কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সুরের মূর্ছনার মাঝে এক রাজা চলে গেলেন

প্রকাশিত : ৫ ডিসেম্বর ২০১৪
  • স্বদেশ রায়

তোমার চোখই এক সময় বলে দেবে, সে নিজের মতো করে পড়তে পারবে ছবির ভাষা। আশির দশকের প্রথমদিকে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী পরম স্নেহে পিঠে হাত রেখে এ কথা বলেছিলেন। যতদূর মনে পড়ে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম স্যার, পেইন্টিং এক্সিবিশন বাদ দেই না। ভাল লাগে দেখতে। কিন্তু মনে হয়, ছবির অর্থ বুঝি না। তখন শাহেদ সোহরাওয়ার্দী, অশোক মিত্র, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর প্রমুখের ছবি সমালোচনা কিছু কিছু পড়েছি। রবীন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু, দিলীপ রায়, বিষ্ণু দে প্রমুখের লেখার ভিতর দিয়েও ছবি নিয়ে কিছু পড়েছি। কিন্তু ছবির অর্থ তো বুঝতে পারি না। তাই একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম কাইয়ুম চৌধুরীকে। তিনি ভরসা রাখতে বলেছিলেন নিজের চোখের ওপর। তিনি বলেছিলেন, দেখতে দেখতে একদিন চোখই অর্থ বলে দেবে, ভাল মন্দ বলে দেবে।

তবে ছবি আঁকা, ছবি দেখা ও ছবি বোঝা সব কিছু নিয়ে কাইয়ুম চৌধুরীর মূল কথাটি ছিল পড়াশোনা। ছবি আঁকার জন্য যেমন প্রচুর পড়াশোনা বা জানাশোনার দরকার হয়, দরকার হয় উপলব্ধির, তেমনি ছবি বোঝার জন্যও। বছর দুয়েক হলো কাইয়ুম চৌধুরী আর রমনা গ্রীনে হাঁটতেন না। ২০১২ সালেও তিনি প্রায় নিয়মিতই হাঁটতেন। একটু দেরিতে আসতেন। ফলে চিত্রা ও আমি প্রায়ই তাঁর হাঁটার সঙ্গী হতে পারতাম। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দিন আলাপ হতো পত্রিকার মেকআপ এবং ইলাস্ট্রেশান নিয়ে। কাইয়ুম চৌধুরীর কথার ভিতর দিয়ে প্রায় বুঝতে পারতাম তিনি সন্তুষ্ট নন, পত্রিকার মেকআপ বা ইলাস্ট্রেশান নিয়ে। তাঁর বক্তব্যটা ছিল এমন প্রযুক্তি এসেছে কিন্তু প্রযুক্তিকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারছে না। প্রযুক্তিকে কেন মেকআপের ক্ষেত্রে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না তার কিছুটা কারণ এখন নিজেও বুঝি। কিন্তু সে প্রসঙ্গ এখানে নয়। সবটুকু যে শিল্পীদের ব্যর্থতা তা নয়, আমাদের চিন্তার ভিতর এখনও সমস্যা আছে। চিন্তার সীমাবদ্ধতা আছে। ইলাসস্ট্রেশান নিয়ে কাইয়ুম চৌধুরীর অভিযোগ ছিল, বেশি ক্ষেত্রে না পড়াশোনা করেই ইলাস্ট্রেশান করা হয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, গল্পের বা উপন্যাসের সময় ও পরিবেশকে যদি সঠিকভাবে শিল্পী না জানে তাহলে সে ইলাস্ট্রেশান করতে পারে না।

পত্রিকার লোগো নিয়েও কাইয়ুম চৌধুরীর মতামত ছিল সম্পূর্ণ আধুনিক। আমাদের দেশে সাধারণত একটি পত্রিকার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একই লোগো থাকে। কাইয়ুম চৌধুরীর মতামত ছিল এখানে ভিন্ন। এ নিয়ে গাজী শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের কথাকলি ও সন্ধানী অফিসের আড্ডায় তিনি অনেকবার বলেছেন, প্রতিবছরই পত্রিকার লোগো ও মেকআপ বদলে ফেলা উচিত। তা না হলে মনোটোনাস হয়ে যায়। কাইয়ুম স্যারের কাছে শোনার আগে ঠিক বিষয়টি এভাবে খেয়াল করিনি। তখন ইন্টারনেটের সুবিধা ছিল না। গ্রাহক থাকার কল্যাণে দেখতে পেতাম এশিয়া উইক প্রতি বছর লোগো, মেকআপ সবই বদলে ফেলত। সচিত্র সন্ধানীর লোগে অনেকবার পরিবর্তন করেছেন কাইয়ুম চৌধুরী।

কাইয়ুম চৌধুরী লিজেন্ড পেইন্টার। কিন্তু তাঁকে নিয়ে লেখার অক্ষম চেষ্টায় বসে কেন বার বার পত্রিকার কথা আসছে। আসলে তরুণ কাইয়ুম চৌধুরী পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন অবজারভার গ্রুপ দিয়ে। আর গাজী শাহাবুদ্দিন, কাইয়ুম চৌধুরী ও সচিত্র সন্ধানী এই তিনকে আলাদা করা যায় না। তাই পেইন্টিংয়ের ইজেলের সামনের কাইয়ুম চৌধুরী ছাড়াও পত্রিকার আরেক কাইয়ুম চৌধুরী সারাজীবনই ছিলেন। যেমন আরেক কাইয়ুম চৌধুরী বইয়ের প্রচ্ছদের কাইয়ুম চৌধুরী। আর তিনি মারা গেলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে। সঙ্গীত রসিক ও সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ কাইয়ুম চৌধুরী এ দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে একটি অজানা অধ্যায় হিসেবে থেকে গেছে। একটা সময় ছিল যখন কাইয়ুম স্যারের আজিমপুরের বাসায় অনেক সোনালী সন্ধ্যা কাটানোর সুযোগ হয়েছে। কোন কোন দিন নিউমার্কেট থেকে গাজী শাহাবুদ্দিন ভাই ও কাইয়ুম স্যার কিনতেন পারশে মাছ বা রূপচাঁদা। আমাকে নেয়া হতো মাছ বিশেষজ্ঞ হিসেবে, মাছটা ভাল না মন্দ এটা বিচার করতে হতো। এই মাছ ভাজি আর সোমরস সব মিলে সে ছিল অনেক সুন্দর সময়। এ সময় দেখেছি কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গীতের রেকর্ডের কালেকশান। এ ক্ষেত্রে তিনি ও জামিল চৌধুরী এই দুই বন্ধুই ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী এবং পরস্পরের সহযোগী। দুই বন্ধুর ভিতরকার কালেকশান বেশি সমৃদ্ধ সেটা আমার মতো সাধারণ সাংবাদিকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। তবে কাইয়ুম স্যারের একটি অদ্ভুত বিষয় দেখেছি, সঙ্গীতের নতুন কোন কিছু নিয়ে তিনি কখনও বিরুদ্ধবাদী ছিলেন না। গাজী শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের ছেলে শুভ্র ব্যান্ড মিউজিকের সঙ্গে জড়িত তখন। ওই কিশোরের সঙ্গে কাইয়ুম চৌধুরীর ব্যান্ড মিউজিক শুধু নয়, মিউজিকের নানান বিষয় নিয়ে আলাপ করতে শুনেছি। উৎসাহ দিতেন। প্রশংসা করতেন।

ছবি দেখা নিয়ে, ছবি বোঝা নিয়ে তার যেমন উপদেশ ছিল চোখের ওপর সঙ্গীতের বিষয়েও তিনি বলতেন, কানের ওপর আস্থা রাখ। এই কানের কথাটা অবশ্য আমরা আরেক বাঙালীর কাছে শুনেছি, যিনি অনেক বড়, যিনি আমাদের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়- সেই নজরুলের মুখে। কবিতা ও গানের ছন্দ নিয়ে নজরুল কখনও ছন্দের ব্যাকরণে আস্থা রাখেননি। তিনি আস্থা রেখেছিলেন কানের ওপর। বাঙালীর শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীও কিন্তু সঙ্গীতকে হৃদয়ের সঙ্গে মেশাতে আস্থা রাখতে বলতেন কানের ওপর।

তবে যে চোখের ওপর কাইয়ুম চৌধুরী আস্থা রাখতে বলতেন, এই চোখ সকলের বুঝি এমনটি হয় না যেমনটি ছিল কাইয়ুম চৌধুরীর। ১৯৯৮ সালের সেই ভয়াবহ বন্যার দিনের কথা। দেশের বিভিন্ন এলাকা আতাউস সামাদ ভাই ও আমি একসঙ্গে ঘুরে এসে বন্যার ওপর দুটো রিপোর্ট করেছি। কাগজের রিপোর্ট দুটো পড়েই গাজী শাহাবুদ্দিন ভাই ফোন করলেন- বললেন, বিকেলে যেন তাঁর বাসায় যাই। অফিসের কাজ সেরে তাঁর বাসায় যাই। দেখলাম তিনি অপেক্ষা করছেন অনেক আগে থেকেই। তাই পৌঁছতেই বললেন, কাইয়ুম ভাই আসতে পারবেন না চল, কাইয়ুম ভাইয়ের বাসায় যাই। কাইয়ুম চৌধুরীর বাসায় যাওয়ার পর তিনি বললেন, তোমার ও খোকনের (আতাউস সামাদ ভাইয়ের ডাক নাম খোকন) রিপোর্ট দুটো পড়েছি। এখন বলো কোন পথে কিভাবে গেলে বন্যার প্রকৃত অবস্থাটা দেখা যাবে। আমি বলি- দেখুন, আমরা যেভাবে মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, নবীনগর ঘুরে এ রিপোর্ট করেছি এটা আপনাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ আমরা কখনও স্পিডবোটে, কখনও ছোট নৌকায়, কখনও ইঞ্জিনবোটে ঘুরে এ রিপোর্ট করেছি। তাছাড়া এ সব এলাকা পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত তাই বিলের পানিতে ঢেউও খুব বেশি বিপজ্জনক। আপনাদের জন্য ভালো হয় আপনারা যদি রামপুরা থেকে নৌকা নিয়ে রামপুরার বিল পার হয়ে বালু ও তুরাগ বেয়ে পুবাইল বিল হয়ে কালীগঞ্জে গাজী ভাইদের বাড়ি অবধি যান, তাহলে বন্যার একটা প্রকৃত চিত্র দেখতে পাবেন।

গাজী শাহাবুদ্দিন গাজীপুরের দেলোয়ার গাজীর রক্ত ধারার উত্তরাধিকার। তাই সব কিছুতেই তার জমিদারী আয়োজন। তিনি বললেন, পথে পথে কিছু রিলিফ দেয়া হবে। এ জন্য বড় অংশটা তিনি ব্যয় করবেন। আর আমাদের কিছু কন্ট্রিবিউট করার সুযোগ থাকবে। তবে সারাদিনের খাবার ও পানীয় সরবরাহের দায়িত্ব তার। আর দায়িত্ব যখন গাজী শাহাবুদ্দিনের তখন খাবার ও পানীয় পূর্বাণী বা ঢাকা ক্লাব থেকে আসবে এ তো সাধারণ হিসাব। আমার ওপর বাড়তি দায়িত্ব থাকল খুব বড় একটা মাঝিচালিত নৌকা যেন আমি ব্যবস্থা করি যাতে কোন শব্দ না হয়। তখনও মাঠের রিপোর্টিংটা একেবারে ছেড়ে দেইনি। তাই এ নিয়ে বেগ পেতে হলো না। বেরাইতের অনেক মাঝির সঙ্গে ভাব ছিল। কেন ছিল ভাবলে সে সব সোনালী গল্প মনে হয় আজ। যাক, সে প্রসঙ্গ এখানে নয়। যাহোক সকাল ৮টার ভিতর নৌকা ছাড়ে রামপুরার খাল থেকে। দুপুরের পরে একপর্যায়ে মাঝি পুবাইল বিলে যাওয়ার পথ হারিয়ে ফেলে। ক্ষতি হয়নি তাতে। সারাদিন বিলের পথে পথে ঘুরে সন্ধ্যায় কালীগঞ্জে পৌঁছেছিলাম। তারপর অনেক রাতে ফিরে আসি রামপুরা। ভরা বিলের পানি, আকাশে মৃদু গলেপড়া চাঁদ আর আমাদের পেটে ভাল খাবার ও পানীয়। তাই বন্যা দর্শন আমাদের অনেকের কাছে হয়ে ওঠে আনন্দের বিষয়। অনেকে পানীয় আবেশে নৌকার ছাদে নরম চাঁদের আলোয় ঘুমিয়ে যান। যাওয়া এবং আসা সারাপথই কাইয়ুম স্যার চেয়েছিলেন আমি তাঁর পাশে পাশে থাকি। নৌকার ছাদে তাঁর পাশেই ছিলাম। তিনি একের পর এক স্কেচ করেন পেন্সিল দিয়ে। কাইয়ুম স্যারের এই সারাক্ষণ স্কেচ করার সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয়। সচিত্র সন্ধানীর গাজী ভাইয়ের রুমে বসে আড্ডার সময় কথার সঙ্গে একের পর এক নিউজ প্রিন্টের প্যাডের পাতা ফেলে দিতেন কাইয়ুম চৌধুরী। নানান সব স্কেচ। অনেক সময় সেগুলো তুলে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করতাম। উনি হেসে বলতেন, কিছু ফেলে দিতে হয়। বন্যার ওই স্কেচগুলো থেকে কতগুলো কাইয়ুম চৌধুরী ফেলে দিয়েছিলেন জানি না। তবে ওই স্কেচের ওপর নির্ভর করে তিনি অনেক ছবি এঁকেছিলেন। এক্সিবিশনের বেশ আগেই তিনি ফোন করেন। তারপর আমার মতো একজন অপগ-কে বলেন, দেখতো বন্যার ছবিগুলো ঠিক হয়েছে কিনা? জীবনে অনেক বড় মানুষের সাহচর্য পেয়েছি। জানি বড়রা এমনই বলেন। তবে এখনও ওই ছবিগুলোর কথা মনে পড়লে একটি ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছবিটি একটি সবজিক্ষেত, বন্যার পানিতে মরে গেছে। জাঙলাগুলো পানির ওপরে দাঁড়িয়ে আর তার ওপরে শুকিয়ে যাওয়া লাউ, শিম, কুমড়ার লতাগুলো। ইছাপুরের একটি সবজিক্ষেতের ধ্বংসাবশেষের ছবি সেটা। ছবিটির রং ও রেখা দেখে আমার একবার মনে হচ্ছিল সত্যই সেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া সবজিক্ষেতটি। আবার তাকিয়ে মনে হয় এ যেন শুধু একটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া সবুজক্ষেত নয়, এর রঙ ও রেখায় কখনও মনে হয় অতীতের গর্ভে চলে যাওয়া একটি স্বপ্ন, একটি ফসল বা একটি আশায় বসতি করা নগরীর ছায়া যেন আছে। আসলে সভ্যতা, সভ্যতার সব ফসল সবই প্রকৃতি দেয় আবার কখনও কখনও প্রকৃতি রুদ্র হয়ে সে সব কেড়ে নেয়। থাকে তার ধ্বংসাবশেষ। কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে জানতে চাইনি ছবির অর্থ। কারণ তিনি তো আমাদের তরুণ বেলাতেই বলে দিয়েছিলেন, নিজের চোখকে ছবির ভাষা পড়তে শেখাও। আজও ছবিটির কথা মনে হলে চোখ এমনি কোন এক জগতে নিয়ে যায়।

এর কিছুদিন পর একটি ট্যুরিস্ট কোম্পানির জাহাজ ভাড়া নিয়ে গাজী শাহাবুদ্দিন ভাই কাইয়ুম চৌধুরীসহ অনেককে নিয়ে যান সুন্দরবনে। কাইয়ুম স্যার ও গাজী ভাই খুব জোর করলেন যাতে আমি যাই। যাইনি। কেন যাইনি সে প্রসঙ্গে শুধু এটুকু বলি, যাকে ভালোবাসি তাকে ঘটা করে দেখতে ভালো লাগে না। তাকে দেখতে হয় নানান ছলে। সুন্দরবন অনেক ছোটবেলার প্রেম। দেখেছিও নানান ছলে। তাই কাইয়ুম স্যার ও গাজী ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেই। যাইনি সে যাত্রায়। হেমন্তে ওঁরা গিয়েছিলেন সুন্দরবনে। সুন্দরবন নিয়ে এরপর কাইয়ুম স্যার সম্ভবত পঞ্চাশটির মতো ছবি এঁকেছিলেন। প্রদর্শনীতে জীবন্ত এক সুন্দরবন পেয়েছিলাম। তবে একটা কথা তাঁকে কোনদিন বলেনি। কারণ, ততদিনে তার বয়স হয়েছে। বার বার ওই ধকল তিনি সহ্য করতে পারবেন না। আজও মনে হয় তিনি যদি শুধু হেমন্তে বা তরুণ শীতে নয়, বর্ষায় ও গ্রীষ্মে সুন্দরবনে যেতেন আমরা সুন্দরবনের আরও দুটি রূপ পেতাম। যা পাই কোরিয়ান ফটোশিল্পী ও অধ্যাপক বন্ধু চো-এর ফটোগ্রাফিতে। বছরের তিনটি প্রধান ঋতুর সুন্দরবন ধরা পড়েছে চোর ক্যামেরায়। চো অবশ্য তরুণ। তাছাড়া আমাজানের ওপর কাজ করতে গিয়ে তার মনে হয়েছে সুন্দরবনকেও সে ঋতুভিত্তিক তাঁর ক্যামেরায় ধরে রাখবে। তবে তারপরও ফয়েজ ভাইয়ের শিল্পাঙ্গনে যখন কাইয়ুম চৌধুরীর সুন্দরবন নিয়ে আঁকা ছবিগুলোর প্রদর্শনীর উদ্বোধনীর দিনে যাই তখন ছবিগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো কৈশোরে দল বেঁধে হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে কয়েকবার যে সুন্দরবন দেখেছিলাম সেই সুন্দরবন যেন উঠে এসেছে আমার প্রিয় শহর ঢাকায়।

ছবির পাশাপাশি কাইয়ুম চৌধুরীর কবিতা ও গল্প আরেক ধরনের পেইন্টিং। রবীন্দ্রনাথ তার ভাইপো অবন ঠাকুরের লেখা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, অবন ঠাকুর ছবি লেখে। কাইয়ুম চৌধুরী কবিতা বা গল্প পড়লে মনে হতো আসলে শব্দ দিয়ে আঁকা এক ছবি। কাইয়ুম চৌধুুরীর বাংলা, বাঙালী ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আঁকা ছবি নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। এ নিয়ে লেখার যোগ্য আমি নই। তবে নন্দলাল বসুর অর্জুনের ছবির ভেতর যেমন একটি সিংহকে আমরা দেখতে পাই, কাইয়ুম চৌধুরীর শেখ মুজিবের ছবিগুলোতে যেন সেই সিংহ আরও শক্তিশালী হয়ে আসে। আর যারা মুক্তিযুদ্ধকে লুট করে নিজেদের বড় করেছে। বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, সব বড় পদক যখন তারা নিজেদের ভেতর ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস পরিবর্তনের কোন পথ আর নেই। শিল্পী হিসেবে সেখানে দায়িত্ব পালনে কোন ভুল করেননি কাইয়ুম চৌধুরী। আগামী দিনের জন্য কাইয়ুম চৌধুরী যে মুক্তিযোদ্ধার ছবি রেখে গেছেন তাঁদের মাথায় একটা গামছা বাঁধা। আসলে ওই একখানা চেক গামছা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের এক মহাসত্য মহাকালের পাতায় রেখে গেছেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। সে যাই হোক না কেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছিল কৃষকের ছেলে গামছা দিয়ে পরাণটারে বাইন্দা নিয়ে।

মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতি নিয়ে কাইয়ুম চৌধুরীর চিন্তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। হয়ত অনেক ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্নেহ পেয়ে বড় হয়েছি বলেই তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার আমার রাজনৈতিক কলামটি বের হলে ফোন করতেন। অনেক কথা বলতেন। গণজাগরণ মঞ্চের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যখন প্রতিদিন লিখেছি, তিনি প্রতিদিন ফোন করে উৎসাহ দিয়েছেন। শেষ জীবনে যে সংবাদপত্রটিতে তিনি আর্ট উপদেষ্টা ছিলেন সেটা অনেকটা তাঁর জীবিকার জন্য। ফোনে বা দেখা হলে তিনি বলতেন, ওরা মূলত অনেক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র তারা পছন্দ করে, সহযোগিতা করে। বাংলাদেশের তথাকথিত কিছু বুদ্ধিজীবী বা শিল্পীর মতো তিনি কখনও বিএনপিকে রাজনৈতিক দল মনে করতেন না। বরং খালেদা জিয়া যে জামায়াতের থেকেও বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ এটা তিনি প্রায়ই বলতেন। এ কথা যাতে আমরা লিখি তাও তিনি বলতেন। তবে চিন্তিত থাকতেন শেখ হাসিনাকে নিয়ে। কারণ তাঁর মতে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, প্রগতিশীল আন্দোলন সবই নির্ভর করছে ওই একজনের ওপর।

নিজের বিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বে কাইয়ুম চৌধুরী যে কত দৃঢ় ছিলেন তার প্রমাণ জীবনে বহুবার পেয়েছি। সর্বশেষ একটি ঘটনা বলি, ধানম-ির বিসিকের গ্যালারিতে একটি ছবির প্রদর্শনী উদ্বোধন। গিয়ে দেখি কাইয়ুম স্যার পৌঁছে গেছেন। হাতের ইশারায় ডাকলেন। পাশে বসে গল্প করছি। এর মধ্যে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মজেনা আসেন। সবাই তাঁর পিছে পিছে প্রদর্শনীতে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত। উদ্যোক্তারা এসে কাইয়ুম চৌধুরীকে ডাকতেই তিনি বিরক্তির সঙ্গে বলে দিলেন ওর পিছে যাওয়ার জন্য এখানে আসেনি। তোমরা যাও। আমাকে বললেন, বস। তারপর বললেন, দেখেছ আমাদের জাতীয় চরিত্র। বাঙালীর চরিত্র নিয়ে শ্রদ্ধা কম করার যথেষ্ট কারণ আছে। সেদিনও তার একটা উদাহরণ পেলাম আমাদের বাঙালী উদ্যোক্তারা একজন রাষ্ট্রদূতকে খুশি করার জন্য ক্ষণজন্মা শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে ডাকছে তার পিছনে পিছনে যাওয়ার জন্য। ভাবলে লজ্জা লাগে আমাদের চরিত্রের কী দীনতা। যে রাষ্ট্রদূত পাশের দেশের রাজধানী দিল্লীতে গিয়ে একজন ডেপুটি সেক্রেটারির এ্যাপয়নমেন্ট পান না। তাঁর পিছনে যেতে আমরা কিনা ডাকি কাইয়ুম চৌধুরীকে। এ দীনতা আমাদের কবে কাটবে জানি না।

কাইয়ুম চৌধুরীকে হৃদয়ের সকল শ্রদ্ধা নিংড়ে দিতে গেলে আরেকজনকে স্মরণ না করলে একটি মহাসত্যকে অস্বীকার করা হবে। তিনি মিসেস কাইয়ুম চৌধুরী। আজ বাংলাদেশের প্রায় কেউই জানেন না তিনিও একজন চিত্রশিল্পী। তবে তাঁর সকল ভালবাসার মানুষটি যাতে শিল্পের জন্য সকল সময়টুকু দিতে পারেন তাই তিনি নিজে ছবি আঁকা ছেড়ে দিয়ে জীবনের সবটুকু সময় তাঁর প্রিয় কাইয়ুমের জন্য দিয়েছেন। এই মহীয়সী ভাবির স্নেহ পেয়েছি জীবনের দীর্ঘ সময়। তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর ভাষা কোথায় পাব! তবে আজ কাইয়ুম চৌধুরীকে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে মিসেস কাইয়ুম চৌধুরীর প্রতি অবনত মস্তকে শ্রদ্ধা না জানালে অকৃতজ্ঞ হব আমরা। ভালবাসার জন্য, শিল্পের জন্য নিজের শিল্প সত্তাকে এভাবে বিসর্জন দেয়ার দ্বিতীয় কোন নজির আছে কিনা আমার জানা নেই।

কাইয়ুম চৌধুরী ও ভাবির কোন সন্তান হয়নি। ভাবির বোনের ছেলে জাভেদই তাঁদের সন্তান। কি অপত্য স্নেহ দিয়ে তাঁকে যে নিজের সন্তান তাঁরা দু’জন করে নিয়েছিলেন, তা না দেখলে বোঝা যায় না। জাভেদের বিয়ে, তাঁর সন্তান হওয়া সব দিনগুলোতে কাইয়ুম স্যারের মুখটা মনে পড়ে।

কাইয়ুম চৌধুরীর বয়স হয়েছিল। শিল্পী শিল্পীর মতোই চলে গেছেন। যেন সুরের আসর দিয়ে সুর মূর্ছনার মাঝে এক রাজা চলে গেলেন। রেখে গেলেন তাঁর রাজপাট। যে রাজপাট চিরকালের। বাঙালীর হৃদয় যতদিন থাকবে ততদিন তার হৃদয়ে কাইয়ুম চৌধুরীর রঙ ও রেখার রাজপাট থাকবেই।

প্রকাশিত : ৫ ডিসেম্বর ২০১৪

০৫/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: