রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শীর্ষস্থানীয়দের বিচার শেষ এখন জামায়াত ও পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই

প্রকাশিত : ১০ নভেম্বর ২০১৪
  • শাহরিয়ার কবির

ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর গত ৫৪ মাসে শীর্ষস্থানীয় ১২ জন গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীর বিচার হয়েছে, যাদের অধিকাংশকে মৃত্যুদ- এবং বাকিদের আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। আমরা সব সময় বলেছি গণহত্যাকারীদের সর্বনিম্ন শাস্তি হওয়া উচিত মৃত্যুদ-। বিশেষভাবে অতীতে বাংলাদেশে গণহত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তি থেকে অব্যাহতির তিক্ত অভিজ্ঞতায় আমরা বলেছি মৃত্যুদ-ের পরিবর্তে অন্য যে কোন দ- দেয়া হলে আগামীতে কখনও যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে সাজাপ্রাপ্তদের দ-ভোগের আগেই তারা মুক্তি দেবে, যেমনটি করেছিলেন এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫-এ স্বাধীন বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকা-ের পর জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসে ’৭১-এর গণহত্যাকারীদের চলমান বিচার বন্ধ করে দিয়েছিলেন, যা আবার আরম্ভ করবার জন্য মুক্তিযুদ্ধের তিরিশ লাখ শহীদের পরিবারবর্গের সদস্যদের অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ৩৫ বছর।

গণহত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তি থেকে জেনারেল জিয়া শুধু অব্যাহতি দেননি, সংবিধানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তিনি তাদের দল জামায়াতে ইসলামীকে তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের মূল্যে অর্জিত বাংলাদেশে রাজনীতি করবার সুযোগ দিয়েছেন এবং নিজে যে দল গঠন করেছেন সেখানেও ’৭১-এর ঘাতক দালালদের যুক্ত করে তাদের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বানিয়েছেন। এর পাশাপাশি জিয়া সংবিধান থেকে রাষ্ট্রের মূলনীতি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’, ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সমাজের ‘পাকিস্তানীকরণ’ ও তথাকথিত ‘ইসলামীকরণ’-এর যে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক ধারা সৃষ্টি করেছিলেন এখনও জাতি সেই পঙ্কিলতা থেকে মুক্তিলাভ করেনি। গত ৫৪ মাসে ১২ জন শীর্ষস্থানীয় গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীর বিচার জিয়াসৃষ্ট কলঙ্কভার কিছুটা লাঘব করেছে। ৩০ লাখ শহীদের পরিবারের হৃদয়ের বিরামহীন রক্তক্ষরণ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে।

’৭১-এর গণহত্যাকারী, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধোত্তর প্রজন্মের সামনে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আবার সজিব হয়েছে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির নৃশংসতম হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও ধ্বংসের বিস্মৃতমলিন দৃশ্যাবলী। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে এই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী এবং এই দলের রাজনীতি ও দর্শন সমানভাবে দায়ী, যে কথা আমরা বলছি প্রায় দুই যুগ ধরে। এ কথা আমরা বার বার বলেছি বাংলাদেশ থেকে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করবার পূর্বশর্ত হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতিসহ তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত ধ্বংস করা। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপ থেকে মুক্ত না হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়া যাবে না। এ কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ’৭১-এর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচার জরুরি হয়ে উঠেছে।

আমরা যখন জামায়াতে ইসলামীর মতো গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট দলকে নিষিদ্ধকরণের কথা বলি তখন পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকা বলে জামায়াত নিষিদ্ধ করা ঠিক হবে না, নিষিদ্ধ হলে তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে আরও জঙ্গী ও সন্ত্রাসী হবে, তাদের ওপর নজরদারি করা যাবে না। পশ্চিমের গোয়েন্দা সংস্থাসমূহকে এতটা অজ্ঞ মনে করবার কোন কারণ নেই যে, জামায়াতের প্রকাশ্য-গোপন জঙ্গী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তারা জানে না। আমরা যতটুকু জানি আমেরিকার সিআইএ ও এফবিআই তার চেয়ে বেশি জানে। এতদিন বহির্বিশ্বে জামায়াতের সংযোগ ছিল ‘আল কায়দা’ ও ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সঙ্গে, এখন যুক্ত হয়েছে ইরাক ও সিরিয়ার ‘ইসলামিক স্টেটস’ (আইএস)। ইউরোপ আমেরিকা থেকে যেসব তরুণ ‘আইএস’-এর জিহাদে অংশ নিয়েছে তাদের চেতনায় আধিপত্য বিস্তার করেছে মওদুদী, হাসান বান্না ও সাঈদ কুত্্ব-এর দর্শন ও প্রেরণা। আমার প্রামাণ্যচিত্র ‘দি আল্টিমেট জিহাদ’-এ যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাস বিশেষজ্ঞ ও আইন প্রণেতারা বলেছেন কিভাবে তাদের পাঠাগার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং ব্রিটিশ তরুণ মুসলিমদের মননে মওদুদীর জিহাদী সাহিত্যের অনুপ্রবেশ ও বিস্তার ঘটেছে।

বাংলাদেশের জামায়াত তাদের সাংগঠনিক ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে বিস্তৃত করেছে তা দ্রুত প্রতিহত করা না হলে দুই দেশের জাতীয় ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে। জামায়াত নিছক একটি রাজনৈতিক দল নয়। কিংবা মাফিয়াদের মতো নিছক সন্ত্রাসী সংগঠনও নয়। জামায়াতের সাহিত্য ও দর্শন তরুণদের মনোজগতে যেভাবে আধিপত্য বিস্তার করে, যেভাবে তারা ধর্মের নামে যাবতীয় সন্ত্রাস ও হত্যাকা-কে বৈধতা দেয়, তা মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস বিনষ্ট করে, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে গ্রাস করে মৌলবাদী বর্বরতা ও জিঘাংসা। মওদুদীবাদ শুধু বিধর্মী কাফেরদের হত্যাকে বৈধতা দেয় না, জামায়াতের রাজনীতি ও দর্শনের বিরোধী মুসলমানদেরও রেহাই দেয় না। প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে হত্যার আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দ-িত ’৭১-এর কুখ্যাত গণহত্যাকারী জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, তাঁর মতো ‘মুরতাদ’দের শাস্তির জন্য ব্লাসফেমি আইন পাস করতে হবে। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে জামায়াতিরা উন্মাদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর। হামলার সময় জামায়াতের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন এলাকায় হিন্দুদের বলেছেÑ ‘তোদের সাক্ষীর কারণে সাঈদী হুজুরের ফাঁসি হয়েছে। বাংলাদেশে আমরা কোন হিন্দু রাখব না।’ এই উন্মাদনা সৃষ্টি করে মওদুদীবাদ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের বিচারের সময় তাদের আইনজীবীরা বলেছেন, ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত বাংলাদেশের পক্ষে ছিল, তারা শুধু ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদে’র বিরোধিতা করেছে। অথচ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের যতবার দ- দেয়া হয়েছে ততবার পাকিস্তান-এর প্রতিবাদ করেছে। শুধু জামায়াত নয়, সেখানকার ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ এবং সরকারের মন্ত্রীরাও বলেছেন, গোলাম আযম-নিজামীরা ’৭১-এ পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন বলেই ভারতের প্ররোচনায় বাংলাদেশ তাদের বিচার করে মৃত্যুদ- দিচ্ছে।

সম্প্রতি জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির আদেশ শুনে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। গত ৬ নবেম্বর (২০১৪) ঢাকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, পাকিস্তান যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোন বিষয়ে নাক না গলায়।

দৈত্যকুলের প্রহøাদের মতো পাকিস্তানে সংখ্যায় নগণ্য হলেও এমন বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ আছেন যারা শুধু ’৭১-এর গণহত্যাকারীদের বিচারই শুধু সমর্থন করেন না, তারা মনে করেন এই গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের উচিত বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া। আমার প্রামাণ্যচিত্র ‘যুদ্ধাপরাধ ’৭১’ এ ধরনের কয়েকজন বিবেকসম্পন্ন পাকিস্তানী বুদ্ধিজীবীর বক্তব্য সন্নিবেশিত হয়েছে। আমার অন্য এক প্রামাণ্যচিত্র ‘সীমাহীন জিহাদ’-এ জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর পুত্র হায়দার ফারুখ মওদুদী বলেছেন, তার পিতা অন্য সবাইকে তার দল করবার জন্য আহ্বান জানালেও নিজের পুত্র-কন্যাদের দলের ছায়াও মাড়াতে দেননি। তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন ইংরেজি স্কুলে, ইংল্যান্ড ও আমেরিকায়। হায়দার ফারুখ বলেছেন, তারা শৈশবকাল থেকেই জামায়াতের গু-ামি ও বদমায়েশি দেখে আসছেন।

দু’বছর আগে পাকিস্তানে আমরা ‘ফোরাম ফর সেকুলার পাকিস্তান’ গঠন করেছি। হায়দার ফারুখ এই ফোরামের অন্যতম সহ-সভাপতি। গত বছর বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি ঢাকা এসেছিলেন। জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে তার বিভিন্ন বক্তব্য গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ঢাকায় তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতি করবার কোন অধিকার থাকতে পারে না। কারণ তারা বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছে এবং এখনও বাংলাদেশের চেতনায় বিশ্বাস করে না। গত সপ্তাহে হায়দার ফারুখ লাহোর থেকে আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেনÑ শাহরিয়ার, তোমরা করছ কি? জামায়াত নেতাদের বিচার নিয়ে তো পাকিস্তানে তুলকালামকা- হচ্ছে। তাকে বললাম, আমাদের কাগজেও বেরিয়েছে পাকিস্তানে কি হচ্ছে। হায়দার বললেন, সাঈদীর ফাঁসির আদেশ আপিলে বদলে গেল কেন? বললাম, ‘আমরা ক্ষুব্ধ; কিন্তু আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের করণীয় কিছু নেই।’ ফারুখ আগেও বলেছিলেন, আবারও বললেন, এরা যা করেছে মৃত্যুদ-ই এদের একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত।

ট্রাইব্যুনালে শীর্ষস্থানীয় গণহত্যাকারীদের বিচার শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে এর পর কি? এ বিচার আর কতদিন চলবে? আমি বলেছি, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের গণহত্যাকারীদের বিচারের পর জেলা, উপজেলা পর্যায়ে যারা আছে তাদের বিচার হবে। ট্রাইব্যুনালে এরকম কয়েকজনের বিচার এরই মধ্যে আরম্ভ হয়েছে। তবে এখন দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর এবং ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যার জন্য দায়ী পাকিস্তানী সামরিক কর্মকর্তাদের বিচারের সময় এসেছে। অনেকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর সরকার পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন, এখন তাদের বিচারের সুযোগ নেই। জামায়াত বলে প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে সহযোগীদের বিচার করা যায় না।

এ বিষয়ে গত বার বছরে অনেক লিখেছি, আবারও বলছি। ১৯৭৪-এর ৯ এপ্রিলে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একটি চুক্তি হয়েছিল দিল্লীতে। এই চুক্তিতে উপমহাদেশে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দী, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল তাদের ছেড়ে দিয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন বাংলাদেশ যদি এসব সামরিক কর্মকর্তাকে ক্ষমা করে দেয় পাকিস্তান কথা দিচ্ছে তাদের বিচার নিজ দেশে হবে। পাকিস্তান এ পর্যন্ত তাদের বিচার করেনি।

বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে, অন্য দেশের সঙ্গে কোন চুক্তি হলে তা জাতীয় সংসদে উত্থাপন করতে হবে এবং সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোন দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় চুক্তি মানা হবে না। ১৯৭৪-এর এই চুক্তি কখনও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়নি, এমনকি মন্ত্রিসভায়ও আলোচিত হয়নি। তাছাড়া তালিকাভুক্ত ১৯৫ জনের বাইরেও অনেক পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী আছে। আমার সম্পাদিত ‘একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি’ গ্রন্থে কয়েকজন ভুক্তভোগী ও নির্যাতিত ব্যক্তির জবানবন্দী রয়েছে। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী কর্নেল হাসান বা ব্রিগেডিয়ার মজুমদার তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের জন্য দায়ী যে সব পাকিস্তানী সামরিক কর্মকর্তার উল্লেখ করেছেন তাদের নাম ১৯৫ জনের তালিকায় নেই। ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিধান আছে এবং এ বিষয়ে এখনই উদ্যোগী হতে হবে। প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানের কাছে সরকারী পর্যায়ে জানতে হবে ১৯৫ জনের মধ্যে কারা বেঁচে আছেন এবং তাদের ঠিকানা কী। পাকিস্তানের সরকার সহযোগিতা না করলে আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারের বিধান আমাদের আইনে আছে। ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে জামায়াতের আলবদর বাহিনীর ঘাতক চৌধুরী মঈনউদ্দিন ও আশরাফুজ্জামানের অনুপস্থিতিতে বিচার করে মৃত্যুদ- দিয়েছে। এদের একজন আছেন যুক্তরাজ্যে, আরেকজন যুক্তরাষ্ট্রে।

১৯৫ জনের ক্ষমা প্রসঙ্গে আমি বিভিন্ন লেখায় ভিয়েনা কনভেনশনের উল্লেখ করে বলেছি এই ক্ষমা আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ নয়। ‘আন্তর্জাতিক আইনে একটি অবশ্যমান্য মতবাদ আছে যাকে বলা হয় ‘জুস কোজেন্্স’ (ঔঁং ঈড়মবহং)। ‘গণহত্যা’, ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’, ‘যুদ্ধাপরাধ’, ‘দাসপ্রথা’ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক অপরাধসমূহ ‘জুস কোজেন্্স’-এর অন্তর্গত যা থেকে কোন ব্যক্তি বা সরকার কোন অবস্থায় অব্যাহতি পেতে পারে না এবং কোন সরকার বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি এসব অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার থেকে অব্যাহতি দিতে বা ক্ষমা করতে পারে না। ১৯৮৬ সালে গৃহীত ‘আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির আইন সংক্রান্ত ‘ভিয়েনা কনভেনশন’-এ সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘জুস কোজেন্্স’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক যে কোন চুক্তি অকার্যকর বলে গণ্য হবে। (সভ্যতার মানচিত্রে যুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শাহরিয়ার কবির, সময়, ফেব্রুয়ারি ২০১১)

এ বিষয়ে শেষ কথা হচ্ছে ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর ক্ষমা সম্পর্কে ১৯৭৪-এর ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশের দেশীয় আইনে এবং আন্তর্জাতিক আইনেও এই ক্ষমার কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ছাড়াও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক বোঝাপড়া এখনও বাকি রয়েছে। পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা এবং ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণের এখনও কোন মীমাংসা হয়নি। প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. দীপু মনি একাধিকবার এসব দাবি সম্পর্কে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। পাকিস্তানের নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ’৭১-এর গণহত্যার জন্য একাধিকবার ক্ষমা চাওয়া হলেও সরকারীভাবে ক্ষমাও চাইতে হবে পাকিস্তানকে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এখন বহু ক্ষেত্রে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক মর্যাদাবান দেশ এ কথাটি সেখানকার সরকারকে ভুলে গেলে চলবে না।

’৭১-এর গণহত্যাকারী পাকি জেনারেলদের বিচার করা হয়নি বলেই পাকিস্তান আজ জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান তাদের জিহাদ উৎপাদন ও রফতানি নীতি অব্যাহত রাখলে এমন দিন বেশি দূরে নয় যেদিন বিশ্বের মানচিত্রে পাকিস্তান নামের কোন দেশের অস্তিত্ব থাকবে না।

প্রকাশিত : ১০ নভেম্বর ২০১৪

১০/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: