কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সূর্যমুখী চাষাবাদের উজ্জ্বল সম্ভাবনা

প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর ২০১৪
সূর্যমুখী চাষাবাদের উজ্জ্বল সম্ভাবনা

বাংলাদেশের বেশিরভাগ এলাকায় কৃষকদের নিকট সূর্যমুখীর চাষ তেমন একটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। কেননা, এটি প্রায় সকল চাষির নিকট একটি নতুন ফসল। বাংলাদেশে সূর্যমুখী সারা বছরই চাষ করা যায়। তবে অগ্রহায়ণ বা মধ্য-নবেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বরের মধ্যে চাষ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। অতিসম্প্রতি জার্মানির অর্থায়নে পরিচালিত এবং বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা বা এনজিওর মাধ্যমে বাস্তবায়িত ‘কোস্টাল লাইভলিহুডস এ্যাডাপটেশন প্রজেক্ট’ (সিএলএপি) এর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা গেছে যে, উপকূলীয় অঞ্চলের বিশেষ করে, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার শতকরা ৯৯ ভাগ ক্ষুদে চাষি সূর্যমুখীর চাষাবাদ তো দূরের কথা এর নামটা পর্যন্ত জানত না। আবার অসংখ্য কৃষক রয়েছে যারা বাস্তবে কখনও সূর্যমুখী দেখেনি। বিগত দু’তিন বছর যাবত নগণ্য সংখ্যক ক্ষুদে কৃষক বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে সূর্যমুখীর উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট এনজিওর সার্বিক সহায়তায় স্বল্পপরিসরে নিজেদের প্লটে এর চাষাবাদ শুরু করেছে।

বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া ইউনিয়নের রূপধন ও কুপধন গ্রামের সূর্যমুখী আবাদ করেছে এমনি ১৫ জন চাষির নিকট থেকে উৎপাদনের আয়-ব্যয়ের তথ্যাবলী সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একজন চাষি এক একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে গড়ে টাকা ১০,০৯৭.০ মাত্র লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এর জন্য তাকে একর প্রতি সর্বমোট টাকা ১৫,৭০৩.০ মাত্র খরচ করতে হয়েছে। শত চেষ্টা ও প্রশিক্ষণ নেয়া সত্ত্বেও নতুন ফসল হিসেবে এর ষোলোআনা যতœ তারা নিতে পেরেছেন এমন দাবি কোন কৃষকই করেনি। তবু একরপ্রতি গড়ে ১০০০ কেজি সূর্যমুখী উৎপাদন করতে পেরে তারা ভারি খুশি এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি ফলন পাবে বলে অনেকটাই আশাবাদী। লাভের অঙ্ক ছাড়াও সূর্যমুখীর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এলাকার সাধারণ মানুষের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে যা সচরাচার অন্যান্য ফসলে দেখা যায় না বললেই চলে। সূর্যমুখী গাছে যখন প্রাকৃতিক নিয়মে ফুল ফুটতে শুরু করে তখন এলাকার সর্বস্তরের নর-নারীর মনে অভাবনীয় আনন্দ আর বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা দোলা দেয়। মানুষের মনের সেই অপার আনন্দ উপলব্ধিটা টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা অত্যন্ত জটিল ও কঠিন ব্যাপার। এদিক থেকে বিচার করলে গ্রামীণ কৃষিতে সূর্যমুখীর গুরুত্ব অপরিসীম। সবচেয়ে বড় কথা হলো, উপকূলীয় এই অঞ্চলে কিছুটা মাটির লবণাক্ততার কারণে সূর্যমুখী চাষের আগে অন্য কোন ফসল উৎপাদন করা যেত না। সূর্যমুখীর চাষ যোগান দিচ্ছে পুষ্টির চাহিদা। বীজ থেকে খাবার তেল বানানোর সহজ কোন যন্ত্র বা পদ্ধতি এই এলাকায় না থাকলেও তারা বরগুনা গিয়ে তেল ভাঙ্গিয়ে নিয়ে আসে এবং তাতে কৃষকরা ভারি খুশি। সূর্যমুখী তেল খুবই স্বাস্থ্যসম্মত এবং এর জনপ্রিয়তা বা কদর দিন দিন বাড়ছে। ফলে, সূর্যমুখীর চাষ ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে বলে উপকূলীয় প্রায় সকল শ্রেণীর মানুষই আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছে।

নতুন ফসল বলে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ থেকে ইচ্ছুক চাষিদের জন্য সূর্যমুখীর উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। সূর্যমুখীর বাজারজাতকরণের কোন সুব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ভাল বীজের অভাব এবং সময়মতো সার না পাওয়ার অভিযোগ কৃষকরা প্রায়শই করে। এর প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বীজ থেকে তেল করার সহজতর টেকসই প্রযুক্তি কৃষকদের শেখাতে হবে। সূর্যমুখী পাকার সময় টিয়া পাখি জমিতে এসে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। স্বল্পব্যয়ে এর প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণা করা জরুরী। এই সমস্যাগুলো জরুরী ভিত্তিতে সমাধান করা গেলে সূর্যমুখী চাষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের আয় ও পুষ্টির মান ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। সূর্যমুখী চাষ অগণিত গ্রামীণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।

লেখক : অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর ২০১৪

২৩/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: