রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সুফিয়া কামাল তোমার দেখানো পথে...

প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০১৪
  • মাহবুব রেজা

নারী জাগরণের কথা এলে প্রথমেই যে নামটি আমাদের মানসপটে জ্বলজ্বল করে ওঠে তিনি মহীয়সী নারী সুফিয়া কামাল। পরাধীন দেশে নারীকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন তিনি। এ ক্ষেত্রে তিনি অগ্রগণ্য। অন্যায়, অসত্য আর অশিক্ষার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অগ্রদূত। বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তাঁকে গণ্য করা হয় মানবতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এবং যাবতীয় অন্যায়, দুর্নীতি ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার এক সমাজসেবী ও নারী নেত্রী হিসেবে। এর বাইরেও তাঁর স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে। তিনি কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে সুবিদিত ।

সুফিয়া কামালের জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের সায়েস্তাবাদে এক অভিজাত পরিবারে। তিনি বাংলা ভাষার অগ্রবর্তী কবি ও সাহিত্যিক। রাজনীতি, স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, নারী সমাজকে এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করেছিলেন। সুফিয়া কামাল প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা লাভ করেননি একথা যেমন সত্য তেমনি তিনি নিজস্ব শিক্ষায় তাঁর চারপাশকে আলোকিত করেছিলেন। তাঁর বাবা সৈয়দ আবদুল বারি। মাত্র সাত বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। বারো বছর বয়সে অর্থাৎ ১৯২৩ সালে মামাত ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তখনকার পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে বাস করেও নিজস্ব চেষ্টায় তিনি স্বশিক্ষিত হন।

ছোটবেলা থেকে লেখালেখির ঝোঁক ছিল তাঁর। সুফিয়া কামালের প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’ ১৯২৩ সালে বরিশালের তরুণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর পর ১৯২৬ সালে সওগাত পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ প্রকাশিত হয়।

১৯২৯ সালে সুফিয়া কামাল সংযুক্ত হন বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলামে। এখানে তিনি নারী শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারসহ নারীদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা- পরিচালিত হতো। এ সময় বেগম রোকেয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শ তাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করত। ১৯৩১ সালে সুফিয়া কামাল মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম ইন্ডিয়ান মহিলা ফেডারেশনের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৩৩-৪১ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা কর্পোরেশন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সাহিত্য চর্চাও অব্যাহত রাখেন। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘সাঁঝের মায়া’ কাব্যগ্রন্থটি। এই বইয়ের ভূমিকা লেখেন কাজী নজরুল ইসলাম। ‘সাঁঝের মায়া’ পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর প্রশংসা করেন। এসময় তাঁর লেখক পরিচিতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৯৪৭-এ সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকা প্রকাশিত হলে তিনি তাঁর প্রথম সম্পাদক নিযুক্ত হন। তাঁর সম্পাদনায় বেগম পত্রিকা সুধীমহলে প্রশংসিত হতে থাকে।

এসময় তাঁর লিখিত সম্পাদকীয়তে সেসময়কার নানা সঙ্গতি-অসঙ্গতি উঠে আসে। ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার সম্পাদকীয়তে সুফিয়া কামাল লিখলেন, “মুসলিম সমাজ আজ এক কঠোর দায়িত্ব গ্রহণের সম্মুখীন। অর্জিত স্বাধীনতা, সম্মান ও গৌরব অক্ষুণœ রাখতে হলে কেবল পুরুষেরই নয়, মুসলিম নারীকেও এগিয়ে আসতে হবে নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কাজে। তার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যৎ নারীসমাজকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সেই স্বাধীন সার্বভৌম আদর্শ রাষ্ট্রের সত্যিকার দাবিদার হতে পারে সগৌরবে। এর জন্য চাই আমাদের মানসিক প্রসার, আশা-আকাক্সক্ষার ব্যাপ্তি আর জীবন সম্পর্কে এক স্থির ধারণা।”

১৯৩২ সালে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হলে তিনি মুষড়ে পড়েন। এ সময় তাঁকে কঠিন জীবন সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় সুফিয়া কামাল সাহসিকতার সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পাশে দাঁড়ান। বাংলাদেশের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি অকুতোভয়ে মানব মুক্তি, নারী মুক্তি, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, নারী-পুরুষের সমতাপূর্ণ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

দেশ ভাগ হলে ১৯৪৭ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা চলে আসেন। নারী নেতৃত্ব তাঁর হাতে ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। দেশভাগের পর তাঁর এ দায়িত্বও যেন আরও বেড়ে গেল। এ সময় সুফিয়া কামাল সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়েন। তিনি যেসব সংগঠন প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনা করেন সেগুলো বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি, দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা, ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থা। তিনি ছায়ানট, কচি-কাঁচার মেলা ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ নানা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। সুফিয়া কামাল তাঁর ‘সাঝের মায়া’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সবিশেষ প্রশংসিত। সাহিত্য মহলে ‘সাঁঝের মায়া’ একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- একাত্তরের ডায়েরী, মোর যাদুদের সমাধি পরে, একালে আমাদের কাল, মায়া কাজল (১৯৫১), কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭) ইত্যাদি।

নারী আন্দোলনের সফল নেত্রী হিসেবে তিনি দেশে ও বিদেশে বিশেষভাবে পরিচিত। স্বাধীন বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। আলোকিত মানুষ গড়ার অন্যতম কারিগরও ছিলেন তিনি। নারী নেত্রী পরিচয়ের বাইরেও তিনি সফল কবি, সার্থক সাহিত্যিক। সাহিত্যচর্চার জন্য সুফিয়া কামাল অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক জাতীয় পুরস্কার ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’ লাভ করেন। কিন্তু ১৯৬৯ সালে বাঙালীদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি তা বর্জন করেন। এ ছাড়াও তিনি বাংলা একডেমি পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), উইমেনস ফেডারেশন ফর ওয়ার্ল্ড পিস ক্রেস্ট (১৯৯৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭) লাভ করেন।

বেগম সুফিয়া কামাল রক্ষণশীল মুসলমান সমাজে জন্মগ্রহণ করেও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কুসংস্কার, অশিক্ষার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। বাঙালী মুসলমান নারী সমাজকে তিনি জাগরণের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন রক্ষণশীল ও আভিজাত্যের বৃত্ত ভেঙ্গে তিনি সাহসী পদযাত্রা শুরু“করেছিলেন। এবং সেখান থেকে সার্থকভাবে বেরিয়ে এসেছেন। বৃত্ত ভাঙ্গার সাহসও দেখিয়েছেন অকুতোভয়ে। সারাজীবন তিনি অশুভ, অসুন্দর, অকল্যাণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। বাংলার পিছিয়ে পড়া নারী সমাজকে অগ্রবর্তী চিন্তায় সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর দেখানো পথে বাংলার নারী শৃঙ্খল মুক্তির স্বাদ পাবে, পাবে বিজয়ী হওয়ার অনুপ্রেরণা।

প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০১৪

২০/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: