আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রূপকথার নায়ক মুমিনুল

প্রকাশিত : ১৯ নভেম্বর ২০১৪
রূপকথার নায়ক মুমিনুল

অতশী আলম ॥ যেন রূপকথার নায়ক মুমিনুল হক। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের তরুণ এই বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান ধারাবাহিকভাবে যা করে চলেছেন তাতে এমন বলাটা খুব বেশি বাড়াবাড়ি নয়। বয়স বাইশ পেরিয়ে সবে তেইশের কোটায় পা রেখেছেন। অথচ এই বয়সেই বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানকে পেছনে ফেলে টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় সেরা ব্যাটিং গড়ের অধিকারী কক্সবাজারে এই যুবা। পাশাপাশি আরও কয়েকটি গৌরবময় রেকর্ডের মালিক বনে গেছেন।

সফরকারী জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে তৃতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে মুমিনুল হাঁকান অপরাজিত ১৩১ রানের ইনিংস। দুরন্ত এই ইনিংসটি খেলার পথে বেশ কয়েকটি গৌরবগাথার সঙ্গী হয়েছেন প্রতিভাবান এই টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান। এখন পর্যন্ত ১২ টেস্টের ২৩ ইনিংসে মুমিনুলের ব্যাটিং গড় ৬৩.০৫। কমপক্ষে ২০ ইনিংস খেলা ক্রিকেটারদের মধ্যে টেস্ট ইতিহাসে মুমিনুলের চেয়ে বেশি গড় শুধু অস্ট্রেলিয়ার স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের। সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং গড় ৯৯.৯৪।

এখন পর্যন্ত চারটি সেঞ্চুরি করেছেন মুমিনুল। নিজের প্রথম ১২ টেস্টে শুধু মুমিনুল ছাড়া আর কারও একটির বেশি শতক নেই বাংলাদেশর কোন ব্যাটসম্যানের। প্রথম ১২ টেস্টেই ১১ বার পঞ্চাশ (চারটি সেঞ্চুরি ও সাতটি হাফসেঞ্চুরি) ছুঁয়ে মুমিনুল স্পর্শ করেছেন এ্যাভারটন উইকস, সুনীল গাভাস্কার ও মার্ক টেইলরকে। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম টেস্টে অর্ধশতক করে টানা ৯ টেস্টে হাফসেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব দেখান মুমিনুল। এক্ষেত্রে তিনি আগেই ছাড়িয়ে গেছেন সতীর্থ তামিম ইকবালকে। তামিমের টানা ৭ টেস্টে অর্ধশতক করার কৃতিত্ব আছে। যেভাবে এগোচ্ছেন তাতে দক্ষিণ আফ্রিকার এ্যাবিডি ভিলিয়াসের রেকর্ড ভাঙলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানের টানা ১২ টেস্টে হাফসেঞ্চুরির অনন্য রেকর্ড আছে। এসবের পাশাপাশি এক সিরিজে দুইবার তিনশ’ বা তার চেয়ে বেশি রান করা বাংলাদেশী রেকর্ডও এখন মুমিনুলের। এবার জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে তিনশ’র বেশি রান করার আগে গত বছর করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে।

বিশ্ব ক্রিকেটের দুই জীবন্ত কিংবদন্তি ব্যাটিং লিজেন্ড ভারতের শচীন টেন্ডুলকর ও বোলিং লিজেন্ড পাকিস্তানের ওয়াকার ইউনুস। দু’জনেরই টেস্ট অভিষেক হয় করাচিতে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে ১৯৮৯ সালের ১৫ নবেম্বর। একই তারিখে বাংলাদেশও কি একজন ভবিষ্যত লিজেন্ড পেতে চলেছে? সেই লিজেন্ড হতে পারেন মুমিনুল হক। যাঁকে এখনই বলা হচ্ছে বাংলাদেশের ‘মিস্টার কনসিসটেন্ট’। ১২ ম্যাচের মধ্যে ১১ ম্যাচেই কোন না কোন ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি করেছেন মুমিনুল। শুধু তাই নয়, জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে তৃতীয় টেস্টে ১৮৯ বলে ১৩১ রানের ইনিংস খেলে চারটি সেঞ্চুরিরও মালিক হয়েছেন। ধারাবাহিক সাফল্য মুমিনুলকে ‘মিস্টার কনসিসটেন্ট’ বানিয়ে দিচ্ছে। পাঁচদিনের ক্রিকেটে যেভাবে ধারাবাহিকভাবে রান পাচ্ছেন মুমিনুল এমন কৃতিত্ব আর কোন টাইগার ব্যাটসম্যান দেখাতে পারেননি। শুধু বাংলাদেশের কেন, বিশ্বের বাঘা বাঘা সব তারকা ব্যাটসম্যারাও এমন সাফল্য দেখাতে পারেননি। মুমিনুল টানা ৯ টেস্টের অন্তত যে কোন একটি ইনিংসে অর্ধশতক করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এভারটন উইক, ইংল্যান্ডের অ্যালেক স্টেওয়ার্ট, অস্ট্রেলিয়ার ম্যাথু হেইডেন, দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যাক ক্যালিস, অস্ট্রেলিয়ার সাইমন ক্যাটিচ, শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারাদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। এখন মুমিনুলের সামনে আছেন অন্তত এক ইনিংসে টানা সবচেয়ে বেশি অর্ধশতক করার দিক দিয়ে শচীন টেন্ডুলকর (১০ ম্যাচে), ইংল্যান্ডের জন এ্যাডরিচ (১০ ম্যাচে), ভারতের বীরেন্দর শেবাগ (১১ ম্যাচে), গৌতম গম্ভীর (১১ ম্যাচে), ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভিভ রিচার্ডস (১১ ম্যাচে)।

শুধু কী তাই, এমন কৃতিত্ব গড়ার ক্ষেত্রে ১২ ম্যাচের মধ্যে ১১ ম্যাচেই কোন না কোন ইনিংসে অর্ধশতক করার দিক থেকে এ্যাভারটন উইকস, সুনীল গাভাস্কার ও মার্ক টেইলরের সঙ্গে অবস্থান করছেন মুমিনুল। সবচেয়ে বিস্ময় জাগানিয়া পারফরম্যান্সও আছে মুমিনুলের। ব্যাটিং গড়ের দিক দিয়ে কমপক্ষে ২০ ইনিংস খেলার হিসেবে স্যার ব্র্যাডমেনের পরেই মুমিনুলের অবস্থান! ব্র্যাডমেনের গড় ৫২ টেস্টে ৯৯.৯৪। আর মুমিনুলের ১২ টেস্টে ব্যাটিং গড় ৬৩.০৫। মুমিনুলের পরের অবস্থানটি দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রায়েম পোলকের (২৩ ম্যাচে ৬০.৯৭ গড়)। বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দ্রুত কম ম্যাচ খেলে ১০০০ রানের ক্লাবে আগেই যুক্ত হয়েছেন মুমিনুল। এবার করে দেখালেন শতকও। গত বছর জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে শুধু মুমিনুল কোন ইনিংসেই অর্ধশতক পাননি। এছাড়া প্রতিটি ম্যাচের কোন না কোন ইনিংসে অর্ধশতক পেয়েছেন। গত বছর মার্চে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে গলে অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসেই অর্ধশতক হাঁকান মুমিনুল। পরের টেস্টের প্রথম ইনিংসেই আবার ৬৪ রানের ইনিংস খেলেন। জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচটিতে কোনো ইনিংসেই অর্ধশতক পাননি। এরপর আর থামেননি মুমিনুল। একের পর এক ম্যাচে পঞ্চাশোর্ধ ইনিংস খেলে চলেছেন।

গতবছর নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ক্যারিয়ার সেরা ১৮১ রানের ইনিংস খেলেন। পরের টেস্টেই একই দলের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ১২৬ রান করেন টপঅর্ডার এ ব্যাটসম্যান। এ বছর জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৫০ করেন। পরের ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে আবার অপরাজিত ১০০ রানের ইনিংস খেলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে প্রথম ইনিংসে করেন ৫১, দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে আসে ৫৬ রান। জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে টানা তিন টেস্টের প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৫৩, দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৪ ও তৃতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে করেন হার না মানা ১৩১ রান। এর ফলে চট্টগ্রামে তিনটি ম্যাচ খেলে তিনটিতেই সেঞ্চুরি করার বিরল কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তিনি। গতবছর নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ক্যারিয়ার সেরা ১৮১ রানের ইনিংস, এ বছর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ১০০ ও এবার জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে ১৩১ রান।

ধারাবাহিকতার এমন মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠার কারণেই বাংলাদেশের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন তরুণ তারকা মুমিনুল হক।

প্রকাশিত : ১৯ নভেম্বর ২০১৪

১৯/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: