মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আপীল বিভাগের রায়ের অপেক্ষায় ॥ কামারুজ্জামান মুজাহিদ সাকা

প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর ২০১৪

ট্রাইব্যুনালে অপেক্ষমাণ আরও ৫ মামলা

০ মীর কাশেম আলীর রায় রবিবার

০ দশ মামলায় ১১ জনের সাজা হয়েছে

০ সুপ্রীমকোর্টে দুই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি

০ ফাঁসি কার্যকর হয়েছে কাদের মোল্লার

০ পলাতক তিনজন- বাচ্চু রাজাকার, চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামন খানের চূড়ান্ত সাজা হয়েছে

আরাফাত মুন্না ॥ একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এখন পর্যন্ত দশটি মামলায় ১১ জনের সাজা দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে মৃত্যুদ- হয়েছে ৮ জনের। বাকি তিনজনের একজনের আমৃত্যু কারাদ-, একজনের যাবজ্জীবন ও অপর যুদ্ধাপরাধীর ৯০ বছর কারাদ- হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে আরও পাঁচ মামলা রয়েছে রায়ের অপেক্ষায়। এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর মামলার রায়ের জন্য রবিবার দিন ঠিক করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালে দ-িত ১১ জনের মধ্যে সাতজনই সুপ্রীমকোর্টে আপীল করেছেন। এর মধ্যে দুটি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিও হয়েছে উচ্চ আদালতে। ট্রাইব্যুনালে যাবজ্জীবন হলেও সুপ্রীমকোর্টের চূড়ান্ত রায়ে কসাই কাদেরখ্যাত জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- হয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার দ- কার্যকরও হয়েছে। আর দেইল্লা রাজাকারখ্যাত জামায়াত নেতা সাঈদীকে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদ- দিলেও সুপ্রীমকোর্ট তার দ- কমিয়ে দিয়েছে ‘আমৃত্যু কারাদ-।’

এছাড়া ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আরেক জামায়াত নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিচার প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে সুপ্রীকোর্টের আপীল বিভাগে। মামলাটির রায়ও শীঘ্র হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মামলাটি গত ১৭ সেপ্টেম্বর শুনানি শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছে সুপ্রীমকোর্ট। বাকি তিনজন বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই পলাতক থাকায় আপীলের সুযোগ হারিয়েছেন। এঁরা হলেনÑ জামায়াতের সাবেক শূরা সদস্য আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম নায়ক আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এবং প্রধান ঘাতক আশরাফুজ্জামান খান। এছাড়া আলবদরপ্রধান ও জামায়াত আমির নিজামীকে বুধবার ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ-ের রায়ের বিরুদ্ধেও আপীল করা হবে বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী।

যুদ্ধাপরাধের বিচার চলাকালে এ পর্যন্ত তিন আসামি মারা গেছেন। এঁরা হলেন ট্রাইব্যুনালে ৯০ বছরের ‘আমৃত্যু’ দ-প্রাপ্ত আসামি গোলাম আযম, আব্দুল আলীম। আর ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন একেএম ইউসুফ।

সংশ্লষ্টরা বলছেন, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর প্রায় সাড়ে চার বছরে তাদের অর্জন কম নয়। তবে যেতে হবে বহু দূর। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলা আপীল বিভাগে রায়ের অপেক্ষায়। এই রায়ও শীঘ্র হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর বিচারিক আদালতে এ পর্যায়ে রয়েছে আরও পাঁচটি মামলা। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এসব মামলার রায়ও খুব শীঘ্রই দেয়া হবে। তাতে প্রত্যাশার প্রতিফলনও থাকবে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ২০১০ সালের মার্চে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর সঙ্গে যাত্রা শুরু করে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন। বিচারে গতি বাড়াতে পরবর্তীতে গঠিত হয় আরেকটি ট্রাইব্যুনাল। একে একে ১৫ মামলায় আসামি হন ১৬। প্রথম রায়ে গত বছরে ২১ জানুয়ারি আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারকে মৃত্যুদ- দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আর দ্বিতীয় রায়ে ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন দ-িত হন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা। এর পর গণজাগরণ মঞ্চের প্রবল দাবির মুখে ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে আসামি পক্ষের পাশাপাশি রাষ্ট্রপক্ষকেও আপীলের সুযোগ দিয়ে আইন সংশোধন করা হয়। এর পর রাষ্ট্রপক্ষ কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদ-ের সাজার বিরুদ্ধে আপীল করে। সেই রায়ের আপীল নিষ্পত্তি শেষে ইতোমধ্যে তা কার্যকরও হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বন্ধুর পথ আমরা পাড়ি দিয়ে এসেছি। এ পথপরিক্রমায় শত প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে কাজ করেছি।’ এত মামলার সফল নিষ্পত্তি দেখে আজ মনে হচ্ছে, আমরা সফল হয়েছি। এই সময়ে আমাদের অর্জন কম নয়। তবে ভবিষ্যতে এ সাফল্য ধরে রেখে সামনে এগোতে হবে।

আপীল বিভাগে দুই মামলার নিষ্পত্তি ॥ বিচারিক আদালত কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন দ- দেয়। এর প্রতিবাদে রায়ের দিন থেকে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতা। গণদাবির মুখে আইন সংশোধন করে খালাস ছাড়া অন্য কোন দ-ের বিরুদ্ধেও সরকারকে আপীলের সুযোগ দেয়া হয়। এরপর বিষয়টি আপীল বিভাগে যায়। সেখানে সরকার ও আসামি পক্ষের করা আপীল নিষ্পত্তি করে আপীল বিভাগ। আপীল বিভাগ কাদের মোল্লার সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদ- দেয়। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কাদের মোল্লার দ- কার্যকর করা হয়।

আবার ২০ অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের সাঈদীর বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে দুটিতে মৃত্যুদ- দেয়া হয়। প্রমাণিত বাকি ছয়টি অভিযোগে তাকে কোন দ- দেয়া হয়নি। রায়ের বিরুদ্ধে সরকার ও আসামি পক্ষ আপীল করে। আপীল বিভাগ উভয়পক্ষের আপীল আংশিক মঞ্জুরের মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তি করে। বিচারিক আদালতে প্রমাণিত মোট আট অভিযোগের তিনটিতে গত ১৭ সেপ্টেম্বরের রায়ে খালাস পান সাঈদী। আর বাকি পাঁচটির মধ্যে তিনটিতে আমৃত্যু কারাদ- ও দুটিতে তাঁকে মোট ২২ বছরের দ- দেয় আপীল বিভাগ।

চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আরও এক ॥ আপীল বিভাগের বর্তমানে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে আরও একটি মামলা। বিচারিক আদালতের দেয়া ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে আবেদন করেন কামারুজ্জামান। এই দ-ের বিরুদ্ধে সরকার কোন আপীল করেনি। আপীল বিভাগে ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ।

অকার্যকর দুই মামলা ॥ ট্রাইব্যুনালে আমৃত্যু কারাদ-প্রাপ্ত বিএনপি নেতা আব্দুল আলীম মৃত্যুবরণ করায় তাঁর দায়ের করা আপীলটি অকার্যকর ঘোষণা করেছে সুপ্রীমকোর্ট। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের নেতা গোলাম আযমকে ট্রাইব্যুনাল দিয়েছিল ৯০ বছর কারাদ-। তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও বয়স বিবেচনায় এ রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল। তিনি এ রায়ের বিরুদ্ধেও আপীল দায়ের করেছিলেন। কিন্তু তিনিও মৃত্যুবরণ করায় তাঁর আপীলটিও অকার্যকর হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আগামী দুই ডিসেম্বর শুনানির জন্য নির্ধারিত দিনেই এ আপীলটি অকার্যকর হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।

আপীল বিভাগে বিচারের অপেক্ষায় আরও দুই ॥ আরও দুই মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে আপীল বিভাগে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদ- দেয়া হয় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে। খালাস চেয়ে এ রায়ের বিরুদ্ধে মুজাহিদ আপীল করেন গত বছরের ১১ আগস্ট। এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদ-ের আদেশ দেয় গত বছরের ১ অক্টোবর। এর বিরুদ্ধে সাকা চৌধুরী আপীল করেন। সেই আপীলও এখন বিচারাধীন।

সাজা চূড়ান্ত তিন আসামির ॥ প্রথম রায়ে জামায়াতের সাবেক সদস্য পলাতক আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদ- দেয় ট্রাইব্যুনাল। পলাতক থাকায় এ রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপীল করেননি। আলবদর সদস্য চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকেও মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ- দেয় বিচারিক আদালত। এই দু’জনও বিদেশে পলাতক। ফলে আপীল করেননি তাঁরাও।

ট্রাইব্যুনালে রায়ের অপেক্ষায় আরও পাঁচ ॥ দুই ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত পাঁচটি মামলা রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মীর কাশেম আলীর মামলার রায়ের জন্য রবিবার দিন ঠিক করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম, এরশাদ সরকারের সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ মোবারক হোসেন ও ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌর মেয়র জাহিদ হোসেন খোকনের মামলার রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

বিচারিক আদালতে সমাপ্ত এক ॥ জামায়াতের নায়েবে আমির আবুল কালাম মোহাম্মদ ইউসুফ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। পরে এই মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে ছিল।

বিচারাধীন আরও পাঁচ মামলা ॥ দুই ট্রাইব্যুনালে আরও পাঁচ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এতে আসামি হিসেবে আছেন আট। জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুস সুবহান ও পিরোজপুর-৪ আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৈয়দ মোঃ হাসান আলী, বাগেরহাটের কসাই সিরাজুল হক সিরাজ মাস্টার, আবদুল লতিফ তালুকদার ও খান মোহাম্মদ আকরাম হোসেন এবং নেত্রকোনার ওবায়দুল হক তাহের ও আতাউর রহমান ননীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে একটি মামলায় সিরাজ মাস্টার, আবদুল লতিফ ও আকরাম হোসেন এবং অন্য মামলায় তাহের ও ননী আসামি।

এ বিষয়ে প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত বলেন, বিচার শুরুর প্রাক্কালে আমরা বিভিন্ন প্রতিকূলতা ও অপ্রতুলতার মধ্যেই কাজ করেছি। এ ধরনের একটি বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের কোন বিশেষজ্ঞ মত গ্রহণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও ছিল না। তবে সেই সব মোকাবেলা করেই আমরা এগিয়েছি। বিচারিক আদালতে যেসব রায় হয়েছে তার সবটিতে আসামি দ-িত হয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আপীল বিভাগেও নিষ্পন্ন হওয়া দুটি মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয়, আমরা সফল। তবে কী দ- দেয়া হবে তা একান্তই আদালতের এখতিয়ার।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক সানাউল হক বলেছেন, এ পর্যন্ত আমরা কিছু মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। যার মধ্যে ট্রাইব্যুনাল কয়েকটি মামলার রায় প্রদান করেছে। কিছু মামলা সিএভি রাখা হয়েছে। আরও কিছু মামলার বিচার কাজ চলছে। আশা করছি শীঘ্রই কয়েকটি মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রদান করা হবে। তবে তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে তাদের নাম প্রকাশ করছি না।

প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর ২০১৪

৩১/১০/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: