কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিদ্যুৎ চুক্তি সত্ত্বেও প্রশ্নবিদ্ধ সার্ক

প্রকাশিত : ৩ ডিসেম্বর ২০১৪

প্রতিষ্ঠার তিন দশক পরও দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ আঞ্চলিক জোট সার্ক। বছরান্তে তা কেবল শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের মতো গঁৎবাধা নিয়মের আবর্তেই বন্দী। জ্বালানি বিদ্রুৎ চুক্তি ছাড়া এবারের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনেও এই ধারাবাহিকতার ব্যত্যয় ঘটেনি। বরং চীনের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন করে মতপার্থক্য তৈরি হয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাঝে। সার্কের এমন অকার্যকর জোটে পরিণত হওয়ার মূলে ভারত-পাকিস্তানের নাজুক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দায়ী অনেকটা। পরস্পরের প্রতি এই দুই রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সার্ক কম সংহত আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়ে গেল। আশির দশকের শুরুতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়াস নিয়ে সার্কের যাত্রা। ১৯৮৫ সালের ৭-৮ ডিসেম্বর ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সার্কের শুরুর দিকে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি বিষয়ে সহযোগিতার ব্যাপারে ঐকমত্য ছিল। পরবর্তীতে মুক্ত বাণিজ্যের বিষয়েও ঐকমত্যে পৌঁছে সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে ২০০৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ামুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) কার্যকরের ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে সাফটার বিধানগুলো এতটা আর্কষণীয় না হওয়ার দরুন, আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়নি। সার্কের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য একেবারেই কমÑ মাত্র ৫ শতাংশ। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের তুলনায় দূর দেশের সঙ্গে বাণিজ্য এবং সহযোগিতা বাড়াতেই আগ্রহী তারা। অথচ আসিয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং নাফটার (যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোর বাণিজ্য জোট) আন্তঃবাণিজ্যের হার যথাক্রমে ৩২, ৫০ এবং ৬৮ শতাংশ। সার্কভুক্ত দেশগুলোর আয়তন বিশ্বের মোট আয়তনের ৩ শতাংশ। এ অঞ্চলে বিশ্বের ২১ শতাংশ মানুষ বাস করে। পরিসংখ্যানের মাধ্যমেই অনুমান করা যায় সার্ক দেশগুলোর জনবসতি। বিশ্বের অন্যতম দারিদ্যপীড়িত অঞ্চল হওয়ার দরুণ এ জনবসতি ও সেই সঙ্গে দারিদতা, মানবপাচার, মাদক সমস্যার মতো বিষয়ে বিপর্যস্ত রাষ্ট্রসমূহ। শিক্ষা-চিকিৎসা-খাদ্যের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর যোগান দিতেই রাষ্ট্রগুলো ক্লান্ত ।

পারস্পরিক সহযোগিতা কিংবা সহমর্মিতার নিদর্শন নেই বললেই চলে। অথচ সার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বছরে অন্তত ২০০টি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারী-বেসরকারী কর্মকতা ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের এসব বৈঠকেও কার্যকর কোন ফলাফল পাওয়া যায় না। এ জোটের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মাঝে যে ফারাক, তা সত্যিকার অর্থেই বেদনাদায়ক। নেপালে সার্কের একটি সচিবালয় রয়েছে এবং পররাষ্ট্র সচিব মর্যাদার কর্মবর্গের প্রধান। এবারের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন নেপালের অনুষ্ঠিত হয় কাঠমান্ডুতে । সম্মলনে বিদ্যুৎ, রেল ও সড়ক বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উদ্যোগের অভাবে এ সম্মেলনেও তা ভেস্তে যায়। এবারের সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের মূল আকর্ষণ ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সার্ক সম্মেলনে যোগ দেয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। ক্ষমতা গ্রহণের পর নরেন্দ্র মোদি সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে যে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, তাতে মনে করা হয়েছিল এবারের কাঠমান্ডু সম্মেলনে সার্ক তার খোলস ভেঙ্গে সত্যিকারের জোটে রূপ নেবে। কিন্তু বিধিবাম। এ সম্মেলনে নতুন একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে মত-পার্থক্য তৈরি হয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাঝে। এবারের সম্মেলনে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ অনেক সার্ক দেশ চীনকে পূর্ণ সদস্য করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়। কিন্তু ভারত তার সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে পূর্ণ সদস্যের মর্যাদা দিতে আগ্রহী নয়। প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীনের বাজার দখল ঠৈকাতেই এ পদক্ষেপ।

প্রতিবেশী দেশগুলোয় নিজের প্রভাব বাড়ানোর কৌশল হিসেবে আঞ্চলিক বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে চীন। ভারত সব সময় আত্মরক্ষার দিকটায় বেশি জোর দিয়ে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়াকে নিজের প্রভাব বলয়ে রাখতে এ প্রবণতা মোটেও ভাল নয়। এ কারণে তাদের সাম্প্রতিক কৌশল হলো আঞ্চলিক দেগুলোতে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য এবং ভূ-উপগ্রহ যোগাযোগ খাতেও বিনিয়োগ। কিন্তু এ কৌশল কতটা কার্যকর হবে। তা নিয়ে, সংশয় রয়েছে। কারণ চীন ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোয় প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগের মাধ্যমে যথেষ্ট প্রভাব বলয় তৈরি করেছে । ফলে সার্কে চীনের অন্তর্ভুক্তি ভারতের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

সার্ক দেশগুলোর জিও স্ট্র্যাটেজিক বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ কারণে এ জোটের সম্মেলনে পর্যবেক্ষক হিসেবে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপানের মতো রাষ্ট্রগুলো। কিন্তু অনৈক্য এবং অবিশ্বাসের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ছে সার্কের পথচলা। এ অচলায়তন ভাঙ্গতে পারে ছোটবড় রাষ্ট্রগুলোর ইতিবাচক ভূমিকা। তবেই আঞ্চলিক উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।

চলমান ডেস্ক

প্রকাশিত : ৩ ডিসেম্বর ২০১৪

০৩/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: