মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ॥ সমাবর্তনে প্রাণের উচ্ছ্বাস

প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর ২০১৪
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ॥ সমাবর্তনে প্রাণের উচ্ছ্বাস

গত মঙ্গলবার দুপুর ১টা। শরীরে কালো গাউন, কিট ও মাথায় হুড পরে সবাই প্রবেশ করছেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। যা তাঁদের দেয়া হয়েছিল সোমবার। প্রধান ফটকে এসে হয়ত অনেকেই আবার দাঁড়িয়ে পড়ছেন হারিয়ে যাওয়া ক্যাম্পাসে নিজের স্মৃতির পাতা দীর্ঘ করতে। উঠানো হচ্ছে ছবি। অনেকের পাশেই রয়েছে মিষ্টি একটি বাবু সঙ্গে তার মা। পিতা প্রাণের ক্যাম্পাসটি দেখিয়ে দিচ্ছেন তাঁর সন্তান ও স্ত্রীকে। এভাবেই রুয়েটের চতুর্থ সমাবর্তনে হারানো সেই ক্যাম্পাসের বাতাসে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন মহাআনন্দে।

১৮ নবেম্বর হয়ে যাওয়া রুয়েটের চতুর্থ সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এতে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রকৌশল শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। এবারের সমাবর্তনে সর্বমোট ২ হাজার ৮৭ জন গ্র্যাজুয়েট অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে বিএসই গ্র্যাজুয়েট রয়েছেন ২ হাজার ৫০ জন এবং এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনকারী রয়েছেন ৩৭ জন। তথ্যগুলো সম্পর্কে বলছিলেন রুয়েট উপাচার্য রফিকুল আলম বেগ।

তিনি জানান, এই সমাবর্তনে রুয়েটের স্নাতক শ্রেণীর (বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং) ২০০৩-২০০৪ শিক্ষাবর্ষ (০৩ সিরিজ) হতে ২০০৮-২০০৯ শিক্ষাবর্ষ (০৮ সিরিজ) পর্যন্ত এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণীর (এমএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং, এম ইঞ্জিনিয়ারিং, এমফিল, পিএইচডি) এ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিগ্রীপ্রাপ্ত সকল ছাত্র-ছাত্রীকে এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সনদপত্র প্রদান করা হয়।

সমাবর্তনকে ঘিরে রুয়েটে নতুন রূপ: ১৮ নবেম্বর রুয়েটের চতুর্থ সমাবর্তনকে ঘিরে এর অনেক আগে থেকেই অনুষ্ঠানটি আড়ম্বরপূর্ণ ও জাঁকজমকভাবে আয়োজন করতে উপাচার্য অধ্যাপক রফিকুল আলম বেগের নেতৃত্বে বিভিন্ন কমিটি প্রস্তুতিমূলক সকল প্রকার কার্যক্রম চালিয়ে পরিচালিত করেন। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ভবন রং ও সাজসজ্জাকরণসহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ কাজ করা হয়। গোটা ক্যাম্পাসে সাঁটানো হয় তোরণ ও ফেস্টুন। রাষ্ট্রপতির আগমন ও গ্র্যাজুয়েটদের ঘিরে রুয়েট যেন পায় নতুন একটি রূপ।

যেখানে অনুষ্ঠিত হয় সমার্তন : সমাবর্তন অনুষ্ঠানটি রুয়েটের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। প্যান্ডেলে গ্র্যাজুয়েট ও অতিথিদের প্রবেশের জন্য করা হয় চারটি গেট। এছাড়াও ভিভিআইপিদের জন্য দুটি গেট রাখা হয়েছিল। মঙ্গলবার দুপুর একটার মধ্যে সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারী সকল গ্র্যাজুয়েট, আমন্ত্রিত অতিথি এবং সংবাদকর্মীরা সমাবর্তন প্যান্ডেলের নির্ধারিত স্থানে আসন গ্রহণ করেন। সমাবর্তনের সকল প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর গত সোমবার থেকেই রুয়েট ক্যাম্পাসে বিরাজ করতে শুরু করে সাজ সাজ রব ও উৎসাহ উদ্দীপনার আমেজ। সাবেক শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা ক্যাম্পাস।

সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতির আগমনের কারণে গোটা ক্যাম্পাসে ১৭ নবেম্বর থেকে নিরপত্তা নিশ্চিত করতে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয় এবং বহিরাগতদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এবারের সমাবর্তনে আচার্যের নেতৃত্বে দুপুর দেড়টায় সমাবর্তন শোভাযাত্রা প্রশাসনিক ভবন থেকে শুরু হয়, এতে রুয়েটের উপ-উপাচার্য, সিন্ডিকেট সদস্য, ডিন, বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক ও গ্র্যাজুয়েটরা অংশ নেন। দুপুর আড়াইটায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠান শুরু। রাষ্ট্রপতি ও রুয়েট আচার্য আবদুল হামিদ সকল গ্র্যাজুয়েটকে ডিগ্রী প্রদান করেন এবং কৃতী গ্র্যাজুয়েটদের গোল্ড মেডেল ও ক্রেস্ট প্রদান করেন। বিকেল ৩টায় মহামান্য রাষ্ট্রপ্রতি সমাবর্তনের সমাপনী ও সভাপতির বক্তব্য দেন।

রাষ্ট্রপতি ও সমাবর্তন বক্তা যা বলেছেন : সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য হলো জ্ঞান সঞ্চালন ও নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন এবং সেই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার পাশাপাশি সৃজনশীল কর্মকা-, মুক্তবুদ্ধিচর্চা ও চিন্তার স্বাধীনতা বিকাশে অবদান রাখতে হবে। তাহলে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জনসহ বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নাগরিক হয়ে উঠতে পারবে।’

রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, ‘বর্তমান বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তির। এ বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ প্রকৌশলী সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই। আমাদের রয়েছে বিপুল মানবসম্পদ। এদের তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানে দক্ষ করে তুলতে পারলেই তারা জাতির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার দেশের বিভিন্ন জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে যুগোপযোগী তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যে আইসিটি ইন এডুকেশন মাস্টার প্লান প্রণয়ন করেছে। ফলে মাধ্যমিক স্তর থেকে শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানে সমৃদ্ধ হচ্ছে।’

সমাবর্তনের গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তোমরা আজ গ্র্যাজুয়েট, দেশের উচ্চতর মানবসম্পদ। আজকের এই সমাবর্তন একদিকে যেমন তোমাদের অর্জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, তেমনি দায়িত্বও অর্পণ করছে। সে দায়িত্ব নিজের পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি, সর্বোপরি দেশ ও জাতির প্রতি। তোমরা তোমাদের অর্জিত জ্ঞান, মেধা ও মনন দিয়ে দেশের কল্যাণ করতে পারলে সে ঋণ কিছুটা হলেও শোধ হবে।’

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্রকৌশলী ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহা. রফিকুল আলম বেগ।

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ‘সনাতন শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতি থেকে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতির দিকে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আকৃষ্ট হচ্ছে। ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে সম্ভাব্য সমাধানসহ মূল্যায়ন করে। শিক্ষক এখানে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন। আমি আশা করব, উপস্থিত শিক্ষকরাও এ ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বইয়ের বাঁধাধরা সমাধান ছাড়াও নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ব্যবহার করে নতুন নতুন প্রযুক্তি কিভাবে সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে উৎসাহ দেবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানি যে গ্রীন হাউজ নিয়ে পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর অতিমাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুত উৎপাদন ও যানবাহনের ব্যবহারের ফলে। আর এই সমস্যা সৃষ্টিতে বাংলাদেশের অংশ অত্যন্ত নগণ্য হলেও বাংলাদেশ চিহ্নিত হয়েছে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে। আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো কিভাবে এই সমস্যার মোকাবিলা করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায়। আমি আশা করব আজকের ¯œাতকরা এই গ্রীন ও টেকসই উন্নয়নের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ¯œাাতক ও ¯œাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করবে এবং এ বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।’

সমাবর্তনে যারা উপস্থিত ছিলেন : সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গ্র্যাজুয়েটদের সঙ্গে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আয়েনউদ্দিন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ দারা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল খালেক, বর্তমান উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান।

প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর ২০১৪

২৩/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: