ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

আ ব ম নূরুল আলম

যুদ্ধদিনের স্মৃতি

প্রবীর বিশ্বাস, খুলনা অফিস

প্রকাশিত: ২৩:২৪, ৭ ডিসেম্বর ২০২২

যুদ্ধদিনের স্মৃতি

অ্যাডভোকেট আ ব ম নুরুল আলম

অ্যাডভোকেট আ ব ম নুরুল আলম। একজন দুঃসাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে সেদিন মায়ের দোয়া নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন তিনি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রপ্ত করেছিলেন যুদ্ধের বিষয়াদি। পরবর্তীতে মুজিব বাহিনীর লিডার হিসেবে প্রশিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেছেন। কোন কিছুই বৃথা যায়নি। বিজয়ী বেশেই ফিরে এসেছিলেন মায়ের কাছে।

নেতৃত্বদানের দক্ষতা আগে থেকেই। ১৯৬৭ সালের কথা। তখন খুলনা নগরীর সেন্ট জোসেফস্ উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ওই সময় পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলার নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে চাপিয়ে দেয় পাকিস্তানের ‘কৃষ্টি ও সভ্যতা’ নামের একটি বই। যা ছিল আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবর্জিত। এ নিয়েই শুরু হয় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সভা, সমাবেশ আর মিছিল। যার অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন নুরুল আলম।

এরপর ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্তর্গত ছাত্রলীগের স্বাধীনতাকামী ধারার অন্যতম সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আর ১৯৭০ সালে সরকারি ব্রজলাল কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন ছাত্র সংসদের ছাত্রলীগের মনোনয়নে সর্বাধিক ভোটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ৭০’র নির্বাচনের কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মুক্তিসংগ্রামে সম্পৃক্ত হন তিনি। সাতক্ষীরার মাগুরা গ্রামে অবিশ্বাস্যভাবে কপিলমুনির রাজাকারদের রুখে দেওয়ার স্মৃতি এখনো তাকে উজ্জ্বীবিত করে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম বলেন, ১ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত বাঁশের লাঠি নিয়ে শুরু হয় সাময়িক প্রশিক্ষণ। পিটিআই মাঠে তিনশ’ জনের মতো যুবক প্রশিক্ষণে অংশ নেই। প্রশিক্ষক ছিলেন জয়নাল আবেদীন, আনোয়ার আলীসহ আরও একজন। ২৩ মার্চ সকালে পিটিআই মাঠে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শহীদ হাদিস পার্কে খুলনায় স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন সমাবেশে যোগ দেই।

এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রশিক্ষণের জন্য সাতক্ষীরার ভোমরা এলাকা হয়ে ভারতে যাই। সেদিন মাকে খুলনা থেকে শ্যামনগরে রেখে দোয়া নিয়ে রওনা হয়েছিলাম। কলকাতার ৯নং প্রিন্সসেফ স্ট্রিটে মিলিত হই খুলনা অঞ্চলের মুজিব বাহিনীর প্রধান কামরুজ্জামান টুকুর সঙ্গে এবং রিক্রুট হই মুজিব বাহিনীতে। এর আগে সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে বেঙ্গল লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) মুজিব বাহিনী গঠিত হয়। এ বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সমন্বয় করা ও দেশের ভেতরে ঢুকে শত্রুঘাঁটিসমূহের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে বাহিনী তৈরি করে শত্রুর ওপর গেরিলা আক্রমণ।
মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম বলেন, ‘শিলিগুড়ির পাঙ্গা ক্যাম্পে আমাদের দুই গ্রুপে ভাগ করে এক গ্রুপকে উত্তরপ্রদেশের দেরাদুন আর এক গ্রুপকে অসমের হাফলং সেনা প্রশিক্ষণে নেওয়া হয়। আমি হাফলং গ্রুপে। সেখানে দেড় মাসের স্পেশাল গেরিলা ট্রেনিং ও ১৫ দিনের বিশেষজ্ঞ ট্রেনিংপ্রাপ্ত হই। বয়স কম হলেও আমি প্রশিক্ষণের নয়টি বিষয়ে এবং চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম হই। ফায়ারেও রেকর্ড হয়। প্রশিক্ষণ শেষে আমরা চলে আসি ব্যারাকপুর ক্যাম্পে।

১৪ আগস্ট কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে সাতক্ষীরা দিয়ে তালায় আসি। ইউনুস আলী, মোড়ল আঃ সালাম ও শেখ আব্দুল কাইয়ূমসহ তখন অনেকেই ছিলেন। আমরা পাটকেলঘাটা আর্মি ক্যাম্প ও কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্পের মধ্যবর্তী মাগুরা নামক গ্রামে অবস্থান নেই। পরে মাগুরা ক্যাম্প থেকে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগ্রহ করে তাদের ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব পাই। তাদের বাওখোলার অস্থায়ী ক্যাম্পে ট্রেনিং দেই।

এরমধ্যে জানতে পারলাম বালিয়াডাঙ্গায় আমাদের একটি গ্রুপের ওপর পাক সেনারা আক্রমণ করেছে। খবর পেয়েই ট্রেনিং শেষে ভারত সরকারের দেয়া মার্ক ফোর (থ্রি নট থ্রি মান) রাইফেল, ১০০ রাউন্ড গুলি, একটি বেয়োনেট ও একটি গ্রেনেড নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। মাগুরা গ্রামের গা ঘেঁষে কপোতাক্ষ নদ। এটি পার হয়েই বাওখোলা যেতে হয়। খেয়াঘাটে পৌঁছালে মাঝি বললো আপনি ফিরে যান। পেছন থেকে কপিলমুনির রাজাকার বাহিনী এদিকে আসছে। আমি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেই।

কপিলমুনি রাজাকার বাহিনীকে যদি সামনে এগুতে দেই তাহলে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া মাগুরার যে বাহিনী অগ্রসর হয়েছে তাদের সামনে পাটকেলঘাটার পাক আর্মি ও পেছনের রাজাকার বাহিনীর মাঝখানে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আমাদের নিয়ম ছিল ‘হিট অ্যান্ড রান’। আমি আখ ক্ষেতে ঢুকে নদীর ওপারে রাজাকার বাহিনীর ওপর গুলি ছুড়ি। হঠাৎ গুলিতে হকচকিয়ে যায় তারা। এ সুযোগে মাগুরাসহ অন্য গ্রাম থেকে ধরে আনা রতনসহ ৩০/৪০ জন বন্দি মুক্ত হয়। রাজাকার বাহিনীও মুষলধারে গুলিবর্ষণ শুরু করে।

আমিও ক্রলিং করে জায়গা পাল্টে পাল্টে গুলি ছুড়ি, ওদের বুঝতে দেই না আমি একা। রাজাকার বাহিনী মাগুরা বাজারে আটকে গেল। এদিন আমার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে বুলেট স্মৃতিচিহ্ন এঁকে দেয়; সেই চিহ্ন এখনও আমাকে মনে করিয়ে দেয় সব কিছু।
খুলনা ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন স্থানের রণাঙ্গনে এমন অনেক স্মৃতি এখনও উদ্বেলিত করে বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলমকে। তবে পাইকগাছার কপিলমুনিতে রাজাকার ক্যাম্প ছিল এতদাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ক্যাম্প।

যেখান থেকে রাজাকার বাহিনী গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাক সেনাদের সহযোগিতা আর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের প্রতি নির্যাতন চালাত। সেই রাজাকারদের জনতার আদালতে বিচার করে মৃত্যুদ- কার্যকর করার মধ্য দিয়ে নিজেকে খানিকটা দায়মুক্ত করেছিলেন তিনি। ১৭ তারিখে তিনি লঞ্চে করে বারোয়াড়িয়া হয়ে বিজয়ের মালা পরে খুলনা এসেছিলেন। এরপরও তিনি থেমে থাকেন নি। বিজয়োত্তর খুলনা শহরের অরাজকতা, লুটপাট ও শত্রু বাহিনীর অস্ত্র উদ্ধারে গুরুদায়িত্ব পালন করেন।

monarchmart
monarchmart