কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দিল্লীতে কয়েক দিন

প্রকাশিত : ৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • সাদিয়া তাবাস্সুম (বৃষ্টি)

একঘেয়েমি আর ব্যস্ততায় ঘেরা জীবন থেকে কিছুটা অবসর পেতেই আকাশ পথে রওনা দিলাম ঢাকা থেকে দিল্লীর উদ্দেশে। কোলাহলে ঘেরা রাজধানীর মাটি থেকে ঔবঃ অরৎধিুং বিমানটি দিল্লীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু“করল। আমার সঙ্গে ছিলেন মা, বাবা, বড় মামা, বড় মামি। প্রায় বাইশ হাজার ফিট ওপর দিয়ে যাচ্ছে আমাদের বিমানটি। অনন্ত আকাশব্যাপী বিশাল হিমালয় পর্বত। একেবারে অজানা, অচেনা অনুভূতি। নতুন এ পথে বেশ ভাল লাগছিল। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ত্রিশ মিনিট পর বিমানটি অবতীর্ণ হলো দিল্লী এয়ারপোর্টে। বিমান থেকে নামার পর প্রথমেই উপলব্ধি করলাম মানুষের ভাষা। বেশিরভাগ মানুষই হিন্দিতে কথা বলছে। আগে থেকেই জানতাম, এখানকার মানুষ হিন্দি, উর্দু, ইংরেজী ও পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলে। তারপরও একেবারে সামনা-সামনি হিন্দি কথা! কিছুটা অবাক হচ্ছি এবং বুঝতে পারছি, আমরা দিল্লী এসেছি। বিমানবন্দরের সকল কাজ শেষ করে একটি টাউন সার্ভিস বাসে উঠে পড়লাম। ঘণ্টা খানেকর মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম পুরান দিল্লীতে। আগে থেকেই ঠিক করা হোটেল ‘তারা প্যালেস’ এ রিসিপসনিস্টের মুখের মিষ্টি হাসি আমাদের তাঁর হোটেলে স্বাগতম জানালেন। হোটেলটি ছিল সম্রাট শাহজাহানকন্যা জাহানারা বেগমের তৈরি বিখ্যাত চাঁদনী চক মার্কেটের খুব কাছাকাছি। লালকেল্লা আর জামে মসজিদ এই হোটেলটি থেকে একেবারেই হাঁটাপথ।

হোটেলে পৌঁছে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর হালকা কিছু খেয়ে আমরা রওনা দিলাম জামে মসজিদ দেখার উদ্দেশ্যে। পথে হেঁটে যেতে চোখে পড়ছিল, ঢাকার সঙ্গে মিলে যাওয়া খুব সুন্দর একটি দৃশ্যÑ তা হলো মানুষের ব্যস্ততা। এখানকার প্রতিটি মানুষ খুবই ব্যস্ত। শীঘ্রই পৌঁছে গেলাম বিশাল আলোকিত এই জামে মসজিদটির সামনে। বহু জায়গায় উল্লেখ আছে, বিখ্যাত এই জামে মসজিদটির নাম। মসজিদটির একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে আমি। প্রধান প্রবেশপথ দিয়ে এই মসজিদে প্রবেশ করেই যেটা চোখে পড়ল, তা হলো অনেক কবুতর। পুরো মসজিদটাজুড়ে যেন কবুতরের মেলা। সবকিছুই যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল। অনিন্দ্য সুন্দর এক খোদার ঘর। এখানে প্রায় ২৫ হাজার লোক একসঙ্গে নামাজ পড়ে। বিশাল এই মসজিদটি লাল পাথর এবং সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে আমরা এই মসজিদটি দেখছিলাম। জামে মসজিদটিতে ঢোকার পর যেটি দেখে বেশি ভাল লাগছিল, তা হলো মসজিদ বলেই যে সেখানে কেবলমাত্র মুসলমানেরই প্রবেশ অনুমতি আছে, তা নয়। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ জানেন, এই মসজিদটি বিশ্বের নামকরা প্রার্থনার জায়গা, তাই দেখতে যান। মানব ধর্মই সব থেকে বড় ধর্ম। এই জন্যই সকল ধর্মের মানুষেরই ছিল প্রবেশের সমান অধিকার। সকল ধর্মের মানুষই শ্রদ্ধার সঙ্গে এই মসজিদটি দেখছেন। সম্রাট শাহজাহানের তৈরি অনিন্দ্য সুন্দর এই জামে মসজিদ যেন সম্রাট শাহজাহানের অমর কীর্তিই বহন করছে। সময় শেষ হওয়ার কারণে আমাদের বেরিয়ে আসতে হলো। এবার কোন ভাল হোটেলে খাওয়ার পালা। লোকমুখে জানতে পারলাম, ওখানকার ভাল হোটেল ‘আল করিমের’ কথা। রাতের খাবার হোটেলে শেষ করে পরিশ্রান্ত শরীরে হোটেল ‘তারা প্যালেস’-এ ফিরে আসলাম।

পরের দিন সকলের নাস্তা সেখানেই সেরে সবাই বেড়িয়ে পড়লাম সম্রাট শাহজাহানের ঐতিহাসিক মোগল স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলীতে নির্মিত লাল কেল্লা দেখার উদ্দেশ্যে। মা-বাবা, মামা-মামির সঙ্গে লাল কেল্লার ভেতরে প্রবেশ করেই বহু প্রতীক্ষিত সেই বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সম্রাট শাহজাহানের সিংহাসনটি ছিল পুরো ময়ূর আকৃতিতে গড়া সোনা ও বিভিন্ন মূল্যবান পাথরের দ্বারা তৈরি। ময়ূর আকৃতিতে গড়ার কারণেই সম্ভবত এটার নামকরণ করা হয়েছিল ময়ুর সিংহাসন।

কালের বিবর্তন ও ঘটনাচক্রে সেই স্বর্ণের সিংহাসনটি না থাকলেও, সেই স্থানটি এখনও আছে। যেখানে ছিল সিংহাসনটি, সেখানে বসেই একসময় সম্রাট শাহজাহান পুরো সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন। অনেকটা বিস্ময়ের চোখে সেই জায়গাটি দেখে আমি মুগ্ধ ও অভিভূত। লাল কেল্লার পুরো জায়গাজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন বিশাল বিশাল ভবন, যার রয়েছে আলাদা আলাদা নামকরণ যেমন- ‘মতি মসজিদ’, ‘মমতাজ মহল’। রানীদের আলাদা থাকার জায়গাসহ বিভিন্ন বিশাল কক্ষ, যা প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা করে নির্মিত। মতি মসজিদ এবং মমতাজ মহলের ঠিক মাঝখানের জায়গাটিতে রয়েছে বিশাল একটি বাগান। বাগানটি সম্রাটের লাল কেল্লাকে আরও সুশোভিত করেছে।

মমতাজ মহলের ভেতরে এখনও মোঘল আমলের অনেক নির্দশন রয়েছে। আড়াই কিলোমিটার এই লাল কেল্লা ঘুরে দেখতে আমাদের প্রায় চার ঘণ্টা সময় লেগেছে। এত অল্প বয়সে বিশাল এই কেল্লাটি ঘুরে দেখে আমি অর্জন করেছি অনেক অজানা অনুভূতি, যার পুরোটা প্রকাশ করা আজ আমার পক্ষে অসাধ্য ব্যাপার। ফিরে এলাম আবার হোটেল ‘তারা প্যালেসে’। দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম।

দিল্লীতে কাটানো অল্প কিছুদিনের মধ্যে সব থেকে মজার মজার যেসব ঘটনা ঘটেছে তার দু’একটি বলার চেষ্টা করছি।

দিল্লীতে যাওয়ার আগে সেখানকার বিখ্যাত জিনিসের মধ্যে কাশ্মীরী চাদরের নাম শুনেছি। অনেক দিনের ইচ্ছাতেই কাশ্মীরের চাদর কিনতে একজন বিক্রেতাকে হোটেলেই ডাকা হলো, বড় মামা, আমি আর মা তিনজনে চাদর দেখতে আসি। অনেকক্ষণ ধরে চাদর দেখার পর দাম জিজ্ঞেস করায় চাদর বিক্রেতা মুচকি হেসে হিন্দিতে বললেন খুব বেশি না সর্বোচ্চ দাম আড়াই লাখ। তবে আমার কাছে, হাজার পঞ্চাশের মতো চাদর আছে। জানি যারা শুনছেন তাঁরা অনেকটা অবাকই হয়েছেন। কিন্তু আমার সে সময় অনেকটা হাসিই পেয়েছিল, কারণ চাদরের দাম শুনে মায়ের দিকে তাকাতে গিয়ে দেখি, মা দাম শুনে লিফট চেপে সোজা সাত তলায় উঠে যাচ্ছে। আর বড় মামার দিকে না তাকিয়ে আমিও আম্মুর পথই ধরলাম। (চলবে)

প্রকাশিত : ৭ ডিসেম্বর ২০১৪

০৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: