিঘা জমি থেকে প্রায় এক লাখ টাকার বেগুন বিক্রি করেন তিনি। সেই কৃষকের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তী বছর এলাকার সবাই বেগুন চাষ শুরু করেন। যার যেটুকু জমি ছিল, তার সবই বেগুন চাষের আওতায় নিয়ে আসা হয়। ফলে সেই বছর এলাকায় বেগুনের বেশি উৎপাদন হয়। এতে বেগুনের দাম পড়ে যায়। গ্রামের হাট-বাজারে বেগুন বিক্রি করতে গিয়ে কৃষকরা পড়েন বিপাকে। প্রতিমণ বেগুন ১০-১১ টাকায় বিক্রি হয়। ঠিক একই সময় রাজধানী ঢাকায় প্রতিকেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছিল ৫ থেকে ৬ টাকায় এতে কৃষকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। উৎপাদন ব্যয় ওঠানো তো দূরে থাক, অনেকেই ভ্যান ভাড়াও তুলতে পারেননি। তাঁদের সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে বেশ কয়েক বছর সময় লাগে। এখন প্রশ্ন হলো, বেগুনচাষীরা সে দিন কেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন? তাঁদের কি এই সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যেত না? এখানে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের যে ভূমিকা পালন করার কথা ছিল, তা তারা করেনি। দ্বিতীয় বছর যখন কৃষকরা বেগুন চাষে অতিমাত্রায় উৎসাহী হয়ে ওঠেন, তখনই তাদের সতর্ক করে দেয়া দরকার ছিল। অতি উৎপাদনের ফলে সে বছর যে বেগুনের দরপতন ঘটতে পাওে, এটা বলে কৃষকদের বেগুন চাষের পরিবর্তে অন্য কোনও ফসল উৎপাদনে উৎসাহী করে তোলা যেত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যদি এটা করতেন, তাহলে উৎপাদক শ্রেণী এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

আমাদের দেশের উৎপাদন শ্রেণী অত্যন্ত অসংগঠিত। দেশের উৎপাদক শ্রেণী বাজারজাতকরণ সম্পর্কে মোটেও সচেতন নন। এ ব্যাপারে তাদের কোন প্রশিক্ষণও নেই। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, একজন কৃষক বা ক্ষুদ্র উৎপাদককে আবার প্রশিক্ষণ দিতে হবে কেন? আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি পণ্য বা সেবা শুধু উৎপাদন করলেই উৎপাদক তা থেকে কাক্সিক্ষত মাত্রায় লাভ বা মুনাফা অর্জন করা যায় না। উৎপাদিত পণ্য বা সেবা সঠিকভাবে বাজারজাত করতে না পারলে সম্পূর্ণ পরিশ্রমই বৃথা যেতে পারে। তাই উৎপাদক শ্রেণীকে প্রথমেই বাজারজাতকরণ সম্পর্কে ধারণা দিতে হয়। কখন কোন্ পণ্য বা সেবা কোথায় এবং কিভাবে বিপণন করলে অধিক মুনাফা লাভ করা যাবে, তা জানতে হয়। এছাড়াও পণ্য ও সেবা বিপণনের ক্ষেত্রে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। কোন পণ্য ও সেবা ভরা মৌসুমে বিক্রি করলে, তাতে কম দাম পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ ভরা মৌসুমে অনেকেই তাদের পণ্য ও সেবা বাজারে নিয়ে আসেন। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট পণ্যের মূল্য কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কোন পণ্য যদি উৎপাদন মৌসুমে বাজারে না ছেড়ে কিছুদিন অপেক্ষা করে বাজারে নিয়ে আসা হয়, তাহলে সেই পণ্যটি বেশি মূল্যে বিক্রি হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের উৎপাদন শ্রেণীর এ বিষয়ক জ্ঞানের অভাব পরিলক্ষিত হয়। এ ছাড়া উৎপাদক শ্রেণী দরিদ্র বিধায়, তারা ইচ্ছে থাকলেও কোন পণ্য বা সেবা উৎপাদনের বেশি দিন ধরে রাখতে পারে না। তারা দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে অর্থ সংগ্রহের জন্য পণ্যটি দ্রুত বাজারে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই অবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। গ্রামে কোন পণ্য সংরক্ষণের ভাল ব্যবস্থা নেই বলে তারা দ্রুত বাজারজাত করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তাদের উৎপাদিত পণ্য যদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে উৎপাদক শ্রেণী তাদের পণ্যের সঠিক মূল্য পেতে পারত।

কৃষকদের আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করা প্রয়োজন। এ ছাড়া উৎপাদিত পণ্য কিভাবে বাজারজাত করলে অধিক মূল্য পাওয়া যাবে, সে সম্পর্কে তাদের ধারণা দিতে হবে। আগেই বলা হয়েছে যে, আমাদের দেশের কৃষক বা গ্রামীণ উৎপাদক শ্রেণী তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে উৎপাদন কার্য সম্পাদন করে থাকেন। এটা মোটেও ঠিক নয়। জমিতে কখন কোন্ সার কী মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে, পানি সেচ দিতে হবে কখন, এসব বিষয়ে কৃষকের আধুনিক ধারণা নেই। ফলে তারা কাক্সিক্ষত মাত্রায় ফল লাভ করতে পারছেন না।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে সব পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয়, তার সঠিক দাম কৃষক বা উৎপাদক শ্রেণী পায় না। এ জন্য কৃষকের অজ্ঞতাই দায়ী। আমরাও তাদের এ ব্যাপারে কোন সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারছি না। কোন্ এলাকায় কী ফসল ভাল হয় বা কোন্ এলাকার মাটি কোন্ ফসল উৎপাদনের জন্য অনুকূল, তা নির্ধারণের জন্য ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা চালানো দরকার। যেমন, মুন্সীগঞ্জে গোল আলু ভাল জন্মে। কিন্তু সেখানে গোল আলুর পরিবর্তে যদি কাঁঠাল ফল চাষ করা হয়, তাহলে উৎপাদন ভাল হবে না, এটাই স্বাভাবিক। তাই আমাদের দেশের প্রত্যেক এলাকার মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে কোন্ জেলায় কী ফসল ভাল হবে তা নির্ধারণ করা জরুরী। প্রতি মৌসুমে ফসল উৎপাদন শুরু করার আগেই বর্ণিত ফসলের স্থানীয় চাহিদা এবং রফতানি চাহিদা বা সম্ভাবনা নির্ধারণ কওে, সেই অনুপাতে ফসলটি উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে কৃষক বা গ্রামীণ উৎপাদক তার পণ্যের সঠিক মূল্য পেতে পারেন।

এছাড়া আমাদের দেশে বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। কৃষক বা গ্রামীণ উৎপাদক এবং ভোক্তা শ্রেণীর মধ্যে কোন সরাসরি যোগাযোগ থাকে না। তাদের মাঝে মধ্যস্বত্বভোগী নামক একটি পরগাছা শ্রেণী ভূমিকা পালন করে। এই মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী অত্যন্ত ক্ষমতাবান এবং সুসংগঠিত। তাদের প্রভাব কোনভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। আমাদের দেশের কোনও সরকারই এই মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীর উপস্থিতি স্বীকার করতে চায় না। যদিও তাঁদের অস্তিত্ব এবং উপস্থিতি অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবেই আমরা অনুভব করি। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে পণ্য ও সেবা উৎপাদনকারী তার পণ্যের সঠিক মূল্য পান না। আবার ভোক্তারাও কম দামে পণ্য ও সেবা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতিহত করে উৎপাদক ও ভোক্তা শ্রেণীর মাঝে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করা গেলে, উভয়পক্ষই লাভবান হতে পারে। এ জন্য গ্রামীণ উৎপাদক শ্রেণীর নিকট থেকে পণ্য ও সেবা সরাসরি ক্রয়ের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এ জন্য সরকারীভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারী উদ্যোগে প্রত্যেকটি ইউনিয়নে একটি করে ক্রয় কেন্দ্র খোলা যেতে পারে। গ্রামীণ উৎপাদক শ্রেণী তাদের উৎপাদিত পণ্য ও সেবা সরাসরি এসব ক্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসবে। সেখান থেকে সরকারী কর্মকর্তারা তা নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করার শহরে চালান করে দেবে। এটা করা হলে কৃষক বা গ্রামীণ উৎপাদক শ্রেণী সঠিক মূল্যে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার সুযোগ পাবে, আর শহরের ভোক্তা শ্রেণী তুলনামূলক স্বল্পমূল্যে এই পণ্য ও সেবা ক্রয় কার সুযোগ পাবেন। এভাবে সুবিধা লাভকারী মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো যেতে পারে। এ ছাড়া অধিকাংশ গ্রামেই যেহেতু এখন বিদ্যুত সরবরাহ রয়েছে তাই সরকারী উদ্যোগে গ্রামগুলোতে কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা যেতে পারে। এসব কোল্ড স্টোরেজে কৃষক বা গ্রামীণ উৎপাদক শ্রেণী তাদের পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের সুবিধা পাবেন। আমাদের দেশে বেশ কিছু পণ্য আছে, যা একটি নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত হয়। সেই মৌসুমে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। কিন্তু এই পণ্যটি যদি কয়েক মাস ধরে রাখা যায়, তাহলে সেগুলো উচ্চমূল্যে বিক্রি করা সম্ভব। আমাদের দেশে বেশিরভাগ কৃষিপণ্যই সরাসরি ভোগ করা হয়, অথচ এগুলো যদি প্রক্রিয়াকরণ করা হতো, তাহলে অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক বেশি লাভবান হওয়া যেত। যেমন, বর্তমানে আম এবং অন্যান্য ফলের মৌসুম চলছে। আমরা আম, কাঁঠাল, লিচু ইত্যাদি ফল সরাসরি গ্রহণ করতেই অভ্যস্ত,অথচ এগুলো যদি প্রক্রিয়াকরণ করা যেত, তাহলে কৃষক অনেক বেশি লাভবান হতে পারতেন। গ্রামীণ এলাকায় ছোট ছোট খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট গড়ে তোলা যেতে পারে। এটা করা গেলে একদিকে যেমন কৃষক তার পণ্যের সঠিক মূল্য পেত, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারত। আমরা বলতে চাইছি, কৃষিকে আর পশ্চাৎপদ না রেখে একে শিল্পের সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করার প্রতি আমাদের উদ্যোগী হতে হবে। মৌসুমে একটি বড় আকারের তরমুজ হয়তো ২০০ বা আড়াই শত টাকা বিক্রি হয়, কিন্তু সেই তরমুজ দিয়ে যদি জুস তৈরি করা যায়, তাহলে তা এক হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে আমাদের পণ্যের উপযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। এর মাধ্যমে আয় বাড়ানো যেতে পারে।

কোনও জমিতে একই ধরনের ফসল বছরের পর বছর উৎপাদন করা হলে, সেখানে উৎপাদন কাম্য স্তরের নিচে নেমে আসতে বাধ্য। কিন্তু আমাদের দেশের চাষীদের মধ্যে এই বোধটুকু নেই বললেই চলে। তাঁরা একই জমিতে বছরের পর বছর একই ফসল ফলান। এতে জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়।

এম এ খালেক, ব্যাংকার ও

অর্থনীতি বিষয়ক লেখক

প্রকাশিত : ৭ ডিসেম্বর ২০১৪

০৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: