কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আর্থিক নীতি প্রণয়নে রাজনীতিই বড় সমস্যা

প্রকাশিত : ৯ নভেম্বর ২০১৪
  • গোলটেবিল বৈঠকে ইমেরিটাস অধ্যাপক নূরুল ইসলাম

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্লানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নূরুল ইসলাম বলেছেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেক দুর্বলতা আছে। তারপরও এসব প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ থাকে। আর এ চাপের ফলে নীতি নির্ধারণীতে পর্যাপ্ত তথ্য পায় না প্রতিষ্ঠানগুলো। এ কারণে দেশের উপযোগী যথাযথ নীতি প্রণয়ন সম্ভব হচ্ছে না। শনিবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) ও বাংলাদেশ ইকোনমিস্ট ফোরাম আয়োজিত ‘পলিসি মেকিং এ্যান্ড ইনস্টিটিউশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে মূল প্রবন্ধে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) রিসার্চ ফেলো এমিরিটাস অধ্যাপক নূরুল ইসলাম আরও বলেন, রাজনৈতিক চাপের কারণে আর্থিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। প্রকৃত তথ্য আড়াল করে কোন পরিকল্পনা করলে তা যথার্থ হয় না। আর্থিক নীতি প্রণয়নে রাজনীতিই বড় সমস্যা। বিষয়টি বর্তমানে উদ্বেগের পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ড. নূরুল ইসলাম বলেন, নীত প্রণয়নে আর্থিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। অনেক রাষ্ট্রে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি পরিকল্পনার বিষয়টি দেখভাল করেন। এতে সংস্থাগুলোর সমন্বয় সাধিত হয়। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেও উন্নয়ন নীতি প্রণয়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মূলত জনশক্তির দক্ষতা ও স্বাধীনতা না থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিকল্পনা কমিশন অথবা পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতো প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারবে না।

পিআরআইর সভাপতি ড. সাদিক আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান, সাবেক গবর্নর ড. ফরাসউদ্দিন, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. মোস্তাফা কে. মুজেরি, অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেন, অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রথম সভাপতি মহিউদ্দিন আলমগীর, পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন, অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন, ড. জাঈদি সাত্তার প্রমুখ। এছাড়া দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

ড. আতিউর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, অনেক চাপ মোকাবেলা করে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। শেয়ারবাজারে যখন ব্যাংকের বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার উপরে চলে গিয়েছিল তখন তা কমাতে পদক্ষেপ নিয়েছি। তবে যেসব বিনিয়োগকারীরা চলে গেছে তাদের ফিরিয়ে আনাতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও আমরা আস্তে আস্তে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সাড়ে পাঁচ বছরের মুদ্রানীতির ওপর দেশের ভেতর থেকে পাঁচটি গবেষণা তথ্যও আমরা পাইনি। তারপরও নিজেদের মধ্য থেকে যতটুকু সম্ভব গবেষণা করে আমরা পরিকল্পনা তৈরি করছি। গত তিন বছর ধরে কলমানি স্থিতিশীল রয়েছে। মূল্যস্থীতি কমে আসছে। গত মাস থেকে স্প্রেডও কমে আসছে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন চাপের মধ্যেও বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি আমরা বেশ ভালভাবে মোকাবেলা করেছি। এ পরিস্থিতিও প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের উপরে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। নতুন সেক্টরের দিকে কিভাবে নিয়ে যাওয়া যায়, কিভাবে গ্রিন ব্যাংকিংয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া যায় সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা মুদ্রানীতি দিচ্ছি। গবর্নর বলেন, আমরা চার কোটি নতুন গ্রাহকের কাছে ব্যাংক হিসাব নিয়ে যেতে পেরেছি। এর মধ্যে দুই কোটিই মোবাইল ব্যাংকিং। যারা মাধ্যমে প্রতিদিন ৩৩৩ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। ২০০৯ সালে এক হাজার মানুষের জন্য গড়ে ব্যাংকের শাখা ছিল ৫টি, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬টি। ২০০৯ সালে এক হাজার মানুষের জন্য এটিএম বুথ ছিল ৮টি, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩২টি। ২০০৯ সালে যেখানে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ৩৭ মিলিয়ন, এখন তা ৫০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, উন্নয়ন হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক। গ্রামের রাস্তার উন্নয়ন হলেও মহাসড়কের উন্নয়ন হচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, জবাবদিহিতা না থাকলে ভাল পলিসি করেও লাভ নেই। সবক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জবাবদিহিতা থাকতে হবে। প্রশাসনের মধ্যে দুর্নীতির একটি সীমা থাকা উচিত। প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, সরকার নিজেদের স্বার্থেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল থাকুক এ আশা করে। কিন্তু দলীয় ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে তারা সমন্বয় করতে পারে না। এসব কারণে দেশের উন্নয়নের জন্য প্রশাসনসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কিছু জায়গা ছেড়ে দেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। ব্যাংকগুলোর বর্তমান নাজুক অবস্থার জন্য সরকারকে দায়ী করে তিনি বলেন, আমাদের সরকারের চিন্তা এমন যে তাঁরা চান তাদের দলীয় দুষ্টু লোকেরা ১০ ভাগ দুর্নীতি করবে। এর বাইরে আর কাউকেই দুর্নীতি করতে সুযোগ দেয়া হবে না। কিন্তু এটা করলে সেই নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানই যে দুষ্টুমি শুরু করবে এটাই তো স্বাভাবিক।

ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, নীতি প্রণয়নে রাজনৈতিক ও আমলাদের মধ্যে একটি সমন্বয় দরকার। শাসকরা গণতন্ত্রের নামে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হতে চায়। এ পরিবেশে জবাবদিহিতা থাকে না। ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ব্যাংক নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আগে একটি ব্যাংক যাকে ঋণ দিত, এখন ১০ জন মিলে ওই ব্যক্তিকে ঋণ দিচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তিনি বলেন, যতই স্থানীয় সরকারের কথা বলা হোক, দেশে বাস্তবে কোন স্থানীয় সরকার নেই। ব্যাস্টিক অর্থনীতি আমি আশার কিছু দেখছি না। ক্ষুদ্রঋণের বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় নেই। কিভাবে আমরা প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করতে পারি তা নিয়ে ভাবতে হবে। পলিসি মেকিং ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কি হবে তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের যে আইন রয়েছে তা দায়িত্বরতরা সঠিকভাবে পালন করছে কিনা সেটি দেখতে হবে।

ড. মুজেরি বলেন, আমাদের সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে এক ধরনের মনোভাব কাজ করে যে প্লানিং কমিশনেরই কোন দরকার নেই। আমাদের দেশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এমন যথাযথ কৌশল গ্রহণের দুর্বলতা আছে বলে তিনিও মনে করেন। আর রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে বাংলাদেশ এসব দুর্বল কৌশল থেকে কোন দিনও বের হয়ে আসতে পারেনি, পারছে না এবং ভবিষ্যতেও পারবে না বলে তিনি জানান। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রথম সভাপতি মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, ২০২১ সালে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে না যদি দরজাটা খোলা না হয়। এখন দরজাটা বন্ধ। কিন্তু এই রূপকল্পকে স্বাগত জানাই। বাংলাদেশে মাহাথির হবে না। এখানে দুই নেত্রী আছেন, দুই নেত্রীই থাকবে এবং এদের দিয়েই আমাদের চলতে হবে। তাদের হাতেই রাজনীতি ছেড়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের প্রয়োজন গণতন্ত্র। তারপর সেটা সুশাসন হোক আর কুশাসন হোক সময়ের প্রেক্ষিতে নির্ধারণ হবে। এই কাঠামোর মধ্যে যদি আমরা এগোয় তাহলে আর্থিক উন্নতির জন্য শক্তিশালী পরিকল্পনা কমিশন, স্বাধীন ও শক্তিশালী পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, জাতিগতভাবে আমরা আটকে আছি ১৯৭১ সালে। আমরা আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারিনি। গণতন্ত্রের মূল বিষয় ছেড়ে রাজনৈতিক দলগুলো ৭১-এ পড়ে আছে। দেশে শক্তিশালী কোন মধ্যবিত্ত শ্রেণীও গড়ে ওঠেনি। মধ্যবিত্ত শ্রেণী গণতন্ত্রের বিষয়গুলোতে চাপ না দিয়ে তারাও ৭১-এ পড়ে আছে। এর কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা যাচ্ছে না। বিনায়েক সেন বলেন, আমাদের বড় কোন কাজের কৌশল গ্রহণে প্রকৃত অভিজ্ঞদের রাখা হয় না। তাছাড়া কৌশলটি বাস্তবায়নেও তাদের মতামত গ্রহণ করা হয় না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ ধরনের প্রকৃত ইন্টেলেকচুয়াল নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রকাশিত : ৯ নভেম্বর ২০১৪

০৯/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: