কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কনকচাঁপা চাকমার ‘এখানেই জীবন’

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • খুরশীদ আলম পাটওয়ারী

‘আমি একজন স্বপ্নচারী। স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নে ঘুরে বেড়াই অজানা অনেক কল্পরাজ্যে, যেখানে বাস্তবতা কখনও ডানা মেলতে পারে না। মন বেড়ায় পাহাড়ের কোল বেয়ে বেয়ে। কখনও নিবিড় রুপালি আলোর জ্যোৎস্নায় ছেয়ে যাওয়া কর্ণফুলীর মাঝখানে একটি একাকী নৌকায়, আবার কখনও অঝোর বৃষ্টিতে বনভূমিতে ছুটে চলা।’ নিতান্ত চিত্ররূপময় উল্লিখিত অনুভূতি প্রকাশ করেছেন শিল্পী কনক চাঁপা চাকমা। সম্প্রতি বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে শিল্পীর একক চিত্রপ্রদর্শনী উপলক্ষে নান্দনিক যে, ব্রোশিওর প্রকাশিত হয়েছে সেখানে ইচ্ছে ঘুড়ি শীর্ষক লেখার শুরুটা এভাবেই করেছেন শিল্পী।

বরাবরের মতোই এই ঋদ্ধ শিল্পী আদিবাসী জনপদ, জনগণ তথা পাহাড়ের নিসর্গ, প্রকৃতি, ঝরনা, জলাধার, কৃষ্টি, সংস্কৃতিকে উপজীব্য করে ছবি এঁকে উপস্থাপিত করেছেন। সবুজের চাদরে ঢাকা পাহাড়, ফেনায়িত জল, বর্ণিল প্রকৃতি, হাস্যময়ী, লাস্যময়ী রমণী, নানা উৎসব, পার্বণ প্রভৃতি বিষয় ক্যানভাসে মূর্ত হয়ে ধরা দেয়। ফরাসী দার্শনিক আঁদ্রে মালরোব ভাষায় অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করে শিল্পকলা সৃজন করেছেন এই শিল্পী। শিল্পীর ছবিতে ‘ঝিনুক নীরবে সহো’ এর মতো করুন রাগিণী আছে আদিবাসীদের ভূমিবিষয়ক বঞ্চনার আর অনেক মানুষের চোখের জলে স্ফীত কর্ণফুলী লেকের গল্প। শিল্পী স্বগতোক্তি করেন-কর্ণফুলী তুমি একহাতে অনেক আলোর জন্ম দিলে আরেক হাতে অনেক জীবনের আশার আলো কেড়ে নিলে, সেটা কি তুমি জানো? আমি কান পেতে শুনতে চাই ভূমি হারানো মানুষের ফিনফিনে কান্না। স্বপ্নে দেখতে পাই আমি ছুটে চলেছি এক ভাসমান দ্বীপে, যেখানে অনন্ত সুখ, অথৈ জল আর আকাশের সীমানা এক হয়ে গেছে। আমি সেই ছবি আঁকি, যে জীবন আমি ফিরে পেতে চাই।

প্রদর্শনীতে স্থাপিত ছবিগুলো নানাকৃতির। ছোট এক ফুট থেকে পুরো দেয়ালব্যাপী পনের ফুট দীর্ঘ মাপের ক্যানভাসেও আশ্রিত হয়েছে শিল্পীর আবেগ। দীর্ঘ ঝঢ়রৎরঃবফ ঞৎধফরঃরড়হং শীর্ষক ছবিটি এক্রিলিক মাধ্যমে করা। এই একটি ক্যানভাসে আদিবাসী জীবনাচরণ, উৎসব, ধর্মীয় রীতি, আবেগ সবকিছু পরিস্ফুট হয়েছে। বিশাল এই ছবিতে স্পেসের ব্যবহারও লক্ষণীয়। অনেকগুলো ছোট গল্পের সমাহার হলেও নেই অযথা ফর্মের জড়াজড়ি। রঙের ক্ষেত্রে হলুদ, কলাপাতা সবুজ, কালো, নীল, সাদা, লাল এবং নানাবিধ মিশ্রিত রঙের ব্যবহার দেখা গেছে। জনমানুষের যাপিত জীবনের অনেক অনুষঙ্গ উপস্থাপিত হয়েছে। বাসন্তী বৈচিত্র্য নিয়ে অনেকগুলো ছবি আছে। এগুলোতে রঙের স্ফুর্তি যেন হোলি খেলায় মেতেছে। বর্ণের উদ্গীরণে যেন বসন্তের লাভা বের হচ্ছে আগ্নেয়গিরি থেকে। আবার আকাশী নীল আর হালকা গোলাপী রংও ব্যবহৃত হয়েছে নিপুণভাবে এই ছবিগুলোতে।

একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে শিকারী যুগল তীর ধনুক নিয়ে শিকারে বের হয়েছে। আদিবাসী স্বল্প পোশাক আর পেশল খালি গায়ে তাদের প্রত্যয়ী করেছে শিকার বধে। অধিকাংশ ছবিতেই নারী উপস্থাপিত হয়েছে নানা রকমে, অভিব্যক্তিতে আর সংস্থানে। নারীদেহ চিহ্নিত হয়েছে ব্রাশের আঁচড়ে। মুখ, মুখম-ল, নারীর স্তনাভাস, দেহ সৌষ্ঠব সব মিলিয়ে বাসনা আর মুগ্ধতার চিত্রন ঘটেছে। এছাড়া ছোট আকারের বেশকিছু মুখম-ল তেল রঙে সৃজন করেছেন শিল্পী বিভিন্ন রং আর অবয়বে। মুখম-লগুলো নিরীক্ষা করলে তাদের হৃদয় সংবেদি প্রকাশ পাওয়া যায়। কারও মুখাবয়বে ফুটে উঠেছে স্বস্তি, সুখ, আনন্দ, বেদনা, বিরক্তি আর নাম না জানা নানা অনুভূতি। শিল্পী কনক চাঁপা চাকমার বিজু উৎসব শীর্ষক একটি ছবিতে নানা অলঙ্কার শোভিত চারজন রমণী জলাশয়ে রঙ্গীন সব ফুল ভাসিয়ে দিচ্ছেন আর হালকা আবহে পেছনে উপাসনালয় আর জনপদ দেখা যাচ্ছে।

শিল্পী কনক চাঁপা চাকমা নিজে চাকমা জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় সঙ্গত কারণেই আদিবাসী জনগণের সঙ্গে তাঁদের জীবনাচরণের সঙ্গে রয়েছে তাঁর আজন্ম সখ্য। তিনি বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী কাজ শুরু“করলেন। ২০১২ সালে মুরংদের জীবনের নানাদিক নিয়ে প্রদর্শনী করলেন। দু’বছরের মাথায় এবার চাকমাদের জীবনাচরণ নিয়ে করলেন এই প্রদর্শনী। শিল্পীর ভাষ্যে জানা যায়Ñ প্রতিদিনের মতো কিছু রোদেলা সকাল, অলস বিকেল, জুমে যাওয়া, কালোর নাচগান। এছাড়া আরও কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় এবার যোগ হলোÑ পাহাড় ও ভূমিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা। মূলত শিল্পীর চিত্র কর্মগুলো নিরীক্ষা করলে প্রকৃতির সঙ্গে অবিরাম সখ্য প্রতীয়মান হয়। তবে একই জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় কনক চাঁপা তাদের সুখ, দুঃখ, বিরহ, কষ্ট, স্বপ্ন সবকিছুর অন্তর্নিহিত রূপটি চেনেন। ফলে চিত্র কর্মগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অকৃত্রিম হয়েছে। অব্যক্ত কথামালা ক্যানভাসে প্রকাশিত হয়েছে সহজেই। নিসর্গে অবগাহন করে শিল্পী সেই প্রকৃতি থেকেই নির্যাস নিয়েছেন। পাহাড়ি জনপদ, জনমানুষের ছবি আঁকতে গিয়ে শিল্পী আলো, ছায়া, আঁধারি, রোদের খেলা এবং ফর্ম ও ফিগার নিয়ে নিরীক্ষাপ্রবণ হয়েছেন। এ জন্যই কনকের রমণীগণ দুর্বল নন বরং পেশল, সবল এবং কর্মিষ্ঠ। সঙ্গত কারণেই প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘এখানেই জীবন’ বাস্তব ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

শল্পী কনক চাঁপা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলার সন্তান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ব্যাচেলর এবং মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেলোশিপ নিয়েছেন। অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এটি তাঁর বিশতম একক প্রদর্শনী।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: