মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এক পাকি দ-িত লক্ষ পাকি বর্তমান

প্রকাশিত : ৪ নভেম্বর ২০১৪

মুনতাসীর মামুন

(৩ নবেম্বরের পর)

বাংলাদেশে একজন খুন করলে অপরাধী। ১০০ জন খুন করলে জাতীয় নেতা আর গণহত্যা করলে সুপারম্যান, ধর্মীয় নেতা। বঙ্গবন্ধু খুন হন, তার জানাজা হয় না। তা দাফন হয় গ্রামে যাতে কেউ যেতে না পারে। তাঁর হত্যাকারীরা পুরস্কৃত হন আর যাঁরা পুরস্কৃত করেন তাঁরা জাতীয় নেতা হিসেবে পূজিত হন। যাদুমিয়া, খান সবুর ১৯৭১-এ খুনীদের সঙ্গে ছিলেন তাই তাঁদের করব হয় জাতীয় সংসদের চত্বরে। কোন দল প্রতিবাদ করে না। মানুষ ভাংচুর করে না। ক্লীব ছাত্র সংগঠনগুলো টেন্ডারের খোঁজে শুধু ঘোরে। জিয়াউর রহমান ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতা লুট করেন, তিনি হন জাতীয় নেতা, তাঁর জানাজায় হয় লাখ লোক এবং তাঁকে করব দেয় হয় জাতীয় সংসদের মুখোমুখি। তার জন্য ইতিহাসও বদলে দেয়া হয়। শুধু তাই নয় যে বিদ্বান সংস্থা তাকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে মেনে নেয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তাকে কোটি টাকা অনুদান দেন। খোঁজ নিয়ে দেখেন। কারও খারাপ লাগে না। প্রতিবাদ হয় না। গোলাম আযম গণহত্যা করেছিলেন তাই জাতীয় মর্যাদায় বায়তুল মোকাররমে তার জানাজা হয়, হাজার হাজার লোক তাতে অংশগ্রহণ করে, জামায়াত নেতারা সরকারকে ধন্যবাদ জানান। গুটিকয় তরুণ ছাড়া কোন ছাত্র সংগঠন রাস্তায় নামে না কারণ লাশ দাফনের জন্য টেন্ডার ডাকা হয়নি। গণহত্যাকারী নিজামীর দ- দিলে জামায়াত ৩ দিনের হরতাল ডাকে, বিএনপির সমর্থনে জনসভা প্রত্যাহার করে, সরকারী দলের কেউ-ও রাস্তায় গাড়ি নামায় না। তাদের দোকানপাট খোলে না এবং এটি যে আসল আদালত অবমাননা সে জন্য কোন বিচারপতি কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে কনটেম্পট রুল ইস্যু করেন না। যুদ্ধাপরাধ বিচারে অনেকে ভূমিকা রেখেছেন যার কারণে আজ আওয়ামী লীগ বা ১৪ দল রাজনৈতিক ও নৈতিক ডিভিডেন্ড পাচ্ছে। কিন্তু এই আন্দোলন শুরু থেকে এ পর্যন্ত টেনে এনেছেন শাহরিয়ার কবির কোন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দূরে থাকুক সমাজ বা রাজনীতিবিদদের থেকে প্রাপ্য সম্মানও পাননি। বরং জেল খাটতে হয়েছে দুবার, রিমান্ডে যেতে হয়েছে। আমাদের ক্ষতিপূরণের মামলাটা পর্যন্ত আইনজীবীকে অনুরোধ করে শুনানি করতে পারিনি। কর্নেল নুরুজ্জামানের কথা কার মনে আছে যিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সবাইকে জড়ো করেছিলেন। অন্যদিকে সাঈদীর দ- হ্রাস হয়, একই আইনে কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়, সাঈদীর হয় না এবং এক বিচারক তাকে খালাস দেন। সাঈদী দ-িত মানবতাবিরোধী অপরাধে কিন্তু তার ক্যাসেট এখনও অবাধে বিক্রি হয় দোকানে, যানবাহনে নিত্য শোনানো হয়। হিটলার, গোয়েবলসে কোন ভাষণ পাওয়া যাবে জার্মানিতে, শোনান হবে যানবাহনে? সমাজ ও এস্টাবলিশমেন্ট এই বার্তা দেয় একজন খুন করো না, ১০০ জন খুন করো। গণহত্যা করো, সমাজ ও এস্টাবলিশমেন্ট তোমাদের পুরস্কৃত করবে। মুক্তিযুদ্ধ এখানে অপরাধ অথচ মুক্তিযুদ্ধ থেকে উৎসারিত এ রাষ্ট্র, তার আইন এবং সুবিধাভোগী সমাজ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের অবস্থা উন্নয়ন করতে পারে কিন্তু সমাজ যদি বোধশক্তিহীন হয় সে দেশ এগোতে পারবে না।

আলবদর ও পাকি নিজামীর [অনেকে এখনও তাকে নিজামী সাহেব বলে উল্লেখ করেন।] দ-ে উল্লসিত হওয়ার কোন কারণ নেই। নিজামীরা গত ৪০ বছর এ দেশে হাজারও নিজামী তৈরি করে গেছে যা আমরা জানি। মনসুর খালেদ আলবদর বইটি লেখার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন এবং আলবদর নেটওয়ার্কে চলাফেরা করেছেন। তিনি ঢাকায় আসেন ২০০২ সালে। খুবই স্বাভাবিক। জামায়াতে ইসলাম তখন ক্ষমতায়। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে জামায়াত কখনই কাক্সিক্ষত ক্ষমতার স্বাদ পায়নি। বাংলাদেশে পরাজিত শক্তি হওয়া সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়া তাদের ক্ষমতায় আনেন। এদিক থেকে বিচার করলে বেগম জিয়াও বাঙালীদের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন।

মনসুরের বই পড়েই জানতে পারি আলবদররা এখনও বেঁচেবর্তে ভালই আছে। তাদের আদর্শ থেকে তারা বিচ্যুত হয়নি। মনসুর ঢাকায় এসে আলবদরের সাহায্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বেড়ান। একজন আলবদর আফশোস করে তাকে বলেছেন, ‘জাতি এসব আত্মত্যাগীদের স্বীকার পর্যন্ত করে না। মুসলিম উম্মাহ এর মর্যাদা বোঝেনি। আমরা ঘরের মধ্যে [বাংলাদেশে] আগন্তুক আর পাকিস্তানে ভিনদেশী।’

মনসুরকে বিভিন্ন আলবদরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। আলবদরদের নেতা বা সুপ্রীম কমান্ডার নিজামী তখন মন্ত্রী। ফলে, পুরনো আলবদরদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে তোলা হয় এবং তিনি অনেক তথ্য সংগ্রহ করেন। মনসুর স্থানীয় অনেক আলবদরের নাম উল্লেখ করেছেন। এগুলো ছদ্মনাম কিনা জানি না, তবে কিছু নামের সঙ্গে আমরা পরিচিত। আলবদর গঠন প্রক্রিয়া থেকে তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আছে। কোথাও কোথাও গরমিল থাকলেও আলবদরদের কার্যকলাপ তিনি বিশ্বস্ততার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। কারণ, তারা মনে করেন, আলবদররা জিহাদী। যেসব আলবদর মারা গেছে তারা শহীদ । যারা বেঁচে আছেন তারা গাজী। আর মুক্তিযোদ্ধারা এখনও তাদের কাছে ‘দুষ্কৃতকারী’। মনুসর ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ থেকে আলবদরীয় ঘটনাগুলো উল্লেখ করতে চান, যাতে নতুন কর্মীরা একনিষ্ঠভাবে জামায়াত করতে এবং আলবদর হতে উদ্বুদ্ধ হয়। তার আফশোস, ‘১৯৭১ সালের এসব শহীদানের ও গাজীগণের নাম পাকিস্তানে আলোচনা করা কেউ পছন্দ করে না। এরা তো আমাদেরই ছিলেন যারা পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ বনানী ও নদনদীতে বুকের তাজা রক্ত উপহার দিয়েছেন। সেই তরুণ আমাদের জাতীয় সত্তারই তো অংশ ছিল।’

মনসুর স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলার সাংবাদিক, আইনবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনীতিক মহলের সঙ্গে বিস্তারিত দেখা-সাক্ষাত করেছি। এর ফলে আলবদরের লক্ষ্যসমূহ আরও নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে। এ ছাড়াও আলবদরের মুজাহিদদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।’

সুতরাং ধরে নেয়া যায়, আমার- আপনার আশপাশেই আলবদর ও তার সাথীরা অপেক্ষা করছে। তারা ভাবেনি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। তাই এখন তারা খানিকটা শঙ্কার মধ্যে আছে এবং তাই এই বিচার প্রক্রিয়া বানচালের জন্য তারা নানা ষড়যন্ত্র করছে। সরকারের শৈথিল্য তাদের এ সুযোগ করে দিচ্ছে। তারা শুধু অপেক্ষা করছে সরকার পতনের বা বিচার বানচালের। তারপরই আপনারা আপনাদের দোরগোড়ায় তাদের দেখতে পাবেন।

সুতরাং বিজয় তখনই আসবে যখন আলবদরীয় রাজনীতি ও তাদের সমর্থকদের রাজনীতি আমরা বিনাশ করতে পারব।

সবশেষে বলি, বিচারের রায় যাই হোক, সে নিয়ে তুলকালাম করব না। আলোচনা হয়তো করব। কিন্তু বিচার শুরুর জন্য এককভাবে প্রধানমন্ত্রীকে আমরা অভিনন্দন জানাব। সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আমাকে বলেছিলেন, মৃত্যুর সপ্তাহ দুয়েক আগে, যে আওয়ামী লীগ বা প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন কর্মকা-ে সমালোচনা করতে পারি, কিন্তু তাঁকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কেউ সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করবে না। সঙ্গে সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের বিচারক তদন্ত ও প্রসিকিউশন দলকেও সাধুবাদ জানাই ৪ বছরে ১০টি বিচার কাজ সমাপ্ত করার জন্য। এটি করাও কম কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। (সমাপ্ত)

প্রকাশিত : ৪ নভেম্বর ২০১৪

০৪/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: