মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছো?’

প্রকাশিত : ২৯ অক্টোবর ২০১৪

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখার একটি স্মরণীয় উক্তি আজ আবার আমার মনে পড়ছে। ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছো?’ আরব আমিরাত সফরে গিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি উক্তি শুনে বঙ্কিমচন্দ্রের এই উক্তিটি আমার স্মরণ হয়েছে। মনে প্রশ্ন জেগেছে বর্তমান সরকার কি পথ হারাচ্ছেন? আরব দেশ সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘জামায়াত বাংলাদেশের জন্য কোন হুমকিই নয়। তারা নির্বাচনে ভোট পায় মাত্র চার-পাঁচ শতাংশ। তারা আমাদের রাজনীতিতে কোন ফ্যাক্টর নয়।’ কথাটা সঠিক বলে মানতে পারলে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতাম। বলতাম, তিনি আরো দীর্ঘজীবী হোন। বাংলাদেশে তার সরকারের শাসনকাল আরও দীর্ঘস্থায়ী হোক।

এ প্রার্থনা অবশ্যই মনে মনে করি। কিন্তু সেই সঙ্গে সরকারকে বঙ্কিমচন্দ্রের কথার অনুসরণ করে একথা বলতেও ইচ্ছে করছে যে, ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছো?’ নইলে গন্তব্যে পৌঁছার সঠিক পথ সম্পর্কে এই বিভ্রান্তি কেন? দীর্ঘকাল ধরেই আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে দুটি ধারা বহমান। একটি ডান এবং একটি বামমুখী। বঙ্গবন্ধুর আমলে বামমুখী ধারাটি শক্তিশালী থাকাতেই আওয়ামী লীগ আপোসের পথ পরিহার করে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পেরেছে এবং দেশ স্বাধীন করেছে।

আওয়ামী লীগে এই বামধারাটির অস্তিত্ব এখন নেই। শুধু আওয়ামী লীগে কেন, সারা দেশে এবং সারা বিশ্বেই এখন বামধারায় রাজনীতির বিপর্যয় চলছে। সুতরাং আওয়ামী লীগকে একা দোষ দিয়ে লাভ কি? আমাদের বামপন্থী নেতাদের অনেকে আগে ঘন ঘন মস্কো অথবা বেইজিং যেতেন। এখন তারা হজে যান। যে গোলাম আযমের বিচার ও দ-ের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বিএনপি সরকারের পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছেন, সেই গোলাম আযম দ-িত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মৃত্যুবরণের পর এখন জাতীয় মসজিদে জাতীয় বীরের মতো পুলিশ পাহারায় তার জানাজা অনুষ্ঠানের সুযোগ পাচ্ছেন। তাতে আমাদের বামপন্থী দল ও নেতাদের সক্রিয় প্রতিবাদ জানাতে এগুতে দেখা যায়নি।

এখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলছেন, জামায়াত বাংলাদেশের জন্য কোন হুমকি নয়। তাহলে হুমকি কি কেবল বিএনপি? এটা কি জাতির কাছে প্রধানমন্ত্রী কারেক্ট মেসেজ দিলেন, না রং মেসেজ দিলেন? জাতির আসল শত্রু চিহ্নিতকরণে আমরা কি আবার ভুল করছি না? এই ভুল করা হয়েছিল স্বাধীনতাপরবর্তী প্রথম সরকারের আমলেও। এ সময় অতিবাম এবং বিভ্রান্ত কিছু সন্ত্রাসী দল দেশে সন্ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা করে এবং সরকার তাদের দমনের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। সরকার ডানদিকের আরো বড় বিপদের দিকে তাকাননি। সরকারের সব নজর যখন বাম সন্ত্রাস দমনের দিকে নিবদ্ধ, তার সুযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত সাম্প্রদায়িক দলগুলোÑ যেমন মুসলিম লীগ, জামায়াত, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি আবার অসাম্প্রদায়িক নাম নিয়ে সংগঠিত হয়। কিন্তু দলীয় পতাকায় রাখা হয় চাঁদতারা। বর্ষীয়ান জননেতা আবুল হাশিমকে এনে এই চরম ডানপন্থী সংগঠনটির নেতা হিসেবে সামনে খাড়া করা হয়েছিল।

একই সঙ্গে এই ডানপন্থী চক্রান্তের অনুপ্রবেশ ঘটে সশস্ত্র বাহিনীগুলোতেও। এমনিতেই এই বাহিনীগুলোতে তখন পাকিস্তানমনা অফিসারদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। কর্নেল (অব) তাহের তার রাজনৈতিক বিভ্রান্তির দরুনই ভেবেছিলেন, এই পেশাদার এবং পাকিস্তানের ট্রেনিংপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের নিয়ে তিনি পিপলস্্ আর্মি বা গণবাহিনী গড়ে তুলতে পারবেন। আসলে এই বাহিনীগুলোতে তখন তলে তলে গড়ে উঠছিল একশ্রেণীর অফিসার ও জওয়ান নিয়ে ফারুক-ডালিমের ঘাতক বাহিনী।

আমি এই সময় ক্যাপ্টেন (অব) মনসুর আলীকে (তিনি তখন সম্ভবত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বলেছিলাম, আপনারা অতি বামপন্থী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে দমনের জন্য অতি ব্যস্ত। কিন্তু বিপদ যে ডানদিক থেকে ঘনাচ্ছে, সে সম্পর্কে কি সজাগ আছেন? তিনি বলেছিলেন, ডানদিক থেকে আমাদের কোন বিপদই নেই। আমরা তো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক দল গঠন নিষিদ্ধ করেই দিয়েছি। ওদের কোমর ভেঙ্গে গেছে। একটু হাতছানি দিলে ওদের অনেক নেতা আমাদের দলে চলে আসবে। আমরাই আসতে দিচ্ছি না।

পরবর্তী ইতিহাস সকলের জানা। বাংলাদেশে সশস্ত্র বামবিপ্লব দানা বাঁধেনি, সফলও হয়নি। দানা বেঁধেছে সকলের অলক্ষ্যে ডান প্রতিবিপ্লবী চক্রান্ত। তার ভয়াবহ ছোবল আমরা দেখেছি পঁচাত্তর সালের ১৫ আগস্ট ও ৩ নবেম্বর তারিখে। বিএনপি এই দুই জাতীয় ট্র্যাজেডির ফসল। কিন্তু বিএনপির নিজস্ব কোন শক্তি নেই। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা একজন ক্ষমতালোভী জেনারেল। ফলে বিএনপির শক্তির ভিত্তি ছিল ক্যান্টনমেন্ট। তারপর সুযোগ বুঝে জামায়াতও যুক্ত হয়। বিএনপিতে প্রথমে ছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নেতা এবং কর্মীও।

তারেক রহমান লায়েক হয়ে বিএনপির আসল কর্ণধার হওয়ার পর এই দুর্বৃত্ত দল থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতা-কর্মীদের অধিকাংশকে তাড়ায়, বাকিদের দলে কোণঠাসা করে ফেলে। জামায়াতকে সে কোলে টেনে নেয়। ফলে বিএনপির শক্তির ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় ‘মস্ক এন্ড মিলিটারি অক্সিস’। দেশের বামপন্থীরাও বহুকাল ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি সন্দিহান। সুতরাং মস্ক এন্ড মিলিটারির সম্মিলিত শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন পেরে ওঠেনি। বিএনপিকে সামনে শিখ-ী হিসেবে খাড়া করে জামায়াত দিন দিন শক্তিশালী হয়েছে।

জামায়াত একটি গণতান্ত্রিক দল নয়। সুতরাং তার শক্তির পরিমাপ নির্বাচনে ভোট প্রাপ্তির সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী এখানে একটি ভুল করেছেন। জামায়াতের শক্তি সন্ত্রাসে এবং ধর্মের মোড়কে এই সন্ত্রাস চালনার দক্ষতায়। জামায়াতের সন্ত্রাস আরও ভয়াবহ এই কারণে যে, তা মাদ্রাসা ও মসজিদভিত্তিক। দেশের মসজিদ-মাদ্রাসার এক বিরাট অংশ এখন জামায়াতের আওতায় এবং এগুলোকে তারা তাদের সশস্ত্র ক্যাডার তৈরির ট্রেনিং সেন্টারে পরিণত করেছে। সন্ত্রাস দমন সহজ। কিন্তু ধর্মের খোলসে ঢাকা সন্ত্রাস দমন প্রায় অসম্ভব। জামায়াত ভোটে কোনদিন ক্ষমতা দখল করবে, এমন মনে হয় না। কিন্তু ধর্মীয় সেøাগানের আড়ালে সন্ত্রাস চালিয়ে দেশকে অচল করে দেয়ার শক্তি সে রাখে।

বিএনপি যে আজ এতটা কাবু তার কারণ, ক্যান্টনমেন্টের বড় অংশের সমর্থন আজ তার পেছনে নেই। পাকিস্তান-মনা অফিসারের সংখ্যা সশস্ত্র বাহিনীগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই কমেছে। তরুণ অফিসারেরা অনেকটাই রাজনীতিবিমুখ এবং পেশাদারিত্বে বিশ্বাসী। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী এখন দেশ-বিদেশে প্রশংসিত একটি দেশপ্রেমিক সুসংগঠিত বাহিনী। তারেক রহমানও ক্ষমতায় থাকাকালে আর্মির সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারের অনেকের সঙ্গে অশোভন ব্যবহার করে তাদের বিগড়ে দিয়েছেন। ফখরুদ্দীন-মইন সরকারের আমলে গ্রেফতার হওয়ার পর বন্দি অবস্থায় তার কিছুটা নাস্তানাবুদ হওয়ারও কারণ ছিল সেখানেই।

ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে বহিষ্কারের পর বিএনপি ক্রমশ জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। জামায়াত তার সুযোগ নিয়ে দলটিকে গ্রাস করে। তাছাড়া বেগম খালেদা জিয়ারও বয়স হয়েছে। তার চেহারায় বার্ধক্যের চিহ্ন ক্রমশ প্রকট। তারেক রহমান অসংখ্য মামলা-মোকদ্দমা মাথায় নিয়ে দেশে ফেরার সাহস করছে না। স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনীতিতে বিএনপির শক্তি ও প্রভাব দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু জামায়াতের বেলায় এ কথাটা সত্য নয়। জামায়াত রাজনৈতিক কৌশলের জন্য ৫ জানুয়ারি-পূর্ব সন্ত্রাস থেকে আপাতত বিরত রয়েছে বটে; কিন্তু সে তার শক্তিকে অক্ষুণœ রেখেছে। অন্যদিকে সে তার আন্তর্জাতিক কানেকশন বাড়িয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গেও তার ঘাঁটির সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। বাংলাদেশেও বিএনপির চাইতে জামায়াতকেই আওয়ামী লীগ সরকার বেশি সমীহ করে চলে। গোলাম আযমের জানাজার ব্যাপারেও তার প্রমাণ মিলেছে।

ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন আমিরাতে গিয়ে বলেন, ‘জামায়াত বাংলাদেশের জন্য কোনো হুমকি নয়’ তখন মনে হয় জাতিকে সঠিক সতর্কবার্তা দেয়া হচ্ছে না এবং আওয়ামী লীগ সরকারও তার ইতিকর্তব্য নির্ধারণে পথ হারিয়েছে। এ কথা সত্য, বিএনপির সংসদ বর্জন ও স্বাধীনতার মূল চেতনাবিরোধী রাজনীতি এবং হত্যার রাজনীতি দেশের জন্য এই মুহূর্তে জামায়াতের চাইতেও বিপজ্জনক মনে হতে পারে। দেশের অসংখ্য রাজনৈতিক হত্যাকা-ের পেছনে, এমনকি ২৪ আগস্টের (২০০৪) ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পেছনেও বিএনপি’র কোনো কোনো শীর্ষ নেতার যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বিএনপি এখন দিন দিনই নখরদন্তবিহীন হচ্ছে এবং তার চক্রান্তও জাতীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আওয়ামী লীগ সরকার তাকে প্রতিহত করার শক্তি রাখে।

অন্যদিকে জামায়াতের রাজনীতি শুধু ব্যক্তি হত্যা নয়, স্বাধীনতার মূল ভিত্তিকেই ধ্বংস করা। ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের সবচাইতে বড় শত্রু জামায়াত এবং তার আন্তর্জাতিক কানেকশন দ্রুত সম্প্রসারিত ও শক্তিশালী হচ্ছে। আগে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের আল কায়েদা ও তালেবানদের সঙ্গে ছিল তাদের সংশ্রব। এখন ইরাক ও সিরিয়ায় যুদ্ধরত আইএস বাহিনীর সঙ্গেও তাদের গোপন যোগসূত্র গড়ে উঠেছে বলে বিদেশী সংবাদপত্রেই খবর বেরুচ্ছে। ব্রিটেন থেকে যে সব বাংলাদেশী তরুণ ‘জিহাদিস্ট’ হয়ে ইরাক ও সিরিয়ায় লড়াইয়ের জন্য গেছে, তারা জামায়াত-রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে জানা গেছে। বাংলাদেশের জামায়াত এখন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের একটা অংশ।

বাংলাদেশে বিএনপি আবার মাথা তুলতে পারবে, আমার মনে হয় না।

নির্বাচনে জিতে আবার ক্ষমতায় এলেও বিশ্ব পরিস্থিতির আমুল পরিবর্তনে তাকে ভারতের বিজেপির মতো নমনীয় ও সমঝোতার রাজনীতি অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু জামায়াতের বেলায় এ কথা সত্য নয়। জামায়াত শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার কথা বলে; কিন্তু তার পরিকল্পনা মধ্যযুগীয় খেলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ইরাক-সিরিয়ার ‘ইসলামিক স্টেট’ নামক জঙ্গী প্রতিষ্ঠানের সশস্ত্র অভ্যুত্থান-পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশে জামায়াত শুধু সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করছে এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে ভুলিয়ে ভালিয়ে অসতর্ক রাখার চেষ্টা করছে।

আমি প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে জানাই, শত্রু চিনতে ভুল করবেন না। ভুল করলে দেশ ও জাতি এক মহাসর্বনাশের সম্মুখীন হবে।

লন্ডন-২৮ অক্টোবর, মঙ্গলবার ২০১৪।

প্রকাশিত : ২৯ অক্টোবর ২০১৪

২৯/১০/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: