মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

লেখাপড়া বনাম মানসিক সমস্যা

প্রকাশিত : ২ ডিসেম্বর ২০১৪

একাডেমিক শিক্ষা বা লেখাপড়ায় ভাল করা বা না করা মানসিক সুস্থতা বা অসুস্থতার কোন মাপকাঠি নয়। কারণ মানসিকভাবে অসুস্থ একজন ব্যক্তি লেখাপড়ায় অনেক ভাল করতে পারে। আবার মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক একজন ব্যক্তি লেখাপড়ায় আগ্রহ-ইচ্ছা না থাকার কারণে রেজাল্ট ভাল নাও করতে পারে। অথবা মেধা বুদ্ধিও স্বল্পতার কারণেও লেখা পড়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে। এজন্য লেখাপড়া কোনভাবেই মানসিক সুস্থতার কোন মাপকাঠি হতে পারে না। লেখাপড়ায় ভাল মানে, একজন ব্যক্তির আগ্রহ-ইচ্ছা ও স্মরণশক্তির ক্ষমতা ও দক্ষতা মাত্র।

ছেলেমেয়েদের বুদ্ধি ভাল হলেও রেজাল্ট ভাল নাও হতে পারে। লেখাপড়ার প্রতি যদি কারও আগ্রহ-ইচ্ছা না থাকে ও পড়া মনে রাখার স্মরণশক্তি খারাপ থাকে তাহলে রেজাল্ট খারাপ হবে। লেখাপড়ার প্রতি ইচ্ছা-আগ্রহ ও স্মরণশক্তি ভাল থাকলে রেজাল্ট ভাল হবে। এছাড়া তার অন্য কোন কিছুর প্রতি আগ্রহ ও দক্ষতা থাকলে সে অন্য বিষয়েও ভাল করতে পারে। জোর খাটিয়ে নয় বরং কোন বিশেষ বিষয়ে নিজ ইচ্ছা আগ্রহ ও পরিশ্রমের ফলেই মানুষ জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারে।

শিশুর ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা : একটি পরিবারে, একই পরিবেশে, একই মা-বাবার সন্তানের মধ্যে দেখা যায় ভিন্ন রকম স্বভাব ও চরিত্র। তাদের মন মানসিকতা, আচার-আচরণ, চালচলনেও থাকে অনেক বেশি পার্থক্য। এর কারণ কি, কেন এমন হয়? অনেক সময় মা-বাবা হিমশিম খান একাধিক সন্তানের বিভিন্ন রকম সমস্যা নিয়ে। তাদের চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাক্সক্ষা, দক্ষতা-অদক্ষতা ইত্যাদি পার্থক্যের কারণে ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা দেখা যায়। এ ভিন্নতার কারণে তাদের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি হয়।

মনোবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে শৈশব খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। শিশুর ব্যক্তিত্ব তার পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও পারিপার্শি¦কতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। তাছাড়া শিশুর নিজস্ব শিক্ষাগ্রহণ ক্ষমতা, ইচ্ছা, আগ্রহ ও প্রবণতা দ্বারাও ব্যক্তিত্ব প্রভাবিত হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে ব্যক্তি নিজেকে কেবল বিকশিত করে।

শান্তা লেখাপড়ায় বেশ আগ্রহী, বরাবরই সে স্কুলে ভাল রেজাল্ট করে থাকে। অথচ তারই ছোট ভাই মোটেই পড়তে চায় না। সারাক্ষণ দুষ্টামি করে, মাকে ও বাড়ির সবাইকে যন্ত্রণা করে। লেখাপড়ার প্রতি তার কোনরূপ ইচ্ছা বা আগ্রহ কাজ করে না। লেখাপড়া যেন ওর মাথায়ই ঢুকে না, খেলাই শুধু তার ভাল লাগে। মা-বাবার শত চেষ্টাতেও কোন লাভ হচ্ছে না, তার আগ্রহ শুধু টিভি দেখা আর কম্পিউটারে গেম খেলা। এ নিয়ে মা-বাবা দুশ্চিন্তায় অতিষ্ঠ হয়ে আছেন।

মাঝে মাঝে কিছু রোগীর মা-বাবা ফোনে জানতে চান, ‘আমার বাচ্চা মোটেই কথা শোনে না, শুধু টিভি দেখে আর লেখাপড়া তো করেই না ইত্যাদি। বলুন তো ওকে কিভাবে ঠিক করে ফেলা যায়, যেন সে মন দিয়ে লেখাপড়া করে আর আমাদের কথা মানে। কিছু টিপস্ দিন না, প্লিজ’। আমি তাদের কিছুটা সান্ত¡না দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি যে ব্যক্তির সমস্যা শুনে বা দেখে এক বাক্যে বলে দেয়া যাবে না যে, এটা করলে এসব সমস্যা চলে যাবে।

যে কোন মানসিক বা আচরণগত সমস্যার চিকিৎসায় রোগীর ব্যক্তিত্বের ধরন, চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধি ও আবেগীয় অবস্থান সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, তারপর তার রোগের কারণ বিশ্লেষণ করতে হবে। কেউ সারাক্ষণ পড়তে পছন্দ করে, কারও কাছে লেখাপড়া একটি যন্ত্রণার মতো মনে হয়। কেউ ইংরেজীতে খুব ভাল, আবার কারও কাছে অংক সহজ মনে হয়, এ সবই ইচ্ছা ও আগ্রহের ব্যাপার। জোর করে কারও মধ্যে কোন বিষয়ের প্রতি ইচ্ছা বা আগ্রহ সৃষ্টি করা যায় না।

আবার একই বিষয়ে সবাই সমানভাবে বা একই রকম প্রতিক্রিয়া করে না। সকলের প্রতিক্রিয়া করার বিষয়বস্তু ও মাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন কেউ একটি তেলাপোকা, টিকটিকি দেখে অতিমাত্রায় তীব্র ভয়ের প্রতিক্রিয়া করতে পারে। কেউ আবার ভয়ঙ্কর বিষাক্ত সাপ দেখেও কোন ভয় না পেয়ে, তাকে মারতে যাবার উদ্যোগ নিতে পারে। যে কোন একটি ঘটনা কারও কাছে খুব কষ্টের মনে হতে পারে। কেউবা একই ঘটনায় আনন্দবোধ করতে পারে, এটি তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।

মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা বা সাইকোথেরাপি- প্রতিটি শিশুর বংশগত বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। তার পরিবেশ, ধর্ম বিশ্বাস, সামাজিক রীতি-নীতি ইত্যাদি থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার মানসিকতা প্রত্যেকের ভিন্ন রকম হওয়ার কারণে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এতটা পার্থক্য থাকে। মানসিকভাবে দু’জন মানুষ সম্পূর্ণ এক রকমের নয়। তাই প্রত্যেকের মানসিক রোগ ও আচরণগত সমস্যাও ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। তবে দৃশত : দু’জন মানুষের আচরণ সমস্যা ও মানসিক রোগ একই রকম মনে হলেও তাদের ব্যক্তিত্বের ভিন্নতার কারণে প্রত্যেক রোগীর সাইকোথেরাপি ও মনোবৈজ্ঞানিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।

মানসিক সমস্যায় ব্যক্তিকে সাইকোথেরাপি প্রদান করা মানে, শুধুমাত্র কথার মাধ্যমে চিকিৎসা নয়। কেবলমাত্র সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিকে সঠিক পরামর্শ প্রদান করা নয়, ভালমন্দ বুঝিয়ে দেয়া বা রোগীকে কেবল সহানুভূতি প্রকাশ করা নয়। ভালমত কথা বললেই মানসিক রোগী ভাল হয়ে যায় না, তার রোগের জন্য সঠিক মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এ সাইকোথেরাপির অর্থ আরও ব্যাপক, এটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংসম্পূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি, যার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা রয়েছে। এখানে ওষুধ ব্যবহারের কোনই সুযোগ নেই। তাই অপ্রাপ্ত ও প্রাপ্তবয়স্ক মানসিক রোগীর আচরণ এবং জীবনধারাকে ইতিবাচক পরিবর্তন করার জন্য এ পদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সম্পূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এবং ঝুঁকিহীন। রোগের শুরুতে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হলে, যে কোন মানসিক রোগ, জটিল আকার ধারণ করতে পারে না।

দক্ষ সাইকোথেরাপিস্ট এর মাধ্যমে ধৈর্য ধরে, মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণ করে মানসিক ও আচরণ সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি জীবনের স্বাভাবিক কর্মকা-ে ফিরে আসতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী উম্মে কুলসুম কলি

মনস্তাত্ত্বিক, গবেষক ও সাইকোথেরাপিস্ট

সাইকোলজি রিসার্চ সেন্টার

ফোন- ০১৭১১-০১৮০৯৪

প্রকাশিত : ২ ডিসেম্বর ২০১৪

০২/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: