মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চলচ্চিত্র সমালোচনা ॥ এক কাপ চায়ে হতাশ দর্শক

প্রকাশিত : ৪ ডিসেম্বর ২০১৪

বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল চিত্রনায়ক ফেরদৌস প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘এক কাপ চা’-র প্রিমিয়ার শো। ফিল্মটির প্রতি আমার আলাদা রকমের আগ্রহ ছিল, কারণ এটা ফেরদৌস প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র। আগ্রহের কারণ আরেকটু খোলাসা করে বললে বলা যায় যে অন্য কোন শিল্পে প্রতিষ্ঠিত টাকাওয়ালা লোক এটির প্রযোজনা করেননি, করেছেন ফিল্মের সঙ্গে সরাসরি রিলেটেড একটি মানুষ। তাই প্রত্যাশা একটু বেশি ছিল। ফিল্মটি ভাল কি মন্দ এ বিবেচনার দায়িত্ব দর্শকদের। তবে একজন দর্শক হিসেবে আমার অনুভূতিগুলো শুধুমাত্র শেয়ার করতে চাই। ছবির টেকনিক্যাল দিকগুলো নিয়ে আলোচনায় আসার পরিসরটা কম ছিল। কারণ ডিজিটালাইজেশনের এই যুগে ঝকঝকে চকচকে দৃশ্য দেখানোটা খুব জটিল কোন বিষয় নয়। ক্যামেরা মুভমেন্ট ও খারাপ ছিল না বরং আমার কাছে ভালই মনে হয়েছে। তবে ছবির সব দিকের বিষয়ের নজর কেড়ে নিয়েছে এর গল্পের দুর্বলতা। সঙ্গে শব্দের ব্যবহার বিভিন্ন সময় দর্শকদের আগাম বার্তা দিয়েছে যে কি ঘটতে যাচ্ছে। তাই বলা যায় এখানে কাজটাও সুচারুভাবে হয়নি। ১ মে-ই প্রশ্ন হতে পারে গল্পটি কিসের? নামকরণ ও ফিল্মের ন্যারেটিভ দেখে মনে হয়েছে এটি একটি নিখাঁদ প্রেমের গল্প হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। বিশেষ করে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’খ্যাত পরিচালক বাসু চ্যাটার্জির কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপে ফিল্মটি হলেও তেমন আশানুরূপ ফল আমার চোখে ধরা পড়েনি। ছবির শুরুতে একটি বিয়ের ভিযুয়্যালাইজেশন ও সঙ্গে গানের দৃশ্য দিয়ে। গানের দৃশ্যে অনেক পরিচিত চলচ্চিত্র তারকার উপস্থিতি। পরক্ষণে দেখা গেল কলেজ লেকচারার শফিকুর রহমান এটা স্বপ্নে দেখছিলেন। স্বপ্নভঙ্গের পর সেই চিরায়ত বাংলা ছবির দৃশ্য বিছানা থেকে মাটিতে তার অবতরণ ধপাস করিয়া। এখন প্রশ্ন এতগুলো তারকাকে প্রথম দৃশ্য কোন প্রকার মূল্য সংযোজন করেছে বলে আমার মনে হয়নি। কারণ এই তারকাগুলোর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে শফিকুর রহমানের পরিচয় আছে বলে আমার মনে হয়নি। তাহলে স্বপ্নে এদের আগমনের কারণের কোন ব্যাখ্যা আমার কাছে ধরা পড়েনি। এরপর দেখা গেল শফিকুর রহমান যে মেয়েটিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে ছিল সে তার কলেজের লাইব্রেরিয়ান দীপা। যাকে সে পছন্দ করে। এখানে একটা নির্দিষ্ট কলেজের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। সেই কলেজের কোন ড্রেস কোড দেখা যায়নি। কলেজের শিক্ষার্থীরা একজন লেকচারারের চেয়ে লাইব্রেরিয়ানের কথা বেশি মান্য করে তা আমার কাছে অন্যরকমই লেগেছে। একজন শিক্ষককে মান্য না করতে পারে তবে একজন লাইব্রেরিয়ানকে সবাই মান্য করে। এটা একটু খটকা লাগার মতো বিষয়। আর শফিকুর রহমানকে সহজ সরল দেখানোর জন্য শিক্ষার্থীরা তাঁকে মানবে না সেটা দেখানো আমার কাছে অত্যুক্তিই মনে হয়েছে। একটি করে দৃশ্যের জন্য কলেজের অধ্যক্ষ ও অন্য একজন পাগলাটে প্রফেসরের উপস্থিতি আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। একই ঘটনার ঘুরপাকের মধ্য দিয়ে ছবির প্রায় ৪০ মিনিট পার হয়ে যায়। এরপর একবিকালে দীপার বাসাতে শফিকুর রহমানের চা খেতে যাওয়ার পর থেকে শুরু করে একরাতের ঘটনা দিয়ে পুরো ছবিটি চলমানতা। কিন্তু ছবিতে কোথাও দীপার বাসার নির্দিষ্ট ঠিকানা শফিকুর রহমান কই পেলেন তা দেখা যায়নি। এরপর ওই বাসায় বিভিন্ন রকমের ঘটনা ঘটিয়ে দর্শককে জোর করে হাসানোর একটা প্রয়াস আমার কাছে মনে হয়েছে। এরপর শফিকুর মি. গোমেজের ছেলের জন্য ডাক্তারের বাসায় ইঞ্জেকশন আনার জন্য যাওয়ার পথে বাহন সংকটকে হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওখানে ১টা সিএনজি নষ্ট হওয়ার পর আর কোন বাহন পায় না যেটা কোন যৌক্তিক বিষয় বলে মনে হয়নি। সে অন্য কোন সিএনজি বা ট্যাক্সি পায়নি, কিন্তু বিকল্প বাহন হিসেবে বাস বা রিকশা থাকতে পারত। সেটা হয়নি। ডাক্তারের বাসায় গিয়ে সে চোরের খপ্পরে পড়ে। চোররা তাকে ডাক্তার মনে করে মার শুরু করে, চোররা ডাক্তারকে চিনে না কিন্তু তিনি ঢাকার বাইরে থেকে কবে ফিরবেন সে খবর তাদের কাছে আছে। তাদের কথা বার্তায় বোঝা যায় যে, তারা পরিকল্পিতভাবেই ডাক্তারের বাসায় চুরি করতে এসেছে। পরে দেখা যায়, তারা চোর না বড় ধরনের সন্ত্রাসী গ্রুপ। তারা শফিকুরের কাছ থেকে ইঞ্জেকশনের নাম ও সিরিয়াল শোনার পর নগদ কোন কিছু না নিয়ে বা কোন দামী জিনিসপত্র না নিয়ে শুধুমাত্র ওই ইঞ্জেকশন নিয়ে চলে যায়। আর যাওয়ার সময় তাকে আঘাত করে যায়। কিন্তু আমার কাছে এটা এক ধরনের অসঙ্গতি মনে হয়েছে। এই রকম কোন চোর বা সন্ত্রাসীরা প্রথমে নগদ কিছুর ওপরে নজর দিবে তারপর অন্যকিছু, এখানে সেটা না দেখানোতে আমার কাছে মনে হয়েছে তা এই পেশার মানুষদের সেন্সের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখানোর নামান্তর। পরে শফিকুর চোরদের কেউ একজন মনে করে মীর সাব্বিরকে আঘাত করে চলে যায়। সে একবার চিন্তার অবকাশও নিল না যে সে তিনজন সদস্যের মধ্যে কাকে আঘাত করেছে। সে মেরে নিচে গিয়ে দেখে সে মীর সাব্বিরের যে গাড়িতে করে এসেছিল তা বের হয়ে যাচ্ছে। তখন সে মীর সাব্বির মনে করে তাদের থামতে বলে কিন্তু শাকিব খানের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বলে তিনজন চোর গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেছে। তাহলে সে যাকে মেরে আসল সে কে? এই প্রশ্নটি তার মাথায় আসেনি। তারপর সে ওই সন্ত্রাসীর পরিচয় পায় যে ফেসবুক গু-া নামে পরিচিত। এই গু-ার খোঁজে সে একটি গেস্ট হাউসের নাচিয়ে করল গার্ল দিলরুবার কাছে যায় এই গু-ার ঠিকানা নিতে। ওই খান থেকে পুলিশ তাকে মীর সাব্বিরের করা অভিযোগে গাড়ি চুরি ঘটনায় ধরলে এবং বাইরে গাড়িটি অবস্থানরত অবস্থায় থাকার কথার সঙ্গে অসঙ্গতি থাকলেও এটার কোন সমাধান ছবিতে দেখানো হয়নি। আর গেস্ট হাউসের (অনেক সময় নাইট ক্লাব বলা হয়েছে) উপস্থাপন যেভাবে করা হয়েছে তাতে মনে হয় ঢাকার শহরে এই রকম জায়গা সম্পর্কে ছবিটি করার আগে কোন রকমের গবেষণা ছিল না। পুলিশ আসার কথা জানার পর দিলরুবা তার কথার মাঝে একবার লাইসেন্সের কথা বলে। এখানে লাইসেন্স বলতে কোনটার কথা বলা হয়েছে তা পরিষ্কার নয়Ñ দেহ ব্যবসা না জল পানীয়। দেহ ব্যবসার লাইসেন্স এই রকম জায়গায় আমাদের দেশে দেওয়া হয় না। আর মদের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত হাউসে এই রকম দেহ ব্যবসা চলে না। এরপর ওখানে দিলরুবা আর শফিকুরকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন অত্যুক্তি মনে হয়েছে। কারণ দিলরুবার কোথায় বুঝা গেছে যে পুলিশ আগে থেকে এই জায়গাটা সম্পর্কে অবিহিত। আবার পুলিশ অন্যকোন মেয়েকে না ধরে বা রুমে না গিয়ে সরাসরি দিলরুবার রুমে চলে আসে যা এই অংশটাকে দুর্বল করে তুলেছে। পুলিশ শফিকুরকে থানায় নিলে দেখা যায় সেখানে তার কলেজের এক ছাত্র যার কাছে সে ওই গু-াকে ধরার সাহায্য না চেয়ে একা একা বেরিয়ে পরে। যা অনেকটা অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। আবার ওষুধ আনার ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ হওয়ার পর ও মি. গোমেজদের অস্থির হওয়া বা তার ছেলেকে অন্য কোন ক্লিনিক বা হাসপাতালে নেয়ার প্রয়াস দেখা যায়নি। সর্বোপরি চলচ্চিত্রটি দর্শক প্রত্যাশা মেটাতে পারেনি বলেই প্রতীয়মান। তবে নবীন নির্মাতা নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুলের জন্য শুভকামনা রইল। নিশ্চিতভাবেই এই চলচ্চিত্রের ভুল-ত্রুটি শুধরে নিয়ে ভবিষ্যতে তিনি আরও নান্দনিক এবং জমাট গল্পনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

সায়েম খান (চলচ্চিত্রকর্মী)

প্রকাশিত : ৪ ডিসেম্বর ২০১৪

০৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: