আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশের ক্রিকেট ফিরে পেল ছন্দ

প্রকাশিত : ৩ ডিসেম্বর ২০১৪
বাংলাদেশের ক্রিকেট ফিরে পেল ছন্দ

একটা জয় পাওয়া খুব জরুরী ছিল, আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া এবং অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্য। প্রতিপক্ষ জিম্বাবুইয়ে বলেই হয়ত বাড়তি একটা উজ্জীবনী শক্তি সিরিজ শুরুর আগেই কাজ করেছিল বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে। সেটার প্রতিফলন সফরকারী জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে মাঠে ঘটিয়েই দেখাল বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। ক্রমাগত পরাজয় থেকে যখন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিল না দল তখনই জয়টা এলো। টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচেই জয় পাওয়ার পর আর পেছনে তাকানোর ফুরসত আসেনি। আরও দুটি জয় তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষকে টেস্ট সিরিজে ধবলধোলাই করার পর দারুণ উজ্জীবিত হয়েছে দল। কারণ ব্যাটসম্যানরা রানে ফিরেছেন, বোলাররা সাফল্য ধরে রেখেছেন এবং তার প্রভাব ফিল্ডিংয়ে ক্রিকেটারদের শারীরিক চলাফেরায়ও পড়েছে। উন্নতি হয়েছে ফিল্ডিংয়েও। সে কারণেই ওয়ানডে সিরিজে শক্তিমত্তায় একেবারে ফিফটি-ফিফটি হলেও জিম্বাবুইয়ে কোন সুযোগই পেল না। আবার হোয়াইটওয়াশ হলো জিম্বাবুইয়ে। গৌরব নিয়েই বছর শেষ করল পরাজয়ের গ্লানিতে ন্যুব্জ বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়েছেন প্রতিটি ক্রিকেটার। ওয়ানডের ব্যাটিং-বোলিং নৈপুণ্য বিশ্লেষণ করলেই সেটা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। উভয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের চেয়ে যোজন-যোজন দূরে জিম্বাবুইয়ের ক্রিকেটাররা।

সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতেই জিম্বাবুইয়েকে কোন পাত্তা দেয়নি বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ব্যাটিং নিয়ে যে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছিল সেটা কাটিয়েছেন দলের ক্রিকেটাররা। যদিও এ বছর অন্য ওয়ানডেগুলোয় যেমন দেখা গেছে সেটার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। টপঅর্ডাররা ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু পঞ্চম উইকেটে নতুন রেকর্ডই গড়েছেন সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহীম। দু’জনের ১৪৮ রানের জুটি ছিল আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ওয়ানডেতে সেরা জুটির রেকর্ড। সাকিবের শতকটা ছিল তাঁর জন্যও বড় দায়মুক্তি। নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরা এবং দলের ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য বড় ধরনের চাপমুক্তি ছিল সেটা। ১০১ রানের দারুণ এক ইনিংস দলকেও বড় সংগ্রহ গড়তে সহায়ক হয়েছে। আর অধিনায়কের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার পর মুশফিকও দায়িত্বশীল একটি ইনিংস খেলেছেন। সবমিলিয়ে প্রথম ওয়ানডেতেই ব্যাটিং বিভাগ থেকে বাড়তি অনুপ্রেরণা পেয়েছে দল। তাছাড়া অভিষেক হওয়া তরুণ অলরাউন্ডার সাব্বির রহমান রুম্মান ২৫ বলে ৪৪ রানের হার না মানা একটি টর্নেডো ইনিংস খেলে বাকিদের জন্য বড় এক সাহসই জুগিয়েছেন। আর বোলাররা তাঁদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পেরেছেন। বোলিংয়েও সাকিব চার উইকেট নিয়ে সামনে থেকে দিয়েছেন নেতৃত্ব। অধিনায়ক হয়েই ফিরেছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। তিনি দুই উইকেট শিকার করে নিজেকে ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তা ধরেও রেখেছেন পরবর্তী ম্যাচগুলোয়। প্রত্যাবর্তনের ম্যাচেই অলরাউন্ড নৈপুণ্য দেখিয়ে জয়ের নায়ক বনে যান সাকিব। ফলে তিনিও বড় ধরনের এক চাপ থেকেই মুক্তি পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ৮৭ রানের বিশাল জয় দিয়েই ওয়ানডে সিরিজ শুর করে বাংলাদেশ দল। এটা কত বড় অনুপ্রেরণা ছিল তা দ্বিতীয় ম্যাচেই দেখা গেছে। ক্রিকেটারদের শরীরি ভাষাতেই ফুটে উঠেছে প্রত্যয়।

দীর্ঘদিন যে উদ্বোধনী জুটির ব্যর্থতার দায়ে প্রতিপক্ষের কাছে নাজেহাল হতে হয়েছে সেই উদ্বোধনী জুটিতেই ১৫৮ রান যোগ করেছেন তামিম ইকবাল ও এনামুল হক বিজয়। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে উদ্বোধনী জুটিতে দ্বিতীয় সেরা পার্টনারশিপ গড়েছেন তাঁরা। তামিমও দীর্ঘ রান খরা কাটিয়ে ৭৬ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলেছেন। এনামুলও ৮০ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। পরে বোলিংয়ে আরাফাত সানি চার উইকেট নিয়ে ধসিয়ে দেন জিম্বাবুইয়ের ইনিংস। দলগতভাবে খেলেই জয়ী হয় বাংলাদেশ দল। সব ক্রিকেটারই সমানভাবে জ্বলে উঠেছেন। পুরো সিরিজেই এভাবে খেলে প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করেছে দল। শেষ ম্যাচে তাইজুল ইসলাম গড়েছেন অসামান্য কীর্তি। অভিষেকেই হ্যাটট্রিক করে নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন। ৪৩ বছরের ওয়ানডে ইতিহাসে একেবারেই আনকোরা নতুন এক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন ২২ বছর বয়সী তাইজুল। হ্যাটট্রিক করে সফরকারী জিম্বাবুইয়ে ইনিংস ধসিয়ে দিয়েছেন। সেজন্য অবশ্য দুই ওভার লেগেছে তাঁর। ২৭তম ওভারের শেষ বলে টিনাশে পানিয়াঙ্গারাকে বোল্ড, ২৯তম ওভারের প্রথম বলে জন নিয়ুম্বুকে এলবিডব্লিউ ও পরের বলে টেন্ডাই চাতারাকে বোল্ড করে ত্রিভুজ পূর্ণ করে হ্যাটট্রিকের স্বাদ নেন। আজ পর্যন্ত বিশ্বে যত ভয়ঙ্কর বোলার এসেছেন এবং ১৯৭১ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ওয়ানডের যাত্রা শুরু হওয়ার পর এর আগে ৩৫ বার হ্যাটট্রিক দেখেছে বিশ্ববাসী। তবে অভিষেকেই হ্যাটট্রিকের ঘটনা এই প্রথম। যা করতে পারেননি মুত্তিয়া মুরালিধরন, শেন ওয়ার্ন, আব্দুল কাদির, সাকলাইন মুস্তাক, বিষেণ সিং বেদী ও অনিল কুম্বলেদের মতো বিশ্ব কাঁপানো স্পিনাররাও। সবাইকে পেছনে ফেলে ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় রচনা করেন নাটোরের এ তরুণ। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে শাহাদাত হোসেন রাজিব, আব্দুর রাজ্জাক ও রুবেল হোসেনের পর তাইজুলও এ বিরল কৃতিত্ব দেখালেন। সবমিলিয়ে ৭ ওভার বোলিং করে দুটি মেডেনসহ মাত্র ১১ রান দিয়ে চার উইকেট শিকার করেছেন। ওয়ানডের ইতিহাসে শুধু বাঁহাতি হিসেবেই নয় বরং স্পিনারদের মধ্যে অভিষেকের সেরা বোলিং নৈপুণ্য এটি। অস্ট্রেলিয়ার স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ২০০০ সালের ১৯ জানুয়ারি সিডনিতে ১৯ রানে চার উইকেট নিয়ে এর আগে ছিলেন সেরা। একই ভেন্যুতে সর্বাধিক উইকেট নেয়ার ক্ষেত্রে মিরপুরে চতুর্থ ওয়ানডেতে সাকিব ছাড়িয়ে যান শ্রীলঙ্কান অফস্পিনারের নেয়া ৫৯ উইকেটের রেকর্ডকে। সাকিব সেদিন সেটাকে করেছেন ৬১ উইকেটে শেষ।

সর্বোপরি সিরিজের ব্যাটিং-বোলিংয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাই এগিয়ে। ব্যাটিংয়ের নৈপুণ্যে শীর্ষ তিনটি স্থানই বাংলাদেশের। এ সিরিজে অধিনায়কত্ব না থাকা মুশফিকুর রহীম ভারমুক্ত হয়েই ব্যাট চালিয়েছেন। সিরিজে সর্বাধিক রান করে তিনিই শীর্ষে। মুশফিক ৫ ইনিংসে দুটি অর্ধশতক হাঁকিয়ে করেছেন ৪২.৬০ গড়ে ২১৩ রান। সে কারণে তিনি হয়েছেন সিরিজের সেরা ক্রিকেটার। দুইয়ে থাকা এনামুল দুই অর্ধশতকে ৪০ গড়ে করেছেন ২০০। তিনে থাকা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও দারুণভাবে নিজেকে মেলে ধরেছেন। তিনি দু’টি অর্ধশতকসহ ১৭৯ রান করেছেন অবিশ্বাস্য ৮৯.৫০ গড় নিয়ে। ১৫ ইনিংস পর তিনি অর্ধশতক পান সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে। ফলে মিডলঅর্ডারের দুঃশ্চিন্তাটা সার্বিকভাবেই কেটেছে দলের। টপঅর্ডারে মোটামুটি রান আসার কারণে সেই দুশ্চিন্তাটাও কেটেছে। অথচ কিছুদিন আগেও ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য, নিজেদের স্বাভাবিক নৈপুণ্যে ফিরিয়ে আনার জন্য মনোবিদেরও শরণাপন্ন হতে হয়েছে। সবই অবশেষে ফলপ্রসূই হলো এ সিরিজের মধ্য দিয়ে। আবার বোলিংয়েও শীর্ষ তিনটি জায়গা ধরে রেখেছেন বাংলাদেশের বোলাররা। ১১ উইকেট নিয়ে শীর্ষে সাকিব আল হাসান। ১০ উইকেট নিয়েছেন আরাফাত সানি। আর তিনে থাকা মাশরাফি কামব্যাক সিরিজে নিয়েছেন ৯ উইকেট। বাংলাদেশের পেসারদের জন্য অনুপ্রেরণার উজ্জ্বল নিদর্শন হয়েছেন তিনি। আর এ অনুপ্রেরণা আগামী বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের পেস সহায়ক উইকেটে বাড়তি আত্মবিশ্বাসের জন্য উপজীব্য হবে বাংলাদেশ দলের অন্য পেসারদের জন্য।

প্রকাশিত : ৩ ডিসেম্বর ২০১৪

০৩/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: