কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে গোপালগঞ্জের ওরা এখন দুধ বিক্রেতা

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

নীতিশ চন্দ্র বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ থেকে ॥ ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছেন গোপালগঞ্জের সাবেক পাঁচ ভিখারী। ওঁরা এখন ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণা করেন। ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে ওঁরা নতুন করে চলার পথ খুঁজে পেয়েছেন। স্বপ্ন দেখছেন নিজেদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার। সমাজের অন্য দশজনের মতো ওরাও এখন মাথা উঁচু করে চলতে শুরু করেছেন।

ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দেয়া ওই পাঁচজনের একজন হলেন চর-কুশলী গ্রামের স্মৃতি রানী সরকার, যার এ জগতে আপন বলতে কেউ নেই। বাড়ি ছিল যশোরে। জন্মের সময়ই মা মারা যান। বড় হয়েছেন পিসিমার বাড়িতে। নাবালিকা অবস্থায় বিয়ের কিছুদিন পর মারা যান স্বামী। এরপর আর তাঁর শ্বশুরবাড়ি যাওয়া হয়নি। একসময় জীবিকার সন্ধানে নামতে হয় তাঁকে। স্থানীয় একটি হোটেলে রান্নার কাজ নেন। সেখানে পরিচয় হয় টুঙ্গিপাড়ার কয়েক মৎস্যজীবীর সঙ্গে। তাদের মাধ্যমে চলে আসেন টুঙ্গিপাড়ার কুশলী গ্রামে। এরপর একে একে কেটে গেছে ৩০টি বছর। কুশলী গ্রামের একটি বাড়িতে আশ্রিতা হিসেবে থেকে বিভিন্ন বাড়িতে কাজকর্ম করেই তাঁর দিন চলত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একসময় তাঁর কর্মক্ষমতাও কমে আসে। জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেন ভিক্ষাবৃত্তি, চলে প্রায় ১০ বছর।

জনকণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে স্মৃতি রানী জানান, একটি বেসরকারী সংস্থার কাছ থেকে তিনি দুটি গাভীসহ কিছু সম্পদ পেয়েছিলেন। এখন দুটি গাভীরই একটি করে বাচ্চা হয়েছে। বর্তমানে ৪ থেকে ৫ কেজি দুধ পান, যা তিনি ঘরে বসেই বিক্রি করে টাকা আয় করতে পারছেন। কিছু দেনা ছিল, তা শোধ করেছেন। চর-কুশলীর যে বাড়িটিতে তিনি আশ্রিত রয়েছেন, সে বাড়িতেই এক শতাংশ জায়গার ওপর একটি ঘরে তিনি বসবাস করছেন, যার একপাশ নিজের জন্য এবং অন্যপাশ ওই গাভীগুলোর বসবাসের জন্য। নিজেকে তিনি এখন যথেষ্ঠ স্বাবলম্বী মনে করেন। তাঁর এ বৃদ্ধ বয়সে তিনি এখন অনেকটা আগের মতোই শক্তি অনুভব করেন। তাই তাঁর ওই গাভী দুটি পালনের পাশাপাশি প্রতিবেশী দু-একটি বাড়িতে পার্টটাইম কাজও করতে পারছেন। তাছাড়া বাড়ি বাড়ি মুড়ি ভেজেও তাঁর ভালো রোজগার হয় বলে তিনি জানান। তিনি মন্তব্য করেন, এতদিন আমি অন্ধকারের পথে ছিলাম, এখন আমি আলোর পথে আসতে পেরেছি।

পাঁচজনের আরেকজন হলেন বাশুড়িয়া গ্রামের জরিনা বেগম। তিনি অন্ধ। তার একটি মেয়ে ‘ফজরা’ চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ত। দিনমজুর স্বামী এনজা শরীফ মারা যাওয়ার পর মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। বেঁচে থাকার তাগিদে তাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে হয় ভিক্ষাবৃত্তি। তিনিও ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছেন ওই সংস্থাটির কাছ থেকে কিছু সম্পদ পাওয়ার পর। জরিনার ভাই আওলাদ হোসেনও এখন বোন ও ভাগ্নিকে কাছে টেনে নিয়েছেন, একই বাড়িতে রেখে একই হাঁড়িতে খাচ্ছেন, গোটা পরিবারই একইসঙ্গে বসবাস করছেন। আওলাদ হোসেনই এখন ওই গরু-ছাগলসহ সবকিছুর দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন। এখন তার গাভী দুধ দেয়। বাচ্চাসহ একটি ছাগলও তাঁর রয়েছে। আর ফজরাও এখন নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। জরিনা বেগম মন্তব্য করেছেন, আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার যে অনুভূতি, তা এমনভাবে কখনও অনুভব করিনি। এখন আর আমার কারও দারস্থ হতে হয় না।

পাঁচজনের একজন চর-কুশলী আদর্শ গ্রামের সোকরা বেগম। তার স্বামী নেই। এক মেয়ে, কোনরকমে বিয়ে দিয়েছিলেন।

কোন এক কালবৈশাখী ঝড়ে তার দু’ছেলে মারা যাওয়ার ক’দিন বাদে তার স্বামীও মারা যান। সেই থেকে মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে তিনজনের একসঙ্গেই বসবাস। জীবিকার তাড়নায় তাঁকে অনেক আগেই ভিক্ষাবৃত্তিতে নামতে হয়। তিনি জানান, একই সম্পদ তিনিও পেয়েছেন এবং ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর নাতিও এখন যুবকে পরিণত হয়েছে। সে-ই মূলত এখন ওই গাভী ও ছাগলের জন্য ঘাসপাতা যোগাড় করা থেকে যাবতীয় দেখাশুনা করেন। তিনি ও তার মেয়ে বাড়ি বসে গাভী ও ছাগলের পরিচর্যা করেন। সুযোগ পেলে দু-একটি বাড়িতে মাঝে-মধ্যে কাজও করেন। গাভী থেকে নিয়মিত দুধ পান, বিক্রি হয়ে যায় বাড়ি থেকেই। সব মিলিয়ে তিনি আগের চেয়ে অনেক ভাল আছেন। তিনি আরও বলেন, এ সম্পদগুলো না পেলে হয়তো এখনও তাঁকে ভিক্ষা করতেই হতো।

পাঁচজনের আরেকজন হলেন নীলফা গ্রামের আসাদুজ্জামান। তিনিও অন্ধ। দীর্ঘদিন তিনি ভিক্ষা করেছেন। বয়সের ভাড়ে কিছুটা ন্যূব্জ হয়ে পড়েছেন। একই সম্পদ পেয়ে তিনিও ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছেন। বৌ জোৎ¯œা এখন তাঁর দেখাশুনা করেন। গাভী ও ছাগলের দেখাশুনা সেই করে। অন্ধত্ব নিয়ে তিনি নিজে যতটুকু পারেন বাড়িতে বসে গাভী ও ছাগলের পরিচর্যা করেন। ওই সম্পদগুলোকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে তিনি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান। আর একজন হলেন দক্ষিণ কুশলী গ্রামের রেসিয়া বেগম। তাঁর স্বামীর এক চোখ অন্ধ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী। স্বামী বাড়িতে পড়ে থাকার কারণে জীবিকার তাগিদে তাঁকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। নামতে হয় ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে। তিনি জানান, তিনিও একই সম্পদ পেয়ে তিনি ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছেন। গাভী থেকে যে দুধ তিনি পান তা বিক্রি করতে প্রথম প্রথম তিনি বাজারেও গেছেন। এ কারণে বাজারে তিনি একজন দুধ-বিক্রেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তবে পাইকাররা এখন তার বাড়িতে এসেই দুধ নিয়ে যায়। এখন বেশিরভাগ সময়ই তিনি এই গাভী ও ছাগল

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: