মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সিরামিক শিল্পের এগিয়ে চলা

প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর ২০১৪
  • মোঃ আরিফুর রহমান হ

ঘটনা : ১ ॥

মাধবী দত্ত নতুন বাড়িতে টাইলস লাগাবেন। বাংলামোটরের টাইলসের দোকানগুলোতে মেয়েকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছেন তিনি। বাহারী রঙের টাইলস থরে থরে সাজানো। সবই দেখতে সুন্দর। বিভিন্ন দামের বিভিন্ন স্টাইলের টাইলস নিজের সাধ্যের মধ্যেই টাইলস দেখলেন মাধবী। কোনটা রেখে কোনটা কিনবেন এ নিয়েই যেন কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যেতেই হলো তাকে। দোকানদারের কাছে শুনলেন এই দেশেই এত উন্নতমানের টাইলস তৈরি হয়। বিদেশি ক্রেতারা এদেশের তৈরি টাইলস কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এ কথা শুনে দেশের জন্য গর্ব অনুভব করলেন তিনি। অনেক বেছে অবশেষে তার মেয়ে চন্দনা টাইলস পছন্দ করল। সেটারই অর্ডার দিলেন মাধবী দত্ত।

ঘটনা : ২ ॥

উর্মিলা আর সজীবের পনেরো বছরের সংসার। দু’জনেই চাকরিজীবী। আদর্শ মধ্যবিত্ত পরিবার বলতে যা বোঝায়, তারা তাই। নিজেদের সংসার বেশ নির্বিঘেœই চলে। আত্মীয়স্বজনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করে। বিয়ে, জন্মদিনে উপহার নিয়ে যায়। ইদানীং স্বর্ণের দাম বেড়ে গেছে বহুগুণ। আগে বিয়েতে ছোটখাটো হলেও স্বর্ণের অলঙ্কারই উপহার দিত এই দম্পতি। কিন্তু এখন স্বর্ণের অলঙ্কারের কথা চিন্তাও করতে পারে না। সাধ্যের মধ্যে আছে সিরামিকের তৈজসপত্রের সেট। দাওয়াত এলেই তাই এই দম্পত্তি ছুটে যায় সিরামিকের তৈজসপত্রের দোকানে।

উপরের দুটি দৃশ্যই আজকের বাংলাদেশের সিরামিক শিল্প কোন দিকে যাচ্ছে সেই অবস্থাকেই নির্দেশ করছে।

ইতিহাসে ফিরে দেখা...

সিরামিক শিল্প এ দেশে নতুন নয়। ষাটের দশকে এমসিআই ও ন্যাশনাল সিরামিক নামের দুটি সিরামিক কারখানা পাকিস্তানী এক শিল্পপতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাছাড়া ঐ দশকে ঢাকা সিরামিক ও তাজমা সিরামিক নামে আরও দুটি ব্যক্তি মালিকানাধীন সিরামিক কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ নামক একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা স্থাপিত হয় যা পরবর্তীতে পিপলস সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড নামে স্বাধীন বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারী উদ্যোগে বাংলাদেশ ইন্স্যুলেটর এ্যান্ড স্যানিটারি ওয়্যার ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয়। স্বাধীনতার পর প্রথম ব্যক্তি মালিকানাধীন মুন্নু সিরামিক কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। নব্বইয়ের দশকে সিরামিক শিল্পের বেশ বিস্তার ঘটে। বর্তমানে দেশে চুয়ান্নটি সিরামিক কারখানা আছে।

কিছু সিরামিক পণ্য ও প্রতিষ্ঠান

তৈজসপত্র, স্যানিটারি পণ্য আর টাইলস এই তিন ধরনের পণ্য সিরামিক কারখানায় উৎপাদিত হয়। টাইলস, বেসিন, কমোড, কিচেন ওয়্যার, স্যানেটারি ওয়্যার, টেবিল ওয়্যার, মাটির জার, কলস, ফুলের টব, মটকা, টেবিল ওয়্যার, স্যানেটারি ওয়্যার, গার্ডেন পট, ভেজ, কিচেন ওয়্যার, ডিনার সেট, টি সেট, কফি মগ, প্লেট, বাটি থেকে শুরু করে গৃহস্থলীর বিভিন্ন জিনিসপত্র সিরামিক দ্বারা তৈরি করা হচ্ছে। শাইনপুকুর, মুন্নু, বেঙ্গল ফাইন, স্টান্ডার্ড, পিপলস এবং ন্যাশনাল সিরামিক কারখানা বাংলাদেশের সিরামিক তৈজসপত্রের উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে। আবার আরএকে, ফুয়াং, চায়না-বাংলা, ফার, মধুমতি, এটিআই, সানফ্লাওয়ার, গ্রেট ওয়াল, ঢাকা-সাংহাই এবং মীর কোম্পানি টাইলস ও স্যানেটারি পণ্য উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

যে দেশে যায় সিরামিক পণ্য

ব্রিটেন, ইতালি, আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, নরওয়ে, কানাডা, সুইডেন, স্পেন, অষ্ট্রেলিয়া, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া, আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ড, পোল্যান্ড, গ্রীস, তুর্কী, ইন্ডিয়া, রাশিয়াসহ পঞ্চাশের অধিক দেশে সিরামিকের তৈজসপণ্য রফতানি হয়। উন্নত পণ্য ও নক্সার কারণেই দিন দিন বহির্বিশ্বে সুনাম ছড়িয়ে পড়ছে আর বাড়ছে রফতানির বাজার।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানা-অজানা তথ্য

ষ সিরামিক প্লান্ট স্থাপনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। মাঝারি পর্যায়ের একটি সিরামিক কারখানা স্থাপন করতেই প্রাথমিকভাবেই কমসে কম দশ কোটি টাকার বেশি অর্থের প্রয়োজন হয়। তারপর পরিচালনা ব্যয়, কাঁচামালসহ অন্যান্য ব্যয় তো আছেই।

ষ চুনাপাথর ও বিভিন্ন ধরনের ধাতু এবং ও কাঁচামালের সংমিশ্রণে তৈরি হয় সিরামিক পণ্য। এজন্য দরকার পড়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ৩৮০ ডিগ্রী গ্যাসের চাপ। এর কোনটায় ঘাটতি দেখা দিলে প্লান্টকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রায় ১২ ঘণ্টা লেগে যায়। এতে বিপুল ক্ষতি হয়ে যায়। নিম্ন তাপমাত্রার কারণে পণ্যের রং ও মান নষ্ট হয়ে যায়।

ষ সিরামিক শিল্পটির কাঁচামালের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। চুনাপাথর, পোড়ামাটি, প্লাস্টার অব প্যারিস, এ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড, এ্যালুমিনিয়াম হাইড্রো অক্সাইড, জিঙ্ক, তরল সোনাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ইন্ডিয়া, চীন, রুমানিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি এবং জার্মানি থেকে আমদানি করা হয়।

ষ সিরামিক শিল্পের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা, চীন, থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়া বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে এই দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের সিরামিক পণ্যর দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং মান ভাল হওয়ায় বিদেশীরা এদেশের সিরামিক পণের‌্য দিকেই ঝুঁকছে।

২০১৩-১৪ অর্থবছরের হিসাব-নিকেশ

২০১৩-১৪ অর্থবছরে আঠারোটি সিরামিকের তৈজসপত্র কারখানায় এক বছরে প্রায় ২৫ কোটি পিস তৈজসপত্র তৈরি করা হয়। এই কারখানাগুলোতে বিনিয়োগকৃত অর্থ ছিল প্রায় ২২০০ কোটি টাকার। বিদেশে রফতানি হয়েছিল ৩৬০ কোটি টাকার পণ্য এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল ৩২৫ কোটি টাকার। বিশটি টাইলস কারখানায় ৭০০ লাখ বর্গমিটার টাইলস উৎপাদন করা হয়। এই কারখানাগুলোতে ২৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়। বিদেশে ১২ কোটি টাকার পণ্য রফতানি করা হয়েছিল এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল ১৮৫০ কোটি টাকার। ষোলটি স্যানেটারি কারখানায় ১১৫০০০ মেট্রিক টন স্যানেটারি পণ্য উৎপাদিত হয়। এই কারখানাগুলোতে ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়। ৮ কোটি টাকার পণ্য বিদেশে রফতানি হয়েছিল এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল ৩৯০ কোটি টাকার। গত অর্থবছরে মোট ৫৪টি সিরামিক কারখানায় ৫৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল। রফতানির মাধ্যমে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৩৮০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ছিল ২৫৬৫ কোটি টাকা।

সিরামিক শিল্পের অবদান

সিরামিক শিল্প আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অভ্যন্তরীণ বাজারের বিস্তৃতি আমদানি হ্রাস করে বিপুল পরিমান অর্থ সাশ্রয় করছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করেও অর্জিত হচ্ছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। টেবিল ওয়্যারের রফতানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারের ক্ষেত্রে আমরা দেখি ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে এ পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে টেবিল ওয়্যারের অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল প্রায় ২৪১ কোটি টাকা যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩২৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ২০০৯-১০ সালের ২২০ কোটি টাকা রফতানি আয় বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩-১৪ সালে ৩৬০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। টাইলসের ক্ষেত্রে ২০০৯-১০ সালে অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল প্রায় ৭৩২ কোটি টাকার যা ২০১৩-১৪ সালে ১৮৫০ কোটিতে দাড়ায়। টাইলস রফতানিতে ২০০৯-১০ সালে প্রায় এগারো কোটি টাকা রফতানি আয় হয়েছিল এরপর পরবর্তী তিন অর্থবছর রফতানি আয় যথাক্রমে ৮,৭ এবং ৯ কোটি টাকা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৩-১৪ সালে রফতানি আয় বেড়ে ১২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। স্যানেটারি ওয়্যারের ক্ষেত্রে ২০০৯-১০ সালে অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ৮০ কোটি টাকার হলেও মাত্র তিন বছর পর অর্থাৎ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সেই বাজার প্রায় ৩৯০ কোটি টাকার হয়েছে। আর রফতানি আয় ২০০৯-১০ সালে যেখানে প্রায় পৌনে ৩ কোটি টাকার ছিল তা ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রায় ৮ কোটি টাকা হয়। ক্রমান্বয়ে সিরামিক পণ্যের অভ্যন্তরীণ ও রফতানি বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখায় অবদান রাখছে। সিরামিক শিল্প দেশের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্প প্রায় পাঁচ লাখ লোকের কর্মসংস্থান করেছে।

প্রতিবন্ধকতা

সম্ভাবনাময় সিরামিক শিল্প নানামুখী সীমাবদ্ধতার কারণে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। গ্যাসের চড়া দাম আর সরবরাহের অপ্রতুলতা এই শিল্পের প্রসারকে ব্যাহত করছে। যেখানে একটি কারখানায় কমপক্ষে পনেরো পিএসআই গ্যাসের প্রয়োজন সেখানে মাত্র চার থেকে পাঁচ পিএসআই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রকৌশলী থেকে শুরু করে শ্রমিকদের কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি এ খাতের এক বড় অসুবিধা। আশার কথা, এখন বুয়েটে সিরামিকের ওপর কোর্স চালু হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা সিরামিক শিল্পের প্রসারের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। বিদেশী ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারার দরুন প্রতিযোগি দেশগুলো এই বাজার দখল করে নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, আমেরিকা জিএসপি সুবিধা বন্ধ করে দেয়ায় সিরামিক শিল্প ক্ষতির মুখে পড়েছে। রফতানি করতে গিয়ে প্রচুর কর দিতে হচ্ছে। এই শিল্পের কাঁচামাল বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়। কিন্তু আমদানি শুল্কও বেশি। ৭.৫% থেকে ১৫% পর্যন্ত আমদানি শুল্ক প্রদান করতে হয় যা এই শিল্পের অন্যতম বাধা। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ঋণ পাওয়ার জটিলতা, কাঁচামালের অভাব, আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ইত্যাদিও সিরামিক শিল্পের প্রসারের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধক।

শেষ কথা

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন ছাড়িয়ে এখন উন্নত বিশ্বের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এ যে বাস্তবতাবর্জিত কাল্পনিক প্রত্যাশা তা কিন্তু নয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এই স্বপ্ন দেখাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে সিরামিক শিল্পের অবদান বাড়ছে। শিল্পখাতটির ওপর সরকারের সদিচ্ছা এবং পৃষ্ঠপোষকতাই পারে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে একে এগিয়ে নিয়ে যেতে। তাহলে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আমরা এগিয়ে যাব কয়েক ধাপ।

প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর ২০১৪

২৩/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: