রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কাইয়ুম চৌধুরীর ‘বঙ্গবন্ধুর হাত’

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • জাফর ওয়াজেদ

আজিমপুরে শেখ সাহেব বাজারের প্রবেশ পথে সড়কের গা ঘেঁষে দোতলা বাড়ি। বাড়িটির দেয়াল জুড়ে বেশ পুরনো দিনের চিহ্ন । ভেতরের দেয়াল গাত্র অবশ্য ভিন্নতর। সেখানে দেয়াল। আঁকা চিত্রকর্ম। কলাপাতার আড়ালে নারীমুখ, অদূরে ভাসমান নৌকা, পুবাকাশে সূর্যোদয়, ভোরের সতেজ প্রকৃতির আবছায়া। মুগ্ধতা কেড়ে নেয়। সময়টা ১৯৭৯ সালের ১ আগস্ট সকাল। আমরা এসেছি, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সংকলনের প্রচ্ছদ আঁকানোর অনুরোধ নিয়ে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বাহালুল মজনুন চুন্নু নিচতলা থেকে খবর পাঠালেন। শিল্পী তখন উপরতলায় থাকেন। নিচতলায় বসার ঘর ও স্টুডিও। খবর পেয়েই নেমে এলেন নিচে। সাদা হাফ হাতা শার্ট, হাল্কা সবুজ রঙের প্যান্ট পরিহিত শিল্পী পরিচয় জেনে খুব খুশী হলেন। বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ টানতেই বেশ বেদনার সঙ্গে বললেন, ‘আমরা পিতৃহীন জাতি। পথ দেখাবার কেউ নেই। সামরিক জান্তা শাসনের বিরুদ্ধে তোমাদের লড়াই-সংগ্রামে আমার সর্বাত্মক সমর্থন রয়েছে।’ আমরা সঙ্কলনের জন্য প্রকাশিতব্য লেখার ‘প্রিন্ট কপি’ দেখালাম। তিনি খুব মনোযোগ সহকারে সে সব লেখা দেখলেন। বঙ্গবন্ধুর আলোকচিত্রগুলো নিয়ে পরামর্শ দিলেন। কয়েকটি লেখার ফাঁকে চিত্র সংযোজন করার কথা বললেন। আমরা প্রচ্ছদের জন্য বঙ্গবন্ধুর মুখ এঁকে দেবার অনুরোধ জানাতেই, তিনি একবাক্যে রাজি হলেন। সঙ্কলনের নাম ‘মুজিব লোকান্তরে, মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে’। কথা শেষ হলে তিনি আমাদের তাঁর সঙ্গে গাড়িতে যাবার আমন্ত্রণ জানান। চারুকলা ইনস্টিটিউটে ক্লাস নিতে যাবার পথে কলাভবনে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বললেন, পরদিন চারুকলার শিক্ষক লাউঞ্জ থেকে প্রচ্ছদ নিয়ে যাবার জন্য। পরদিন তিনি তুলে দিলেন আমাদের হাতে বঙ্গবন্ধুর মুখ আঁকা তিনটি প্রচ্ছদ। আমাদের পছন্দ হলো তিনটিই। কোনটা ছাপবো, জানতে চাইলে তিনি নিজেই বাছাই করে দিলেন। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী সেই দিন থেকে হয়ে গেলেন আমাদের সকল প্রকাশনার প্রচ্ছদকার। ১৯৮০ সালে আওয়ামী লীগের জাতীয় শোক দিবসের প্রকাশনা ‘আমি তোমাদেরই লোক’ এর প্রচ্ছদও এঁকেছিলেন তিনি। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার অনুরোধে তিনি এঁকেছিলেন আরও কয়েকটি সঙ্কলনের প্রচ্ছদ। এই প্রচ্ছদ সংগ্রহের সুবাদে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সম্পর্কটা পুত্রপ্রতিমে পরিণত হয়। পিতার মতো, ভ্রাতার মতো, বন্ধুর মতো তিনি স্নেহ করতেন আমাকে। বাসায় গেলে গ্রামোফোন রেকর্ড বাজিয়ে শোনাতেন ত্রিশ-চল্লিশ দশকের আমার অশ্রুত গান। নানা বিষয়ে গল্প শোনাতেন। ১৯৮০ সালে যখন ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হই, তিনি অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ডাকসুর প্রকাশনার জন্য প্রচ্ছদ দাবি করলেও রাজি হননি। পরামর্শ দিলেন, চারুকলার শিক্ষার্থীদের দিয়ে প্রচ্ছদ আঁকার জন্য।

১৯৮৬ সালে নওরোজ সাহিত্য সংসদ (নসাস) থেকে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দেশ তার হারায় গৌরব’ প্রকাশিত হয়। বই প্রকাশ হচ্ছে জেনে পিতৃতুল্য কাইয়ুম চৌধুরী নিজেই আগ্রহী হলেন প্রচ্ছদ আঁকার জন্য। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছিল ‘একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে নেতা-জনতার মিলিত মাহেন্দ্রক্ষণ’কে। দেখে তিনি পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, ‘সাব্বাস বেটা’। প্রচ্ছদে তিনি আঁকলেন অগুনতি মানুষের মুখ আর মাঝখানে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী তোলা হাত। প্রচ্ছদটি হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘দিলাম এঁকে বঙ্গবন্ধুর উত্থিত হাত’। প্রচ্ছদটি ছাপার পর বেশ আলোচিত হয়েছিল।

পিতৃতুল্য কাইয়ুম চৌধুরী পড়ন্ত বয়সেও মনে রেখেছিলেন আমাকেও। দেখা হলে কুশলাদি জেনে নিতেন। শিল্পীর আঁকা প্রচ্ছদগুলোর দিকে তাকালে আজ চোখে জল আসে তাঁকে আর পাবো না, হবেনা আর লেখা। ভাবলেই বুক জুড়ে হাহাকার জাগে।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: