আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভাবমূর্তি সঙ্কটে মমতা

প্রকাশিত : ৩ ডিসেম্বর ২০১৪
ভাবমূর্তি সঙ্কটে মমতা

শংকর লাল দাশ ॥ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভাবমূর্তির সঙ্কটে পড়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সে সঙ্কট ক্রমে ঘনীভূত হয়ে উঠছে। ভোটের বাক্সে বিপ্লব ঘটিয়ে গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা নিয়ে ৩৫ বছরের বামফ্রন্টের শাসনকে ধরাশায়ী করে তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেছিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে সে জনপ্রিয়তায় শুধু ধসই নামেনি, বরং পদে পদে ঘটছে বিপর্যয়। পঞ্চায়েত সমিতি থেকে শুরু করে পৌরসভা পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচনে তাঁকে পেতে হচ্ছে শোচনীয় পরাজয়ের স্বাদ। ভাবমূর্তি সঙ্কটে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন দৌড়, বামফ্রন্ট ও জাতীয় কংগ্রেসসহ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর পাইকারি হারে নির্যাতন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাত্রাতিরিক্ত দৌরাত্ম্য, রাজ্যে নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে না ওঠা, অন্য রাজ্যসহ বিদেশী বিনিয়োগ না আনার ব্যর্থতা, কথার সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকা, বিজেপির জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং সর্বশেষ বর্ধমান বিস্ফোরণ, জামায়াত ও জঙ্গী তোষণ, বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করা, সারদা গ্রুপের চিটফান্ড কেলেঙ্কারির সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলীয় এক শ্রেণীর প্রভাবশালী নেতাকর্মীর জড়িয়ে পড়াকেই দায়ী করা হচ্ছে। এছাড়াও আরও বেশ কিছু কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তার পারদ ক্রমেই হচ্ছে নিম্নমুখী ।

রাজ্যের সর্বস্তরে দলীয়করণ এতটাই নগ্ন হয়ে উঠেছে যে, তাতে সাধারণ মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত। এমনকি পুজোর পুরস্কার বিতরণেও দলীয়করণ। সর্বত্র তৃণমূলের তোলাবাজা-চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য। বামপন্থীসহ বিরোধীদলীয় অসংখ্য নেতাকর্মী এখনও তাদের বাড়িঘরে ফিরতে পারছে না। আর যারা ফিরছে তাদের দিতে হচ্ছে নিয়মিত চাঁদা। সাড়ে তিন বছর পরে নিজ বাড়িতে ফিরতে গিয়ে শীর্ষ বামপন্থী নেতা মাজিদ মাস্টারের ওপর ঘটেছে সশস্ত্র হামলা। ভাঙ্গরে তৃণমূল নেতা আরাবুলের প্রত্যক্ষ মদদে ঘটেছে দুটি খুন। অভিনেতা ও বিধায়ক তাপস পালসহ কয়েক নেতার লাগামহীন কথাবার্তা তৃণমূলকে ফেলে দিয়েছে চরম বিপাকে ।

সারদা কেলেঙ্কারি পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। প্রতি লাখ টাকায় প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা মুনাফার প্রলোভন দিয়ে সারদা গ্রুপের কর্ণধার সুদীপ্ত সেনসহ সাঙ্গপাঙ্গরা কয়েক হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। এর বেশির ভাগ অর্থ গেছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। লোপাট করা অর্থের মোটা অংশ সুদীপ্ত সেন ব্যয় করেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতানেত্রীদের পেছনে। এমনকি মমতার আঁকা ছবি কিনেছেন কোটি টাকা দিয়ে। এর মাধ্যমে তিনি মমতার কাছের পাত্র হিসেবে পরিণত হয়েছিলেন। সারদা গ্রুপের অর্থ জঙ্গী মদদেও ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাতে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে বস্তায় বস্তায় সারদার টাকা পাঠানো হয়েছে জামায়াত ও জঙ্গীদের কাছে। এক্ষেত্রে প্রাথমিক তদন্তে এরইমধ্যে তৃণমূলের বিধায়ক মমতার ¯েœহধন্য আহমেদ হাসান ইমরানের নাম উঠে এসেছে। তিনিই বাংলাদেশের জঙ্গীগোষ্ঠী ও জামায়াতের সঙ্গে মধ্যস্থতা করেছেন। তার মাধ্যমেই গাড়ি ভর্তি টাকা পাঠানো হয়েছে। এ অভিযোগ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে মরিয়া বিধায়ক আহমেদ হাসান ইমরান মধ্য অক্টোবরের এক রাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন বলেও মিডিয়ায় খবর এসেছে। বর্তমানে এ ঘটনাটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই তদন্ত করছে। কলকাতার অধিকাংশ মিডিয়া আভাস-ইঙ্গিত দিচ্ছেÑ বাংলাদেশে জঙ্গী তৎপরতায় তৃণমূলের আরও ওপর তলার অনেক নেতা জড়িয়ে আছেন। বাংলাদেশে জঙ্গী তৎপরতাকে রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ ভালো চোখে দেখছে না। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিতজনদের মাঝে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে সভা-সমাবেশ এবং ঘরোয়া আড্ডাতেও শেখ হাসিনাকে নিয়ে চলে নানামুখী প্রশংসনীয় আলোচনা। সেই শেখ হাসিনাকে উৎখাতের ষড়য়ন্ত্র কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না মানুষ। তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিরোধিতাকেও রাজ্যের মানুষ এখন অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছে। গত ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে জঙ্গীদের আস্তানায় ঘটেছে বোমা বিস্ফেরণ। এতে ঘটনাস্থলেই দু’জনের মৃত্যু ঘটে। ঘটনা পরবর্তী এক সপ্তাহের বেশি সময় স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসন, রাজনীতিক তথা রাজ্য সরকারের নির্লিপ্ততাকে স্থানীয় মিডিয়াগুলো নানাভাবে বিশ্লেষণ করছে। এই নির্লিপ্ততার মাঝে জঙ্গীরা নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। এখন তাদের ধরার জন্য কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ঘাম ছুটে যাচ্ছে। ঘোষণা করতে হয়েছে মোটা অঙ্কের পুরস্কার। এ ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের শীর্ষ জঙ্গী ‘বোমা মিজান’সহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। নাম এসেছে জামায়াত ও জেএমবির। কলকাতার অধিকাংশ মিডিয়ার ধারণা, বর্ধমানসহ পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গী নেটওয়ার্ক বিস্তারে মমতার তৃণমূলের একাংশের যোগসাজশ রয়েছে। তৃণমূলের সহযোগিতা ছাড়া কোনক্রমেই জঙ্গীরা তৎপরতা চালাতে পারে না। এরসঙ্গে বর্তমানে জেলে আটক সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেনের নামও উঠে এসেছে। নাম এসেছে আলোচিত তৃণমূল নেতা ও বিধায়ক আহমেদ হাসান ইমরানসহ আরও অনেকের। সম্প্রতি এ ঘটনাটি রাজনীতিকসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ধরনের একের পর এক কারণে নিজের পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে, যা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও ভাবিয়ে তুলেছে। যার প্রমাণ মিলেছে কলকাতাসহ ৮০টি পৌরসভার নির্বাচনকে এগিয়ে আনার চিন্তা-ভাবনার মধ্য থেকে। এসব পৌরসভার মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের বিভিন্ন সময়ে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইছেন মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে এসব পৌরসভার নির্বাচন সম্পন্ন করে নিজের জনপ্রিয়তা যাছাই করতে। সেই সঙ্গে ভাবমূর্তির সঙ্কট কাটাতে। কিন্তু এতে শেষ রক্ষা হবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বিজেপি যে ক্রমে জনসম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে, এগোচ্ছে দ্রুতগতিতে, তাতে তৃণমূলের আশঙ্কা কেবল বাড়ছেই।

প্রকাশিত : ৩ ডিসেম্বর ২০১৪

০৩/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: