হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শিশুর আচরণ সমস্যায় আমাদের করণীয় উম্মে কুলসুম কলি

প্রকাশিত : ২৫ নভেম্বর ২০১৪
শিশুর আচরণ সমস্যায় আমাদের করণীয় উম্মে কুলসুম কলি

৫ বছরের শিশুটি ভর্তি হয়েছিল ঢাকার একটি স্বনামধন্য স্কুলে। এক বছর পর স্কুলের টিচারদের অভিযোগ আসে, সে কোন কথাতেই রেসপন্স করে না। ক্লাসে সবাইকে যন্ত্রণা করে, কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারে না। অন্যমনষ্ক থাকে, একমনে নিজে নিজে কথা বলে। সব কিছুতেই খুব অমনোযোগী। কোন কথা বুঝতে পারে না, কিছু শিখতে পারছে না। জেদ বেশি, বুদ্ধি খাটিয়ে কোন খেলা বা কাজ করতে পারে না। কোন কাজ শুরু করে শেষ করতে পারে না। মা-বাবা তার লেখাপড়া ও ভবিষ্যত সম্পর্কে খুবই হতাশ ছিলেন। এরপর সাইকোথেরাপি চিকিৎসা শুরুর ৬ মাস পর শিশুটি নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয়া শুরু করেছে। একা একা কথা বলা কমিয়ে দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছে। প্রায় দুই তিন বছর নিয়মিত মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার পর তার উল্লেখিত সমস্যাগুলোর প্রায় অনেকগুলো কাটিয়ে উঠেছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্কুলে যাবার বয়স হওয়ার পর বোঝা যায়, তার মধ্যে বুদ্ধি বা আচরণ সমস্যা আছে। এর আগে পরিবারের সদস্যরাও বুঝতে পারেন না সন্তানের কোন সমস্যার কথা। তখন মা-বাবারা হতাশ হয়ে যান। সন্তানের সঠিক চিকিৎসার আশায় বিভিন্ন ডাক্তার পরিবর্তন করেন, দেশের বাইরে নিয়ে যান। এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় ডাক্তার বলেন, ‘না, তেমন কোন রোগ নেই। বড় হলে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।’ আসলেই এটি কোন শারীরিক রোগ নয়। শিশু-কিশোরদের এসব সমস্যা মূলত মনের সমস্যা, বিকাশগত বা আবেগীয় সমস্যা। বিভিন্ন কারণে এসব মনের সমস্যাই ধীরে ধীরে মানসিক রোগ সৃষ্টি করে থাকে।

অনেক সময় বাড়িতে মা-বাবা খুব আদর-যতœ করেন, কখনও খুব শাসন করেন, তবুও সন্তানের আচরণে কোন পরিবর্তন হয় না। বয়স বাড়তে থাকে, তার সমস্যাও ঘনীভূত হতে থাকে। সঠিক চিকিৎসার জন্য সঠিক ডায়াগনোসিস হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যত কম বয়সে চিকিৎসা শুরু করা যাবে, রোগী তত দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। সমস্যা লুকিয়ে না রেখে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। শিশু-কিশোরদের আচরণ ও মানসিক সব ধরনের সমস্যাই ওষুধবিহীন মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা সম্ভব, এ সাধারণ তথ্যটি আমরা অনেকেই জানি না।

মা-বাবা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য লক্ষণীয় বিষয়

* সন্তানের কাছে আপনি যা প্রত্যাশা করেন, সে স্বপ্ন পূরণের ক্ষমতা বা যোগ্যতা তার মধ্যে আছে কি?

* আপনার প্রত্যাশিত বিষয়ে তার নিজের আগ্রহ বা সুযোগ আছে কি?

* কখনও ভেবেছেন কি, আপনার সন্তান যে ভুল বা অন্যায় করছে, তা সে কোথায় শিখেছে?

* আপনার সন্তান কি বয়স অনুপাতে সঠিক আচরণ করছে?

* বয়স অনুপাতে তার বুদ্ধি স্বাভাবিক মাত্রায় বেড়েছে কি?

* আপনি কি জানেন কোন বয়সের ছেলেমেয়ের জন্য কতটুকু মানসিক বিকাশ অপরিহার্য?

* আপনার সন্তানকে কৈশোরে বা যৌবনে পদার্পণের জন্য আপনি কি তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছেন?

আমাদের করণীয়

আপনার সন্তানের বয়স, বিকাশের পর্যায় ও বুদ্ধির পরিপক্বতা অনুসারে তাকে পরিচালনা করা অবশ্য প্রয়োজন। এই সম্পর্কে অভিভাবক ও শিক্ষকদের নিজ নিজ ভূমিকা সম্পর্কেও জানা প্রয়োজন। মা-বাবার মধ্যে অনেক বিষয়ে মতের অমিল থাকতে পারে। অন্তত সন্তান লালন-পালনে দু’জনকে একমত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নইলে সে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করতে পারে। আচরণে কোনরূপ অসঙ্গতি ধরা পড়লে দ্রুত সতর্ক হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা, অত্যন্ত দুষ্টু হওয়া, অতিরিক্ত শান্ত স্বভাব, আচরণ ও আবেগের দিক থেকে ভিন্ন প্রকৃতির হওয়া মানেই এই নয় যে, তার বুদ্ধি কম, সে ভাল না বা অস্বাভাবিক। এই অবস্থায় তাকে মারধর করলে বা জোর খাটালেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এই ধারণা ঠিক নয়। জোড়পূর্বক তাকে কোন কিছু শিখতে বাধ্য করবেন না। তার পছন্দের বিষয়ে তাকে শেখার সুযোগ সৃষ্টি করে দিন।

খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি

শিশুর সুষ্ঠু মানসিক বিকাশে খেলাধুলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেরাম, লুডু, ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি যে কোন খেলা হতে পারে। সমবয়সীদের সঙ্গে আনন্দ করে খেলার মাধ্যমে, শিশুর মন ও দেহের অনুশীলন হয় এবং শিশু পৃথিবী ও পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে মৌলিক ধারণা পেতে শুরু করে। অনেকে মনে করেন খেলাধুলা করলে সময় নষ্ট হয়, এ সময়টুকু পড়ালেখায় ব্যয় করাই শ্রেয়। প্রকৃত অর্থে খেলাধুলার মাধ্যমেই শিশু প্রকৃত শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন করে। খেলাধুলা মানুষকে নতুন চিন্তা করতে শেখায়, সমস্যা সমাধানের কৌশল শেখায় এবং স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করে। তাই বাধা না দিয়ে সন্তানকে খেলাধুলার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করে দিন।

লেখক : মনোবিজ্ঞানী, গবেষক ও সাইকোথেরাপিস্ট

সাইকোলজি রিসার্চ সেন্টার

ফোন : ০১৭১১০১৮০৯৪

প্রকাশিত : ২৫ নভেম্বর ২০১৪

২৫/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: