কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মধ্য আয়ের পথে দেশ

প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর ২০১৪

তিন সূচকের একটি ইতোমধ্যেই অর্জিত

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ মধ্যম আয়ের দেশের উন্নীত হওয়ার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। কেননা এই পর্যায়ে উন্নীত হতে তিনটি সূচকের মধ্যে একটি ইতোমধ্যেই অর্জিত হয়েছে, দ্বিতীয়টির প্রায় কাছাকাছি এবং তৃতীয়টিতে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যদিয়ে দীর্ঘদিনের স্বল্পোনত দেশের দুর্নাম ঘুচছে। পাশাপাশি জাতি হিসেবে একটি অন্যতম অর্জন হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, এর মধ্যদিয়ে আমাদের যে স্বল্পোন্নত দেশের কালিমা এতদিন ছিল, সেটি মুছে যাবে। জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থান উপরে যাবে। বিদেশ নির্ভরতা কমবে এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দু-একটি চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। যেমন সহজ শর্তের ঋণ এখন যেটা পাওয়া যাচ্ছে সহজে সেটি হয়ত আর পাওয়া যাবে না। তাছাড়া বিভিন্ন দেশে পণ্য রফতানিতে কোটা বা ডিউটি ফ্রি যে সুবিধাগুলো পাওয়া যেত সেগুলোর সুযোগ সীমিত হয়ে আসবে। তিনি বলেন এতে খুব বড় কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া আমাদের আগে তো রুয়ান্ডা মধ্য আয়ের দেশে যাচ্ছে। তারা কিভাবে তাহলে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) মূল্যায়ন প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে মধ্যম আয়ের দেশে যেতে হলে যে তিনটি সূচকের মানদ- বিবেচনা করা হয়, সেগুলোর মধ্যে মাথাপিছু মোট দেশজ আয় (জিএনআই) সূচকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য এক হাজার ১৯০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ ২০১৪ সালের সর্বশেষ হিসেব মতে জিএনআই এক হাজার ১৯০ মার্কিন ডলার হয়েছে। অন্যদিকে সিডিপির ২০১২ সালে প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৮-১০ এই তিন বছরে গড় (ব্যবহৃত সূত্র বিশ্বব্যাংকের ওয়াল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটর অনুযায়ী) ৬৩৭ মার্কিন ডলার এবং পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১২ সালের হিসাবে মাথাপিছু জিএনআই ছিল ৮৪০ মার্কিন ডলার ছিল।

মানবসম্পদ সূচকে স্বল্পোন্নত থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় মান ৬৬ বা তার বেশি। বাংলাদেশের বর্তমানে অবস্থান হচ্ছে ৬৫ দশমিক ৯৬। ২০১২ সালের সিডিপির পর্যালোচনা প্রতিবেদন অনুযায়ী ছিল ৫৪ দশমিক ৭।

অর্থনৈতিক সঙ্কট সূচকে স্বল্পোন্নত থেকে বের হতে প্রয়োজনীয় মান ৩২ বা তার কম। কিন্তু বর্তমানে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কার্যক্রম চলছে, আশা করা হচ্ছে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জিত হতে পারে। তবে ২০১২ সালের সিডিপির পর্যালোচনায় বাংলাদেশের মান ছিল ৩২ দশমিক ৪।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারের একটি লক্ষ্যই রয়েছে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়া। আমি মনে করি এলডিসি তালিকা থেকে আমরা বেরুতেই পারলেই সে লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে। এর ফলে উন্নয়ন দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে। স্বল্পোন্নতের তালিকায় থাকলে আমাদের উন্নয়ন অনেক পিছিয়ে যাবে। আমাদের অর্থনীতি যদি সবল হয় তাহলে এখন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আমরা যেসব সুবিধা পাচ্ছি সেসব সুবিধা না হলেও চলবে। যেমন ভারত, চীন এরাত এলডিসিভুক্ত দেশ নয়, তারপরও এদের রফতানি প্রবৃদ্ধি তো অনেক বেশি। সে রকম বাংলাদেশ যখন এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসবে তখন আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তবে দ্রুততার সঙ্গে স্বল্পোন্নত তালিকা থেকে বের হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতি যাতে সবল হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব (ইআরডি) মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন বলেন, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কারণে বাংলাদেশের মানব উন্নয়নে এগিয়েছে। মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে কাজ করছে সরকার। তাছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে, যা মূল বাজেটের একটি বড় অংশ। ফেয়ার প্রাইস কার্ড ব্যবহার করায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, এছাড়া কারিগরি শিক্ষাসহ বেসরকারী খাতে ক্ষুদ্র ঋণের কারণে মহিলারা অনেকদূর এগিয়ে গেছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত সার্ক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজিস) অগ্রগতির ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদশ। সার্ক উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নবজাতক মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা হচ্ছে প্রথম আর দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ, তৃতীয় নেপাল। তারপরই রয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। গড় আয়ু লাভের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার পরই দ্বিতীয় বাংলাদেশ ও নেপাল, তৃতীয় অবস্থানে ভুটান। পাঁচ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার পরই বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে এবং তৃতীয় অবস্থানে নেপাল। মাতৃ মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার পর দ্বিতীয় অবস্থানে নেপাল এবং তৃতীয় ভুটান। স্যানিটেশন উন্নয়নের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা প্রথম, দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ এবং তৃতীয় অবস্থানে পাকিস্তান। ফারটিলিটি রেটে বাংলাদেশ প্রথম, দ্বিতীয় অবস্থানে শ্রীলঙ্কা ও ভুটান এবং তৃতীয় ভারত। নবজাতকের টিকা দানের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা প্রথম, বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে এবং তৃতীয় অবস্থানে ভুটান।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ইমার্জিং ইকোনমির সব বৈশিষ্ট্যই বাংলাদেশে রয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে অর্জন অনেক, সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, রেমিটেন্স বাড়ছে, রিজার্ভ বাড়ছে এসবই অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষণ। আমাদের শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না। তারা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের পথ দেখিয়েছে এ কথা সত্যি। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছি তা কম নয়।

অন্যদিকে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) বাস্তায়নে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। যেগুলো ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে সেগুলো হচ্ছে, দারিদ্র্যের পরিমাণ ও গভীরতা কমানো, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা আনয়ন, ৫ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যু হার কমানো, এন্ট্রিরেট্রোভাইরাল ড্রাগ সহজলভ্য করার মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণ রোধ, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের কীটনাশক-চিকিৎসা মশারির নিচে ঘুমানো, ডটসের মাধ্যমে যক্ষ্মারোগ চিহ্নিতকরণ ও নিরাময়। এছাড়া বাংলাদেশ দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিশুদের অপর্যাপ্ত ওজনের প্রকোপ, শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার, মাতৃমৃত্যু হার, শিশুদের টীকা প্রদানের আওতা বৃদ্ধি এবং সংক্রামক রোগের বিস্তার কমিয়ে আনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১০ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৯৯১-৯২ হতে ২০১০ পর্যন্ত বছরে গড়ে দারিদ্র্য হার কমেছে ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় বলা যায় যে, ২০১২ সালেই বাংলাদেশ দারিদ্র্য হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নির্মূলে প্রশংসনীয় অগ্রগতি সাধন করেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কারণে ১৯৯১-৯২ সালের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে; বিগত দশক অপেক্ষা বর্তমান দশকে দারিদ্র্য হার অধিক হ্রাস পেয়েছে। সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১০ অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০০০-২০১০ মেয়াদে গড়ে প্রতিবছর দারিদ্র্য হার কমেছে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যদিও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে একই সময়ের জন্য প্রয়োজন গড়ে প্রতিবছর ১ দশমিক ২০ শতাংশ হারে দারিদ্র্য হ্রাস। ২০১৩ সালে মাথাগুণতি দারিদ্রের হার ২৬ দশমিক ২ শতাংশ । বাংলাদেশ ২০১০ সালেই দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্য পার্থক্য কমানো শীর্ষক অভীষ্টলক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান এর আগে বলেছেন, অর্থায়নের সমস্যা না থাকলে অনেক বেশি এমডিজির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব ছিল। এমডিজি লক্ষ্য অর্জনে ফিসক্যাল পলিসি ও মনিটরিং পলিসি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়া রেমিটেন্সের ভূমিকা অনেক। কেননা বাংলাদেশ ব্যাংকে সাত মাসের সমান রিজার্ভ রয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য ভাল।

প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর ২০১৪

০৬/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: