কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

লালমনিরহাটে চরাঞ্চলের মেয়েরাও এখন স্কুলমুখী

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

জাহাঙ্গীর আলম শাহীন, লালমনিরহাট থেকে ॥ সরকারের অবৈতনিক নারী শিক্ষা কার্যক্রমের সুফল বইতে শুরু করেছে উত্তরাঞ্চলে। নিম্ন আয়ের পরিবারের নারীও এখন শিক্ষার আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে চলেছে। লালমনিরহাট, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও নীলফামারীর গ্রামে, চরাঞ্চলের নারীরাও এখন স্কুলমুখী। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি বা পরিবারে এখন একজন হলেও এসএসসি কিংবা এইচএসসি পাস মেয়ে রয়েছে। দুর্গম চরাঞ্চলের অনেক মেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে নিজের গ্রাম বা চরের গ-ি পেরিয়ে শহরমুখী হচ্ছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় চিনতে শিখেছে। নারী শিক্ষার অগ্রগতিকে সাধারণ মানুষ ইতিবাচক চোখে দেখছে। বর্তমানে নিম্ন আয়ের মানুষ রিক্সাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা থেকে শুরু করে গৃহপরিচারিকার পরিবারের মেয়েও বাড়ির পাশের সরকারী প্রাথমিক স্কুল, উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়ে খুব সহজে এসএসসি বা এইএসসি পাস করছে। এসব শিক্ষিত মেয়ে সমাজ ও পরিবারের কাছে বোঝা না হয়ে জনসম্পদে পরিণত হচ্ছে। পরিবারের প্রয়োজনে, জীবনজীবিকার প্রয়োজনে গার্মেন্টসহ এরা এখন বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছে। এতে দেশের অর্থনীতির চাকাও সচল থাকছে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ধারার তুলনায় উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগ পিছিয়ে রয়েছে। এরমধ্যে লালমনিরহাট জেলা অপেক্ষাকৃত একটু বেশি অনাগ্রসর। স্বাধীনতার ৪৩ বছরে এই জেলায় তেমন কোন শিল্প কলকারখানা গড়ে ওঠেনি। জেলার অর্থনীতি প্রধানত কৃষিনির্ভর। এক সময় তেমন কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই অঞ্চলে ছিল না, বললেই চলে। তাই গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি ছিল সমৃদ্ধ। অভাব অনটন ছিল না। একটু আরাম প্রিয় ও অলস প্রকৃতির ছিল এই অঞ্চলের মানুষ। এক বেলার খাবার ঘরে থাকলে, পরের বেলার চিন্তা করেনি। অল্পে তুষ্ট ছিল রংপুর অঞ্চলের মানুষ। এই অঞ্চলের মানুষকে নিয়ে হয়েছে রাজনীতি। ভোটের সময় নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঠকানো হয়েছে।

উত্তরবঙ্গের ক্ষণজন্মা কৃতী সন্তানদের মধ্যে নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত, সাবেক সেনাবাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান, সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ আন্দোলনের সৈনিক রাজা রামমোহন রায়, কৃষক বিদ্রোহের নেতা নূরুলউদ্দিন, সুফি সাধক কবি শেখ ফজলল করিম জন্মেছেন রংপুরে।

লালমনিরহাট জেলা এখন শতভাগ নিরক্ষরমুক্ত জেলা। ১৯৯১ সালে এই জেলাকে নিরক্ষরমুক্ত ঘোষণা করা হয়। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র খুলে বয়স্ক নারী-পুরুষের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। লালমনিরহাটের উত্তরবাংলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মনওয়ার হোসেন বলেন, এই অঞ্চলে নারী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরী শিক্ষা, প্রকৌশল বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই নারী শিক্ষা বেগবান হবে। শিক্ষিত নারী নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। তিস্তা পাড়ের নদীভাঙ্গনের শিকার পশ্চাদপদ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত মহিষখোচা ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নে ধর্মীয় কড়াকড়ির কারণে নারী শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ ছিল না। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এখানে নারীদের ভোটাধিকারও ছিল না। এ বছর মহিষখোচা স্কুল অ্যান্ড কলেজে মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখায় মোট ৩৭৬ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে ৩২৫ নারী শিক্ষার্থী। পুরুষ শিক্ষার্থী মাত্র ৫০ জন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথমে কেউ প্রবেশ করলে মনে করতেই পারে, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি হয়ত মহিলাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সিদ্ধান্ত মহিষখোচায় নারী শিক্ষার চিত্র পাল্টে দিয়েছে। উগ্রমৌলবাদী চক্রের দাপট খর্ব করেছে। এখন এই অঞ্চলের কয়েক শতাধিক শিক্ষিত নারী ঢাকায় গার্মেন্টস কারখানায় সম্মানজনক বিভিন্ন পদে কাজ করছে। বহু নারী সরকারী চাকরি করছেন।

কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আজিজুল হক জানান, গ্রামের অর্ধশিক্ষিত, শিক্ষিত নারীদের দেশের উন্নয়ন কাজে সম্পৃৃক্ত করতে হবে। তাই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নারী উদ্যোগক্তা তৈরি করতে হবে। নারীদের উৎসাহিত করতে হবে ব্যবসা-বাণিজ্যে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ছালাম (৭০) জানান, জীবনদ্দশায় দেশে নারী শিক্ষার উন্নয়ন দেখে গেলাম। মুক্তিযুদ্ধের একটি স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। নারী শিক্ষার উন্নয়নে তিনি বর্তমান দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সকল কৃতিত্ব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ভাবে মেয়েদের শিক্ষিত করতে উচ্চ শিক্ষাও অবৈতনিক করেছে। বর্তমান সরকারের অবৈতনিক নারী শিক্ষার কৌশলের সুফল তাই ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। বাঙালী বীরের জাতি। সংগ্রামী জাতি। তারা মুক্তিযুদ্ধের অর্জন হারাতে দেবে না। এই দেশ একদিন বিশ্বের কাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে বিশাল অবদান শেখ হাসিনার। তিনি ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে নারী শিক্ষা এসএসসি পর্যন্ত অবৈতনিক করে দেয়। স্বল্প আয়ের পরিবারের কন্যা সন্তানের শিক্ষা নির্বিঘœ করতে শিক্ষা বৃত্তি চালু করেন। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে এইচএসসি ও ডিগ্রী পর্যন্ত নারী শিক্ষা অবৈতনিক করে দেয়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক পর্যায়ে শতভাগ শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে নতুন বছরের শুরুর দিন হতে সরকারীভাবে বই সরবরাহ করা হয়।

সরকারের এই শিক্ষা অনুরাগের কারণে অনাগ্রসর উত্তরাঞ্চলে নারী শিক্ষায় ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। নারীরা এখন শিক্ষিত হয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। শিক্ষিত নারীদের কারণে পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় নারীর প্রতি দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। সমাজ ও সংসার হতে কুসংস্কার বিতাড়িত হয়েছে।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: