রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিশ্ব হ্যাকিং হামলার মুখে

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

সুমন সাহা ॥ বিশ্ব দিনকে দিনে এগিয়ে চলছে ইন্টারনেটের গতিতে, ইন্টারনেটের ওপর ভড় করে। যিনি এই ইন্টারনেটের কথা চিন্তা করেছিলেন তিনি হয়ত নিজেও জানতেন না যে তার এই চিন্তা বিশ্বকে এক নতুন মাত্রা দিয়ে যাবে। যেসব নতুন প্রযুক্তি বা আবিষ্কার যেমন আমাদের জীবনকে সহজ সরল ও আরামদায়ক বানিয়েছে তেমন এই আবিষ্কারগুলোই আমাদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সবার নিশ্চয়ই মনে আছেÑ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পারমাণবিক শক্তির আবিষ্কার যেমন যুগকে নতুন এক রূপ দিয়েছিল ঠিক তেমনই সেটা কিন্তু হিরোশিমা ও নাগাসাকির জন্য কান্নার রূপ দিয়েছিল। তেমনই এই ইন্টাননেটের যুগে আমাদের যেমন এনে দিয়েছে সুযোগ-সুবিধা তেমন এনে দিয়েছে আমাদের ধ্বংস করে দেয়ার মতো ব্যবস্থা। কেউ যেমন কখনই ভেবেছিল না যে পারমাণবিক শক্তি ধ্বংসের কাজে আসতে পারে, তেমন ইন্টারনেট আবিষ্কারের সময় হয়ত কেউ ভাবতেও পারেনি যে এই আবিষ্কার এক একটি রাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দিতে পারে সব দিক থেকেই।

মজার কথা হলো, যখন কম্পিউটার আবিষ্কারই হয়নি তখনই হ্যাকিং শব্দের উৎপত্তি। যে ব্যক্তি প্রথম হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অসদুপায় বেছে নিয়েছিলেন তিনি প্রথম হ্যাকিং করেন টেলিফোনের মাধ্যমে। আস্তে আস্তে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে উন্নত হয়ে হ্যাকিং কৌশল। প্রতিদিন নতুন নতুন উপায়ে হ্যাকিংয়ের শিকার হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন সার্ভার। লুটপাট হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার তথ্য বা অকেজো হয়ে পড়ছে ইন্টারনেটভিত্তিক সিস্টেমগুলো। তাই সাইবার ইস্যু আজ পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বেশি আলোচিত। যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে হিরোশিমা নাগাসাকির পারমাণবিক বিপর্যয়ের চেয়েও মারাত্মক কোন বিপর্যয়। এই সমস্যা সমাধানে সাইবার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি উঠে পড়ে লেগেছে বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী পর্যন্ত। আর বলাই বাহুল্য এতে এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সাইবার বিশ্বে সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা এক দশকের বেশি। তবে গত দু-তিন বছরে বিষয়টি মোড় নিয়েছে ভিন্নদিকে। নিরাপত্তা খাতে স্থায়ীভাবে যোগ হয়েছে সাইবার নিরাপত্তা শাখা।

৪ বছর আগে সামরিক ও সাইবার সমন্বয়ে একটি বিশেষ বিভাগ গঠন করেছে দেশটি। কেবল সাইবার কার্যক্রম চালানোর প্রথম বিশেষায়িত বাহিনী এটি। এ ‘ডিজিটাল বাহিনী’ গঠন করা হয়েছে ৭ হাজার সেনা ও বেসামরিক কর্মীর সমন্বয়ে। এদের মধ্যে কিছু হাজারখানেক চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাও রয়েছেন। তাদের প্রধান কাজ ড্রোনের মতো নানা যন্ত্রের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে। যেগুলোর সাইবার গুরুত্ব সামরিক গুরুত্বেও চেয়ে কোন অংশেই কম নয়।

কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের আওতা যে আরও ব্যাপক। ইরানের পারমাণবিক গবেষণা নস্যাত করতে মারমুখী অবস্থানে থাকা ইসরাইলকে নিয়ে ইরানের সাইবারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সরাসরি কোন প্রমাণ না থাকলেও বিষয়টি ওপেন সিক্রেট বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রেরই লেখক ডেভিড স্যাঙ্গার তার নতুন বইয়ে এ ব্যাপারে এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ২০১০ সালে চালানো সাইবার হামলায় ইরানের পারমাণবিক গবেষণা ব্যাহত করতে স্ট্যাক্সনেট নামে একটি ভাইরাস কম্পিউটারে প্রবেশ করিয়ে দেয় ইসরাইল ও আমেরিকার হ্যাকাররা। এ গুপ্তচর ভাইরাসটি ধরা পড়ে অনেক পরে। শুরুতেই যে বিশেষ ডিজিটাল বাহিনীর কথা বলা হয়েছে, ধরা হয় তাদেরই সহায়তা ঘটেছে ওই সাইবার হামলায়। এই অপারেশনের নাম দেয়া হয়েছিল অলিম্পিক গেমস। অলিম্পিক গেমস অপারেশনের সফলতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পরামর্শদাতারাও অনেক খুশি ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ডেভিস স্যাঙ্গারের বইটিতে।

স্ট্যাক্সনেটের বড় সাফলতা যে এটি ইরানী সাইবারের বিশেষজ্ঞদের ছিদ্র দেখিয়ে দিয়েছিল। আর ইরানের দুর্বলতা রয়েছে এটা জেনেই তখন বেশি খুশি মার্কিন ছিলেন হ্যাকিং বিশেষজ্ঞরা। এক মার্কিন বিশেষজ্ঞ তো জানিয়েই দিয়েছিলেন, ‘দুর্বলতা বুঝতে পেরে ইরানীরা নিজেদের নির্বোধ ভাববে, আর এটিই অলিম্পিক গেমসের বড় সফলতা।’

ইরান ও কিন্তু একেবারেই ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়। তারাও এর জবাব খুব তাড়াতাড়িই দিয়েছে, তবে একটু ভিন্ন উপায়ে। ড্রন নির্দেশনা, পরিচালনা এবং সাইবার নিরাপত্তা দেয়ার জন্য আমেরিকার রয়েছে বিশেষ এক সিকিউরিটি টিম। এত অভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তাদের হার মানতে হয়েছিল ইরানের হ্যাকার টিমের কাছে। বছর খানেক আগেই আমেরিকার একটি ড্রোন গুপ্তচর হিসেবে কাজ করছিল ইরানের আকাশে। কিছুদিন আকাশে ওড়ার পর সেটা ধরা পড়ে ইরানের সামরিক বাহিনীর সাইবার সিকিউরিটি বিভাগের হাতে। আমেরিকার অভিজ্ঞ সিকিউরিটি কর্মকর্তার নাকের ডগা দিয়ে হ্যাক করে ড্রোনটিকে ইরানে নামিয়ে আনতে বেশি কসরত করতে হয়নি ইরানকে। এই নিয়ে দুই দেশের ভেতর এখন এক দমকা সম্পর্ক বয়েই চলেছে। এই দমকা সম্পর্কে আরও ঝড় সৃষ্টি হলো যখন এই ড্রোন আমেরিকাকে ফেরত দিতে ইরান পুরোপুরিই অস্বীকার করল। যার কারণে ইরান-আমেরিকার ভেতর কিছুটা সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে এখনও সংঘাত লেগে রয়েছে। কিছু দিন হলো সেই সেই সংঘাত যেন রূপ নিয়ে এক মহাসাইবার যুদ্ধে।

কোন দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের প্রথম সাইবার আঘাত ছিল এটি। কম্পিউটারের মাধ্যমে হামলা চালানো হয় বলে বিষয়টিতে নতুনত্ব ছিল তো অবশ্যই তবে তথ্যচুরির মতো অপরাধ দেশটির পক্ষে নতুন নয়। যেখানেই যুদ্ধে জড়িয়েছে, সেখানেই কম্পিউটারগুলোর ব্যবচ্ছেদ করে হাতিয়ে নিয়েছে নানা তথ্য। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার সময় ব্যাপকভাবে কম্পিউটারগুলোর মেমোরি হাতিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। নিয়মিত তথ্যচুরির এ কাজে এগিয়ে দেশটির গুপ্তচর সংস্থা এনএসএ। সাইবার বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাবে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া-চীন কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? কখনোই না তাদের সাইবার যোদ্ধারা কিবোর্ডে হাত চালিয়ে তৈরি করে যাচ্ছে নতুন নতুন ম্যালওয়্যার ভাইরাস। এছাড়া অন্যান্য যেসব দেশের বিরুদ্ধে সাইবার আগ্রাসনের যে অভিযোগ রয়েছে, তাদের কেউই বিধ্বংসী কোন ঘটনা ঘটাচ্ছেন না। অধিকাংশই নীরবে চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন করে। তারা অন্ধকার থেকে রতœপাথর বা দামী কষ্টি পাথরের মূর্তি না বরং তারা চুরি করছে মহামূল্যবান তথ্য। স্ট্যাক্সনেটের মাধ্যমে ইরানের যে ক্ষতি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে তার বৈধতা নিয়েও প্রশ্নের আড়ালেই থেকে গেছে। তবে সহজেই অনুমেয়, এতে অনুমতি দিতে দ্বিতীয়বার চিন্তা করেননি বুশ কিংবা ওবামা।

এ ধরনের হামলার কার্যকারিতা ব্যাপক। সাইবার যুদ্ধে ধ্বংস বা রক্তপাত নেই, সবচেয়ে বড় কথা নেই কোটি ডলার খরচের খ—গ। এত সহজে ছিচকে চোরের মতো নিরিবিলি কাজ সারার মোক্ষম অস্ত্র সাইবার হামলা। গোলাগুলোতে হতাহতের খবর ছবিসহ প্রচার করা হয়। কিন্তু সাইবার হামলার ক্ষতি কি সেভাবে উপলব্ধি করা কঠিন। স্ট্যাক্সনেটের আগ্রাসনে ইরানের গবেষণা কিছুদিনের জন্য হলেও পিছিয়েছে। এ নিয়ে বেড়েছে কূটনৈতক ঝামেলাও। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার হামলার মাধ্যমে সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়টি ইঙ্গিত দিচ্ছে তা হল অন্যান্য দেশ কর্তৃক অনুসরণ করার সম্ভাবনা। যুক্তরাষ্ট্র সাইবার হামলায় সক্ষম হলে রাশিয়া কেন পারবে না? অন্যের ঘরে হানা দেয়া যুক্তরাষ্ট্র কি নিজে নিরাপদ? সাদ্দাম হোসেন ও আল কায়েদার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নিষেধ করেছিল প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ও বুশ। কাজেই যুক্তরাষ্ট্র সাইবার বিশ্বে তৎপরতা দেখালে অন্য অনেক দেশই প্রয়োগ করতে চাইবে। সাবেক প্রেসিডেন্ট যুগল ডিজিটাল বাহিনীকে ইন্টারনেট মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ করতেও নিষেধ করেন কারণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ব্যাংকিংয়ের ওপর দেশটির অর্থনীতি প্রচ-ভাবে নির্ভরশীল।

সাইবার হামলার মুখে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও। বিদ্যুত উৎপাদনস্থল ও পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রগুলো বেশিই হুমকির মুখে। ১৯৯৯ সালে ওয়াশিংটনে এ্যাশটি গ্যাসোলিন পাইপ লাইনের বিস্ফোরণ ঘটে ৩ জন মারা যায়। এ দুর্ঘটরনার কারণ ছিল কম্পিউটার সিস্টেমের আচার্যভাবে অকেজো হয়ে যাওয়া। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে চালানো হামলা সফল হলে ঘটতে পারে মারাত্মক কোন দুর্ঘটনা। বাংলায় একটা বাগধারা রয়েছে ‘বাপের ও বাপ রয়েছে।’ যেভাবে সারাবিশ্ব সাইবার ক্রাইম রোধে ও পাশাপাশি হ্যাকিংয়ে শক্তি সামর্থ্য হচ্ছে তাতে কারোই একক অধিপত্ত থাকছে না। কারণ এই সম্পূর্ণ যুদ্ধটা শুধু বুদ্ধি আর টেকনোলজির মাধ্যম দিয়ে হয়, এখানে কার কত সৈন্য-সামন্ত বা গোলাবারুদ আছে তার ওপর নির্ভরশীল নয়। আমাদের দেশও কিন্তু এদিক থেকে এগিয়ে আছে সমান তালে, আমরাও মেধার দিক থেকে কারও থেকেই কম নই।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: