মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

নাম-সই জালিয়াতি করে অর্থ লোপাটের মামলা থেকে ডিসিকে রক্ষার ফন্দি

প্রকাশিত : ২ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মাতারবাড়ী বিদ্যুত প্রকল্প

এইচ এম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ কক্সবাজারে মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুত প্রকল্পের ২৩ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জালিয়াতি করার ঘটনায় তোলপাড় চলছে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কক্সবাজারের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আদালতে নিয়োজিত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ্যাডভোকেট আবদুর রহিম ও বাদীর আইনজীবী এ্যাডভোকেট মোসতাক আহমদ চৌধুরী অন্যদের যোগসাজশে বাদীর নাম ও দস্তখত জালিয়াতি এবং প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে বলে দায়ের করা দুর্নীতির মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার অভিযোগ থেকে জেলা প্রশাসকের নাম কেটে দেয়ায় রবিবার কক্সবাজার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে এই মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলায় আসামি করা হয়েছে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ রুহুল আমিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) এসএম শাহ হাবিবুর রহমান হাকিম, জেলা প্রশাসনের নাজির স্বপন পাল ও দুইজন আইনজীবী যথাক্রমে মহেশখালীর ধলঘাটার বাসিন্দা এ্যাডভোকেট মোসতাক আহমদ চৌধুরী ও উখিয়ার বাসিন্দা দুর্নীতি দমন কমিশনের পিপি এ্যাডভোকেট আবদুর রহিমসহ ৫

জনকে। মহেশখালীর মাতারবাড়ী উপজেলার সিকদারপাড়া এলাকার চিংড়ি চাষী এ কে এম কায়সারুল ইসলাম চৌধুরী বাদী হয়ে প্রতারণা, জালিয়াতি ও দুর্নীতি দমন আইনে এ মামলাটি দায়ের করেন। কক্সবাজারের সিনিয়র স্পেশাল জজ মোঃ সাদিকুল ইসলাম তালুকদার মামলাটি তদন্ত করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিকট প্রেরণ করেছেন।

মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প হিসেবে ঘোষিত মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প নির্মাণে সরকার ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের কাজ। কিন্তু এর মধ্যে মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুত প্রকল্পের অধিগ্রহণ করা চিংড়ি জমির ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়ার নামে স্বনামে-বেনামে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ২৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে স্থানীয় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভুয়া চিংড়ি চাষী নামধারী একটি সিন্ডিকেট।

বাদীর আইনজীবী এ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাকারিয়া জানান, গত ১৯ নবেম্বর কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ রুহুল আমিনসহ ৯ জন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ১৯ জন ভুয়া চিংড়ি চাষীসহ ২৮ জনকে আসামি করে একই আদালতে এবং একই বাদী একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। ওই মামলার আসামিরা হলেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ জাফর আলম (বর্তমানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট), সাবেক জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আরেফিন আক্তার নূর, মহেশখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মশিউর রহমান, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিডেটের প্রজেক্ট পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোঃ ইলিয়াস, জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখার প্রধান সহকারী আবুল কাশেম মজুমদার, জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কানুনগো আবদুল কাদের, সার্ভেয়ার ফখরুল ইসলাম ও বাদশা মিয়া এবং অপর ১৯ জন ভুয়া চিংড়ি চাষী যথাক্রমে মাতারবাড়ীর রফিকুল ইসলাম প্রকাশ ভে-ার রফিক ও মহিবুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম, মাতারবাড়ীর মাইজপাড়ার মোঃ হারুন, মিয়াজীপাড়ার মোঃ জমির উদ্দিন, একই এলাকার মোঃ এরফান, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, মোঃ সেলিম, জিএ ছমি উদ্দিন, নূর আহমদ, নুরুল ইসলাম, চকরিয়ার বদরখালী এলাকার আবুল বশর, মাতারবাড়ীর আশরাফ আলী, দানু মিয়া, মীর কাশেম, কালারমারছড়ার মোঃ সেলিম উদ্দিন, মাতারবাড়রী মোঃ রিদুয়ান, আনিছুর রহমান ও ছকি আলম।

বাদীর দায়ের করা ওই অভিযোগ যথারীতি আদালত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে তদন্ত করে ২৫ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার মৌখিক আদেশের প্রেক্ষিতে গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। কিন্তু ১৯ নবেম্বর এই অভিযোগ দায়েরের পরবর্তী সময়ে বাদী এ কে এম কাইছারুল ইসলাম চৌধুরীর অজান্তে জেলা প্রশাসক মোঃ রুহুল আমিনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ফৌজদারি দরখাস্ত-৪৮/২০১৪ ইং-এর মামলার আরজি থেকে জেলা প্রশাসকের নাম কেটে দেয়া হয়। মামলার বাদী পরে ঢাকা দুদকের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে জানতে পারেন গত ১৯ নবেম্বর দায়ের করা মামলার বাদীর নিয়োজিত আইনজীবী এ্যাডভোকেট মোসতাক আহমদ চৌধুরী এবং কক্সবাজার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আদালতের নিয়োজিত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ্যাডভোকেট আবদুর রহিম অপর দুই আসামির যোগসাজশে দরখাস্ত থেকে জেলা প্রশাসকের নাম কৌশলে কেটে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই আইনজীবীদ্বয় পেশাগত আচরণ লংঘন করে বাদীর নাম দস্তখতও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের নাম বাদ দেয়ার মতো জঘন্য কাজ করেছেন।

প্রসঙ্গত, ইতোমধ্যে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে হরিলুট করা এই বিপুল অঙ্কের টাকা উদ্ধারের জন্য কক্সবাজারে সার্টিফিকেট আদালতে গত ১২ অক্টোবর মহেশখালীর মাতারবাড়ী দ্বীপের ২১ জনের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা দায়েরপূর্বক টাকা ফেরত দেয়ার নোটিস প্রদান করে। ওই ২১টি সার্টিফিকেট মামলার মধ্যে ১৫টিতে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। সেইসঙ্গে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে জাল-জালিয়াতিতে যোগসাজশের জন্য জেলা প্রশাসনের ৪ জন কর্মচারী যথাক্রমে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সাবেক প্রধান সহকারী আবুল কাশেম মজুমদার, কানুনগো আবদুল কাদের, সার্ভেয়ার ফখরুল ইসলাম ও বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও রুজু করা হয়েছে। সর্বশেষ এ ঘটনার প্রধান হোতা হিসেবে অভিযুক্ত জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখার (এলএ শাখা) সাবেক প্রধান সহকারী আবুল কাশেম মজুমদারকে সাসপেন্ডও (সাময়িক বহিষ্কার) করা হয়েছে এবং অপর তিনজনকে চট্টগ্রাম জেলায় বদলি করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে এ্যাডভোকেট মোসতাক আহমদ চৌধুরী বলেন, বাদী নিজেই জজ আদালতে জবানবন্দীতে এবং হলফনামা মূলে জেলা প্রশাসকের নাম বাদ দিয়েছেন। এতে আমার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ আনা সম্পূর্ণ অবান্তর বলে আমি মনে করি। কক্সবাজার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আদালতের নিয়োজিত পিপি এ্যাডভোকেট আবদুর রহিম জনকণ্ঠকে বলেন, আমি বাদীর আইনজীবীও নই এবং বাদীর পক্ষে সাক্ষীও নই। ওসব ব্যাপারে আমার কোন ধরনের সম্পৃক্ততাও নেই। তারপরও কেনইবা আমাকে জড়িয়ে এসব মিথ্যা অভিযোগ এনেছে তা আমার বোধগম্য নয়। তিনি এ ব্যাপারে আইনের আশ্রয় নেবেন বলে জানিয়েছেন।

প্রকাশিত : ২ ডিসেম্বর ২০১৪

০২/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: