কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

হিন্দী ভাষী বাঙালী কবি

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • আলমগীর সাত্তার

মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায় খুব বড় মাপের দু’জন কবি জন্মগ্রহণ করেছেন। ওই উপজেলার মাইজপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছেন বর্তমান বাংলার শ্রেষ্ঠতম কবি ও ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আর পাশেরই গ্রাম গোপালপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কবি কাজী আশরাফ মাহমুদ।

এ দু’জনকে নিয়েই আমি গর্ববোধ করি। সুনীল শুধু আমার পাশের গ্রামেরই নন, আমার একদম বাড়ির পাশের মানুষ। আর আশরাফ মাহমুদ আমার চাচা। এই শেষোক্তজনকে নিয়ে আমার গর্বের মাত্রাটা একটু বেশি এ জন্য যে, আমি বেশ বড় গলায় বলতে পারিÑএকজন খুব উঁচুমানের কবি এবং আমার শরীরে একই রক্ত বহমান।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম জানেন না এমন শিক্ষিত বাঙালী বোধ হয় নেই। অন্যদিকে আশরাফ মাহমুদের নাম জানেন, বাঙালীদের মাঝে এমন লোক বর্তমানে সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না। এর কারণ তিনি কাব্যচর্চা করেছিলেন হিন্দী ভাষায়। আরও সঠিকভাবে বলতে হবে, মৈথিলী ভাষায়।

কবি আশরাফ মাহমুদ গোপালপুর গ্রামে ১৯০৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা, অর্থাৎ আমার পিতামহ কাজী আবদুস সাত্তার ছিলেন সার্জন অব ইন্ডিয়া পদমর্যাদার ডাক্তার। তিনি অবিভক্ত ভারতের মধ্যপ্রদেশের রায়পুর শহরে একটি ব্রিটিশ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। আশরাফ মাহমুদের বয়স যখন দু’বছর তখন তিনি মায়ের সঙ্গে পিতার কর্মস্থল মধ্যপ্রদেশে চলে যান।

মধ্যপ্রদেশের রায়পুর অঞ্চলের ভাষাকে ঠিক হিন্দী বলা যাবে না। ওখানকার মানুষের মুখের বুলি মৈথিলী, যা কিনা হিন্দী এবং বাংলার মাঝামাঝি। ওই ভাষা হিন্দী এবং উর্দুর চেয়ে অনেক শ্রুতিমধুর। কাজী আশরাফ মাহমুদ দু’বছর বয়সে ওদেশে চলে গিয়েছিলেন। ওখানেই বড় হয়েছিলেন এবং লেখাপড়াও শিখেছিলেন ওখানকার স্কুলে। তাই তারও মুখের বুলি ছিল মৈথিলী। ওই ভাষাতেই তিনি কাব্যচর্চা করেছেন। তাই তাঁর লেখা কবিতাগুলো অনুবাদ ছাড়া আমরা বুঝতে পারি। তাঁর বিরোহী কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় তিনি যে কবিতাটি লিখেছেন, তার থেকে একটুখানি উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

‘বন্ধু না পূছো মুজছে মেরে

ইন গীতোঁ কা জনম-বিকাশ,

কি সী দিবস আ লিখ যাওয়েগা

স্বয়ং প্রেম ইনকা ইতিহাস।’

এখানে উল্লেখ্য, রাজা দশরথ-পুত্র শ্রীরামচন্দ্রের স্ত্রী সীতা ছিলেন মিথিলার রাজকন্যা। মিথিলা রাজ্য ছিল বর্তমানের মধ্যপ্রদেশে। মিথিলার ভাষা ছিল মৈথিলী। যেমন মগধের ভাষা ছিল মাগধী। মৈথিলী এবং মাগধী থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে। মৈথিলী হলো বাংলা ভাষারই আদি ও ক্ল্যাসিক্যাল রূপ। আমরা ওই ভাষার আদিরূপকে কিছুটা হলেও ধরে রেখেছি বলে বাংলা ভাষা এত মধুর এবং কবিত্বময়।

পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ডাক্তার হওয়ার জন্য চাচা আশরাফ মাহমুদ কলকাতার মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কমিউনিস্ট ভাবধারার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ফলে মেডিক্যাল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাকালে কলেজ থেকে তিনি বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি আলীগড় এবং নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে উদ্ভিদ বিজ্ঞানী হন। ওই বিষয়ে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রীও অর্জন করেন।

ডাক্তার আবদুস সাত্তার রায়পুরে মহাত্মা গান্ধী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সেবাগ্রাম আশ্রমে স্বেচ্ছামূলক সেবাদান করতেন। একই সঙ্গে করতেন কংগ্রেস দলীয় রাজনীতি। এ সব কারণে গান্ধীজীর পরিবার এবং ডাক্তার সাত্তারের পরিবারের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই সুবাধে আশরাফ মাহমুদ ও গান্ধী পরিবারের খুব আপনজন হয়ে যান। তবে তিনি বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ হন, গান্ধীজীর পুত্র রামদাস গান্ধীর সঙ্গে।

১৯৪৩ সালে তিনি মধ্যপ্রদেশের রামটেক পাহাড়ে রামদাস গান্ধীর পরিবারের সঙ্গে কিছুদিন বাস করেছিলেন। ওই পরিবারের সঙ্গে বাস করতে গিয়ে তিনি গৃহকর্তার অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়ে সুমিত্রার প্রেমে পড়েন। কবি হবো, প্রেমিক হবো নাÑএমনটা তো হতে পারে না। তাদের এই পারস্পরিক প্রেমের কথা জানাজানি হলে রামদাস গান্ধী এবং তার স্ত্রী খুশি মনেই তাদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দেন। কিন্তু গান্ধীজী এ বিয়ের ব্যাপারে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। সুমিত্রার বয়স ছিল তখন ১৭-১৮ বছর। আশরাফ মাহমুদের বয়স ছিল দ্বিগুণেরও বেশি। বয়সের এই পার্থক্যের জন্যই গান্ধীজী এ বিয়েতে আপত্তি করেছিলেন। ফলে বিরহী কবি হওয়া ছাড়া আশরাফ মাহমুদের উপায়ান্তর রইল না।

আশরাফ মাহমুদের সঙ্গে সুমিত্রা দেবীর বিয়ে না হওয়ায় হিন্দী সাহিত্য একদিকে লাভবান হয়েছিল, আবার অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছিল। সুমিত্রা দেবীর প্রেমের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে কাজী আশরাফ মাহমুদ চিরকুমার থেকে যান এবং কুটজমালা, বিরহী, নিমন্ত্রণ, বিয়োগী, বিয়োগিনী, নিবেদন এমনি বিখ্যাত কয়েকখানা কাব্যগ্রন্থ লিখে গেছেন। কিন্তু অসাধারণ ওসব কবিতায় ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ পেয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু বিরহপূর্ব তার কাব্যে গীতিময়ভাব এবং প্রাণরস ছিল অনেক বেশি।

বিরহপূর্ব কবিতা থেকে উদ্ধৃতি :

‘ঠুমুক ঠুমুক পগ

কুসুম কুঞ্জ মগ

চপল হরিণ আয়ে

হো হো চপল হরিণ আয়ে

মেরে প্রাণ ভুলাওন আয়ে

মেরে নয়ন ভুলাওন আয়ে

রিমিক ঝিমিক ঝিম

নর্তন পদ হরি আয়ে’

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপ কুমার রায় ছিলেন তাঁর সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী গীতিকার ও সুরকার। তিনি আশরাফ মাহমুদের কিছু কবিতা ক্ল্যাসিক্যাল ভজনসঙ্গীত মনে করে তাতে সুরারোপ করে গাইতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে আশরাফ মাহমুদ এবং দিলীপ কুমার রায়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হৃদ্যপূর্ণ সম্পর্ক। আজও মধ্যপ্রদেশের রায়পুর অঞ্চলের মন্দিরে মন্দিরে আশরাফ মাহমুদের লেখা কবিতা ভজনসঙ্গীত হিসেবে ভক্তিভরে গাওয়া হয়।

বিরহপরবর্তী কবিতায় যমুনা তীরের মূরলীওয়ালার বাঁশির সুর আর রইল না। তার পরিবর্তে পেলাম বিরহরসে আপ্লুত কিন্তু অনবদ্য আর এক সৃষ্টি।

বিরহপরবর্তী আশরাফ মাহমুদের কবিতার উদ্ধৃতি :

‘রে নির্দয়, পরওয়ানে,

জ্বলতি হুঁ মৈ কিস্্ জ্বালা মে

ক্যা তু উসকো জানে...’

কুটজ কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতাটির নাম, ‘অন্তিম সন্দেশ’।

তার থেকে চার লাইনের উদ্ধৃতি :

‘মেরে জীবন কে প্রিয়বর,

মেরে কব্র শিলাতল পরÑ

কিসী দিবস আ লিখ যানা

জগ্্ মেঁ হৈ প্রেম অমর’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমিনুল হক সাহেবের অনুবাদ :

‘মোর জীবনের প্রেয়সী গো

আমার কবর শীলা পর;

কোন একদিন লিখে যেও

ধরায় শুধু প্রেম অমর’

কবি আশরাফ মাহমুদ ১৯৪৮ সালে বাংলাদেশে চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর পদে যোগদান করেছিলেন। তারপর অবসরপ্রাপ্ত যখন হলেন, তখন চিরকুমার এই কবি তারই বোন অর্থাৎ আমার বড় ফুফু ডাক্তার জোহরা বেগম কাজীর সেগুনবাগিচার বাসায় কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ১৯৮৩ সালের ৩ ডিসেম্বর তিনি ইহলীলা সম্বরণ করেন।

কাজী আশরাফ মাহমুদের মৃত্যুর পর বুঝতে পারলাম, জানতে পারলাম, বাংলাদেশের বাইরে তিনি কতটা খ্যাতিমান ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর দিন দিল্লী থেকে প্রচারিত অল ইন্ডিয়া রেডিও সারাটা দিন, তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচার করল। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে গান্ধীজীর পুত্র রামদাস গান্ধী তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: