কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঘুরে এলাম ভারত

প্রকাশিত : ৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • ফকির আলমগীর

(পূর্ব প্রকাশের পর)

গাইড আমাদের চমৎকার করে এই বিস্ময়কর শিল্পকর্মের নেপথ্য কাহিনী, ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরেন। সাদা মার্বেলের সমাধিসৌধ তাজমহল ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় অবস্থিত। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর তৃতীয় স্ত্রী মমতাজের নামে মমতাজ মহলের স্মৃতি রক্ষার্থে এটি নির্মাণ করেন। তাজমহল মুঘল স্থাপত্যের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃত। এটি ইসলামিক, পার্সিয়া, ওসমানী, ও ভারতীয় স্থাপত্য সমন্বয়ে রচিত। ১৯৮৩ সালে তাজমহল ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। সাদা মার্বেলে সুসজ্জিত সমাধি-সৌধটি তাজমহলের সবচেয়ে পরিচিতি অংশ। এটি মূলত একটি সমন্বিত কাঠামোর কমপ্লেক্স। হাজার হাজার শিল্পী ও কারিগর নিয়োগ করে ১৬৩২ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু করে ১৬৫৩ সালে সমাপ্ত হয়। তাজমহলের নির্মাণকাজ রাজকীয় তত্ত্বাবধানে আবদুল করিম মামুর খান মারকামাত খানও ওস্তাদ আহমদ লাহৌরীসহ গর্বিত স্থাপত্যবিদদের বোর্ডের ওপর ন্যস্ত হয়। শাহজাহান মহারাজ জয় সিংহকে আগ্রা মধ্যবর্তী স্থানে এটি বড় মহল উপহার দেন, প্রায় তিন একর জমি খোদাই করা হয়, স্মরণরোধে কাঁচামাটি ভরাট করা হয় এবং নদীর তীরে ৫০ মিটার (১৬০ ফুট) উঁচু করে সমান করা হয়। সমাধিস্থানে কূপ করে সেখানে সমাধির ভিত্তি স্থাপনের জন্য পাথর ও ইটের কুচি ঢালা হয়। বাঁশের পরিবর্তে শ্রমিকরা একটি বিশাল ইটের ভারা তৈরি করে। সেই ভারাটি এতবড় ছিল যে, শ্রমিকদের প্রধান ধারণা দিয়েছিল সেটি সরাতে বছরখানেক লাগতে পারে।

লোককাহিনী মতে শাহজাহান হুকুম জারি করেন যে, যে কেউ এই মঞ্চ থেকে ইটগুলো নিতে পারে এবং এরূপে তা ক্ষুদ্র কৃষকরা রাতারাতি সেটি সরিয়ে ফেলে। নির্মাণস্থলে মার্বেল ও সামগ্রী পরিবহনের জন্য পনের কিলোমিটারের ঢালু পথ নির্মাণ করা হয় এবং বিশ বা ত্রিশটি ষাঁড়ের দল এই ব্লকগুলোর গাড়ি টেনে নিয়ে যেত। নির্দিষ্ট স্থানে ব্লকগুলো উত্তোলনের জন্য একটি বিশেষ টানার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। একটি বিশাল পানির ট্যাঙ্কে প্রার্থী শক্তির মাধ্যমে রশি ও বালতির মেকানিজমে নদী থেকে পানি উত্তোলন করা হতো এবং এর মাধ্যমে একটি বিশাল পানির ট্যাঙ্ক তৈরি করা হয়। সেখান থেকে তিনটি ট্যাঙ্কে এবং পাইপের মাধ্যমে কমপ্লেক্সে পানি সরবরাহ করা হতো।

ভিত্তি ও সমাধি নির্মাণ সম্পন্ন করতে প্রায় ১২ বছর লেগে যায়। বাকি অংশগুলোর জন্য অতিরিক্ত ১০ বছর সময় লাগে এবং সেগুলো মিনার, মসজিদ, জওয়াব ও তোরণরূপে সম্পন্ন করা হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে কমপ্লেক্স নির্মাণের ফলে এর নির্মাণকাজ সম্পন্নের ব্যাপারে বিভিন্ন তারিখের মতপার্থক্য দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, সমাধিটির কাজ ১৬৪৩ সালের মধ্যে অবশ্যই সম্পন্ন হয়। সমগ্র ভারত ও এশিয়া থেকে সামগ্রী ব্যবহার করে তাজমহল নির্মিত হয় এবং নির্মাণ সামগ্রী পরিবহনে ১০০-এর চেয়ে বেশি হাত ব্যবহৃত হয়। অস্বচ্ছ সাদা মার্বেল রাজস্থানের সারকাসা থেকে, জ্যাসপার পাথর পাঞ্জাব থেকে, জেড ও ক্রিস্টাল চীন থেকে আনা হয়।

তাজমহলের নির্মাণকাজে প্রধান ডিজাইনার লাহোরীকে বিবেচনা করা হয়। এই নির্মাণকাজে ভারত থেকে প্রায় বিশ হাজার শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। বুখারা থেকে ভাস্কর, সিরিয়া ও পার্সিয়া থেকে ক্যালিওগ্রাফার, দক্ষিণ ভারত থেকে পাথর খোদাইকার, বেলুচিস্তান থেকে পাথর কাটার লোক আনা হয়। প্রাসাদশিল্প নির্মাণের জন্য বিশেষজ্ঞ ও মার্বেলে ফুল কাটার জন্য ৩৭ জনের সমন্বয়ে একটি সৃজনশীল ইউনিট তৈরি করে। যাক সে প্রসঙ্গ আসলে স্ত্রীকে ভালবেসে সে সৌন্দর্য নির্মাণ করে শাহজাহান নিঃস্ব করেছিলেন রাজ কোষাগারকে। তিনিই আবার নিঃশেষ হলো তার খেসারত দিতে গিয়েÑ পৃথিবীর ইতিহাসে এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির ঘটনা বিরল। সে সৌন্দর্য নির্মাণ করে বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছিল সম্রাট শাহজাহান সেই তার ছেলে আওরঙ্গজেবের কাছে বন্দি হয়ে আগ্রার লাল কেল্লায় কেবল বাইরের সৌন্দর্যই উপভোগ করতে পেরেছিলেন গাইডের মুখে এসব কথা শুনতে শুনতে মনে হলো অনিন্দসুন্দর তাজমহলের সঙ্গে আর কিছুর তুলনা হয় না। ভালবেসে স্ত্রী মমতাজের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য, মমতা হারিয়েও রেখে গেছেন অমর স্মৃতি। মিষ্টি বিকেলে যমুনার পাড়ে অবস্থিত তাজমহলকে পেছনে ফেলে আমাদের গাড়ি এগিয়ে যায় মথুবার দিকে। এবার সেই পুরনো পথ অর্থাৎ চার ঘণ্টার যানজটযুক্ত সরু রাস্তা অনেকটা অন্ধকার, এছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। অগত্যা ছুটে চলা অন্যান্য পর্যটকদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান মথুরায়।

গাইড পূর্ব থেকেই হিন্দিভাষায়, কখনও ইংরেজীতে আমাদের এই স্থানের ইতিহাস এবং তাৎপর্য তুলে ধরছিলেন সেইযুগের শেষ দিকে এক মহাপুণ্য তিথিতে মথুরা নগরীতে অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে বন্দী দেবকী ও বাসুদেবের বেদনাহত ক্রোড়ে জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দুর্বলের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন করতেই এ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। (চলবে)

প্রকাশিত : ৭ ডিসেম্বর ২০১৪

০৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: