আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভর বছর সকল আবাদ ॥ গ্রামীণ জীবনে উন্নয়নের জোয়ার

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪
ভর বছর সকল আবাদ ॥ গ্রামীণ জীবনে উন্নয়নের জোয়ার
  • খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় অগ্রযাত্রার পালা

সমুদ্র হক ॥ ভর বছর ধানসহ যে কোন খাদ্যশস্য ও সকল ধরনের সবজি উৎপাদিত হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে পুষ্টির যোগান এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেড়ে গিয়েছে সারাদেশে। বিশেষ করে কৃষি প্রধান উত্তরাঞ্চল যন্ত্র ও আধুনিক কৃষির আঁতুর ঘর থেকে উৎপাদিত পণ্য এবং যন্ত্র রফতানির পথে যাত্রা শুরু করেছে। একদার তীব্র অভাব (যা মঙ্গা নামে অধিক পরিচিত) তো জাদুঘরে স্থান পেয়েছেই, দারিদ্র্যের চিহ্ন এখন মাঠ পর্যায়ে সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। গ্রামের মানুষের জীবন মান কতটা উন্নত হয়েছে তা বিদ্যুতায়িত গ্রামগুলোতে গেলে খালি চোখেই দেখা যায়। গেল ক’ বছর ধরে গ্রামের গরিব নারীদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে বছর কয়েক পর তার আর প্রয়োজন হবে না। নারী নিজেরাই স্বাবলম্বী হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা বলয়কে সুদৃঢ় করছে। তাদের কথা, ঘরে বাইরে কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করলে সরকারী সাহায্যের কোন দরকার নেই। গ্রামের ও শহরের শিক্ষিত অনেক মধ্যবিত্ত নারীর কথা, সরকারী চাকরির বেতন ভাতার বড় একটি অংশ শিশুদের লালন পালনে ব্যয় হয়। বিশেষ করে কোন অফিসেই ডে কেয়ার সেন্টার চালু না হওয়ায় ঘরে কাজের লোক রেখে শিশু লালন পালনে যে ব্যয় হয় তার সঙ্গে আরও বাড়তি ব্যয়ে নিরাপত্তা বলয়ে হেরফের ঘটে। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে মাসান্তর ঠিকমতো বেতনের নিশ্চয়তা নেই। এই অবস্থায় গ্রামীণ নারী কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কৃষি কাজ ও উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করে কৃষকের পাশাপাশি কিষাণী দিনে দিনে নিজেদের গরজে সামাজিক ব্যবসার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের বগুড়া, রাজশাহী, জয়পুরহাট, নওগাঁ, পাবনা, নাটোরসহ যে সকল এলাকা প্রায় দারিদ্র্য মুক্ত সেখানে অতি দরিদ্র নারী ও শিশুদের জন্য প্রতি তিন মাস অন্তর ২শ’ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা সরকারী সাহায্য প্রদানের তালিকা করা যায় না। গ্রামের যে সকল নারী স্বাবলম্বী হয়েছে তারা এই অর্থ গ্রহণকে অমর্যাদাকর মনে করতে শিখেছে। তাদের সাফ কথা, এভাবে পরোক্ষ ভিক্ষে নয় কাজ করে পারিশ্রমিক নিতে আগ্রহী। এভাবেও তারা নিজেরাই সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরিতে এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের ও শহরের শিক্ষিত সুধীজনের কথা, প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের দিন বদলের যে পালা শুরু হয়েছে তাতে সাধারণের সামাজিক মর্যাদাবোধ বেড়েছে। তারা উদাহারণ দেন, এই কাজে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কৃষিসহ সকল সেক্টরের বিজ্ঞানীরা। বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) কৃষি বিভাগের পরিচালক এ কে এম জাকারিয়া বললেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) প্রতি বছর নানা ধরনের যে ধান উদ্ভাবন করছে তাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা খরা তীব্র শীত এখন আর আবাদের জন্য কোন সমস্যা নয়। দুর্যোগ কেটে যাওয়ার সঙ্গে এবং কখনও দুর্যোগের মধ্যেই ধান উৎপাদন করা যায় এমন বীজ উদ্ভাবিত হয়েছে। এমন কি নতুন যে জিঙ্ক ধান (বিআর ৬২) উদ্ভাবিত হয়েছে তার মধ্যে জিঙ্কের পুষ্টিমান এতটাই বেশি যে নারী শিশুর চাহিদা মেটাবে। বিশেষ করে প্রসূতি মাতার জন্য এই ধানের চালের ভাত পুষ্টি মেটাবে। অন্যান্য ধান উপাদনে ১শ’ ২০ দিন থেকে দেড় শ’ দিন সময় লাগে। জিঙ্ক ধান উৎপাদনে সময় লাগে ৯০ থেকে ১শ’ দিন। প্রতি বিঘায় উৎপাদনও বেশি এলাকাভেদে ২১ থেকে ৩৩ মণ পর্যন্ত ধান মিলেছে। সাধারণত অন্য ধানে যে উৎপাদন প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২১ মণ। এই বিষয়ে বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা চন্ডি দাস কুন্ডু জানালেন, বগুড়ার প্রতিটি উপজেলায় রোপা আমনের পর জিঙ্ক ধান বীজ সরবরাহ করে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গিয়েছে। সদর, কাহালু শেরপুর এলাকায় ৯৭ দিনে প্রতি হেক্টরে ৪ থেকে সাড়ে ৪ মেট্রিক টন ধান মিলেছে। এই ধানের বড় বৈশিষ্ট হলো বীজ সহজে মেলে। খাবার ধান থেকে আলাদা করে কিছুটা ধান রাখলেই পরবর্তী সিজনে তা থেকে চারা পাওয়া যায়। এই বিষয়ে বগুড়া আরডিএর কৃষি পরিচালক বলেন, দেশে আর হাইব্রিড বীজের কোন প্রয়োজন নেই। হাইব্রিড ধানের বীজ দেশে তৈরি করা যায় না। আমাদের বিজ্ঞানীরা যে বীজ উদ্ভাবন করছে তাই যথেষ্ট। এই বীজ এখন বিদেশে রফতানির প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। জাকারিয়া জানালেন দেশ কতটা এগিয়েছে তার বড় প্রমাণ, তারই সুপারভিশনে ওয়াশিংটন, নেদারল্যান্ডস ও ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষার্থী পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য গবেষণা করছেন। এদিকে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) সেন্টার ফর ইরিগেশন এ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্টের (সিআইডব্লিউএম) পরিচালক মাহমুদ হোসেন খান বললেন যন্ত্র কৃষিকে আরও আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার প্রায়োগিক গবেষণায় সাফল্য এসেছে। একটা সময় এই দেশে বলদের হালের লাঙ্গলে যে চাষ হতো তাতে লাঙ্গলের ফলা জমির অন্তত ৮ ইঞ্চি ভিতরে গিয়ে উর্বর মাটিকে ঠিকভাবে এলোমেলো করে মিশিয়ে দিত। বর্তমানে কলের লাঙ্গলের (পাওয়ার টিলার) ফলা এতটা গভীরে যায় না। এই অবস্থা চললে একটা সময় মাটির নিচেই থেকে যাবে উর্বরতা অংশ। বগুড়া আরডিএ এই অবস্থার উত্তরণে খুব কম খরচে এমন টিলার উদ্ভাবন করেছে যাতে জমির ভিতরে নির্দিষ্ট পরিমাণ নিচেই লাঙ্গলের ফলা পৌঁছে। মাহমুদ হাসান খানের কথা, এভাবে যন্ত্র কৃষি উদ্ভাবনে আবাদি জমিতে ফসল উৎপাদনের হার বেড়ে গিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি হবে।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: