মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

এখনও দৃষ্টি কাড়ে নওগাঁর সাড়ে ৪শ’ বছরের কুসুম্বা মসজিদ

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মনে হয় যেন গম্বুজগুলো ছাদের সঙ্গে লেপ্টে আছে

বিশ্বজিৎ মনি, নওগাঁ থেকে ॥ নওগাঁ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বলতম নিদর্শন ঐতিহাসিক ‘কুসুম্বা মসজিদ’ কালের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। ইতিহাসকে জাগ্রত রাখতে সরকার পাঁচ টাকার নোটের উল্টো পৃষ্ঠায় এই কুসুম্বা মসজিদের ছবি ছাপিয়ে দিয়েছেন। শুধু নওগাঁ জেলা নয়, এই মসজিদটি সারাদেশের গৌরব বহন করছে। দেশ-বিদেশের মানুষ এই মসজিদ দেখতে ও নামাজ পড়তে আসেন এখানে। পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় এই স্থানটিতে বিদেশী পর্যটকদের থাকার জন্য একটি পর্যটন মোটেল স্থাপনের দাবি এলাকাবাসীর অনেকদিনের। কিন্তু আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

নওগাঁ জেলা শহর থেকে ৩৫ কিমি. পশ্চিমে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে এই মসজিদের অবস্থান। স্বচ্ছ-সলিলা বিশাল এক দীঘির পশ্চিম পাড়ে ধুসর বর্ণের এই মসজিদটি সকলের দৃষ্টি কাড়ে। ওই দীঘির নাম কুসুম্বা দীঘি। এই দীঘির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২৫০ ফুট ও প্রস্থ ৯শ’ ফুট। এর পাড় বেশ উঁচু। কথিত আছে, এই দীঘির পানিতে পারদ মিশ্রিত থাকায় কচুরি পানা বা কোন আগাছা জন্মিতে পারে না। এই কুসুম্বা মসজিদ উঁচু করে তৈরি খিলান করা ভিতের ওপর নির্মিত। বাংলাদেশে আরও কয়েকটি মসজিদ অনুরূপ খিলানের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণত ভূমিকম্প বা বন্যা-প্রবণ এলাকাতে এভাবে ভবন নির্মাণ করা হয়। ফলে ভবনগুলো বেশিদিন টেকে। সম্ভবত কুসুম্বা মসজিদও এই নির্মাণ কৌশলের জন্য আজো অক্ষত রয়েছে।

কুসুম্বা মসজিদ মুসলিম স্থাপত্যকলার এক অনুপম নিদর্শন। সবর খান বা সোলায়মান নামে জনৈক ধর্মান্তরিত মুসলমান মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের দুটি শিলালিপির প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে মানুষের মনে সংশয় সৃষ্টি করে। তবে কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের শিলালিপি থেকে প্রমাণিত যে, এই মসজিদ ৯৬৬ হি./১৫৫৮ সালে শেরশাহের বংশধর আফগান সুলতান প্রথম গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহের শাসনামলে (১৫৫৪-৬০) নির্মিত। কেন্দ্রীয় মিহরাবের ওপরে হোসেন শাহের একটি শিলালিপি আছে। এতে ৯১০ হি./১৫০৩ খ্রিস্টাব্দে হোসেন শাহের শাসনামলে মসজিদটি নির্মিত বলে অনেকে ধারণা করে থাকেন। কিন্তু এই লিপিটি কুসুম্বা মসজিদে পরে কোন এক সময় স্থাপন করা হয়েছে বলে ঐতিহাসিকরা মত প্রকাশ করেছেন। ‘মাহে নও’ পত্রিকায় এক প্রবন্ধে মোহাম্মদ মতিয়র রহমান হোসেন শাহের লিপির নিম্নরূপ পাঠ উল্লেখ করেছেন। ‘আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই। মুহাম্মদ (দ.) তাঁহার প্রেরিত রাসুল। সুধী ও ন্যায় পরায়নদের রক্ষক এবং দুনিয়া ও দ্বীনের বাদশাহ সৈয়দ আসরাফ আল হোসেনের পুত্র সৈয়দ আবুল মোজাফ্ফর হোসেন শাহ। আল্লাহ পাক তাঁহার বাদশাহী ও রাজত্ব কায়েম করুন : সন-দশম হিজরি।’

প্রাচীন ঐতিহাসিক প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করা যায় কৌশাম্বীর নাম। কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতমে’ কৌশাম্বী নামক একটি স্থানের উল্লেখ রয়েছেন। ‘বরেন্দ্র ভূমির প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদ’ প্রবন্ধে আবদুল আজিজ ফারুক লিখেছেন, ‘রাজশাহী জেলার নওগাঁ মহকুমায় (বর্তমানে জেলা) অবস্থিত বর্তমান কাসুম্বা বা কুসুম্বাও ঐতিহাসিক স্থান। এর উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিস্টাব্দ বারো শতকে রচিত রামচরিতের ভাষ্যে। বিচ্ছিন্নভাবে ইতিহাসের আরও বহুস্থানে কৌশাম্বীর উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। প্রখ্যাত প্রতœতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় নওগাঁর মান্দা থানার বর্তমান কুসুম্বাকেই প্রাচীন কৌশাম্বী বলে উল্লেখ করেছেন। ড. এইচসি রায় চৌধূরীও নওগাঁর কুসুম্বাকে পুরনো কৌশাম্বী বলে স্বীকার করেছেন।

বাংলার স্থাপত্য বিশেষ করে গৌড়ীয় স্থাপত্য রীতিতে কুসুম্বা মসজিদ নির্মিত। সমচতুস্কোন মসজিদটির ছাদ বাংলা কুঁড়েঘরের চালার মতো ঈষৎ ঢালু। গৌড় এবং ত্রিবেনীতে নির্মিত মসজিদের মতো বহু গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের দৈর্ঘ্য ৫৮ ফুট ও প্রস্থ ৪২ ফুট। এই মসজিদের জুল্লাহ বা নামাজ কক্ষের অভ্যন্তর ভাগ দুটি পাথর স্তম্ভ দ্বারা উত্তর-দক্ষিণে দুটি লম্বমান আইল বা খিলান পথ এবং পূর্ব-পশ্চিমে তিনটি ব্যে বা হ্রস্ব গলিপথে বিভক্ত হয়ে ৬টি সম আকৃতির স্পেস বা পরিসর সৃষ্টি করেছে। রাজশাহীর বাঘা মসজিদের মতো এই দুই স্তম্ভের উপরিভাগে সুন্দরভাবে খোদাই করা বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলান আছে। এই খিলানসমূহের কমনীয়তা মুসলিম স্থপতিদের নৈপুন্যের পরিচয় বহন করে। কিন্তু বাঘা মসজিদের ১০টি গম্বুজের স্থলে কুসুম্বা মসজিদে দুই সারিতে ৬টি ছোট অর্ধগোলাকৃতি গম্বুজ আছে। সমচতুস্কোন হলো ঘরে অবস্থিত উপরোল্লেখিত দুটি পিলার বা স্তম্ভের ওপর গম্বুজগুলোর ভার ন্যাস্ত। কুসুম্বা মসজিদের গম্বুজের কোন ভিত্তিবেদি নেই। মনে হয় যেন গম্বুজগুলো গুড়িমেরে ছাদের সঙ্গে লেগে আছে। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভূমিকম্পে মসজিদের ৪টি গম্বুজ ও একটি পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার পিলার ও গম্বুজগুলো পুনর্নির্মাু করান। কুসুম্বা মসজিদ মূলত ইটের তৈরি। ইটের দেয়ালের ভেতর ও বাইরে এমনভাবে দানাদার কালো পাথর দিয়ে আচ্ছাদন দেয়া হয়েছে যে, তা সহজে বুঝার উপায় নেই। মসজিদের চার কোনায় চারটি মিনার আছে। প্রত্যেকটি মিনার কারুকার্যময় উদগত রেখার দ্বারা একাধিক স্তরে বিভক্ত। মিনারের চূড়াগুলো অনেক আগেই ভেঙ্গে গেছে। কুসুম্বা মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে সুন্দরভাবে খোদাই করা কালো আগ্নেয় প্রস্তরের ৩টি মিহরাব আছে। মধ্য মিহরাবের ডান পাশ ঘেঁষে আছে একটি মাত্র পাথর খ-ে তৈরি একটি বড় মিম্বার। মসজিদের ভেতরে উত্তর পাশে গৌড়ের ছোটসোনা মসজিদের মতো একটি পর্দাঘেরা উঁচু মঞ্চ আছে। এটাকে জেনানা গ্যালারি বলা হয়েছে। গ্যালারিতে ওঠার জন্য পাথরের সিঁড়ি আছে। এটি আদিনা মসজিদের বাদশা তখতের অনুকরণে নির্মিত বলা যেতে পারে।

‘মাহে নও’ এ মতিয়র রহমান উল্লেখ করেছেন, ‘মনে হয় এখানে দরবার বসতো বা আলেমরা শাস্ত্র অধ্যয়ন ও আলোচনা করতেন। তবে ড. ইয়াকুব আলী কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, কুসুম্বা মসজিদের উপরতলায় সংরক্ষিত পরিসর রাজকীয় পরিবারের সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। সে কারণে তার প্রবেশপথের ব্যবস্থা মসজিদের ভেতর থেকে করা হয়েছিল। মসজিদে প্রবেশের জন্য পূর্বদিকে সুুচালো খিলানবিশিষ্ট ৩টি প্রবেশপথ আছে। খিলানগুলো আবার তরঙ্গায়িত পলকাটা। বাঘা মসজিদে পাশ থেকে মসজিদে প্রবেশের পথ আছে। কিন্তু কুসুম্বা মসজিদে তা নেই। বরং উত্তর দক্ষিণ দিকে দুটি করে পাথরের ঝাঁঝরি বা গ্রিল করা জানালা আছে। মসজিদের সম্মুখ ভাগের দেয়াল উদগত রেখার কারুকার্য দ্বারা দুই স্তরে বিভক্ত। এর মাঝে আছে কালো পাথরে অলঙ্কৃৃত সমকোনী প্যানেল।

কুসুম্বা মসজিদের প্রধান আকর্ষণ কেন্দ্রীয় মিহরাবের চিত্তাকর্ষী খোদাই কারুকার্য। মিহরাবটি অবতল এবং তরঙ্গায়িত পলকাটা। শিল্প সুষমায় সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে মিহরাবের জন্য বাছাই করা হয়েছিল গ্রেনড ব্লাক ব্যাসাল্ট বা দানাদার কালো আগ্নেয় পাথর। অবতল এই কুলঙ্গি জোড়া ফ্রেম দ্বারা বেষ্টিত। দু’পাশ দিয়ে খ- খ- পাথর সমন্বিতভাবে সাজিয়ে দেয়ালে পিলার স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া আরও আকর্ষণীয় করার জন্য এই সমকোনী কাঠামোটি সূক্ষ্ম ও অনুপম সর্পিল আঁকড়ী, লতা-পাতা, কৃত্রিম গোলাপসহ নানা ফুল দ্বারা অলঙ্কৃত করা হয়েছে। এই মসজিদের মিহরাব নির্মাণ ও অলঙ্করণে স্থপতি এবং খোদাইকারেরা চরম নৈপুন্যের পরিচয় দিয়েছেন। এই কুসুম্বা মসজিদের ৩শ’ গজ পশ্চিমে সোনাবিবির মসজিদ নামে আরও একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ ও জলাশয় আছে। এর আশপাশে ধ্বংসপ্রাপ্ত পুরনো ইমারতের চিহ্ন বিদ্যমান। নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়ক থেকে কুসুম্বা মসজিদে যাওয়ার পথে ডান দিকে বাক্সের মতো একখ- কালো পাথর দেখা যায়।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: