রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কাইয়ুম চৌধুরীর গ্রন্থ ভুবন

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মফিদুল হক

একথা সকলে শিরোধার্য করে নেন যে, বাংলা গ্রন্থের প্রচ্ছদ অঙ্কনে কাইয়ুম চৌধুরী এককভাবে বয়ে এনেছিলেন বিপ্লবী রূপান্তর; কিন্তু এই পরিবর্তন ঘটানোর সৃষ্টিশীল মাত্রা ও গভীরতা প্রায়শ থেকে যায় আমাদের নজরের বাইরে। যে সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনদক্ষতা নিয়ে তিনি এমন কাজ করেছেন তার পেছনে কত যে কাঠখড় পুড়েছে, কেটেছে কত বিনিদ্র রাত, সৃজনদেবীর আরাধনায় কত যে উপাচারে সাজাতে হয়েছে অর্ঘ্য, সে সবের হদিশ কে করে!

কাইয়ুম চৌধুরী গ্রন্থের প্রচ্ছদচিত্রণে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন এমন কথা বলা গেলেও তাতে সবটুকু বলা হয় না। কেননা বিপ্লব হচ্ছে এককালীন ঘটনা, যা কোন বাস্তবতাকে নতুন বাবতায় উত্তরণ করে। কিন্তু কাইয়ুম চৌধুরী তো প্রায় ষাট বছরজুড়ে প্রচ্ছদ-অঙ্কনের কাজ করেছেন, বার বার নিজেকে পাল্টেছেনে, প্রচলিত ধারায় নব-রূপান্তর ঘটিয়েছেন,Ñ এই জীবনভর সাধনা তো নিছক এককালীন ও একক বৈপ্লবিক ঘটনা নয়, বারংবার তিনি হয়েছেন নতুনের উদগাতা। দীর্ঘ এই সময়ে মুদ্রণ প্রযুক্তির ঘটেছে বৈপ্লবিক রূপান্তর, পাল্টে গেছে নকশা তৈরির ধরন, এমনকি প্রচ্ছদ অঙ্কনে কাগজ-তুলি-রঙের ব্যবহারেরও বিলোপ ঘটেছে, তারপরও নতুন প্রযুক্তির ধারা করায়ত্ত করে সাবেকী ও সমকালীনের সমন্বয় ঘটিয়ে আধুনিক ধারার প্রচ্ছদ চিত্রণরীতিরও প্রবর্তক হয়েছেন তিনি। সময়ের সঙ্গে কাইয়ুম চৌধুরীও যে রইলেন বহতা, সর্বদা আধুনিক, ঝকঝকে ও হালফিল, সেটা তাঁর শিল্পীজীবনে ও ব্যক্তিজীবনেও প্রকাশ পেয়েছে। সব মিলিয়ে এটা এখন আমরা নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করতে পারি যে, তিনি শিল্পীসত্তা ও জীবনসত্তার মিলনে জীবনভর বহুমুখী কাজ করে গেছেন এবং সর্বদা সতত সর্বকাজে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর এই সম্মিলিত সাধনা যা প্রতিক্ষেত্রে রেখেছে নিজস্বতার অনন্য ছাপ।

কেবল প্রচ্ছদ চিত্রণ ও গ্রন্থসৌকর্যরচনার কথাই যদি বলি তাহলেও আমরা দেখব একজন নিবিড় পাঠক ও সাহিত্যানুরাগী যখন তুলি-কলম হাতে নেন তখন বোদ্ধা ও সংবেদনশীল সত্তা নিয়েই চিত্রণকাজ সম্পন্ন হয়। ফলে কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদ-নকশায় থাকে এক বিশিষ্টতার ছাপ। বইয়ের সঙ্গে বসবাসের ফলে কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন গ্রন্থ সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল, বাংলা গ্রন্থ প্রকাশের ও গ্রন্থচিত্রণের ধারা তিনি নিবিড়ভাবে জেনেছেন, আর সাহিত্যের পাঠ নিয়েছেন বিপুলভাবে। ফলে প্রচ্ছদ-অঙ্কন তাঁর কাছে নিছক কোন ফরমায়েশি কাজ ছিল না, তিনি আনন্দের সঙ্গে মনপ্রাণ ঢেলে করতেন এই কাজ।

ষাটের দশকে, যখন ব্লকে ছাপা হতো রঙিন প্রচ্ছদ, নকশার সঙ্গে ট্রেসিং পেপারে তার আউটলাইন এঁকে দিতে হতো শিল্পীকে, সঙ্গে দিতে হতো কালার চার্ট, যেন রঙের প্রতিটি অংশের আলাদা ব্লক তৈরি করে তা আলাদাভাবে ছাপা যায়। সেইসঙ্গে কাইয়ুম চৌধুরী ব্লকের স্ক্রিনের পরিমাপও বলে দিতেন, এক রঙের ওপর আরেক রঙের মিশেল ঘটলে তৃতীয় কোন্ রঙ ফুটে উঠবে সেটাও তিনি চার্টে দেখিয়ে দিতেন। অনেক শিল্পীই এই বাড়তি বোঝা কাঁধে নিতেন না, সরলভাবে করতেন ডিজাইন, তাতে শৈল্পিক স্পর্শ থাকলেও শিল্পের এক সীমানা টানা থাকতো, কিন্তু কাইয়ুম চৌধুরী মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ ছিলেন, ফলে তাঁর ক্ষেত্রে কেজো সীমানা ছিল অনেক প্রসারিত।

প্রচ্ছদের মাধ্যমে বাংলার জনরুচি বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছেন কাইয়ুম চৌধুরী। ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ববাংলায় নতুন ধারার প্রকাশনার উদগাতা যেমন ছিলেন সৃষ্টিশীল কতক লেখক, প্রকাশক, তেমনি ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। গ্রন্থ তাঁর কাছে বিবেচিত হয়েছিল পূর্ণাঙ্গ এক শিল্পকর্ম হিসেবে। তিনি পেছনের প্রচ্ছদ ও ব্লার্ব বিন্যাসের দিকে মনোযোগ দিতেন, নামপত্র, সূচিপত্র ও মূল পাঠ্যাংশের টাইপোগ্রাফি বা হরফবিন্যাসও দেখিয়ে দিতেন, এমন কি বইয়ের বাঁধাই কীভাবে সম্পন্ন হবে পারলে সেখানেও নিজস্বতার ছাপ রাখতে চেষ্টা করতেন। প্রকাশক এবং গ্রন্থশিল্পীর যুগল মিলনে কাইয়ুম চৌধুরী যেন জ্বলে উঠতেন, ষাটের দশকে যেমন ঘটেছিল শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতার বই ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশকালে। রুচিবান ব্যক্তিত্ব মহিউদ্দিন আহমদ ‘বার্ডস এ্যান্ড বুকস’-এর পক্ষে প্রকাশ করেছিলেন এই গ্রন্থ। অসাধারণ এক প্রচ্ছদ-নকশা করেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বাঁধাইয়ের বৈশিষ্ট্য, পুট ছিল কাপড় দিয়ে মোড়া, তার ওপর হাতে সেঁটে দেয়া হয়েছিল গ্রন্থনাম। ভেতরে হরফ ব্যবহারেও ছিল বিশিষ্টতা, সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল গ্রন্থ সংস্কৃতির এক অনুপম উদাহরণ।

এমনিভাবে সূচিত হলো কাইয়ুম চৌধুরীর বুদ্ধিদীপ্ত কাজ, শামসুর রাহমানের দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘রৌদ্র করোটিতে’-এর প্রচ্ছদ নকশায় ঘটলো একেবারে ভিন্নতার অভিঘাত, খাঁ খাঁ রৌদ্রদীপ্ত দুপুরের আবহ বয়ে আনতে সামনের পেছনের প্রচ্ছদের পুরো জমিনজুড়ে তীব্র এক হলুদের আচ্ছাদন গড়ে দিলেন তিনি, এর ওপর চাইনিজ ইঙ্কে সামান্য নকশার রেখাপাতÑ এভাবেই শামসুর রাহমানের কবিতা ও কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্পকর্ম মিলেমিশে তৈরি হলো অনন্য প্রচ্ছদ। এই পর্বে কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্প সহায়ক হয়েছিলেন যে কয়েকজন গুণী প্রকাশক তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মাওলা ব্রাদার্সের আহমেদ আতিকুল মাওলা, চট্টগ্রামের বইঘরের এসএম শফি এবং বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলাম। উল্লেখ্য, তাজুল ইসলাম যখন লক্ষ্মীবাজারে একই নামে বইয়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার সাইন বোর্ডের নকশাও করে দিয়েছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। প্রকাশক হিসেবে শিল্পীর সঙ্গে যুগল সাধনায় অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন আজীবনের বন্ধু ও সাথী গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। এই সম্মিলন যেসব অনন্য শিল্প-উদাহরণ তৈরি করেছে সংক্ষেপে তার বয়ান দেয়া মুশকিল।

আমি যখন প্রথম প্রকাশ করি ‘শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা’, বাংলাদেশে জীবিত কোন কবির শ্রেষ্ঠ রচনার সম্ভার সেই প্রথম গ্রন্থরূপ পেল। স্বভাবতই প্রচ্ছদের নকশার জন্য শরণ নিতে হয়েছিল কাইয়ুম ভাইয়ের। তিনি কেবল প্রচ্ছদ নয়, গোটা গ্রন্থের হরফবিন্যাস ও নামপত্রের নকশাও স্থির করে দিলেন। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন পত্র-পুষ্পে পল্লবিত এক বৃক্ষের আদলে, তখন সবে শামসুর রাহমানের এগারোটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তিনি অনেক সৃষ্টিশীল উপাচার তৈরি করেছেন বটে, তবে বয়ে আনবেন আরও অনেক সৃষ্টিশীল উপহার, সেই বার্তা ঘোষিত হয়েছিল কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদ-নকশায়। এখন সবিস্ময়ে আরও লক্ষ্য করি পল্লবিত সেই নকশায় তিনি ব্যতিক্রমীভাবে কতক কালো ছোপও তৈরি করেছিলেন ইতস্ততভাবে, শামসুর রাহমানের কবিতার অন্তর্গত বিষাদ এভাবেই রূপায়িত হয়েছিল শিল্পীর তুলির আঁচড়ে। এই বইয়ের সর্বশেষ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৪ সালে, কবি তখন প্রয়াত, সবুজ জমিনে পত্রপল্লবের ওপর দৃঢ়ভাবে শামসুর রাহমানের নামটি যেন পাথরে খোদাই করা, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ কথাটুকু একেবারেই গৌণ, যেন শামসুর রাহমান তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা-সম্ভারের চাইতেও অনেক বড়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ, অনেক স্থায়ী।

ঠিক তেমনটাই তো আমাদের কাইয়ুম ভাই।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: