মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বিদেশী ষাঁড়ের শুক্রাণু থেকে উন্নত জাতের গাভী, দুধ দেবে দিনে ২৫ লিটার

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৪

কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে আরডিএ’র প্রকল্প

সমুদ্র হক ॥ আরডিএ-পল্লী উন্নয়ন একাডেমি। বগুড়ার কৃষকদের বন্ধু প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠান কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে বহুদিন ধরে। প্রতিষ্ঠানটির নেয়া এমনই একটি প্রকল্প হলো বিদেশী ষাঁড়ের শুক্রাণু কৃত্রিমভাবে দেশী গাভীতে প্রয়োগ করা। এর ফলে জন্ম নেয়া গাভীর দুধ দেয়ার পরিমাণ আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। গাভীটিও হয় বিদেশী জাতের মতোই হৃষ্টপুষ্ট। এর ফলে দেশে পশুসম্পদের উন্নয়নের সঙ্গে খাঁটি দুধের অভাব দূর হবে।

দারিদ্র্য দূরীকরণ ও স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিটি পরিবারেই দুধের চাহিদা পূরণ হয়ে বাড়তি দুধের আধার সৃষ্টি হবেÑ এমনটি জানিয়ে আরডিএর মহাপরিচালক এমএ মতিন বলেন, এভাবে অতি দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব আমরা। দেশে বর্তমানে গরু লালনপালন করে প্রতিটি গাভী থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই লিটার করে দুধ মেলে। বগুড়া আরডিএর গবেষণায় প্রতিদিন প্রতিটি গাভী থেকে দুধ মিলবে গড়ে ২৫ লিটার করে এবং পরবর্তীতে তা ৫০ লিটারে ঠেকবে। এভাবে প্রতিটি গাভী বছরে ল্যাকটেশন পিরিয়ডে (৩০৫ দিন) দুধ দেবে সাড়ে সাত হাজার থেকে ১৫ হাজার লিটার। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ও গবেষণায় আরডিএতে বিশ্বের অত্যাধুনিক কম্পিউটারাইজড আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেশন (এআর) গবেষণাগার (কৃত্রিম প্রজনন) স্থাপিত হয়েছে।

প্রকল্পটির পরিচালক ড. শেখ ফজলুল বারী ও সহকারী পরিচালক ড. রিয়াজুল ইসলাম জানান, কয়েক মাস আগে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফ্রিজিয়ানা জাতের দুটি ষাঁড় এয়ার কার্গোতে (বিমানে) আনা হয়। কোন কারণে একটি ষাঁড়কে বাঁচানো যায়নি। অন্য ষাঁড়টি খুবই ভাল আছে। আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। অতি উন্নত এই ষাঁড়ের শুক্রাণুই বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কৃত্রিম গাভী বানিয়ে তার ওপর জাম্প করানো হয় ওই ষাঁড়কে। প্রতিবার ৬-১২ মিলিলিটার শুক্রাণু বের হওয়ার সঙ্গেই তা ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে সংগ্রহ টিউবে নিয়ে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ওয়াটার বাথে নেয়া হয়। বিশ্বের সর্বশেষ প্রযুক্তির এন্ড্রোভিশন সিস্টেমে কম্পিউটার অটোমেটিক বিশ্লেষণ করে ফলাফল দেয়। ২০ সেকেন্ডে অপেক্ষার পর ডায়ল্যুশন পদ্ধতিতে গিয়ে বিশেষ ধরনের ডায়ালুয়েন্ট যোগ করতে হয়। এরপর আরও দুটি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রাণু স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে ফিলিং সিলিং করা হয়। তারপর সংরক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হয় শীতল কেবিনেটের মাধ্যমে ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। সেখানে কম্পিউটারের ফলাফল অনুযায়ী তিন থেকে চার ঘণ্টা রাখা হয়। এরপর মাইনাস ১২০ ডিগ্রী থেকে মাইনাস ১৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফ্রিজিং প্রসেসে নেয়া হয়। সর্বশেষ ধাপে তরলীকৃত শুক্রাণু মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় নাইট্রোজেন কন্টেনার সংরক্ষণাগারে মাননিয়ন্ত্রণ করে রাখা হয়। এই শুক্রাণু কৃত্রিমভাবে প্রয়োগ করা হয় দেশী বা শঙ্কর জাতের গাভীর বাছুর ধারণের থলিতে। টিউবের মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রয়োগের আগে কোল্ড চেন সিস্টেম যথাযথভাবে মেনে চলা হয়। শুক্রাণু বের করার ২০ সেকেন্ডের মধ্যে তা প্রয়োগ করতে হয়। এর আগে গাভীকে বিশেষ পদ্ধতিতে শুক্রাণু গ্রহণে প্রস্তুত করা হয়। এরপর নির্ধারিত সময় বাচ্চা প্রসবের পর গাভী দুধ দেয়া শুরু করে।

ড. রিয়াজুল জানান, একাডেমির ‘ক্যাটেল ব্রিড ইমপ্রুভমেন্ট শেডে’ এ পর্যন্ত অন্তত ২০টি গাভীকে পরীক্ষামূলক প্রয়োগে বড় ধরনের সফলতা এসেছে। একাডমির ক্যাটেল ব্রিড ইমপ্রুভমেন্টের গবেষণাগারকে আরও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। আরডিএর মহাপরিচালক এমএ মতিন ও পরিচালক (পানি প্রযুক্তি) মাহমুদ হোসেন খান জানান, আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেশন ল্যাবরেটরিকে পরিপূর্ণ করতে সর্বশেষ উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি বসানো হচ্ছে। দেশকে দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন করে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যেই আরডিএ ক্যাটেল ব্রিড ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্প আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে পারলে পুষ্টি ও পশু পালনে আয় বেড়ে যাবে। একজন কৃষক উন্নত জাতের যে বাছুর পাবে তা বলদই হোক বা গাভী হোক তারা লাভবান হবে। একই সঙ্গে উৎপাদিত দুধের মাধ্যমে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি দুধ বিক্রি করতে পারবে। এভাবে এমন একটা সময় আসবে যখন দেশেই দুধ সংরক্ষণের পর পাউডার করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব হবে।

ড. রিয়াজুল বলেন, বিদেশী ষাঁড়ের শুক্রাণু দেশী জাতের গাভীতে প্রয়োগের পর সিমেন জেনেটিকস বিশ্লেষণ যে ফল দেবে সেভাবেই বাছুর বেড়ে উঠবে। মানব ভ্রƒণে সন্তান যেমন বাবা মায়ের আধাআধি গুণাগুণ পায় এই ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই হবে। যে কারণে ল্যাকটেশনের প্রথমদিকে প্রতিবার ২০ থেকে ২৫ লিটার দুধ দেয়ার পর দিন দিন তা বাড়তে থাকবে। গরুর খাবার যোগাতে উন্নত জাতের ঘাসের আবাদও হবে।

আরডিএর মহাপরিচালক এমএ মতিন আরও জানান, বীজের পর পরবর্তী ধাপে মাঠ পর্যায়ে বাছুর ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প নেয়া হবে। তবে শুরু থেকেই গ্রাম ও চর এলাকাগুলোকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের আওতায় আনা হবে। যাতে দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন হয়ে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয় বাংলাদেশ।

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৪

২৭/১০/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: