কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য আখ্যান ॥ মেঘমল্লার

প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০১৪
মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য আখ্যান ॥ মেঘমল্লার

কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইনকোট’-এর ছায়া অবলম্বনে গড়ে উঠেছে চলচ্চিত্র ‘মেঘমল্লার’-এর কাহিনী। সিনেমার প্রেক্ষাপট ১৯৭১ সালের কোন এক মফস্বল শহর। যুদ্ধের ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। সেই সময়ের শরৎকালের টানা তিন দিনের তীব্র বর্ষণমুখর সময়ে গড়ে উঠেছে এই সিনেমার আখ্যান। নূরুল হুদা শহরের সরকারী কলেজের রসায়নের সিনিয়র প্রভাষক। নির্বিবাদী মানুষ। তিনিই এই গল্পের মূল চরিত্র। স্ত্রী আসমা এবং চার বছরের মেয়ে সুধাকে নিয়ে তার ঝুট ঝামেলাবিহীন সংসার। তবে ধীরে হলেও যুদ্ধের আঁচ লাগতে শুরু করে মফস্বল শহরে এবং সেটি নূরুল হুদার জীবনে ও বয়ে আনে এক বিয়োগান্তক পরিণতি। অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া এক যুদ্ধ অনেক সাধারণ মানুষের তাঁর জীবনকে ও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। যুদ্ধের সঙ্কটকালীন সময়ে আরও কয়েকজন শিক্ষকের মতো নিয়মিত কলেজে হাজিরা দেয়। সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। মধ্যবিত্তের শঙ্কা, ভয়, পিছুটান তাকে অসহায় করে তোলে। তবে নিজে যুদ্ধ যেতে না পারলেও নূরুল হুদা মনেপ্রাণে কামনা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। নূরুর হুদার একমাত্র শ্যালক তরুণ মিন্টু একদিন কাউকে কিছু না বলে যুদ্ধে চলে যায়। একদিন সে এক বর্ষণমুখর দিনে বোনের সঙ্গে দেখা করতে বাসায় আসে। যাবার সময় ফেলে যায় তার রেইনকোট। মিন্টুকে ঘিরে নূরুল হুদা এক চাপা অস্বস্তিতে থাকে।

এরই মধ্যে একদিন কলেজের ট্রান্সফর্মার গ্রেনেড মেরে উড়িয়ে দেয়া হয়। কলেজ থেকে পিয়ন জরুরী খবর নিয়ে আসেÑ এক্ষুণি যেতে হবে কলেজে। সেখানে পাকিস্তানী আর্মি মেজর অপেক্ষা করছে। নূরুল হুদার জ্বর, তবুও সে যেতে মনস্থ করে। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। আসমা তাকে মিন্টুর ফেলে যাওয়া রেইনকোটটা পরে যেতে বলে। রেইনকোট পরে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে যায়। নূরুল হুদা মিন্টুর জন্য এক ধরনের মায়া অনুভব করে। আহারে ছোট ছেলেটা কত কষ্টই না করছে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে দেশকে স্বাধীন করার জন্য। স্কুলে নূরুল হুদার জন্য অবর্ণনীয় কষ্ট অপেক্ষা করছিল। মেজর তাকে এবং ইতিহাসের শিক্ষক আব্দুস সাত্তার মৃধাকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। অকথ্য নির্যাতন চালায় তাঁর উপরে। মেজরের ধারণা নূরুল হুদার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যোগাযোগ আছে এবং স্কুলে সেই তাদের ঢুকিয়েছে। নূরুল হুদা সে এসবের কিছুই জানে না। কথা বের করার জন্য নির্যাতন চালায় নূরুল হুদার উপর। তার নাক মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। রেইনকোটে টপ টপ করে পড়ে রক্ত। এক মুক্তিযোদ্ধার রেইনকোট পরে নূরুল হুদার নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা মনে হয়। নিজের মধ্যে সাহস অনুভব করে। সে মুখোমুখি হয় মেজরের। সে মেজরকে জানায়, আমি সব জানি কিন্তু তোমাকে কিছুই বলব না, কারণ সব মুক্তিযোদ্ধারা আমার ভাই। দৃপ্তকণ্ঠে বলে জয় বাংলা। এরপর মেজরের এক বুলেটে থেমে যায় নূরুল হুদার কণ্ঠ। এদিকে স্ত্রী আসমা অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে। সে কিছুতেই জানতে পারে না তার স্বামী কি অবস্থার মধ্যে আছে। সে তার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। দেশ স্বাধীন হয়। একটা ট্রাকে করে সমস্ত জিনিসপত্র তোলা হয়। মিন্টু তার বোনকে নিয়ে চলে যায় অন্যত্র। পেছনে পড়ে প্রিয় মানুষের মুখ আর স্মৃতি।

মেঘমল্লার চলচ্চিত্রটি নানা কারণেই আলোচনার দাবি রাখে। প্রথমত, এর বিষয়বস্তু আমাদের গৌরবোজ্জ্ব¡ল মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের দেশে যে কয়টি হাতেগোনা মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে তাতে যুদ্ধের ভয়াবহতাই ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টাই দৃশ্যমান। মেঘমল্লার চলচ্চিত্রে যুদ্ধের ভয়াবহতার চেয়েও যুদ্ধের ফলে মানুষ কিভাবে আক্রান্ত হচ্ছে সেটি উপজীব্য। ব্যক্তির মনোজগৎ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের আদি অন্তই শেষ পর্যন্ত মেঘমল্লারের মূল সুর। একজন সাধারণ মানুষের প্রতিরোধী হয়ে ওঠার গল্প মেঘমল্লার। নৌকার মাঝি থেকে শুরু করে কলেজের শিক্ষক সবারই শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প। পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জনের চলচ্চিত্রের নায়ক এক সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ। যে শ্যালকের যুদ্ধে যাওয়াটাকে পছন্দ না করলেও মেনে নিয়েছে। কারণ সে ঝামেলা পছন্দ করে না। কিন্তু কিছু না করেও তাকে ও যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং নির্মমতা গ্রাস করে।

মেঘমল্লার চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত নানন্দিকভাবে বাংলার প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছে। অবিশ্রান্ত বর্ষণমুখর প্রকৃতি দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। বার বার ঘুরেফিরে নদী এসেছে। নদী যেন মানুষের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সেতু। কারণ নদী দিয়েই আসে তারা। চলচ্চিত্রটির প্রপস এবং সেটের ব্যবহারে ১৯৭১ সালকে পরিচালক তুলে ধরতে চেয়েছেন। সেটিতে তিনি পুরোপুরি সফল। মেঘমল্লার চলচ্চিত্র প্রতিটি চরিত্র যেন বাংলাদেশের এক এক ধরনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। যেন একটি পরিবার, একটি দেশ। শেষ পর্যন্ত তরুণ মুক্তিযোদ্ধা মিন্টু আপামর মুক্তিযোদ্ধার প্রতীক হয়ে ওঠে। ছাপোষা শিক্ষক নূরুল হুদা হয়ে ওঠে সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর প্রতিচ্ছবি। একটি দৃশ্যে নদীর পাড়ে মানুষের লাশ নিয়ে শকুনের কামড়াকামড়ি দৃশ্যটিকে অনন্য করে তুলেছে। নদীর মধ্য দিয়ে গোধূলী লগ্নে মুক্তিযোদ্ধার উদাস মুখ দর্শক হিসেবে আমাদের ও উদাস করে দেয়। বোধ করি বাংলাদেশের আর কোন চলচ্চিত্রে বর্ষা এতটা অসাধারণভাবে উঠে আসেনি যতটা এসেছে মেঘমল্লারে। ছবিটিতে অসাধারণ ফটোগ্রাফি ব্যবহার করেছেন পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন। স্বচ্ছ এবং ঝকঝকে ছবি, সেইসাথে লোকেশন সাউন্ডে অসাধারণ আউটপুট। পুরো চলচ্চিত্রটিতে আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার পরিশীলিত এবং নান্দনিক। পরিচালক এ সব কারণে নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।

চলচ্চিত্রটিতে নূরুল হুদা চরিত্রে শহীদুজ্জামান সেলিমের অভিনয় প্রশংসা কুড়িয়েছে। তার চরিত্রায়ন করার আপ্রাণ চেষ্টা পুরো চলচ্চিত্রেই দৃশ্যমান। আসমা চরিত্রে অপর্ণা ভাল অভিনয় করেছেন। তরুণ মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে মিন্টুর অভিনয় দর্শকদের অনেক দিন মনে থাকবে। সুধা চরিত্র ছোট্ট জারার অভিনয় দেখে মনেই হয়নি সে অভিনয় করছে। নান্দনিকতার ছোঁয়া মিলেছে চলচ্চিত্রের সব কটি বিভাগে। সর্বোপরি, মেঘমল্লার চলচ্চিত্রটি আমাদের চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরে আসার ইঙ্গিত বহন করে। এই চলচ্চিত্রটি বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক অনুদানে নির্মিত হয়েছে। আমাদের গৌরবোজ্জ্ব¡ল মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য টুকরো টুকরো গল্প ছড়িয়ে রয়েছে সারা দেশে বাংলাদেশের সাধারণ দর্শকের প্রত্যাশাÑ সেই গল্পগুলো নান্দনিক দৃষ্টিকোণে উঠে আসবে আমাদের চলচ্চিত্রে।

প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০১৪

২০/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: