মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সাতক্ষীরার সেই জিয়া আফগানী এখন পশ্চিমবঙ্গে!

প্রকাশিত : ১৩ নভেম্বর ২০১৪
  • জানিয়েছে কলকাতায় ধৃত সাজিদ ॥ না’গঞ্জে আটক তার ভাই দু’দিনের রিমান্ডে

শংকর কুমার দে ॥ ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’ এবং ‘শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা’ করার জন্য জঙ্গী মডিউল তৈরির কাজ চলছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ২৫ জঙ্গী মডিউল কাজ করছে বিস্ফোরক তৈরি, সংগ্রহ এবং জিহাদী কাজে জঙ্গী সদস্য সংগ্রহে। এ জন্য রয়েছে ‘ইসাবা টিম’ ও ‘দায়ে’ টিম‘ এই দুই ধরনের জঙ্গী টিম। বিস্ফোরক তৈরি ও সংগ্রহে কাজ করছে ইসাবা টিম আর জিহাদী কার্যক্রমের জন্য জঙ্গী মনোভাবাপন্ন যুবক-যুবতীদের জঙ্গী সংগঠনে ভেড়ানোর কাজ করছে ‘দায়ে টিম’। সাজিদ নারায়ণগঞ্জের আরও কয়েক জেএমবি জঙ্গীর নামের তালিকা দিয়েছে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সিকে (এনআইএ)। কলকাতার সাজিদ ওরফে নারায়ণগঞ্জের মামুনের গ্রামের বাড়ি বন্দরের ফরাজীকান্দা থেকে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া তার ভাই মনোয়ার হোসেন মনাকে দুই দিনের রিমান্ডে এনেছে বন্দর থানা পুলিশ।

তদন্ত সূত্র জানায়, কলকাতায় গ্রেফতার হওয়া জেএমবির জঙ্গী নেতা সাজিদের দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী র‌্যাব তার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার ওপারে বন্দরের ফরাজীকান্দায় অভিযান চালিয়ে তার ভাই মনোয়ার হোসেন মনাকে গ্রেফতার করে জঙ্গীকর্মকা- সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে। বন্দর থানার ওসি নজরুল ইসলাম বুধবার সাজিদ ওরফে মামুনের ভাই মনাকে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দিনের আদালতে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানান। আদালত তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার পর বুধবার রাতে কলকাতায় গ্রেফতার হওয়া তার ভাই সাজিদ ওরফে মামুন সম্পর্কে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সাজিদ ওরফে মামুন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে মনা। জিজ্ঞাসাবাদে মনা বলেছে, চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট মাসুম সাজিদ যাত্রাবাড়ীর একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেছে। সে ২০০৭ সালে বিপুল বিস্ফোরকসহ চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। তার বিরুদ্ধে একটি বিস্ফোরক মামলাও হয়। সেই মামলায় সাজিদ জামিনে বের হয়। ওয়েল্ডিং মিস্ত্রির কাজ করে জানিয়ে মনা বলেছে, বছরদশেক ধরে মামুনের সঙ্গে তার পরিবারের কোন সম্পর্ক নেই। দুবাই যাওয়ার কথা বলে সেই চলে গেছে। তারপর থেকে আর বন্দরের বাড়িতে আসেনি। তার ভাইয়ের নাম সাজিদ নয়, মামুন। মামুন আফগানিস্তানে চলে গেছে বলে লোকমুখে শুনেছিলেন। এখন শুনছেন, কলকাতায় যে সাজিদ গ্রেফতার হয়েছে সেই সাজিদই তার ভাই মামুন।

সাজিদ যা বলেছে ॥ সাজিদ ওরফে মামুন ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএকে জানিয়েছে, ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে মুর্শিদাবাদের লালগোলায় গঠিত হয় জেএমবির ৬৫তম বৈদেশিক শাখা। বর্ধমানের খাগড়াগড়ের তা বিস্তার লাভ করে। বীরভূম, নদীয়া, মালদহে তাদের সিøপার সেল আছে। বর্ধমান, মুর্শিদাবাদসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে জঙ্গী মডিউলের জন্য বিস্ফোরক ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইডি) তৈরি এবং জিহাদী কাজের জন্য ২৫ টিমকে বাছাই করে জামা‘আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। অব্যাহত জেরার মুখে সাজিদ বলেছে, জেএমবির রীতি অনুযায়ী যে কোন এলাকায় জঙ্গীমডিউল গঠনের কাজে নিয়োগ করা হয় ইসাবা ও দায়ে টিমকে। ইসাবা টিমের কাজ হচ্ছে বিস্ফোরক তৈরি ও সংগ্রহ এবং দায়ে টিমের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে জিহাদী মনোভাবাপন্ন যুবক-যুবতীদের দলে ভেড়ানো। এ রাজ্যে ইসাবা হিসেবে কাজ করছে দশ টিম। ধৃত আমজাদ আলী শেখ ওরফে কাজল সেরকমই এক টিমের এক সদস্য। বর্ধমানের খাগড়াগড়ের বোমা বিস্ফোরণে নিহত শাকিল গাজীও ছিল সেই টিমে। পলাতক কাওসরও এই টিমেরই সদস্য। জঙ্গী জিহাদী মডিউলের কাজ হচ্ছে বৃহত্তর বাংলাদেশ গঠন এবং শরিয়ত আইন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য।

নারী জঙ্গীরা পরিচালনা করত দায়ে টিম ॥ তদন্ত সংস্থা এনআইএ গ্রেফতার হওয়া সাজিদের কাছে জানতে পেরেছে, পশ্চিমবঙ্গের ‘দায়ে টিমগুলো’ পরিচালিত হয় মহিলাদের মাধ্যমে। তবে শিমুলিয়া মাদ্রাসার ইউসুফ শেখ ছিল এদের সবার মাথা। রাজ্যের দায়ে টিম পরিচালিত হত ইউসুফের স্ত্রী আয়েশা, শাকিল গাজীর স্ত্রী রাজিয়া, নাসিরুল্লা ওরফে সোহেলের স্ত্রী সামিনা, তালহা শেখের স্ত্রী ময়না বেগমের মতো কয়েকজনের মাধ্যমে। অসমে এই মুহূর্তে ইসাবা টিম ছিল না। তবে দায়ে টিম ছিল। এই টিমের প্রধান ছিল বরপেটার চাতলা গ্রামের বাসিন্দা কোয়াক ডাক্তার শাহনুর আলম ও তার স্ত্রী সুজেনা বেগম। বরপেটার দায়ে টিম মূলত জেহাদী যোগাড় করে শিমুলিয়া মাদ্রাসায় পাঠাত। সুজেনা বরপেটা ও নলবাড়ির আরও চার মহিলা দায়ে টিমের মাধ্যমে শিমুলিয়ায় জঙ্গী পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। অসমের বরপেটার বাসিন্দা এনআইএর হাতে ধৃত সফিকুল ইসলামও একটি দায়ে টিমের মাথা হয়েছিল।

তদন্ত সংস্থা এনআইএ সূত্র জানায়, অব্যাহত জেরার মুখে সাজিদ জানিয়েছে, বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের জেএমবির কয়েক জঙ্গী আছে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা আছে। সাজিদের ভাই মনা সম্পর্কেও বলেছে। এ ছাড়া সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন হচ্ছে তাদের অন্যতম। সাজিদের দেয়া তথ্যানুযায়ী তার ভাই মনাকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। রিমান্ডে এনেছে বন্দর থানার পুলিশ। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে হামলার মাধ্যমে পুলিশ খুন করে যে তিন জঙ্গী ছিনিয়ে নিয়েছিল তাদের অন্যতম সালেহীন। সালেহীন পরে আশ্রয় নেয় পশ্চিমবঙ্গে। বর্ধমানসহ অন্যত্র জঙ্গি- জেহাদী মডিউল খোলার বিষয়ে সাহায্য করছিল সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন।

কে এই জিয়া আফগানী ॥ তদন্ত সংস্থা জানতে পেরেছে, সাতক্ষীরা জঙ্গীদের অন্যতম সংগঠক জিয়া আফগানি। আফগানিস্তানে তালেবানের হয়ে সোভিয়েত সেনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কৃতিত্ব হিসেবে পদবি পায় আফগানী। আলকায়েদা ও তালেবানদের সঙ্গেও যোগাযোগ আছে তার। তার খোঁজ খবর জানতে গিয়ে তদন্ত সংস্থা জানতে পেরেছে, বছরখানেক আগে বেনামে ডেরা বাঁধে পশ্চিমবঙ্গে। জঙ্গী-জেহাদীর নতুন কোন দায়িত্ব পালন করছে জিয়া আফগানী।

সাতক্ষীরা ও রাজশাহী সীমান্ত দিয়েই ॥ গোয়েন্দারা বলেছেন, রাজশাহী ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়েই বর্ধমানের খাগড়াগড়ে তৈরি বোমা পাঠিয়েছে বাংলাদেশে। ভারত থেকে যেসব চোরাই মোবাইল বাস্ক আসে তার মধ্যে থাকে বোমা, বুলেট ও ছোট পিস্তল। এমনকি হেরোইনসহ মাদকও আসে। রাজশাহী ও সাতক্ষীরায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হানা দিলেই জামায়াত ও জঙ্গীরা চলে যায় পশ্চিমবঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গী ঘাঁটিগুলোতে গিয়ে আস্তানা গাড়ছে বাংলাদেশের জঙ্গীরা। পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গী বিরোধী অভিযান জোরদার হওয়ায় জঙ্গীদের অনেকেই বাংলাদেশের রাজশাহী ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়েছে বলে গোয়েন্দাদের দাবি।

যুদ্ধাপরাধী বিচার শুরুতে ॥ যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হলে জামায়াত সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে বেছে নেয় সাতক্ষীরাকে। জামায়াতের সন্ত্রাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতক্ষীরায়। সাতক্ষীরা সীমান্ত সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল তখন জামায়াতীরা। তখন সীমান্তের ওপার থেকে বিপুল অস্ত্র ও বিস্ফোরক আসে সাতক্ষীরায়। আর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ হচ্ছে চোরাচালানের মুক্ত অঞ্চল। তদন্ত সংস্থা এনআইএর ধারণা, খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণের পর জঙ্গীদের কয়েকজন মাথা এই সীমান্ত দিয়েই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সাতক্ষীরার মতো রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জেও জামায়াতের ঘাঁটি, যার সুবাদে জঙ্গী-জেহাদীদের অভয়রাণ্যের রুটে পরিণত হয়েছে।

প্রকাশিত : ১৩ নভেম্বর ২০১৪

১৩/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: