কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আন্তঃনদী সংযোগ টিপাইমুখ ও গঙ্গায় আরও ১৬ বাঁধ ।। পানিশূন্য হবে দেশ

প্রকাশিত : ১০ নভেম্বর ২০১৪
  • দেশের নৌপথ ২৪ হাজার কিমি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার কিমি শুষ্ক মৌসুমে আর নদী মনে হয় না বরাক ও মেঘনা বেসিনের ২৫ নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করে ভারত

শাহীন রহমান ॥ আন্তঃনদী সংযোগ, টিপাইমুখ বাঁধ ও গঙ্গা নদীর ওপর আরও ১৬টি বাঁধ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশ পানিশূন্য হয়ে পড়বে। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে। গঙ্গা নদীর ওপর প্রায় ৪০০টির মতো ছোট-বড় বাঁধ রয়েছে। আরও ১৬টি বাঁধ নির্মিত হলে বাংলাদেশের জন্য ধ্বংস বয়ে নিয়ে আসবে।

এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন পানি বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, ভারত গত ৪০ বছর ধরে সব আন্তর্জাতিক নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে। সম্প্রতি দেশটি পানি প্রত্যাহারের আরও যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কোন অস্তিত্বই থাকবে না। সব নদী পানিশূন্য হয়ে দেশ মরুভূমিতে পরিণত হবে। পানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, ’৭৪ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর মাত্র ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে ভারত। এরপর প্রায় ৪০ বছর পার হয়ে গেছে। আজও বন্ধ হয়নি ফারাক্কার পরীক্ষামূলক কাজ। শুধু ফারাক্কার প্রভাবেই প্রতিবছর দেশে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। সম্প্রতি আরও যেসব প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে তার প্রভাব হবে ফারাক্কার চেয়েও ভয়াবহ।

তাঁদের মতে, ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, টিপাইমুখ প্রকল্প ও সম্প্রতি ভারতের গঙ্গা নদীর ওপর আরও ১৬টি বাঁধ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশে জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে তা সহজেই অনুমেয়। পানি স্বল্পতায় গোটা দেশই হুমকির মধ্যে পড়বে।

অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ভারত শুধু ফারাক্কা ও তিস্তা বাঁধের মাধ্যমে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে না। তার অভ্যন্তর দিয়ে বয়ে আসা প্রায় সব আন্তর্জাতিক নদীর ওপর একের পর এক বাঁধ তৈরি করে বাংলাদেশকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসা এসব নদীর শাখা নদী, উপনদী থেকেও পানি প্রত্যাহার, সেচ প্রকল্প ও বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে।

হিমালয় থেকে বয়ে আসা নদীগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৯০ ভাগ পানি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। দেশের ভেতর দিয়ে ৩০২টি নদী প্রবাহিত হলেও ৫৭টি নদীর অভিন্ন উৎস একই। এসব নদীর বেশিরভাগই হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করেছে। কিন্তু ভারত পানি প্রত্যাহার করে তাদের অন্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর ফলে প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের প্রায় নদীই পানিশূন্য থাকছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ভারত যখনই এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তখনই দেশের ভেতর থেকেই প্রবল প্রতিবাদ উঠছে আর ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। কিন্তু বার বার এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও কাজ করছে তার উল্টো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নদীগুলোতে কোন দেশ ইচ্ছে করলেই একতরফাভাবে বাঁধ নির্মাণ করতে পারে না। এ বাঁধ নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক আইন-কানুন রয়েছে অথচ ভারত এসব আইনের কোন তোয়াক্কা করছে না। ১৯৬৬ সালের হেলসিংকী নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত দেশ অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনা করবে। এ জন্য অবশ্যই অন্য দেশের যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

একই নীতিমালার ২৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে এক অববাহিকার একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক অববাহিকার প্রবাহিত পানি ব্যবহার সম্পর্কে গৃহীত পদক্ষেপ অবহিত করবে। ১৯৭১ সালে ইউনেস্কো জলাভূমি সম্পর্কিত রামসার কনভেনশনের নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশ প্রকৃতি এবং জলজজীব বৈচিত্র্য রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিটি দেশ আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ থেকে পানি ব্যবহারের সময় পার্শ্ববর্তী একই অববাহিকার অন্যান্য দেশের যাতে কোন বড় ধরনের ক্ষতি না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ১৯৯৮ সালে বিশ্বব্যাংক এবং আইইউসিএন প্রতিষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড কমিশন অন ড্যামের নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে কোন বড় নদীতে ড্যাম তৈরি করতে চাইলে সেই নদীর বেসিনের মানুষের কাছে অবশ্যই এ ড্যামের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে অথচ একের পর এক ভারতের নেয়া এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের একটির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক এসব আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। সবই তারা একতরফা সিদ্ধান্তে বাস্তবায়ন করেছে।

ফারাক্কা বাঁধ ॥ ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক নদীগুলোর মধ্যে প্রথম ফারাক্কার ওপর বাঁধ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছে। ১৯৭৪ সালে এ বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এরপরই বাংলাদেশের ভেতর থেকে প্রবল প্রতিরোধ শুরু হয়। কিন্তু প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা প্রথমে ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মাত্র ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে। কিন্তু আজও তাদের এ পরীক্ষমূলক কাজ বন্ধ হয়নি। এর পর পেরিয়ে গেছে ৪০ বছর। গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে বার বার ভারতের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। সর্বশেষ চুক্তি করা হয় ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর। ৩০ বছর মেয়াদী এ চুক্তি অনুসারেই প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে দু’দেশের মধ্যে পানি বণ্টন হয়ে আসছে।

ফারাক্কা বাঁধে ভারতের নিজেরও কোন উপকারে আসেনি অথচ এটি বাংলাদেশের জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাবে বর্ষাকালে গঙ্গা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ২০ ফুট নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে গঙ্গার শাখা নদীগুলোতে পানি থাকে না বললেই চলে। প্রধান শাখা নদী গড়াই এখন পানিশূন্য। নদীতে পানি কমে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে সমুদ্রে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। ফলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মায় পানি না থাকায় দেশের লাখ লাখ জেলে পরিবারের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের নৌপথ ২৪ হাজার কিলোমিটার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ হাজার কিলোমিটারে। নদীর পানি কমে যাওয়ায় ভূ-অভ্যন্তরের পানি আর্সেনিক দূষণ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আর্সেনিকে দেশে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে এক সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প জিকে প্রকল্পও প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পে সময়মতো পানি কমে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে দেশের ৫ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

তিস্তা নদীতে বাঁধ ॥ এ বছর নীলফারামীর তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে সবচেয়ে কম পানি আসার কারণে কৃষকরা ধান চাষ করতে পারেননি। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তাকে শুষ্ক মৌসুমে এখন আর নদী মনে হয় না অথচ দেশের উত্তরাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত প্রধান নদী তিস্তা। ভারত ইতোমধ্যে তিস্তা নদীর ওপর ৬টি বড় বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি থাকে না বললেই চলে। জানা গেছে, ভারত তিস্তার বুকে ছয়টি বাঁধ ছাড়াও সেচ প্রকল্পের জন্য তিস্তার উপনদীগুলোতে অসংখ্য বাঁধ এবং ৩০টির মতো জলবিদ্যুত নির্মাণ করেছে। এছাড়া আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের হিমালয় এক নং সংযোগ খাল মানস-সাংকোশ-তিস্তা গঙ্গা সংযোগ খালের কাজ সম্পন্ন করেছে। ভারতের গজলডোবা বাঁধের উজানের জলাধার থেকে পানি সরাসরি ফারাক্কা বাঁধের উজানে গঙ্গা নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। বাঁধের মাধ্যমে তিস্তা বেসিনের পানি মহানন্দা বেসিনে সরিয়ে নিচ্ছে। গঙ্গা থেকে সংযোগ খালের মাধ্যমে পানি দাক্ষিণাত্যে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ কারণে শুষ্ক মৌসুমে দেশে তিস্তা একেবারেই শুকিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে এবং এ নদী থেকে প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া না গেলে প্রতিবছর দেশে ১৩৫ বিলিয়ন টাকার সমপরিমাণ ক্ষতি হবে।

দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত অন্যতম বৃহৎ নদীর নাম ব্রহ্মপুত্র। এটি চীনের ভেতর দিয়ে ভুটান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। চীনের অংশে এ নদীর ওপর প্রথম দিকে বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা দেয়া হলেও পরে চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন বাঁধ তারা তৈরি করবে না। যদিও এখনও এ নদীর ওপর ভারত কোন বাঁধ নির্মাণ করেনি। তবে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোন বাঁধ ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর তারা তৈরি করবে না। কিন্তু এখনও কোন বাঁধ তৈরি না হলেও ভুটান থেকে প্রবাহিত এ নদীর প্রায় ২০টি উপনদীতে তারা বাঁধ দিয়েছে। এই ২০টি উপনদীর সরাসরি ব্রহ্মপুত্র নদে প্রবাহিত হয়েছে। এমনকি তারা ভুটান থেকে আসা দুধকুমার ও ধরলা নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ ব্যাহত করেছে।

টিপাইমুখ ॥ সম্প্রতি ভারতের যে কয়টি প্রকল্প নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে টিপাইমুখ প্রকল্প। যদিও ভারত থেকে বলা হয়েছে বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন প্রকল্প তারা নেবে না। তারপরেও টিপাইমুখ বাঁধ পরিকল্পনা থেকে তারা সরে আসেনি। এমনকি এ বাঁধ নির্মাণে অটল রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বরাক ও মেঘনা বেসিনের ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা প্রায় ২৫টি নদীর উজানে ভারত বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। টিপাইমুখে এখনও বাঁধ নির্মাণ করা না হলেও সমীক্ষার কাজ চলছে। জানা গেছে, ভারতের মনিপুর রাজ্যে টিপাইমুখ নামক স্থানে ১৬৩ মিটার উঁচু ড্যাম তৈরি করে বরাক ও তার উপনদীগুলোর মিলিত প্রবাহের গতিরোধ করে ৩শ’ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জলাধার নির্মাণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এছাড়া অসমের কাছার জেলার ফুলেরতাল নামক স্থানে একটি বড় ব্যারাজ তৈরি পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যারাজ তৈরি করে বরাক নদীর পানি সরিয়ে নিলে ভাটিতে নদী প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বাঁধ বাস্তবায়িত হলে হাওড় এলাকায় ইরি, বোরো এবং অন্যান্য ফসল চাষ ব্যাহত হবে। এ এলাকার লাখ লাখ কৃষকের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। পরিবেশের ভারসাম্য হারিয়ে যাবে। এছাড়া টিপাইমুখ এলাকায় ১৮৯৭ সালে ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি এক শ’ থেকে দেড় শ’ বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকায় এ ধরনের বড় ভূমিকম্প হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এটি হলে হাওয়া এলাকা ধ্বংসলীলায় সাধিত হবে।

আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ॥ বিশেষজ্ঞদের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ভারতের দীর্ঘদিনের প্রকল্প। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সে দেশের আদালতের রায় রয়েছে। জানা গেছে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে তারা ৩৭টি নদীকে ৩০টি সংযোগ খালের মাধ্যমে যুক্ত করে পানি অন্য রাজ্যে স্থানান্তর করবে। ব্রহ্মপুত্র গঙ্গা নদীকে সংযোগ খালের সঙ্গে যুক্ত করে ব্রহ্মপুত্র থেকে প্রথমে তিস্তা নদীতে এবং তিস্তা নদী থেকে গঙ্গা নদীর ফারাক্কার বাঁধের উজানে পানি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে সংযোগ খাল কেটে উড়িষ্যার সুবর্ণরেখা ও মহানন্দা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হবে। এছাড়া মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী ও ভাইগাই নদীগুলো অন্য একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি উড়িষ্যা, অন্ধ্র প্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরালায় ও কর্নাটক রাজ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। অন্য একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে গঙ্গা নদীর কয়েকটি উপনদী গন্ডক, ঘাগরা, সারদা ও যমুনাও এক সঙ্গে যুক্ত করা হবে। যমুনা থেকে খাল কেটে পানি সূদুর রাজস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। অন্য একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে সবরমতির পানি ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনার মাধ্যমে।

গঙ্গানদীতে আরও ১৬টি বাঁধ ॥ একের পর ভারতের পানি প্রত্যাহার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে যখন দেশের ভেতর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে তখন ভারত একতরফাভাবে গঙ্গার উজানে আরও ১৬টি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। ইতোমধ্যে এ পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে ভারত অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সুবিধা বৃদ্ধি ও পর্যটন বিকাশে এলাহাবাদ থেকে হলদিয়া পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার নদীতে ১০০ কিলোমিটার অন্তর অন্তর ১৬টি ব্যারাজ নির্মাণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে ভারতের পানিসম্পদ সচিবের নেতৃত্বে একটি সচিব কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ৪ হাজার ২শ’ কোটি রুপী ও কারিগরি ব্যবস্থাপনার জন্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের নিকট সহায়তা কামনা করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকও এই প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগে প্রস্তুত বলে ভারতকে জানিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভারতের কাছে এই ব্যারাজ নির্মাণের বিস্তারিত জানতে কূটনৈতিকপত্র দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, গঙ্গায় উজানে এই বাঁধ দেয়া হলে তা বাংলাদেশের ওপরে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে। তাই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এ বিষয়ে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, গঙ্গায় ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশ ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এভাবে যদি ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করা হয়, তবে তা বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। জাতিসংঘের সাবেক পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. এসআই খান বলেন, গঙ্গা নদীর ওপর প্রায় ৪০০টির মতো ছোট-বড় বাঁধ রয়েছে। আরও ১৬টি বাঁধ নির্মিত হলে ধ্বংস বয়ে নিয়ে আসবে।

পরিবেশ সংগঠন বাপার সাধারণ সম্পাদক ডাঃ আব্দুল মতিন বলেন, প্রকল্পের ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের বিহার রাজ্যেও প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে বিহার রাজ্যের পানিসম্পদমন্ত্রী এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এখনই এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান।

প্রকাশিত : ১০ নভেম্বর ২০১৪

১০/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: