কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বার্লিন দেওয়াল পতনের ২৫ বছর

প্রকাশিত : ৯ নভেম্বর ২০১৪
  • দাউদ হায়দার

সময় : বিকেল তিনটে। দিন : শুক্রবার। তারিখ : বিশ। মাস : জানুয়ারি। সাল : ১৯৮৯। স্থান :

আলেক্সান্ডার প্লাতস্ (মূলত কংক্রিট মাঠ)। জনসভা। বক্তা : পূর্ব জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি (এসইডি)-র পলিটব্যুরোর সেক্রেটারি জেনারেল (রাষ্ট্রকর্তাও ) এরিখ হোনেকার। নম্র ভাষী। অনুচ্চ কণ্ঠ। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মাথায় কালো উলের টুপি। পরনে হালকা-সবুজ প্যান্ট। গায়ে অফ-হোয়াইট কোট। গলায় লাল টাই। মাইনাস ১১ ডিগ্রী শীত। গতকালের তুষারপাতে গোটা চত্বর (প্লাতস্ ) সাদা।

মাঠে সাকুল্যে চার হাজার শ্রোতাও নয়। গত বছর থেকেই গুঞ্জরন, ফ্রাউ বারবেল বোলাই পূর্ব বার্লিনসহ পূর্ব জার্মানির বিভিন্ন রাজ্যে, শহরের গির্জায় গোপনে মিটিং করছেন, দাবি তুলছেন বাক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ইউরোপ-আমেরিকা যাওয়ার অবাধ ছাড়পত্র (উল্লেখ্য, বয়স যাদের পঁয়ষট্টির উর্ধে, তারাই কেবল বিদেশে যাবার অনুমতি পাবে, তাও আবার ইউরোপের সব দেশ, উত্তর আমেরিকায় নয়। হিটলার বলতেন, বয়স যাদের নয়ের (৯) কম, পঁয়ষট্টির বেশি, এরা অকর্মণ্য, বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই।)। জোট পাকাচ্ছেন। বারবেল বোলাইকে তিন মাস আটক করে ছেড়ে দেয়া হয়। বাতাসে বীজ ছড়ালে যেমন কোথাও গিয়ে পড়ে, গাছ হয়। আন্দোলন গির্জায়-গির্জায় ছড়িয়ে পড়েছে। যাজকরাও সাড়া দিচ্ছেন। স্টাসি (রাষ্ট্রীয় গুপ্ত পুলিশ) খবর পাঠাচ্ছেন কেন্দ্রীয় অফিসে।

আন্দোলনের তীব্রতার আঁচ পাচ্ছেন এরিখ হোনেকার। পলিটব্যুরো। জনসভায় ঘোষণা করলেন এরিখ হোনেকার ‘ফরব গধঁবৎ নষবরনঃ হড়পয ১০০ ঔযধযৎব’ (ডি মাউয়ার ব্লাইবট নোখ হুন্ড্রেট ইয়ারে। দেয়াল আরও একশ’ বছর বহাল থাকবে)। এরিখ হোনেকারের এই কথা দিয়েই (রেডিও-র ভাষায় ‘ওটোন’) রিপোর্ট শুরু করি ডয়েচে ভেলে-তে।

স্মরণীয়, পশ্চিম বার্লিনের সাংবাদিক, জনগণ, পূর্ব বার্লিন বা পূর্ব জার্মানির যে কোন অঞ্চলে যেতে বাধা নেই, সঙ্গে বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা থাকতে হবে। বারো ঘণ্টার জন্য ভিসা বাবদ ২-৩ দিনের জন্য ৫০ ডয়েচ মার্ক (পশ্চিম জার্মানি)। পশ্চিমের এক ডয়েচ মার্ক ভাঙ্গালে দশ ওস্ট ডয়েচ মার্ক।

পূর্ব বার্লিনসহ পূর্ব জার্মানির মিডিয়ার কোন সাংবাদিকের পশ্চিম বার্লিন বা পশ্চিম জার্মানির কোন শহরে যাওয়া নিষেধ। অবশ্য রাজধানী বনে দু’জন সাংবাদিক আছেন। পূর্ব জার্মানির রাজধানী পূর্ব বার্লিন। একটিই রেডিও, একটিই টিভি চ্যানেল। পূর্ব বার্লিন থেকে প্রচারিত। রিলে স্টেশন প্রত্যেক শহরেই অবশ্য। সংবাদপত্রও একটি, নয়েস ডয়েচল্যান্ড, মুদ্রিত নানা শহরে। কোন বিজ্ঞাপন নেই।

এগন ক্রেনতস পলিটব্যুরোর দ্বিতীয় ব্যক্তি। গুয়েন্টার সাবোস্কির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত রেষারেষি।)

৮ নবেম্বরে সন্ধ্যা থেকেই ছয়টি চেক পয়েন্টে লোকের সমাবেশ, হাতে পাসপোর্ট। সব চেক পয়েন্টেই পশ্চিম বার্লিনের মানুষ কাতারে-কাতারে দাঁড়িয়ে, সংবর্ধনার জন্য। প্রথমে একজন-দু’জন করে প্রবেশ। রাত নয়টার পরে বেশি। রাত বারোটার পরে শত-শত।

রাত একটা আঠারো মিনিটে খোলা হয় চেক পয়েন্ট চার্লি। গাড়ি নিয়ে পূর্ব বার্লিন থেকে লোক ঢুকছে পশ্চিম বার্লিনে, সঙ্গে অবশ্যই পাসপোর্ট।

৮ নবেম্বরের দুপুর থেকেই এরিখ হোনেকার টেলিফোনে বহুবার চেষ্টা করেন সোভিয়েট-কর্তা মিখায়েল গর্বাচভের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

একবারও ধরেননি। বলা হয়, প্রেসিডেন্ট জরুরি মিটিংয়ে আছেন।

উপায়ান্তর না দেখে পলিটব্যুরো ঠিক করে, কোন অ্যাকশনে যাওয়া ঠিক হবে না, এটা সাময়িক হুজুগমাত্র।

৯ নবেম্বর। সন্ধ্যা সাতটা ৪০ মিনিট। পলিটব্যুরোর সংক্ষিপ্ত সাংবাদিক সম্মেলন। এরিখ হোনেকার বা এগন ক্রেনতস নেই। গুয়েন্টার সাবোস্কি পকেট থেকে একটি চিরকুট বের করেন। মাত্র তিন লাইন। শান্তিপূর্ণ বিপ্লবকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, আজ থেকে সমস্ত চেক পয়েন্ট জনগণের যাতায়াতের জন্য খুলে দেয়া হবে। ব্যস। সাংবাদিকদের উল্লাস, হৈচৈ। বাকি দুই লাইন পড়তে পারেননি। শুরু হয় জনতার মাতম, ছুটতে থাকে চেক পয়েন্টে।

পূর্ব বার্লিনের একজন মানুষও দেওয়াল টপকায়নি। পশ্চিম বার্লিনের মানুষই দেওয়ালের ওপরে উঠেছে, লাফিয়ে নেমেছে পূর্ব বার্লিনে। ওই রাতে অনেকেই হাতুড়ি, শাবল দিয়ে দেওয়াল ভাঙ্গার চেষ্টা করে। কংক্রিট দেওয়াল, খুব সুবিধে করতে পারে না। কিছু টুকরো ভাঙ্গে বৈকি। সরকারীভাবে (চ্যান্সেলর হেলমুট কোলের নির্দেশে) পাঁচদিন পরে। পূর্ব বার্লিনের একজনও দেওয়াল ভাঙ্গেনি।

৯ নবেম্বর কনকনে শীত। মাঝে-মাঝেই বৃষ্টি। উপেক্ষা করে জনতার ঢল। আসে পশ্চিম বার্লিনে। গোটা রাত্রি শহর জমজমাট। লোকারণ্য। হৈচৈ। আনন্দ। স্ফূর্তি। উদ্দাম নাচগান।

১১ নবেম্বর থেকে ওয়েলকামিং মানি (১০০ ডয়েচ মার্ক। যারা পুব থেকে আসছে।) শিশু-ছেলে-বুড়োবুড়ি কেউ বাদ নেই। সব ব্যাংকের সামনে দীর্ঘ লাইন। রাত আটটা পর্যন্ত ব্যাংক খোলা। সাতদিন ধরে ওয়েলকামিং মানি প্রদান। কেবল পশ্চিম বার্লিনেই নয়, গোটা পশ্চিম জার্মানিতে।

বার্লিন দেওয়াল পতনের ২৫ বছর, দুই জার্মানির একত্রীকরণের ২৪ বছর, কিন্তু, পুবে (পূর্ব জার্মানি) কোন ভারি শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। বাহ্য। ষোলোজন মন্ত্রীর মধ্যে তিনজন পুবের। বড় বড় কোম্পানি, কারখানা, করপোরেট সংস্থার ১৩০ জন এক্সিকিউটিভের মধ্যে চারজন পুবের। আঠারোটি প্রথম বিভাগ ফুটবল দলের মধ্যে তিনটি পুবের।

গত ২৪ বছর ধরে পশ্চিমের (পশ্চিম জার্মানি) মানুষ সলিডিটারি মানি দিচ্ছে পুবকে, পশ্চিমের মতো গড়ে তুলতে। গড়া কবে শেষ হবে, হিসাব নেই।

বার্লিন দেওয়াল নেই ( টুরিস্টদের জন্য আছে মার্টিন গ্রোপিউস মিউজিয়ামের পাশে। এই মিউজিয়াম ১৯৩৪ সালে দখল করেছিলেন হিটলারের প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী ইয়োসেপ গোয়েবলস্। দেওয়াল আধ-ফার্লংও নয়।) বটে, তবে যে রাস্তা বা অঞ্চলে দেওয়াল গাঁথা ছিল, ওখানে খয়েরি রঙের ইটপাতা, মাটিতে। লেখা: ডি মাউয়ার ১৯৬১-১৯৮৯।

দেশী-বিদেশীর জন্য শহরের নানা টুরিস্ট স্পটে গ্রাফিটিসুদ্ধ দেওয়ালের তিন-চারটে বড় চাড় দঁাঁড় করিয়ে রাখা। কিছু শপিংমলের সামনে, কিছু সরকারী অফিসের সামনে। পূর্বাংশে (বার্লিনে), ওস্ট বানহোফের (পূর্ব রেলওয়ে স্টেশন) পেছনে হাফ কিলোমিটার দেওয়াল রাখা আছে (বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে এনে।) ঠিকই, কিন্তু আগের মূল গ্রাফিটি নেই, মুছে, নব্য শিল্পীদের আঁকা ছবি। প্রাণ নেই, মজা নেই ছবিতে।

এই প্রজন্মের আদৌ উৎসাহ নেই কোথায় দেওয়াল ছিল কি ছিল না। জানতেও চায় না। স্কুলের ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে মাত্র তিন পৃষ্ঠা লেখা, তাও আবার পাতাজুড়ে একটি ছবি। বার্লিন মাউয়ার মিউজিয়াম (বার্লিন দেওয়াল মিউজিয়াম) দেখতেও ঢোকে না, ফ্রি প্রবেশাধিকার সত্ত্বেও।

গোটা জার্মানিতে বেকারের সংখ্যা ৬.০৮, এর মধ্যে পাঁচ ভাগ পূর্ব জার্মানির। পশ্চিম জার্মানির একজন কর্মী যদি ১০০ ইউরো বেতন পান, একই কাজের জন্য পূর্ব জার্মানির কর্মী পাবে ৮০ ইউরো। কারণ, পশ্চিম জার্মানির কর্মীরা সলিডিটারি গোল্ড (টাকা) দিচ্ছে পূর্ব জার্মানিকে। ওদিকে, বাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে বাস-ট্রাম-ট্রেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে সকাল-সন্ধ্যায়।

চব্বিশ বছর আগে (৩ অক্টোবর ১৯৯০ ) দুই জার্মানি এক হলেও পূর্ব জার্মানি এখনও পূর্ব জার্মানিই রয়ে গেছে। কমিউনিস্টদের হটিয়েছে, তবে, ৬ থেকে ১২ ভাগ ভোটে জিতে সংসদে রীতিমতো বহাল। তিনটি রাজ্যে তো সরকারের কোয়ালিশন।

গোটা বার্লিনজুড়ে নয়, আটটি টুরিস্ট স্পটে সাতদিনব্যাপী আলোকসজ্জা, হরেক অনুষ্ঠান।

বক্তৃতা। প্রদর্শনী। গান-বাজনা, নাচা-নাচি তো আছেই।

প্রকাশিত : ৯ নভেম্বর ২০১৪

০৯/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: