মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ৩ আশ্বিন ১৪২১
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতিসংঘকে পাশে চাই ॥ প্রধানমন্ত্রী
বাংলানিউজ ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতিসংঘে ৪০ বছরের পথ-পরিক্রমায় আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। এর কোনটিই অনায়াসে হয়নি। যখনই আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসেছি, জাতিসংঘের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করেছি, যা পারস্পরিক ব্যবধান কমিয়ে এনেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য অর্জনে আমরা জাতিসংঘকে আমাদের পাশে দেখতে চাই। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ স্মারক অনুষ্ঠানে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। বুধবার বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ আয়োজন করা হয়।
বক্তৃতার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে দেশের পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা ছাড়া তাঁর এ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
আর এ জন্য জাতিসংঘের সদস্যপদ অর্জন ছিল অপরিহার্য। দেশের বাইরে তখনও আমাদের দূতাবাসগুলো ভালভাবে চালু হয়নি। সে অবস্থায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভের জন্য জাতির পিতা বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ও তৎকালীন বিশ্ব নেতাদের সমর্থন আদায়ের পদক্ষেপ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার পররাষ্ট্রনীতির আদর্শই আমাদের ‘শান্তির সংস্কৃতি ও সহিংসতাবিরোধী’ নীতিতে সব সময় অবিচল রেখেছে। ১৯৯৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত প্রস্তাবের প্রতি আমরা দৃঢ় সমর্থন দেই। এ আদর্শের পথ ধরেই আমাদের নারী-পুরুষ বিশ্বের সংঘাত-সঙ্কুল এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ভাষা-বৈচিত্র্য রক্ষা ও মাতৃভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে বিশ্ববাসী আজ যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে-সে অর্জন এসেছে জাতির পিতা প্রদর্শিত পথ ধরেই।
জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ এজেন্ডায় আমাদের অবস্থান সব সময়ই সামনের সারিতে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, সমুদ্র, আকাশ এবং সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে চাই। সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদবিরোধী বৈশ্বিক সংগ্রামে আমরা স্বপ্রণোদিত হয়ে কাজ করতে চাই। রাজনৈতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী আমরা দেশে মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি।
গণহত্যা প্রতিরোধে সারাবিশ্বে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে, আমরা তার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি যাতে বন্ধ হয়, সেজন্য অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার আন্দেলনে আমরা নীতিগতভাবে অগ্রগামী। মিয়ানমারের শরণার্থী সমস্যা সমাধানে আমরা কূটনৈতিক পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও করে যাব।
তিনি বলেন, নারীর ক্ষমতায়নকে আরও সুদৃঢ় করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ এবং শিশু নির্যাতন ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা কার্যকর কর্মসূচী গ্রহণ করেছি।
বাংলাদেশ জাতিসংঘে প্রবেশ করার আগেও বিশ্বের অনন্য এই প্রতিষ্ঠান সুখে-দুঃখে আমাদের পাশে ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘ বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এখনও জাতিসংঘ আমাদের পাশে আছে। বাংলাদেশের মানুষ যোগ্যতা বলেই উন্নয়ন ও নিরাপত্তার দরকষাকষিতে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেই পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
আমরা যুদ্ধ-সংঘাত চাই না, শান্তি চাই-উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই মহান দিনে আমি বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানাব, আসুন যুদ্ধ-সংঘাত বন্ধে আমরা আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেই। জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দেই।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন- অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, জাতিসংঘ বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ ও ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী নিল ওয়াকার।
পরে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে সদস্যপদ লাভের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি স্মারক ডাকটিকেট উন্মোচন করেন। এছাড়া দিবসটি সামনে রেখে বাংলাদেশকে তুলে ধরে প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। আয়োজনের একেবারে শেষে শিশু একাডেমির শিল্পীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী ও অতিথিরা।
চট্টগ্রামে সাবকন্ট্রাক্টনির্ভর ৩ শতাধিক গার্মেন্টসে কাজ নেই
স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রামের পোশাক কারখানাগুলোর প্রায় অর্ধেকই এখন কর্মহীন। ভবন সমস্যা, অর্ডার না পাওয়াসহ নানা কারণে কারখানাগুলো উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারছে না। এদিকে, ঈদ-উল-আযহাকে সামনে রেখে বরাবরের মতো এবারও শ্রম অসন্তোষের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। পাশাপাশি ঈদের আগে তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যাও ভাবিয়ে তুলেছে মালিকপক্ষকে। এ অবস্থায় আজ বৃহস্পতিবার বন্দর সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হতে যাচ্ছেন বিজিএমইএ নেতারা।
বিজিএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি নাসিরউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জানান, চট্টগ্রামে ৭শ’র কাছাকাছি পোশাক কারখানা থাকলেও এখন সচল রয়েছে সাড়ে ৩শ’টির মতো। ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করা না হলেও তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনের চাকা এক প্রকার বন্ধই বলা যায়। মাঝেমধ্যে সাবকন্ট্রাক্টের কাজ পেলে তবেই সচল থাকে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধান সমস্যা অবশ্যই ভবন সংক্রান্ত। অনেক ভবন রয়েছে যেগুলো কারখানার জন্য উপযুক্ত নয়। সম্প্রতি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এক্ষেত্রে নজরদারি বাড়িয়ে দেয়ায় পুরনো ভবনে কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
বিজিএমইএ নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রতিবছরই ঈদের আগে বন্দরের ওপর বেশ চাপ থাকে। ঈদে লম্বা ছুটি থাকে বিধায় রফতানিকারকরাও এ সময়ে অধিক পণ্য শিপমেন্টের চেষ্টা করেন। সে কারণে সবচেয়ে প্রকট হয় কন্টেনার সমস্যা। পর্যাপ্তসংখ্যক খালি কন্টেনার পাওয়া যায় না। এতে রফতানি ব্যাহত হয়।
এদিকে, প্রতিটি ঈদের পূর্বে শ্রম অসন্তোষের ঘটনাও নতুন নয়। বিশেষ করে শ্রমিকদের মজুরি এবং বোনাস নিয়ে গোলযোগ হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে না পারলে সড়কে নেমে আসেন শ্রমিকরা।
৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদ- দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল
স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, ধর্মান্তর করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটি অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করে ট্রাইব্যুনাল। বাকি ১২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়াতে সেগুলো থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছিলেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যে সব অভিযোগে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করেন সেই অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল ৬, ৭, ৮, ১০, ১১, ১৪, ১৬, ১৯। এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার আদেশ দেয়া হয়েছে। অন্য ছয়টি অভিযোগে আলাদা করে কোন শাস্তি দেয়া হয়নি। অন্যদিকে ১২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সাঈদীকে সেই সমস্ত অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়েছে।
চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর বলেন, ‘আমরা রায়ের আগে দুটি কথা বলতে চাই। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পরিচয় দেয়ার কোন দরকার নেই। ওনার ওয়াজ শোনার জন্য হাজার মানুষ যান। ওনার বর্তমান নাম আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। উনি শুধু প্রখ্যাত মাওলানা নন, উনি দুবারের এমপি। জামায়াতের নায়েবে আমির। কিন্তু আমরা তাঁকে নায়েবে আমির কিংবা সাংসদ হিসেবে বিচার করছি না। তবে আমরা আজ থেকে ৪২ বছর পূর্বে সংঘটিত অপরাধের বিচার করছি। ওই সময় সাঈদী ছিলেন ৩০ বছরের যুবক। তিনি ছিলেন বিবাহিত, এক সন্তানের জনক। পিরোজপুরে সাউদখালীতে বাড়ি। তখন তিনি কোন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি পিরোজপুরের শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি আলেম পাস। উর্দুতে ভাল কথা বলতে পারতেন। তাই পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে তাঁর ভাল যোগাযোগ তৈরি হয়। আমাদের বিচার করতে হবে, তিনি সে সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না। আমরা সেই ৩০ বছরের যুবকের বিচার করছি। বর্তমানের সাঈদীর বিচার করছি না, যার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে গ্রামের নিরীহ লোক ও সাধারণ মানুষ। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে ২৮ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসামিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন ১৭ জন।
মৃত্যু দ-াদেশে প্রদান করা ৮ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ৮ মে বেলা ৩টায় সাঈদীর নেতৃত্বে তার সাঙ্গোপাঙ্গরা পাকিস্তানী বাহিনীর সহায়তায় সদর থানার চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারির বাড়িতে হানা দিয়ে তার ভাই মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহিমকেসহ দুই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যান। সেখানে পাঁচটি বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সেনাক্যাম্পে ফেরার পথে সাঈদীর প্ররোচণায় ইব্রাহিমকে হত্যা করে লাশ ব্রিজের কাছে ফেলে দেয়া হয়। মফিজকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
পরে সাঈদী ও অন্যদের আগুনে পারেরহাট বন্দরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় সাঈদী সরাসরি অপহরণ, খুন, যন্ত্রণাদানের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিলেন, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ৩(২)(এ) ধারা অনুসারে অপরাধ।
অভিযোগ-১০ এ বলা হয়েছে, ২ জুন সকাল ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে তার সশস্ত্র সহযোগীরা ইন্দুরকানি থানার উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার হানা দিয়ে ২৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসব বাড়ির মালিকরা হলেন, চিত্তরঞ্জন তালুকদার, হরেন ঠাকুর, অনিল ম-ল, বিশাবালি, সুকাবালি, সতিশ বালা প্রমুখ। সাঈদীর ইন্ধনে তার সহযোগীরা বিশাবালিকে নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে। বেসামরিক মানুষের বসবাসের বাড়িতে আগুন দেয়া নিপীড়নের শামিল। সাঈদী এ ঘটনায় বাড়িঘর পোড়ানো, বিশাবালিকে হত্যা মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন, যা আইনের ৩(২)(এ) ধারায় অপরাধ।
এ দুটি বাদে আরও ছয়টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সেই চার্জগুলো হচ্ছে, ৬, ৭, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগ। চেয়ারম্যান রায়ে বলেন, ২টি অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় এসব অপরাধে নতুন সাজা দেয়ার প্রয়োজন নেই। এসব অভিযোগে কি রয়েছে। অভিযোগ-৬ এ বলা হয়েছে, ৭ মে সাঈদীর নেতৃত্বে একদল শান্তি কমিটির সদস্য পিরোজপুর সদরের পারেরহাটে গিয়ে পাকিস্তানী সেনাদের ওই এলাকায় স্বাগত জানান। মুকুন্দ লাল সাহার দোকান থেকে বাইশ সের স্বর্ণ ও রৌপ্য লুট করেন সাঈদী।
অভিযোগ-৭ এ বলা হয় সাঈদী তার সশস্ত্র সাঙ্গোপাঙ্গ ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সদর থানার ভাদুরিয়া গ্রামের নুরুল ইসলাম খানের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে হানা দেন। পরে তিনি তাকে আটক করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন, যারা তাকে নির্যাতন করে।
অভিযোগ-১১ : সাঈদীর নেতৃত্বে শান্তি কমিটি ইন্দুরকানি থানার টেংরাখালী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে পাকিস্তানী সেনাদের নিয়ে যান। সেখানে সাঈদী তার বড় ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদারকে ধরে নির্যাতন করেন।
অভিযোগ-১৪ : মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে ৫০-৬০ জনের একটি রাজাকার বাহিনী হোগলাবুনিয়ার হিন্দুপাড়ায় যায়। মধুসূদন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামী ঘর থেকে বের হতে পারেননি। তখন সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকাররা তাকে ধর্ষণ করেন।
অভিযোগ-১৬ : সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জনের রাজাকার দল পারেরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ি থেকে তার তিন বোন মহামায়া, অন্ন রানী ও কমলা রানীকে ধরে পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তিন দিন ধরে ধর্ষণ করে পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
অভিযোগ-১৯ : সাঈদী প্রভাব খাটিয়ে পারেরহাটসহ অন্য গ্রামের ১০০-১৫০ জন হিন্দুকে ইসলাম ধর্মে রূপান্তর করে। তাদের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে বাধ্য করা হতো।
যেগুলো প্রমাণিত হয়নি
১২টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে সেই সমস্ত অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়েছে। অভিযোগগুলো হলো ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৯, ১২, ১৩, ১৫, ১৭, ১৮ ও ১৯।
পর্যটন কেন্দ্রে আটকা পড়েছে হাজার হাজার পর্যটক
মেক্সিকোতে হারিকেন
মেক্সিকোর সামরিক ও বাণিজ্যিক বিমানগুলো মঙ্গলবার থেকে পর্যটনকেন্দ্র লস কাবোসে আটকে পড়া পর্যটক ও দুর্গত লোকদের আকাশপথে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। হারিকেন ওডিল আঘাত হানার পর আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়া বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে এরা অত্যন্ত দুরাবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ওডিল রবিবার রাত ও সোমবার ভোরের মধ্যবর্তী সময়ে বাজা ক্যালিফোর্নিয়ার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গোটা এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এরপর এটি দুর্বল হয়ে গ্রীষ্মম-লীয় ঝড়ে পরিণত হয়। ফলে প্রায় ৩০ হাজার পর্যটক ক্যালিফোর্নিয়া উপদ্বীপের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আটকা পড়ে। প্রাইভেটকার বা গণপরিবহনগুলোতে জ্বালানি ভরার জন্য সার্ভিস স্টেশনগুলো খোলা হয়নি। তাই বিমানে আসন পেতে কয়েক শ’ পর্যটক তাদের মালপত্র না নিয়েই বিমানবন্দরের উদ্দেশে ছুটতে শুরু করে। ঝড়ে বিমানবন্দরটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিলা রোচ বলেন, ‘আমি প্রায় চার ঘণ্টা ধরে প্রচণ্ড গরমে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি।’
রবিবার তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল। লা পাজে ওই এলাকার অপর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে এই বিমানবন্দরটিও ঝড়ের আঘাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এগুলো বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। লস ক্যাবোস টার্মিনালটির বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এর জানালার কাচগুলো ভেঙ্গে গেছে। কেন্দ্রীয় পুলিশ জানিয়েছে, একটি বিমানে ১৩৭ জন উঠেছেন।
মেক্সিকান বিমান কোম্পানি ইন্টারজেট ১৫০ যাত্রীর জন্য একটি বিমান পাঠিয়েছে। আটকেপড়া মানুষদের তিজুয়ানা ও মেক্সিকো সিটিতে নিয়ে যেতে সশস্ত্রবাহিনী বেশ কয়েকটি বিমান মোতায়েন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও কানাডার কনস্যুলার কর্মকর্তারা তাঁদের নাগরিকদের পাশে দাঁড়াতে দুর্গত এলাকায় গেছেন।
রবিবার রাতে ওডিল আঘাত হানার পর প্রায় ২৬ হাজার বিদেশী পর্যটক ও ৪ হাজার স্থানীয় নাগরিক আক্রান্ত এলাকার হোটেলগুলোতে আশ্রয় নেয়। -এএফপির
ইরাকে স্থল অভিযানে অংশ নিতে পারে মার্কিন সেনা
সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটিকে জেনারেল ডেম্পসি
মার্কিন নেতৃত্বাধীন পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এ্যান্ড সিরিয়াকে (আইসিস) নির্মূলে ইরাকে স্থল অভিযান চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া আইসিসের শক্তঘাঁটি সিরিয়াতেও বিমান হামলা চালানোরা পরিকল্পনা করছে দেশটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা জয়েন্ট চীফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্টিন ই ডেম্পসি গত মঙ্গলবার একথা জানিয়েছেন। ওবামা যে রূপরেখা প্রকাশ করেছিলেন, এই পরিকল্পনা তার চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও আরও বেশি ব্যয়বহুল হবে। ডেম্পসি সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটিকে বলেছেন, আমেরিকার নেতৃত্বাধীন জোটের আইসিসকে পরাজিত করার বিষয়ে তিনি আস্থাশীল। তিনি বলেন, আইসিসের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে গঠিত এই জোট সঠিকভাবেই সামনে এগিয়ে চলছে। আমার বিশ্বাস, তারা এটি সত্য প্রমাণ করবেন। যদি এটি ব্যর্থ হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আইসিস হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমি আবার প্রেসিডেন্টের কাছে যাব এবং মার্কিন বাহিনীকে ইরাকে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়ার বিষয়ে সুপারিশ করব। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, তার এই পরিকল্পনা প্রেসিডেন্টের নীতিবিরোধী হতে পারে। তবে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট তাকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে বলেছেন। ডেম্পসির এই বিবৃতি ওবামার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরোধী পরিকল্পনার প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। ওবামা বার বারই বলে আসছেন যে, ইরাকে ইসলামি স্টেটের বিরুদ্ধে মার্কিন স্থল সেনা জড়াবে না। প্রশাসনের মিশ্র বার্তায় দেখা গেছে, ওবামা এটিকে যুদ্ধ না বলার প্রতি জোর দিয়েছেন, অপরদিকে তার উপদেষ্টা এটিকে যুদ্ধ বলেছেন। আইসিসের পতন ঘটাতে ও একে নির্মূল করতে ওবামার নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমবারের মতো সংগঠনটির ওপর বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
ডেম্পসি বলেছেন, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী আইসিসের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করতে ইরাকী বাহিনীকে সহায়তা করবে মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা। তবে পরিস্থিতি বুঝে ইরাকী সেনাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে এই উপদেষ্টারা। হোয়াইট হাউস থেকে মঙ্গলবার বলা হয়েছে, ওবামা তার পরিকল্পনার কোন পরিবর্তন করেননি এবং জেনারেল ডেম্পসির সঙ্গেও তার তেমন কোন মতভেদ হয়নি। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জস আর্নেস্ট বলেছেন, প্রেসিডেন্টের সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে ডেম্পসির দায়িত্ব হলো বিস্তারিত সব বিষয় বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা। কমান্ডার ইন চীফ হিসেবে ওবামার দায়িত্ব একটা স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা। এদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, সিরিয়াতেও আইসিসের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। সিরিয়াতেই তারা পশ্চিমা বন্দীদের আটক করে রেখেছে এবং দেশটির রাকা শহরে তাদের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। -নিউইর্য়ক টাইমস, এএফপি ও বিবিসি অনলাইন
এআইআইবির সদস্য হচ্ছে বাংলাদেশ
অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ইআরডি সচিব ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গবর্নরের বৈঠক
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ চীনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) সদস্য হওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ইআরডি সচিব মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গবর্নরের মধ্যকার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে এআইআইবি নামক উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে চীন। অক্টোবরে যাত্রা শুরুর কথা রয়েছে ব্যাংকটির। এ ব্যাংকের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ, সংযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করছে চীন সরকার। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, আইডিবির আদলে তৈরি এআইআইবি ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্য হবে- সদস্য দেশগুলোকে অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়া। এর অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২০ শতাংশ আসবে সদস্য দেশগুলো থেকে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে ব্রাজিলের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ব্রিকস নামের অন্য একটি উন্নয়ন ব্যাংক। নতুন এই উন্নয়ন ব্যাংকের সদর দফতর হবে চীনের সাংহাইয়ে। ব্যাংকটির জোটভুক্ত দেশ ৫টি। এ দেশগুলো হলো- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সচিব মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন জানান, চীনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া এ ব্যাংকটির সদস্য দেশের মধ্যে এশিয়া অঞ্চলের ২০টি দেশ থাকতে পারে। ইতোমধ্যে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া এর সদস্য হওয়ার বিষয়ে তাদের সম্মতি জানিয়ে দিয়েছে। আগামী অক্টোবরে প্রতিষ্ঠাতা দেশের সঙ্গে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর আতিউর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী কথা বলবেন। তবে বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের মনোভাব ইতিবাচক।’
এআইআইবি ও ব্রিকস ব্যাংক বিষয়ে গত মাসে ইআরডি আলাদা দুটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নে প্রতিবছর ৫০০ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ সহায়তা প্রয়োজন বলে বলা হয়েছে। তবে বর্তমানে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পাওয়া যাচ্ছে বলেও প্রবন্ধে বলা হয়েছে। বাকিটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। যেজন্য নতুন এ দুটি ব্যাংকের সদস্য হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে ইআরডি।
পুঁজিবাজারে ১৪ মাসের সর্বোচ্চ লেনদেন
অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ দেশের পুুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ওস ব্যক্তি পর্যায়ের সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের কারণে প্রধান বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিগত ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে। বেশিরভাগ কোম্পানির দর কমলেও মূলত বড় মূলধনী কোম্পানির চাহিদা বাড়ার কারণে সব ধরনের সূচকই বেড়েছে প্রায় ১ শতাংশ করে। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে। ক্রমাগতভাবে দর কমতে থাকা কোম্পানিগুলোর হারানো দাম ফিরে পেতে শুরু করায় বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা বাড়তে শুরু করেছে। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপীল বিভাগের চূড়ান্ত রায় ঘোষণার কারণে সকাল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ সক্রিয় ছিল। ফলে তারা শেয়ারের দরপতন ঠেকাতে ক্রয়াদেশ বাড়িয়েছে।
বাজার পর্যালোচনা দেখা গেছে, দিনশেষে ডিএসইর সার্বিক সূচক আগের দিনের চেয়ে ৩৮ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৪ হাজার ৭৯৮ পয়েন্টে। ফলে প্রথমবারের মতো ডিএসইর নতুন সূচকটি প্রায় ৪ হাজার ৮শ’ পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক সীমাটি ছুঁই ছুঁই করছে। মঙ্গলবার ডিএসইর সার্বিক সূচক অবস্থান করছিল ৪ হাজার ৭৫৯ পয়েন্টে। গ্রামীণফোন, মবিল যমুনার মতো কোম্পানিগুলোর প্রাধান্যের দিনে সেখানে লেনদেন হয়েছে ৯৬৬ কোটি ৪২ লাখ ৬১ হাজার টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট।
যা বিগত ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৯৮৬ কোটি ৭৮ লাখ ১৪ হাজার টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট। মঙ্গলবারে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৮৩৬ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট। সে হিসেবে বুধবার ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে ১৩০ কোটি ২০ লাখ ১০ হাজার টাকা বা ১৫.৫৭ শতাংশ। দিনটিতে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩০০টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৩১টির, কমেছে ১৩৩টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৬টি কোম্পানির।
বুধবার ডিএসইর টপ-২০ তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলোর মোট ৫১৭ কোটি ৮ লাখ ৬২ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। যা ডিএসইর মোট লেনদেনের ৫৩.৫০ শতাংশ। বুধবারে সবচেয়ে বেশি শেয়ার লেনদেন হয়েছে গ্রামীণফোনের। দিনভর এ কোম্পানির ১৩ লাখ ৬৩ হাজার ৪০০টি শেয়ার ৪৮ কোটি ৫৪ লাখ ১৫ হাজার ৬০০ টাকায় লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া মবিল যমুনা বিডির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ, বেক্সিমকো ফার্মার ৪০ কোটি ৮৩ লাখ, বিএসআরএম স্টিলসের ৩৯ কোটি ৮২ লাখ, লাফার্জ সুরমার ৩৮ কোটি ৯৮ লাখ, বেক্সিমকোর ৩৬ কোটি ১৬ লাখ, ডেল্টা লাইফের ২৮ কোটি ৭৪ লাখ, এসিআই ফরমুলেশনের ২৪ কোটি ৬০ লাখ, গোল্ডেন সনের ২৪ কোটি ৩০ লাখ ও ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ২৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করায় ইতিবাচক অবস্থা বিরাজ করছে। জুনে আর্থিক বছর শেষ হওয়া কোম্পানিগুলোর তুলনামূলক ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা, পুনর্অর্থায়ন তহবিল থেকে সুবিধা পাওয়া এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর পোর্টফলিও অনেকাংশে সচল হওয়ায় সার্বিক লেনদেনে তা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
দিনশেষে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাধারণ মূল্যসূচক ৮৭ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৮৯৫০ পয়েন্টে। দিনভর লেনদেন হওয়া ২২৭টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১০১টির, কমেছে ৯৬টির আর অপরিবর্তিত রয়েছে ৩০টি কোম্পানির শেয়ার দর। টাকার পরিমাণে মোট লেনদেন হয়েছে ৬০ কোটি ৭৯ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট। এর আগে গত ৪ জুন সিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৬৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিগত তিন মাসের মধ্যে সিএসইতে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে বুধবার। মঙ্গলবার সিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৫৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। সে হিসেবে বুধবার সিএসইতে লেনদেন বেড়েছে ১৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
সিএসইর লেনদেনের সেরা কোম্পানিগুলো হলো- গ্রামীণফোন, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট, বেক্সিমকো, বিএসআরএম স্টিল, মবিল যমুনা বাংলাদেশ, বেক্সিমকো ফার্মা, ডেলটা লাইফ, ওরিয়ন ফার্মা, গোল্ডেন সন ও ইউনাইটেড এয়ার।
শেখ রাসেলের লক্ষ্য ফাইনালে খেলা
এএফসি প্রেসিডেন্টস্ কাপের চূড়ান্ত পর্ব, আজ সকালে লঙ্কাযাত্রা মিঠুনবাহিনীর
স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ ‘বৃহস্পতিবার সকালে লঙ্কার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করছি। এই আসরে শেখ রাসেল শুধু বাংলাদেশের কোন ক্লাব হিসেবে নয়, গোটা বাংলাদেশেরই প্রতিনিধিত্ব করবে। আমি আশাবাদী শেখ রাসেল নিজের যোগ্যতায় ফাইনালে খেলতে পারবে। খেলোয়াড়রা সবাই যদি নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারে, তাহলে ঠিকই আমরা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারব।’ কথাগুলো যার, তিনি আসন্ন ‘এএফসি প্রেসিডেন্টস কাপ’-এ বাংলাদেশের ক্লাব শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র লিমিটেডের দ্রোণাচার্য্য জাকারিয়া বাবু। গত ২৬ জুলাই মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে ‘এএফসি প্রেসিডেন্টস কাপের চূড়ান্ত পর্বের ড্র’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের শেখ রাসেল পড়ে গ্রুপ ‘বি’ তে। তাদের সঙ্গে আছে উত্তর কোরিয়ার রিমাইয়োংসু স্পোর্টস ক্লাব এবং মঙ্গোলিয়ার এরচিম ক্লাব (গ্রুপ ‘এ’ তে আছে শ্রীলঙ্কার এয়ারফোর্স, তুর্কিমেনিস্তানের এইচটিটিইউ আসগাবাত ও নেপালের মানাং মারশিয়াঙ্গদি ক্লাব)। শ্রীলঙ্কার সুগাথাদাসা স্টেডিয়ামে ২০ সেপ্টেম্বর শেখ রাসেল তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে খেলবে এরচিম এবং ২৪ সেপ্টেম্বর খেলবে রিমাইয়োংসুর বিপক্ষে। দুটি ম্যাচই শুরু হবে বাংলাদেশ সময় দুপুর দেড়টায়। দুই গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দল ফাইনালে মুখোমুখি হবে ২৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৪টায়। ভেন্যু সুগাথাদাসা স্টেডিয়াম।
উল্লেখ্য, ২০১২-১৩ মৌসুমে ঘরোয়া লীগ চ্যাম্পিয়ন শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র এর আগে গত মেতে একই ভেন্যুতে এ আসরের বাছাইপর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশের প্রথম ক্লাব হিসেবে চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
বাছাইপর্বে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ৫ গোল করেছেন এইচটিটিইউ আসগাবাতের সুলেমান মুহাদৌ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪ গোল করেছেন শেখ রাসেলের ফরোয়ার্ড মিঠুন চৌধুরী। মিঠুন এবার দলের অধিনায়ক। ক্লাব পর্যায়ে এবারই প্রথম ক্যাপ্টেন্সি করতে যাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, দলীয় অধিনায়ক মিঠুন চৌধুরী বলেছেন, ‘অনুর্ধ-২৩ পর্যায়ে এর আগে অধিনায়কত্ব করেছি। এবার রাসেলের অধিনায়কত্ব করব। এ জন্য বাড়তি কোন চাপ নেই। কেননা, ফুটবলে অধিনায়কের মাঠে বাড়তি কিছু করতে হয় না। এখানে কোচই আসল। শেখ রাসেল নয়, সবার আগে আমার দেশ। আগে দেশ পরে ক্লাব। অধিনায়ক হিসেবে আশা করি আমরা ফাইনাল খেলতে পারব। দেশের নাম উজ্জ্বল করতে চাই। এ জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।’
বুধবার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ভবনের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের সভাপতি কাজী মোঃ সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘রাসেলই বাংলাদেশের প্রথম ক্লাব, যারা এ আসরের চূড়ান্ত পর্বে খেলবে। রাসেল যেন বাছাইপর্বের মতো চূড়ান্ত পর্বেও ভাল রেজাল্ট করে, এ আশাই করি। সেদিন এশিয়াডে বাংলাদেশ আফগানিস্তানকে হারিয়ে ২৮ বছর পর জিতেছে। এমন যদি আরও কিছু জয় আছে, তাহলে আমি নিশ্চিত অচিরেই বাংলাদেশ এশিয়ার ১৫ নম্বর অবস্থানে চলে আসবে (এখন ৩৬)।’
প্রতিপক্ষ সম্পর্কে মিঠুনদের তেমন ধারণা নেই। তবে কোচের কিছুটা রয়েছে। জাকারিয়া বাবু বলেন, ‘প্রতিপক্ষ ক্লাবগুলোর কিছু ভিডিও দেখেছি। তবে সেগুলো বেশ আগের। সেগুলো দেখে উত্তর কোরিয়ার দলটিকে বেশি শক্তিধর মনে হয়েছে। মঙ্গোলিয়ার দলটি আমাদের সমমানেরই হবে।’
তবে মিঠুন প্রথম ম্যাচটিকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ‘প্রথম ম্যাচে আমরা মুখোমুখি হব মঙ্গোলিয়ার এরচিম এফসির। এ ম্যাচটাতে জিততে পারলে আমাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বেড়ে যাবে। যে কারণে প্রথম ম্যাচটাতেই জয় চাই আমরা।’ দলের সঙ্গে যাচ্ছেন মোহামেডানের চার ফুটবলার। এ প্রসঙ্গে রাসেলের ডিরেক্টর ইনচার্জ ইসমত জামিল আকন্দ লাভলু বলেন, ‘আমরা যাদের চেয়েছিলাম সবাইকেই পেয়েছি। সবাই যাচ্ছে দলের সঙ্গে। খেলোয়াড়দের সঙ্গে ক্লাবের কোন দূরত্ব নেই।’
তবে ভাল ফল প্রত্যাশা করলেও পাঁচ ফুটবলারকে নিয়ে সমস্যার কারণে একসঙ্গে অনুশীলন করা হয়নি দলের সব ফুটবলারদের। ইতোমধ্যে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে ইনচন গিয়েছেন জাহিদ হোসেন। যদিও দলীয় অধিনায়ক মিঠুন চৌধুরী বলেছেন প্রায় দু’সপ্তাহ একসঙ্গে অনুশীলন করেছে দলের সবাই। তবে ক্লাবের ঘনিষ্ট সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে মোহামেডান শোকজ করায় প্রায়ই অনুশীলনে হাজির হতে পারেননি। যে কারণে দলের মধ্যে বোঝাপড়ার একটা ঘাটতি নিয়েই দেশ ছাড়তে হচ্ছে শেখ রাসেলকে।
টেস্টেও হোয়াইটওয়াশ- লজ্জা মুশফিকদের
দ্বিতীয় টেস্টে ২৯৬ রানে হারল বাংলাদেশ, ম্যাচসেরা চন্দরপল, সিরিজ সেরা ব্রাথওয়েট
মিথুন আশরাফ ॥ দ্বিতীয় টেস্টে যে বাংলাদেশ হোয়াইটওয়াশ হতে যাচ্ছে, তা তৃতীয় দিন শেষেই বোঝা গেছে। তাই বলে সেই হোয়াইটওয়াশের সঙ্গে ২৯৬ রানের এত বড় হার যুক্ত থাকবে! কলঙ্কমাখা হার নিয়েই ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর শেষ করবে বাংলাদেশ! তাও আবার চারদিনেই খেলা শেষ হয়ে যাবে!
তামিম ইকবাল-মুমিনুল হক মিলে যেভাবে খেলছিলেন, তাতে সবার মনে আশা জাগে। হারের ব্যবধান কমবে। কিন্তু কোথায়, যেই তামিম ১৫৮ রানে গিয়ে আউট হলেন; সঙ্গে সঙ্গে ৩৪ রানে বাংলাদেশের নেই ৮ উইকেট! ১৯২ রানেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ। যেন ব্যাটসম্যানদের মাঝে কে কত দ্রুত আউট হয়ে সাজঘরে ফিরবেন সেই প্রতিযোগিতা লেগে যায়।
প্রথম ইনিংসেত ১৬১ রানেই বাংলাদেশের ইনিংসের দম ফুরায়। কি দুর্দশা দলের। ওয়ানডে সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হেরে হোয়াইটওয়াশের পর দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজেও সেই একই কলঙ্ক যুক্ত হলো। ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় লজ্জাই শুধু যুক্ত হলো। অথচ শিবনারায়ণ চন্দরপল প্রতিটি ম্যাচেই দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছেন। দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে শতক করে ব্যক্তিগত ৩০তম শতক পূরণ করে ম্যাচ সেরাও হয়েছেন। তার এ দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ৪ উইকেটে ২৬৯ রান করে ইনিংসও ঘোষণা করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথম ইনিংসে ৩৮০ রান করায় বাংলাদেশের সামনে টার্গেট দাঁড়ায় ৪৮৯ রানের। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানরা ধারে কাছেও দলকে নিয়ে যেতে পারেননি। আর ওপেনার ক্রেইগ ব্রাথওয়েটত প্রতিটি ম্যাচেই বড় ইনিংস খেলেছেন। প্রথম টেস্টে আবার ডাবল শতকই করেছেন। এ সুবাদে সিরিজ সেরাই হয়ে গেছেন ব্রাথওয়েট। আর বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানরা দেখিয়েছেন কিভাবে ব্যর্থ হতে হয়।
তামিম সেই অহেতুক শট খেলে আউট হওয়ার প্রবণতা থেকে বের হতে পারেননি। ৬৪ রান করার পর ১৫৮ রানে আউট হন। তামিম আউট হওয়ার আগে মুমিনুলের সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে ১১০ রানে জুটি গড়েন। এনামুল হক বিজয়কে দিয়ে যে টেস্টে চলে না তা বোঝাই গেছে। রানের খাতা খোলার আগেই আউট হয়ে যান। আর শামসুর রহমান টি২০ স্টাইলে খেলে ২৭ বলে ৩০ রান করে আউট হন। তামিমের আউটের পর ৪ রান যোগ হতেই মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও (০) সাজঘরে ফেরেন। একই সময় মুমিনুল হক (৫৬) আউট হতেই মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস। নাসির হোসেন (২), তাইজুল ইসলাম (৪), মুশফিকুর রহীম (১১), রবিউল ইসলাম শিপলু (০), শফিউল ইসলাম (১৪) আউট হন। ব্যাটসম্যানদের যেন লজ্জা দেন বোলাররা। বিশেষ করে একের পর এক ম্যাচে ব্যর্থ হতে থাকা নাসির হোসেনকে। এক সুলেমান বেন (৫/৭২) আবারও ৫ উইকেট শিকার করে নেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ক্রিকেটার কলিন ক্রফট তো বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং দেখে বলেই দিয়েছেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বিব্রতকর অধ্যায়।’ সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘দ্বিতীয় ইনিংসে তামিম খুব ভাল খেলছিল। মুমিনুলও ভালই সঙ্গ দিচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই কি যেন হয়ে গেল। ৩৪ রানে শেষ ৮ উইকেট হারানোর ব্যাপারটি সত্যিই বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর।’
বাংলাদেশ অধিনায়ক মুশফিকুর রহীম হতাশ হবেন কি উল্টো যেন ঢোল পেটাচ্ছেন। সেই আগের মতোই সুর, ‘তামিম, মুমিনুল লড়াই করেছে। কিন্তু এরপর আমরা ধসে পড়েছি। আমাদের উন্নতির প্রয়োজন।’ আর কত উন্নতি করতে চান মুশফিক। একের পর এক ম্যাচ হার হচ্ছে। এ বছরই টেস্ট, ওয়ানডে, টি২০ মিলিয়ে টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর বিপক্ষে টানা ২০ হার হলো বাংলাদেশের। এরপরও দলের কোন উন্নতি হচ্ছে না। এবার বোধ হয় মুশফিকের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার সময় এসেছে। ব্যক্তি বদলে যদি ভাগ্যের বদল হয়।
দ্বিতীয় ইনিংসে তামিমের আউটের পর থেকেই যে দলের বেহাল দশা দেখা গেছে তা মানতে রাজি নন মুশফিক। তিনি পুরো সেশনজুড়েই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ার কথা বলেছেন, ‘এক বা দুই ঘণ্টা নয় আমরা পুরো সেশনজুড়েই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম।’ নিজেদের ব্যর্থতার ঢোল কিভাবে পেটাচ্ছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেই নয়, বছরজুড়েই হার হচ্ছে বাংলাদেশের নিয়তি। হারের বৃত্তেই আটকে আছে। টেস্ট খেলুড়ে কোন দলের বিপক্ষেই এ বছর কোন জয় তুলে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। হেরেই চলেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যেমন টানা ৫ হার হয়েছে। বছরের শুরু থেকেই তেমনি হারের গোলকধাঁধাতেই পড়ে আছে দল। টেস্ট, ওয়ানডে ও টি২০ মিলিয়ে টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর বিপক্ষে টানা ২০ হার হয়ে গেছে। এর মধ্যে টেস্টে হার হয়েছে ৩টি, ওয়ানডেতে ১১ হার ও টি২০’তে ৬টি হার হয়েছে। আবার আফগানিস্তান ও হংকংয়ের বিপক্ষে হারের লজ্জাও যুক্ত আছে। এ বছর মাত্র দুটি জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। তাও আবার টি২০ বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে। নেপাল ও আফগানিস্তানকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া টেস্ট, ওয়ানডে ও টি২০ মিলিয়ে ২৪টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। হেরেছে ২১টি ম্যাচেই। একটি টেস্ট শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বছরের শুরুতেই ড্র করেছে বাংলাদেশ। আর টি২০’তে আফগানিস্তান ও নেপালকে হারিয়েছে। এছাড়া সব ম্যাচেই হার হয়েছে। বেহাল দশার মধ্য দিয়েই কাটছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সময়। কোচ চন্দ্রিকা হাতুরাসিংহেতো এখন পর্যন্ত দলে যোগ দেয়ার পর জয়ের মুখই দেখেননি! তার কঁপালে শুধুই হার লেখা থাকছে। ভারতের বিপক্ষে পরপর দুই ওয়ানডেতে হার দেখেছেন। এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে প্রথম ওয়ানডেতে ৩ উইকেটে, দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৭২ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জার সঙ্গে ১৭৭ রানে হার, তৃতীয় ওয়ানডেতে ৯১ রানে হার দেখেছেন। আর দুই টেস্টের প্রথমটিতে ইনিংস হার থেকে একটুর জন্য বাঁচলেও ১০ উইকেটের বড় ব্যবধানে হার দেখা থেকে মুক্ত হতে পারেননি হাতুরাসিংহে। আর দ্বিতীয় টেস্টেত দেখলেন শত চেষ্টার পরও ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা থেকে বের করা যাচ্ছে না। বার বার একই ভুল করছেন ব্যাটসম্যানরা। আর দল শুধু কলঙ্কের বোঝা মাথা পেতেই নিচ্ছে।
উজবেকদের মোকাবেলায় প্রস্তুত মামুনুলরা
এশিয়ান গেমস ফুটবলে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ আজ উজবেকিস্তান
রুমেল খান ॥ সাফল্যের জন্য আসলে কি দরকার? সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম, দলীয় সংহতি, আত্মবিশ্বাস, ভাগ্যের ছোঁয়া ... এসবই তো! আজ যদি সব সমন্বয় সুন্দরভাবে ঘটাতে পারে বাংলাদেশ অনুর্ধ-২৩ জাতীয় ফুটবল দল, তাহলে হয়ত পয়েন্ট ছিনিয়ে নিতে পারবে প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তান অনুর্ধ-২৩ জাতীয় ফুটবল দলের কাছ থেকে। ফুটবলপ্রেমীরা এতে হয়ত আপত্তি করবেন এই বলে- ফুটবল শক্তির বিচারে তো বাংলাদেশের চেয়ে যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে উজবেকরা (উজবেকিস্তানের ফিফা র‌্যাঙ্কিং ৫১, এশিয়ান র‌্যাঙ্কিং ৩। বাংলাদেশেরটা ১৭০ ও ৩৬)। জাতীয় দলের সিনিয়র পর্যায়ে গত ১৪ বছরে দু’দেশ মুখোমুখি হয়েছে তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে। আর তাতে প্রতিটিতেই তিক্ত হারের স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ। সবচেয়ে বড় কথা, এই তিন ম্যাচে ন্যূনতম একটি গোলও করতে পারেনি লাল-সবুজরা। পক্ষান্তরে হজম করেছে ১৫ গোল। সেক্ষেত্রে এশিয়ান গেমসের সপ্তদশ আসরে ফুটবল ডিসিপ্লিনে কিভাবে আজ দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচনে আনসান-ওয়া স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশ পয়েন্ট ছিনিয়ে নেবে প্রবল প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তানের কাছ থেকে? এর উত্তর আছে। র‌্যাঙ্কিংয়ে উজবেকরা ৫১ নম্বরে, আর বাংলাদেশ ১৭০ নম্বরে। তবে এই র‌্যাঙ্কিং যে সবসময় ফল দেয় না, সেটা কিন্তু প্রমাণ করে দিয়েছে হংকং। সোমবার বাংলাদেশের আফগানদের হারানোর দিনেই কিন্তু একইদিনে একই গ্রুপের অন্য খেলায় দুর্বল হংকং ১-১ গোলে রুখে দেয় শক্তিশালী উজবেকদের। আর এ জন্যই বাংলাদেশকে নিয়ে আশা করা যায়। তাছাড়া এটা হচ্ছে বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা। এখানে ছোট দলগুলো অনেক সময় বড়দের বিরুদ্ধে জিতে যায় বা ড্র করে। ‘যদি হংকং উজবেকদের রুখে দিতে পারে, তাহলে কেন বাংলাদেশ পারবে না? এক্ষেত্রে আমাদের ফুটবলারদের মনোযোগ ও দলীয় সংহতি ধরে রাখতে হবে। ফোকাস রাখতে হবে জয়ের প্রতি।’ মঙ্গলবার জনকণ্ঠের সঙ্গে একান্ত আলাপনে এমনই অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক এবং গোলরক্ষক আমিনুল হক।
উল্লেখ্য, বয়সভিত্তিক কোন ফুটবল আসরে এবারই প্রথম মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ-উজবেকিস্তান। দেশদুটি।
১৯৭৮ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাঙ্ককে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো অংশ নেয় বাংলাদেশ। তারপর থেকে এ পর্যন্ত সাতটি আসরে অংশ নিয়ে বাংলাদেশে খেলেছে ২০ ম্যাচ। কোন ড্র নেই। হেরেছে ১৮টিতেই। জয় মাত্র দুটিতে (সোমবার আফগানিস্তানকে হারানোর আগ পর্যন্ত পরিসংখ্যান)। বলাই বাহুল্য, কখনই গ্রুপ পর্বের বাধা পেরোতে পারেনি বাংলাদেশ। এবার আফগানদের হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে। যেদিন বাংলাদেশ আফগান দলকে হারায়, সেদিনই অপর ম্যাচে হংকং ১-১ গোলে ড্র করে উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে। আর এ জন্যই উজবেকদের সঙ্গে খেলে পয়েন্ট পাওয়ার আশায় বুক বেঁধেছে বাংলাদেশ শিবির। কেননা, হংকংয়ের ফিফা র‌্যাঙ্কিং (১৬১) বাংলাদেশের প্রায় কাছাকাছি।
যদিও এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ এবারই প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হতে যাচ্ছে উজবেকবাহিনীর। এর আগে জাতীয়-সিনিয়র পর্যায়ে এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপের বাছাইপর্বে মোট তিনবার লড়াই করেছে দু’দল। প্রথমবার ২০০০ সালে আবুধাবিতে। বাংলাদেশ বিধ্বস্ত হয় ০-৬ গোলে। ২০০৭ সালে তাসখন্তে দ্বিতীয় সাক্ষাত। এবারও হার, তবে উন্নতি বলতে এক গোল কম হজম করা (০-৫)! একই বছরে আট মাস পর ঢাকায় তৃতীয় মোকাবেলায় এবারও এক গোল কম খেয়ে হারে বাংলাদেশ (০-৪)।
ভাল খেলার প্রত্যয় নিয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর ইনচনের উদ্দেশে যাত্রা করে ক্রুইফবাহিনী। যাওয়ার আগে বাফুফে ভবনে ফুটবল দলের অধিনায়ক মামুনুল বলে যান, ‘আমাদের টার্গেট থাকবে কিছু অর্জন করার। ধারাবাহিকভাবে ভাল না খেলার যে দুর্নাম আছে, সেটা কাটিয়ে উঠতে চাই। চেষ্টা করব সবাই মিলে যেন দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনতে পারি। প্রথম ম্যাচটাই হচ্ছে আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আফগানদের যদি মারতে (হারাতে) পারি, তাহলে আমাদের আত্মবিশ্বাস বহুলাংশে বেড়ে যাবে এবং আরও ভাল খেলতে হবে অনুপ্রাণিত হব, যা দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এদিকেই থাকবে আমাদের মূল ফোকাস।’ আফগানদের হারিয়ে প্রথম লক্ষ্য পূরণ করেছেন মামুনুল।ইনচন যাওয়ার আগে বাংলাদেশের যুবারা মোট ৬টি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে। এর মধ্যে জেতে চারটিতে, হারে ১টি, ড্র করে ১টি ম্যাচে। হারায় বাংলাদেশ পুলিশ এ্যাথলেটিক ক্লাবকে ৩-০, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ৫-৪ এবং ৩-১, নেপাল অনুর্ধ-২৩ জাতীয় ফুটবল দলকে ১-০ গোলে। ড্র করে ঢাকা একাদশের বিপক্ষে (০-০)। নেপাল অনুর্ধ-২৩ জাতীয় ফুটবল দলের কাছে হারে ০-১ গোলে। ইনচনে গিয়ে আরেকটি প্রস্তুতি ম্যাচে ভিয়েতনাম অনুর্ধ-২৩ জাতীয় দলের কাছে ৪-২ গোলে হারে বাংলাদেশ দল। এখন দেখার বিষয়, আজ উজবেকিস্তানের কাছ থেকে কোন পয়েন্ট ছিনিয়ে আনতে পারে কি না মামুনুলরা।
সাঈদীর মামলার রায়ে অসন্তোষ পিরোজপুর
নিজস্ব সংবাদদাতা, পিরোজপুর, ১৭ সেপ্টেম্বর ॥ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপীল শুনানির রায়কে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার রাত থেকে পিরোজপুরেরর সর্বত্র নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করা হয়। বুধবার ভোরে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী মানিক পশারী এবং মাহাবুবুল আলমসহ সাক্ষীদের নিরাপত্তা হেফাজাতে সরিয়ে আনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে সকাল সোয়া দশটায় রায় ঘোষণার পর সাঈদীর জন্ম স্থান পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলার সাউথখালী এলাকাসহ সর্বস্তরে এক ধরনের অসন্তোষ বিরাজ করছিল। তবে এ রায়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করেন মামলার বাদী ও সাক্ষীরা।
অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ এবং বিশবালী হত্যা মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুর রহমান বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ মামলা করেছিলাম। ভেবে ছিলাম স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর হলেও ন্যায়বিচার পাবে বাংলার মানুষ। কিন্তু এ কেমন রায় হলো। তারপরেও আমৃত্যু কারাদ- পেয়েছে এতেও গর্ববোধ করি। তবে পিরোজপুরের মুক্তিযোদ্ধা সমাজ, যে সব পরিবারের হত্যা, ধর্ষণ, লুট চালানো হয়েছিল তারা এতে খুশি হয়নি।
মামলার ৪ নং সাক্ষী সুলতান মাহামুদ বলেন, পূর্বের রায় বহাল থাকলে আমরা বেশি খুশি হতাম। অবশ্যই তার ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। তবে ক্ষতি যা হবার আমাদেরই হলো। আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই। আত্মীয়স্বজন, ছেলেমেয়ের নিরাপত্তা নেই, ২৪ ঘণ্টা পুলিশ পাহারায় থাকছি। কাজ-বাজ না করতে পেরে না খেয়ে মরতে বসেছি। আপনাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছে বলতে চাই এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি দেয়া হোক।
এদিকে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সমির কুমার দাস বাচ্চু বলেন, সুপ্রীমকোর্টের সর্বোচ্চ রায়ের বিরুদ্ধে বলার কিছু নেই। তবে এ রায়ে আমরা খুশি নই।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য একেএমএ আউয়াল বলেন, আদালতের রায়ের বিষয়ে কোন মন্তব্য করা উচিত নয়। তবে এ রায়ে স্বাধীনতার সপক্ষ্যে সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
তবে রায় ঘোষণার পর এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জেলার সর্বত্র সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ২টা পর্যন্ত নাশকতার আশঙ্কায় জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে জামায়াতের ২৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ছাড়লেন এ কে খন্দকার
বাংলানিউজ ॥ সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি এবং সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) এ কে খন্দকার, বীরউত্তম। পাশাপাশি তিনি সংগঠনটির প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
বুধবার সন্ধ্যার পর মহাসচিব বরাবর লেখা পদত্যাগপত্র ফোরামের ধানমণ্ডি কার্যালয়ে পৌঁছানো হয়। ফোরামের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হারুন হাবীব এটি গ্রহণ করেন। এতে বলা হয়, “আমি অদ্য ১৭/০৯/২০১৪খ্রিঃ তারিখ থেকেই সজ্ঞানে এবং সুস্থ মস্তিষ্কে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের ‘চেয়ারম্যান’ এর পদ থেকে পদত্যাগ করছি এবং অদ্য ১৭/০৯/২০১৪খ্রিঃ তারিখ থেকে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সদস্য পদ থেকে আমার নাম প্রত্যাহার করছি।” বয়সের কারণে বর্তমানে উক্ত পদে থেকে ফোরামের সার্বিক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়ে উঠছে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সম্প্রতি প্রথমা প্রকাশনী থেকে এ কে খন্দকারের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক বই ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ প্রকাশিত হয়। বইটিতে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে কিছু মন্তব্যের কারণে বইটি নিয়ে অব্যাহত বিতর্ক হচ্ছে। বইটি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে সংসদে। বিবৃতি দেয়া হয় সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের পক্ষ থেকে।
এতে বলা হয়, বইটিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সম্পর্কে যে দাবি উত্থাপন করেছেন, তা বাস্তবতাবিবর্জিত। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এমন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য আমাদের হতবাক করেছে। এই বইয়ের বক্তব্য এ কে খন্দকারের একান্তই নিজস্ব। বইয়ে তাঁর বক্তব্য ও মন্তব্যের সঙ্গে ফোরামের নীতি, আদর্শ ও ঐতিহাসিক সত্য উপলব্ধির মিল নেই।
সন্ত্রাস ॥ এক বছরেও ধরা পড়েনি জামায়াত-শিবিরের কোন আসামি
ফের হরতাল ডেকে তা-ব চালানোর প্রস্তুতি
শংকর কুমার দে ॥ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদেশের বিরুদ্ধে বার বার রক্তক্ষয়ী সহিংস সন্ত্রাস চালিয়েছে জামায়াত-শিবির। মামলা হচ্ছে। আসামি আছে সহস্রাধিক। গ্রেফতার হচ্ছে না আসামিরা। এক বছরে একজনেরও বিচার হয়নি। এবার সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধেই সহিংস সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালানোর পরিকল্পনা নিচ্ছে তারা। আবারও দুই দিনের হরতাল ডেকে সহিংস সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত-শিবির। পুলিশের উচ্চ পর্যায় সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
এক বছর আগে দেইল্লা রাজাকার ওরফে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আদালতের রায়ের প্রতিবাদে রক্তক্ষয়ী সহিংস সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালায় জামায়াত-শিবির। তাদের এক বছরের রক্তক্ষয়ী সহিংস সন্ত্রাসে সারাদেশে ১৫ জন পুলিশ, ২ জন বিজিবি সদস্যসহ ৭০ জন খুন হয়েছেন। পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, পুলিশের অস্ত্র লুট, পুলিশের গাড়ি, বাড়ি, বিদ্যুত কেন্দ্রে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করেছে জামায়াত-শিবির। এ ঘটনায় সারাদেশের থানাগুলোতে মামলা হওয়ার পরও আসামিরা গ্রেফতার হচ্ছে না। এমনকি গত এক বছরে একজনেরও বিচার পর্যন্ত হয়নি।
এক বছর পর দেইল্লা রাজাকারের ফাঁসির আদেশ থেকে সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত আপীল বিভাগ। সাজা কমিয়ে দেয়ার পরও আবার দুই দিন হরতাল ডেকেছে জামায়াত-শিবির। আদালতের রায়ের প্রতিবাদে এই দুই দিনের হরতাল ডেকে আবারও সহিংস সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। হরতালের নামে নাশকতা, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য মাঠে নামার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে জামায়াত-শিবির।
সূত্র জানায়, সাধারণ মানুষজন হত্যা ও জানমালের ক্ষতির মামলাগুলোর আসামিরা তো গ্রেফতার হয়ইনি। এমনকি ১৫ পুলিশ ও ২ বিজিবি সদস্য খুনের বিচার দূরের কথা আসামিরা গ্রেফতারই হয়নি। এক বছর ধরে মামলার তদন্ত, আসামি গ্রেফতার, বিচার কার্যক্রম ঢিমেতালে চলার সুযোগে আবারও সহিংস সন্ত্রাসের তৎপরতায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে জামায়াত-শিবির। রায় ঘোষণার প্রতিবাদে রাজশাহীতে পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করেছে। এ ছাড়া সিলেট, লক্ষ্মীপুর, নওগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল বের করে সহিংস সন্ত্রাসের চেষ্টা করা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে।
দেইল্লা রাজাকারকে ফাঁসির আদেশ দেয়ার প্রতিবাদে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে নানা ধরনের বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমেদ। এবার সর্বোচ্চ আদালত তার সাজা কমিয়ে দেয়ার পরও প্রতিবাদে দুই দিনের হরতাল ডেকেছেন তিনি। সর্বোচ্চ আদালত আপীল বিভাগের রায় ঘোষণার পর তিনিই বৃহস্পতিবার ভোর ছয়টা থেকে শুক্রবার ভোর ছয়টা চব্বিশ ঘণ্টা এবং রবিবার ভোর ছয়টা থেকে সোমবার ভোর ছয়টা পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টা হরতাল ডেকেছেন সারাদেশে।
পুুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, জামায়াতিদের হরতাল মানেই নাশকতা, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা। ‘চাঁদে সাঈদীকে দেখা গেছে’ বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায়ের প্রতিবাদে রক্তক্ষয়ী সহিংস সন্ত্রাস চালিয়েছে তারা। এবার ‘ফরজ কাজ’ বলে অনলাইনে প্রচার করে সর্বোচ্চ আদালত আপীল বিভাগের রায়ে সাজা কমিয়ে দেয়ার পরও তার প্রতিবাদে হরতাল ডেকেছে। সর্বোচ্চ আদালত আপীল বিভাগের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বড় ধরনের কোন নাশকতার ঘটনা ঘটতে দেয়া হয়নি। হরতাল ডেকে জামায়াত-শিবিরের রক্তক্ষয়ী সহিংস সন্ত্রাস করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও প্রস্তুত।
জিয়া হত্যার পর আমিই সর্বপ্রথম নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেই
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী
সংসদ রিপোর্টার ॥ প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমরা দুই বোন দেশে ফেরার চেষ্টা করলেও জিয়াউর রহমান সবসময় বাধা দিয়েছেন। অথচ জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের পর প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও আমি সর্বপ্রথম নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেই। জিয়া হত্যাকা-ের পর ভৈরব থেকে একটি বিবৃতি লিখে ঢাকায় পাঠাই। যার মূল বক্তব্য ছিল- ‘দেশ সংবিধান অনুসারে চলবে, এর ব্যত্যয় যেন না ঘটে। অর্থাৎ কোন সেনা কর্মকর্তা যেন ক্ষমতা দখল না করে।’
বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য বেগম ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা একথা বলেন। সংসদ সদস্য নুুরুল ইসলাম সুজনের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখলকে অবৈধ বলে সর্বোচ্চ আদালত ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। ক্ষমতায় এসে আমরা সংবিধান সংশোধন করে গণতন্ত্রকে আরও সুরক্ষিত করেছি। সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদের (খ) ধারা সংযুক্ত করে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কেউ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলে তাঁর সর্বোচ্চ বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
জিয়া হত্যাকা- সম্পর্কে মূল প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে জেনারেল জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করে। আমি শেখ হাসিনা ও আমার ছোটবোন শেখ রেহানা জার্মানিতে ছিলাম বলে প্রাণে বেঁচে যাই। আমরা দুই বোন দেশে ফেরার চেষ্টা করলেও জিয়া সবসময় বাধা দিয়েছে। আমরা বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকি। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও গণতন্ত্র পুনর্বহালের জন্য বিশ্ব জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করি।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দলের কাউন্সিলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আমাকে দলের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করে। শত বাধা অতিক্রম করে আমি দেশে ফিরে আসি। আমি ২৮ মে সিলেটে যাই, হযরত শাহজালাল (র)-এর মাজার জিয়ারত করি। পরদিন রাতে আমরা ট্রেনে উঠি ঢাকায় ফিরে আসার জন্য। পথে বন্যায় একটি ব্রিজ নষ্ট হয়ে যায় বলে আমরা আটকা পড়ি। সকালে ব্রিজটি ঠিক হলে আমরা আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে আসি, তখন জানতে পারলাম জিয়া চট্টগ্রামে নিহত হয়েছেন। ঢাকাগামী সব ট্রেনের যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হয়।
তিনি জানান, এরপর আমরা ট্রেন থেকে নেমে রবিউলের বাসায় যাই, সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে নৌকায় চড়ে ভৈরবে আইভি রহমানের (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী) বাবার বাড়িতে গিয়ে উঠি। ট্রেনের অনেক যাত্রী আমাদের দলের তাই ছোট ছোট গ্রুপ করে একেক গ্রুপ একেক বাড়িতে উঠি। কথা হয় যে, সবাই আইভি রহমানের মায়ের কাছে যাব, সেখান থেকে ঢাকায় যাব। ভৈরবে পৌঁছার পরের দিন আমি একটা বিবৃতি লিখে মোস্তফা মহসীন মন্টুর (বর্তমানে গণফোরাম নেতা) হাতে দিয়ে ঢাকায় পাঠাতে বলি। সেখানে মূল বক্তব্য ছিল- দেশ সংবিধান অনুসারে চলবে এর কোন ব্যত্যয় যেন না ঘটে, অর্থাৎ কোন সেনা কর্মকর্তা যেন ক্ষমতা দখল না করে। ট্রেন চালু হলে আমরা ঢাকায় ফিরে আসি।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে দেশে প্রতিদিন কারফিউ ছিল। রাত ১০/১১টার পর বাইরে বের হওয়া যেত না। যাতায়াত করা খুবই কঠিন ছিল। আমাদের দিনে দিনে ঢাকায় ফেরার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।
এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা দেশের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করে তাদের প্রতিনিয়ত বন্ধুর ও কন্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয়। আমাকে সেই বন্ধুর পথই পাড়ি দিতে হচ্ছে। আর যারা শুধু ক্ষমতার মোহ নিয়ে রাজনীতি করে তারা ক্ষমতায় যেতে পারে, কিন্তু তারা দেশের জন্য কিছু করতে পারে না। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ যাতে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে আসতে না পারে, সেজন্য এক রাতে বঙ্গবন্ধুসহ আমার পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়। আমাকে কখনও গুলি, কখনও গ্রেনেড হামলাসহ বার বার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু আমি মৃত্যুকে ভয় করি না, আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে মাথানত করি না। ক্ষমতা দেয়ার ও নেয়ার মালিক আল্লাহ। আমার হাত দিয়ে রাব্বুল আলামিন যেটুকু কাজ করাতে চান, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না। তাই যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই আমাদের চলতে হবে। আমি সব হারিয়েছি, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমার একটাই লক্ষ্য দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্বসভায় উন্নত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই।
জব্বারের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাক ও মোতালেবকে হত্যা করা হয়
যুদ্ধাপরাধী বিচার
আবুল কালাম শরীফের জবানবন্দী
স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ৫ম সাক্ষী আবুল কালাম শরীফ জবানবন্দী প্রদান করেছেন। জবানবন্দীতে তিনি বলেছেন, ফুলঝুড়ি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস ও মোতালেব শরীফকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় তার সামনে হাজির করার জন্য রাজাকার কমান্ডার ইস্কান্দার আলী মৃধাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন জব্বার। ওইদিন বিকেলেই ওই দুই মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়। পরবর্তী সাক্ষীর জন্য রবিবার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
জবানবন্দীতে সাক্ষী বলেন, আমার নাম আবুল কালাম শরীফ। আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৬০ বছর। আমার ঠিকানা গ্রাম- আমুর বুনিয়া উদয় তারা বুড়িরচর, থানা- মঠবাড়িয়া, জেলা- পিরোজপুর। এখন আমি গৃহস্থালী কাজ করি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি নৌকা বাইতাম। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরা শেষ করেন জব্বারের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আবুল হাসান। এর আগে চতুর্থ সাক্ষী সিদ্দিক মাতুব্বরেরও জেরা শেষ করেন একই আইনজীবী।
সাক্ষী বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল আনুমানিক ১৮ বছর। আসামি ইঞ্জিনিয়ার জব্বারকে তিনি আগে থেকেই চিনতেন বলে সাক্ষ্যে দাবি করেন সাক্ষী। ১৯৭১ সালের ১৬ মে বেলা ১১টার দিকে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার তুষখালী হাইস্কুল মাঠে এক সভা করেন। সেই সভায় ইঞ্জিনিয়ার জব্বারকে বক্তৃতা করতে দেখেছেন তিনি। সভায় ইঞ্জিনিয়ার জব্বার মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ‘পাকিস্তানের শত্রু’ উল্লেখ করে বক্তৃতা দিয়েছিলেন।
ওই সভা থেকেই ফুলঝুড়ি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস ও মোতালেব শরীফকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় তার সামনে হাজির করার জন্য রাজাকার কমান্ডার ইস্কান্দার আলী মৃধাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন জব্বার।
আবুল কালাম শরীফ বলেন, ইঞ্জিনিয়ার জব্বারের নির্দেশেই ওইদিন বিকেলে পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস ও মোতালেব শরীফকে হত্যা করা হয়। এছাড়া আসামির নির্দেশে পরদিন সন্ধ্যায় তুষখালীর কুলুপাড়া ও নাথপাড়ায় গিয়ে রাজাকার বাহিনী হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘর লুট করার পর জ্বালিয়ে দেয়। এ ছাড়াও ফুলঝুড়ি গ্রামের সারদা পাইককে হত্যা এবং ওই গ্রামের তিন শতাধিক বাড়ি-ঘর লুটপাট পরবর্তীতে পাইক বাড়ির দুই শ’ লোককে জোর করে ধর্মান্তরিত করার ঘটনাও তার সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন সাক্ষী।
গত ৭ সেপ্টেম্বর শুরুর পর থেকে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন আরও চার সাক্ষী।
যুদ্ধক্ষেত্র ও গণকবরে স্মৃতিস্তম্ভ, স্মৃতিসৌধ নানা তথ্য-উপাত্ত
কুষ্টিয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
এমএ রকিব ॥ জেলাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার চিহ্ন। বিভিন্ন জায়গায় বধ্যভূমি ও গণকবর। স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও এগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই। তবে এবার এগিয়ে এসেছে কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে তারা। নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দিতে সংগঠনটি নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং কুষ্টিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একাত্তরের যুদ্ধক্ষেত্র, বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো চিহ্নিত করে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ, স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিমিত্র স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
কুষ্টিয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলায় অনুসন্ধান চালিয়ে এমন ৭৬টি যুদ্ধক্ষেত্র, বধ্যভূমি ও গণকবরের সন্ধান পায়। এর মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্র রয়েছে ৪৪টি। যুদ্ধক্ষেত্রগুলো নিয়ে একটি প্যাকেজ প্রোগ্রামের মাধ্যমে কাজ করছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কুষ্টিয়া। এতে একাত্তরের ৩১ মার্চ থেকে কুষ্টিয়া মুক্ত দিবস ১১ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধগুলো স্থান পেয়েছে। এ সব যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে আবার নিহত ও আহতের ঘটনা ঘটেছে এমন যুদ্ধক্ষেত্রের সংখ্যা ৩১টি। এই ৩১টি যুদ্ধক্ষেত্রের প্রত্যেকটিতে একই ডিজাইনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, বধ্যভূমি ও গণকবরগুলোতে আলাদা ডিজাইনে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের আর্থিক সহায়তায় ১৪টি যুদ্ধক্ষেত্রে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট স্মৃতিস্তম্ভগুলোর কাজ আগামী অর্থবছরে সমাপ্ত হবে।
নির্মিত এ সব স্মৃতিস্তম্ভের সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। থাকছে যুদ্ধের তারিখ, সময় এবং যে কমান্ডারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে তাঁর নাম, যুদ্ধে কতজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন কিংবা আহত হয়েছেন তাঁদের নাম। থাকছে হানাদার পাকবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও। যুদ্ধক্ষেত্রে নির্মিত এ সব স্মৃতিস্তম্ভগুলো নতুন প্রজন্মের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। তারা এ থেকে জানতে পারছে এলাকায় সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। জানতে পারছে কে নেতৃত্ব দিয়েছেন ওই মুক্তিযুদ্ধে এবং কারা শহীদ হয়েছেন। এ সব স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণে জেলা পরিষদ ছাড়াও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে এলজিইডি, জেলা প্রশাসন। এর বাইরে কিছু ব্যক্তিগত সহায়তাও পাওয়া গেছে। যেসব স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- সদর উপজেলার আড়পাড়া যুদ্ধক্ষেত্র, করিমপুর, বংশীতলা ও পিয়ারপুর যুদ্ধক্ষেত্র। দৌলতপুরের ব্যাংগারীর মাঠের যুদ্ধক্ষেত্র, শেরপুর, বালিয়াডাঙ্গা, ভাগজোত মোড় যুদ্ধক্ষেত্র ও গোয়ালগ্রাম যুদ্ধক্ষেত্র-বধ্যভূমি। মিরপুরের কাকিলাদহ-আবুরী যুদ্ধক্ষেত্র এবং কুমারখালীর কুশলীবাসা ধলনগর, ডাঁশা চাষী ক্লাব ও ঘাষখাল যুদ্ধক্ষেত্র। আর প্রতিটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে গড়ে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৬০ হাজার টাকা করে।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাছিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দিতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কুষ্টিয়া জেলা ইউনিট কমান্ড মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে। হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এমন যুদ্ধক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নিদর্শন রাখার চেষ্টা হিসেবে প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে একই ডিজাইনে একটি করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সে মোতাবেক ইতোমধ্যেই জেলায় ১৪টি যুদ্ধক্ষেত্রে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এ সব স্মৃতিস্তম্ভে মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত থাকছে।
তিনি জানান, যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে একই ডিজাইনে স্মৃতিস্তম্ভ, বধ্যভূমি ও গণকবরগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন মডেলে স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হচ্ছে। আর এমন উদ্যোগ দেশের মধ্যে কুষ্টিয়ায় প্রথম বলেও তিনি দাবি করেন। কমান্ডার নাছিম আরও বলেন, এ কাজ করতে গিয়ে তাঁকে নানা বাধা-বিপত্তিরও সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ ছাড়া ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলার বৃহৎ বধ্যভূমি যেখানে পাক হানাদার ও রাজাকাররা বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে গুলি ও জবাই করে হত্যা করে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার সেই বৃত্তিপাড়া বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিসৌধ এবং সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যয়ে দৌলতপুরের বোয়ালিয়া ইউনিয়নের গোয়ালগ্রাম যুদ্ধক্ষেত্র-বধ্যভূমিতে (যেখানে ১৭ জনকে হত্যা করা হয়) একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সদর উপজেলার বংশীতলা ও করিমপুর যুদ্ধে শাহাদতবরণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের কবর রয়েছে সদর উপজেলার দুর্বাচারায়। সেখানে ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ আংশিক শেষ হয়েছে। এ স্মৃতিসৌধের নামকরণ করা হয়েছে ‘কুষ্টিয়া রক্তঋণ-১’। এলজিইডির অর্থায়নে কুষ্টিয়া শহরতলীর চৌড়হাঁস মোড়ে একটি ‘মুক্তিমিত্র স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণের কাজ চলছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ লাখ টাকা।
গণজাগরণ মঞ্চ কর্মীদের ওপর টিয়ার শেল জলকামান
তিন দিনের কর্মসূচী
স্টাফ রিপোর্টার ॥ জামায়াত নেতা সাঈদীর ফাঁসির রায় প্রত্যাখ্যান করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। ’৭১-এর এই ঘাতকের ফাঁসি নিশ্চিত করার দাবিতে মঞ্চের আয়োজনে এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে তিন দিনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে। সে অনুযায়ী আজ দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে সাঈদীর রায় শুনে বুধবার সকালে প্রজন্ম চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। ক্ষোভে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে শাহবাগ। মিছিল আর স্লোগানে মুখরিত হয় পুরো এলাকা। এ সময় তারা রাস্তা অবরোধ করার চেষ্টা করলে পুলিশী হামলায় মঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকারসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। রায় প্রত্যাখ্যান করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা।
আন্দোলন করে সাঈদীর ফাঁসি নিশ্চিত করা হবে ॥ কুখ্যাত রাজাকার সাঈদীর রায় প্রত্যাখ্যান করে বুধবার সন্ধ্যায় প্রজন্ম চত্বরে সমাবেশ করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। এতে বক্তরা বলেন, তরুণ প্রজন্ম নিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে কাদের মোল্লার মতো আইন সংশোধন করে সাঈদীর ফাঁসি নিশ্চিত করতে সরকারকে বাধ্য করা হবে। সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনী বলেন, রায়ে আমি মনে মনে এতটাই কষ্ট পেয়েছি যা বলার ভাষা নেই। মনের ভাষা প্রকাশ করতে পারছি না। ৪৪ বছর ধরে চেতনায় ঝং ধরে আছে। আজও সাঈদীর রায়ের মধ্য দিয়ে কষ্ট পেলাম। তিনি বলেন, কাদের মোল্লার রায়ের পর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আইন সংশোধন করতে সরকারকে বাধ্য করা হয়েছিল। ফাঁসি দেয়া হয়েছিল এই যুদ্ধাপরাধীর। সাঈদীর ফাঁসি কার্যকর করতে তরুণদের নিয়ে তীব্র আন্দোলন গতে তোলা হবে। আইন সংশোধন করে তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলাতে সরকারকে বাধ্য করা হবে। গণজাগরণ মঞ্চে কর্মীদের ওপর পুলিশী হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণরাই আমাদের আশ্রয়স্থল। তাদের ওপর হামলার ঘটনা আমাকে উদ্বিগ্ন করছে। ঘটনার সুবিচারের জন্য তিনি সরকারের কাছে অনুরোধ জানান। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ছাত্র নেতা খান আসাদুজ্জামান, তাসমিনা সুলতানা, ছাত্র নেতা হাসান তারেক, ইমরান হাবিব রুমন, ফয়সাল ফারুক, সাঈদা সুলতানা, সম্পা বসু, মারুফ রসুল প্রমুখ।
তিন দিনের কর্মসূচী ॥ সাঈদীর রায় প্রত্যাখ্যান ও সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে তিন দিনের কর্মসূচী ঘোষণা করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত প্রজন্ম চত্বরে অবস্থান। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায় দেশের সকল জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় বিক্ষোভ কর্মসূচী। শুক্রবার বিকেল চারটায় শাহবাগে গণসমাবেশের ডাক দেয়া হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় এক সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচী ঘোষণা করেন প্রজন্মসেনা আরিফ জেবতিক। অসুস্থ থাকায় ইমরান এইচ সরকার সমাবেশে উপস্থিত হতে পারেননি।
রায়ে উত্তাল শাহবাগ ॥ যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদ-ের রায় প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভরত গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে পুলিশ। পুলিশের ছোড়া কাঁদুনে গ্যাস ও গরম জলে মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ ১০ জন কর্মী আহত হয়েছেন। এর আগে সকালে রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় এই রায়কে আঁতাতের রায় বলে মন্তব্য করেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করে পরিকল্পিতভাবে এ রায় দেয়া হয়েছে। এই রায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। এরকম একটি রায় দেয়ার জন্য বছর খানেক ধরে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই রায়ের বিরুদ্ধে দেশের তরুণ সমাজ যাতে আন্দোলন করতে না পারে, সে জন্য গণজাগরণ মঞ্চকে ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা আগেই আশঙ্কা করেছিলাম, এমন একটি রায় হতে যাচ্ছে।’ এ রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য দেশের তরুণ সমাজসহ সবাইকে শাহবাগে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একটি মিছিল নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীরা শাহবাগ থেকে ট্রাইব্যুলের দিকে যান। সেখান থেকে ফিরে তাঁরা শাহবাগে অবস্থান নিয়েছিলেন। এদিকে গণজাগরণ মঞ্চের কামাল পাশা চৌধুরীর অংশটি সকালে শাহবাগ মোড়ে রাস্তা অবরোধ করতে গেলে পুলিশ সেখান থেকে তাঁদের সরিয়ে দেয়। পরে তাঁরা সেখানে একটি বিক্ষোভ মিছিল করেন। মিছিল শেষে কামাল পাশা চৌধুরী বলেন, আমরা পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই, এ রায় মানি না। এ রায়ের মাধ্যমে স্বাধীন দেশের মানুষ প্রতারিত হয়েছে। আমরা শপথ নিয়েছিলাম যতদিন পর্যন্ত রাজাকারের বিচার না হবে, ততদিন রাজপথ ছাড়ব না। এ আইন যদি চলতে থাকে, কোন রাজাকার জনগণের হাতে যদি নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, তবে আমাদের দায়ী করবেন না। জানতে চাইলে পুলিশের রমনা বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) শিবলী নোমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা কোন সমাবেশে বাধা দেইনি। যখন যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে, তখনই কেবল আমাদের এ্যাকশনে যেতে হয়েছে।
মঞ্চের কর্মীদের ওপর পুলিশের হামলা ॥ রায় ঘোষণার খবর শাহবাগে আসা মাত্রই বিক্ষোভে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে প্রজন্ম চত্বর। বিক্ষুব্ধ কর্মীরা তখন বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিল আর স্লোগানে মুখরিত হয় চার পাশ। তখন মঞ্চের কর্মীরা ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বে রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ বাঁধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। মঞ্চের কর্মীরা কয়েকটি গাড়ির কাঁচ ভাংচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান, টিয়ারশেল নিক্ষেপসহ ফাঁকা গুলি ছুড়ে পুলিশ। মঞ্চের কর্মী সুজন বলেন, পুলিশ দফায় দফায় জলকামান থেকে গরম জল ছোড়ে; সঙ্গে নিক্ষেপ করা হয় কাঁদুনে গ্যাসের শেল। ওই এলাকায় কাউকে দাঁড়াতে দেয়া হচ্ছিল না। ইমরানসহ চারজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে মেডিক্যাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, তারা কাঁদুনে গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তাদের শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। ‘আঁতাতের এই রায় মানি না/প্রহসনের এই রায় মানি না’, ‘আপোসকারীর আস্তানা/জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’ প্রভৃতি সেøাগান দেয় তারা। গত বছরের পাঁচ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়ার পর তার ফাঁসির দাবিতে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে শাহবাগের এই আন্দোলন। তাদের আন্দোলনের মুখেই আইন সংশোধন করে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষেরও আপীল করার সুযোগ তৈরি হয় এবং কাদের মোল্লার রায়ের বিরুদ্ধে আপীল নিষ্পত্তির পর গত বছরের ডিসেম্বর তার মৃত্যুদ-াদেশ কার্যকর হয়।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সাঈদীর বিচার শুরু হয়েছিল ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর। ট্রাইব্যুনালে রায় হয় ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যাতে তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছিল।
একাত্তরের ঘাতকদের সঙ্গে আঁতাতের প্রশ্নই ওঠে না
১৪ দলের প্রতিক্রিয়া
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ একাত্তরের ঘাতক জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ মামলায় আপীল বিভাগের রায় প্রত্যাশিত না হলেও উচ্চ আদালতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তা মেনে নিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। উচ্চ আদালতের রায়কে মেনে নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই উল্লেখ করলেও জোটের নেতারা প্রদত্ত রায়কে চরম হতাশাজনক বলেই মন্তব্য করেছেন।
বুধবার ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংকালে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, উচ্চ আদালতের রায়কে মেনে নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ ১৪ দল উচ্চ আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই এ রায়ের প্রতিও আমরা শ্রদ্ধাশীল। তবে জনগণ ও ১৪ দলের প্রত্যাশা ছিল, আপীল বিভাগের রায়ে একাত্তরের ঘাতক দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকবে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর বিরুদ্ধে আপীল বিভাগের দেয়া রায়ে ওয়ার্কার্স পার্টি খুশি নয়। কারণ যুদ্ধাপরাধ সর্বোচ্চ অপরাধ। দ-ও সর্বোচ্চ হওয়া উচিত। বিষয়গুলো মাথায় রেখেই ভবিষ্যতে বিচারকরা রায় দেবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ব্রিফিংকালে আপীল বিভাগের রায় প্রত্যাখ্যান করে জামায়াতের ডাকা দুই দিনের হরতাল প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, চিহ্নিত ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের ডাকা হরতালে জনগণের সমর্থন নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের মোকাবেলা করবে। আর আমরা তাদের মোকাবেলা করব রাজনৈতিকভাবে। আইনও তার গতিতে চলবে।
জামায়াতের সঙ্গে কোন আঁতাত হয়েছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে নাসিম বলেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন। আপনারা (সাংবাদিকরা) এটা প্রধান বিচারপতিকে জিজ্ঞাসা করেন। তাছাড়া স্বাধীন বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করা শোভন নয়। তিনি বলেন, যারা আঁতাতের অভিযোগ তুলছে হয় তারা জ্ঞানপাপী, নয়ত না বুঝে এসব অহেতুক ও অযৌক্তিক কথা বলছে। একাত্তরের ঘাতকদের সঙ্গে আঁতাতের প্রশ্নই আসে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অনেক বাধা সত্ত্বেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ চার দশক পর হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর হচ্ছে। কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর না করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার তা বাস্তবায়ন করেছে।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল পাসে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে ১৪ দল। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দেশের স্বাধীনতার পর বাহত্তরের সংবিধান সবচেয়ে বড় অর্জন। সেই বাহাত্তরের সংবিধান ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য বাহাত্তরের সংবিধান পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা। ১৪ দল এ ধরনের উদ্যোগের জন্য শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ফিলিস্তিনে আহত ১০ মেডিক্যাল ছাত্রকে বাংলাদেশে চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছি। তাদের সহায়তায় একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর কথা ছিল আমাদের, এ ব্যাপারে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছি।
এদিকে ১৪ দলের পক্ষ থেকে দর্গাপুজো ও ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে দেশবাসীকে অগ্রিম শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শান্তির বৃক্ষ’ উপহার পাওয়ায় এবং তাঁর কন্যা সায়মা হোসেন পুতুল অটিজমের ওপর আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ায় ১৪ দল তাদের অভিনন্দন জানিয়েছে।
মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম, জাসদের শরিফ নূরুল আম্বিয়া, মঈনুদ্দিন খান বাদল, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক নূরুর রহমান সেলিম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, ডাঃ দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ড. হাছান মাহমুদ, এ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুর বশর মাইজভা-ারী, মহাসচিব এম এ আউয়াল, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ডাঃ ওয়াজেদুল ইসলাম খান, ডাঃ অসিত বরুণ রায়, ন্যাপের ইসমাইল হোসেন, গণআজাদী লীগের এস কে সিকদার প্রমুখ।
এদিকে সাঈদীর রায়ের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ছাত্রলীগ। সমাবেশে ছাত্রলীগ সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমসহ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রায় প্রত্যাখ্যান করে সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার এবং আগামী রবিবার সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে যুবলীগ। যুবলীগ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ হারুনুর রশীদ দুদিনের কর্মসূচী সফল করতে সারাদেশের নেতাকর্মীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রায়ে জনমতের প্রতিফলন হয়নি- জানিয়ে পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি।
স্বাধীন বিচার বিভাগে সরকারের কোন হস্তক্ষেপ নেই: খাদ্যমন্ত্রী ॥ খাদ্যমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশর বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। বিচার বিভাগে সরকারের কোন হস্তক্ষেপ নেই। আমাদের সৌভাগ্য স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাচ্ছে; এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।
বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বিশ্ব বাঙালী সম্মেলন ও দক্ষিণ এশিয়া সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের উদ্যোগে ‘চলমান রাজনীতি: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাঈদীর রায়ের প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
কামরুল ইসলাম বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন না হলে দেশে পুনরায় অগণতান্ত্রিক সরকার আসত। শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার দেশের শাসনভার হাতে নিয়েছে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাও বজায় রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত ও ড. কামাল এক সুঁতোয় বাধা উল্লেখ করে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ যখন দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে তখন তারা একত্রিত হয়ে উন্নয়নে বাধা দিচ্ছে। এসব নব্য ইতিহাস বিকৃতিকারীরা ওয়ান-ইলেভেন পরিস্থিতি পুনরায় সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত।
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি মুহাম্মাদ আব্দুল খালেকের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মমতাজউদ্দিন, মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আশরাফুননেসা মোশাররফ প্রমুখ।
হরতাল ডেকেই তাণ্ডব ॥ পুলিশের ওপর বোমা গাড়ি ভাংচুর, আগুন
আজ ও রবিবার ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে জামায়াত ॥ বিভিন্নস্থানে সংঘর্ষ, পুলিশসহ আহত শতাধিক
স্টাফ রিপোটার ॥ যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপীলে সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রত্যাখ্যান করে তার মুক্তির দাবিতে আজ ও রবিবার সারা দেশে হরতালের ডাক দিয়েছে জামায়াত-শিবির। একই সঙ্গে আগামীকাল সাঈদীর জন্য দোয়া ও শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করবে দলগতভাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এ শক্তি। রায় ঘোষণার পরই প্রতিবাদ ও সাঈদীর মুক্তির দাবিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপির এ রাজনৈতিক মিত্র। এদিকে কর্মসূচী ‘শান্তিপূর্ণ’ দাবি করলেও হরতাল ডেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বোমা হামলা, গাড়ি ভাংচুর, অগ্নি সংযোগ, রাস্তা অবরোধসহ তা-ব শুরু করেছে জামায়াত-শিবির। বেশ কয়েকটি জেলায় হামলা করা হয়েছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন আট পুলিশসহ শতাধিক।
বুধবার রায় ঘোষণার পরই জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ এক বিবৃতিতে কর্মসূচীর ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, প্রথম দফায় বৃহস্পতিবার (আজ) সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা এবং দ্বিতীয় দফায় রবিবার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা সারা দেশে হরতাল হবে। এছাড়া শুক্রবার সাঈদীর জন্য দোয়া অনুষ্ঠান এবং শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ করবে দলটি। জামায়াত নেতার দাবি, সাঈদী সরকারের চরম জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সরকারের সাজানো মিথ্যা মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও তিনি ন্যায় বিচার বঞ্চিত হয়ে চরম জুলুমের শিকার হলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে তাকে আমৃত্যু কারাদ- দিয়ে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ রায় বহাল থাকলে মানুষটিকে জেলের ভিতরেই ইন্তেকাল করতে হবে। হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, নির্যাতন ও ধর্মান্তরে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদ- দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সারা দেশে সহিংস বিক্ষোভে নামে জামায়াতীরা। তাদের তা-বে প্রথম তিন দিনেই নিহত হন পুলিশসহ অন্তত ৭০জন। গাড়ি, বাড়ি এমনকি বিদ্যুত কেন্দ্রও পুড়িয়ে দেয়া হয়। এদিকে এবারেও রায়ের পরই শুরু হয়েছে তা-ব। এখন পর্যন্ত রাজধানীতে দু’একটি ঝটিকা মিছিলের মধ্যে কর্মসূচী পালন করলেও জেলা ও উপজেলায় নাশকতা চালিয়েছে তারা। আগের মতোই বোমাসহ সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর।
রায়কে কেন্দ্র করে হরতালের আগে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষে পাঁচ পুলিশসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। বুধবার দুপুর ২টার দিকে নবীগঞ্জ উপজেলা সদরের ওসমানী সড়ক এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পর পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জামায়াতের ২৫ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। আহতদের মধ্যে নবীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম (৪০), কনস্টেবল আলাউদ্দিন আহমেদ (৩৮) ও কনস্টেবল নাসির উদ্দিনসহ (৩৫) পাঁচ পুলিশ সদস্য, নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মলেন্দু দাস রানাকে (৪০) হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রায়ের প্রতিবাদে দুপুর ২টায় জেলা জামায়াত সেক্রেটারি মুশাহীদ আলীর নেতৃত্বে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা নবীগঞ্জ শহরের ওসমানী সড়ক এলাকায় মিছিল বের করে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও পুলিশ মিছিলকারীদের বাধা দিলে ধাওয়া পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় লাঠিসোটা ও ইটপাটকেলসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যায় জামায়াতীদের। নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিয়াকত আলী জানান, জননিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ জামায়াতের মিছিলে বাঁধা দিলে তারা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। জেলা শহর হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলায়ও আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় পুলিশ রয়েছে সতর্কাবস্থানে।
রাজশাহীতে বিক্ষোভ মিছিল থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে জামায়াত-শিবির বোমা হামলা চালিয়েছে। রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানিয়েছেন, সাঈদীর আপীলের রায় ঘোষণার পর রাজশাহীর বেশ কয়েকটি স্থানে একযোগে সহিংসতার চেষ্টা চালায় জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। এতে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও গুলি ছুড়ে। নগরী ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ অন্তত ২০ জনকে আটক করেছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (সদর) তানভীর হায়দার চৌধুরী জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজশাহীর শালবাগান, কাটাখালি, বিনোদপুর, ডিঙ্গাডোবা, রাণীবাজার ও দাসপুকুর এলাকায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। খবর পেয়ে পুলিশ বিভক্ত হয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছলে শিবির কর্মীরা তাদের লক্ষ্য করে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। পুলিশও টিয়ারশেল ও গুলি ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। একই সময় নগরীর রাজপাড়া থানার ডিঙ্গাডোবা এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল থেকে রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। এখানেও পুলিশ এলে শিবির নেতাকর্মীরা তাদের লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে গুলি ছুড়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ছাড়াও মতিহার থানার কাটাখালি এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করার চেষ্টা করে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। ঘটনার পর থেকে নগরজুড়ে পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকেই নগরজুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নেয়। র‌্যাব পুলিশের পাশাপাশি রাজশাহী নগরীতে ৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (সদর) তানভীর হায়দার চৌধুরী বলেছেন, জামায়াত-শিবিরের যেকোন নাশকতা পুলিশ শক্ত হাতে প্রতিরোধ করবে।
এদিকে পাবনায় রায়ের পরে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে নিজেদের ১৫ জন কর্মী আহত হয়েছে বলে দাবি জামায়াত-শিবিরের। রায়ের প্রতিবাদে জামায়াত-শিবির মিছিল বের করলে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ তিন রাউন্ড শটগানের গুলি ছোড়ে। পাবনা সদরের আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ রাসেল আলী মাসুদ জানান, জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা মিছিল থেকে শহরে নাশকতা ও জানমালের ক্ষতি করার পাঁয়তারা করছিল। উপস্থিত যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা তা প্রতিহত করেছে মাত্র। পাবনা সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার রোকনুজ্জামান মিয়া জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শটগানের গুলি ছুড়েছে। তবে পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে।
সাঈদীসহ অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রতিহত করার বই, পোস্টার, সরকারকে উৎখাত ও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ লিফলেট এবং জঙ্গী তৎপরতা সংক্রান্ত বই সংরক্ষণ এবং নাশকতার অভিযোগে টাঙ্গাইলে স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা প্রগতির আলোর প্রধান সম্পাদক নাজমুছ সাদাৎ নোমানকে (৪২) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মধুপুর থানা পুলিশ বুধবার ভোরে তার মালিকানাধীন প্রেস থেকে তাকে গ্রেফতার করে। পরে বিকেলে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এদিকে পুলিশ বিপুল পরিমাণ জিহাদী বই এবং লিফলেটসহ নোমানকে গ্রেফতার করলেও তার মালিকানাধীন প্রেসটি রহস্যজনক কারণে সিলগালা করেনি। মধুপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবর রহমান জানান, গ্রেফতার হওয়া নাজমুছ সাদাৎ নোমান টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত দৈনিক প্রগতির আলোর প্রধান সম্পাদক। একই সঙ্গে তিনি দৈনিক নয়া দিগন্তের মধুপুর উপজেলা প্রতিনিধি এবং মধুপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক। মধুপুর পৌর শহরের শহীদ স্মৃতি রোডে অবস্থিত বার্তা প্রেসের মালিক তিনি। পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বুধবার ভোরে ওই প্রেসে অভিযান চালায় এবং নিষিদ্ধ কয়েক হাজার বই, পুস্তিকা ও পোস্টার আটক করে। এসব নিষিদ্ধ বই ও পুস্তিকা কয়েকটি বান্ডিল করে টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলা ও ময়মনসিংহ জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত জঙ্গীদের নিকট পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছিল। বুধবার জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপীলের রায় বানচাল করার ষড়যন্ত্র এবং রায়পরবর্তী টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলায় করণীয় বিষয়ে জামায়াত-শিবিরকে অবহিত করা এবং জঙ্গী ও নিষিদ্ধ বই মৌলবাদীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছিল বলে মধুপুর থানা পুলিশ জানায়। পুলিশ আরও জানায়, গ্রেফতার হওয়া নাজমুছ সাদাৎ নোমান ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার ছোট ভাই ফারুকুর রহমান ফারুক মধুপুর পৌর জামায়াতের আমির। এছাড়া তার পিতা আব্দুস সাত্তার ও মাতাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য জামায়াতের রোকন পদে দায়িত্ব পালন করছেন। নোমান এবং তার পরিবারের জঙ্গী তৎপরতার প্রতি আগে থেকেই পুলিশ নজরদারিতে রাখছিল।
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলায় জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষে ২ পুলিশ কনস্টেবলসহ ৫জন আহত হয়েছেন। উপজেলার নওগাঁ-বগুড়া সড়কের সিও অফিস বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিয়াজ উদ্দিন জানান, হঠাৎ করে জামায়াত-শিবিরের লোকজন চারদিকে থেকে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জড়ো হতে থাকে। এ সময় পুলিশ তাদের বাধা দিলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ৭ রাউন্ড শটগানের গুলি ছুড়ে।
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে শিবির নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে এক পুলিশ কনস্টেবলসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। কুমিল্লা- নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের বিপুলাসার ও নাথের পেটুয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সাঈদীর আমৃত্যুদ- রায়ের প্রতিবাদে দুপুরে উপজেলার বিপুলাসার ও নাথেরপেটুয়া এলাকায় ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে সড়কে গাড়ি ভাংচুরের চেষ্টা চালায়। পুলিশ তাদের বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে খোকন মিয়া নামে এক পুলিশ কনস্টেবলসহ শিবিরের অন্তত ১০ নেতা-কর্মী আহত হয়। মনোহরগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুল হাই সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, শিবিরের নেতা-কর্মীরা মিছিল বের করে গাড়ি ভাংচুর ও বিভিন্ন নাশকতার চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ তাদের বাধা দিলে তারা পুলিশের উপর হামলা চালায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি ছোড়ে।
রায়ের প্রতিবাদ ও হরতালের সমর্থনে মিছিল থেকে সুনামগঞ্জে পুলিশের উপর ইটপাটকেল ছুড়েছে জামায়াত-শিবির সমর্থকরা। শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এরপর পুলিশ জামায়াত-শিবিরের মিছিল লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে মিছিল থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে হাতবোমা হামলা করেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। ঘটনাস্থল থেকে একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এএসপি ওহিদুল ইসলাম জানান, সর্বোচ্চ আদালতে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের পর বুধবার দুপুরে শহরের নিমতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তিনি জানান, নিমতলা থেকে বেলা ২টার দিকে জামায়াত-শিবির মিছিল বের করার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে পুলিশকে লক্ষ্য করে কয়েকটি হাতবোমা ও ইটপাটকেল ছুড়ে মারে তারা। এ সময় ১০ রাউন্ড টিয়ার সেল ও ১৫ রাউন্ড শটগানের গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।
সিলেটে ঝটিকা মিছিল থেকে পুলিশের উপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও গাড়ি ভাংচুর করেছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নিমতলা এলাকায় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সহকারী পুলিশ সুপার ওহিদুল ইসলাম জানান, শহরের নিমতলা থেকে বেলা দু’টার দিকে জামায়াত শিবির মিছিল বের করার চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ তাদের বাধা দিলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল ও ইটপাটকেল ছুড়ে। এছাড়া জেলার চার উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মঙ্গলবার রাতে ৭ জামায়াত-শিবির নেতা কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উপজেলার লাহারপুর থেকে বুধবার সকালে ২৩টি তাজা ককটেল উদ্ধার করেছে র‌্যাব। রায়ের পর নাশকতামূলক কর্মকা- ঘটানোর উদ্দেশ্যে দুষ্কৃতকারীরা মওজুদ করে থাকতে পারে।
নীলফামারীর ডিমলায় জামায়াত-শিবির ও আওয়ামী লীগ মুখোমুখি অবস্থান নেয়ায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার দুপুরের পর সাঈদীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি তুলে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ি, পূর্বছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ি, নাউতারা, খগাখড়িবাড়ি, ডাঙ্গারহাট থেকে বেশ জামায়াত শিবির ক্যাডাররা মাথায় লাল পট্ট্ িবেঁধে উপজেলা শহরের হাসপাতাল সড়কে অবস্থিত জামায়াত শিবির অফিসে এসে সমবেত হতে থাকে। অপর দিকে জামায়াত শিবিরকে প্রতিহত করতে ডিমলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ পাল্টা অবস্থান নিলে উপজেলা ঘিরে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এতে ডিমলা শহরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা শহর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ডিমলায় গিয়ে অবস্থান নিয়ে টহল জোড়দার করলে জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীরা পিছুহটে যায়। এলাকাবাসী ডিমলায় জামায়াত শিবির ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন। নাশকতার আশংকায় নোয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জামায়াত-শিবিরের ১১ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। কোম্পানিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজিদুর রহমান সাজেদ জানিয়েছেন- কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মোহাম্মদিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোস্তফা কামালের রামদীর ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে বিভিন্ন জিহাদী বইও উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ১৪টি জামায়াত-শিবিরের বই, চাঁদা আদায়ের রশিদ, জীবন বৃত্তান্ত ফরম জব্দ করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে জামায়াত-শিবিরের ১৫ কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার ভোরে জেলা শহরের শিবিরের বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। নাশকতামূলক কর্মকা-ে জড়িত থাকার সন্দেহে পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জামায়াতের ২ নেতা ও শিবিরের ৯ কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। কুষ্টিয়ায় পুলিশ জামায়াত-শিবিরের ছয় নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। সাঈদীর রায় ঘেষণাকে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে বুধবার ভোর রাতে জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। রায়কে ঘিরে কুষ্টিয়ায় নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোতয়েন করা হয় ব্যাপক পুলিশ।
দণ্ড হ্রাসের রায় মেনে নিলেও আইনজ্ঞদের অসন্তোষ, ক্ষোভ
অনেকেই মর্মাহত
বিকাশ দত্ত ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কমিয়ে আপীল বিভাগ আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেয়াতে আইনমন্ত্রী, সাবেক আইনমন্ত্রী, প্রধান আইন কর্মকর্তাসহ আইন বিশেষজ্ঞরা অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি তাঁরা মর্মাহতও হয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, আমরা রায় মেনে নিয়েছি। সর্বোচ্চ আদালতের যে কোন আদেশ ও রায়ের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে মানবতাবিরোধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি আমরা আশা করি, সেটা না হওয়ায় আমরা মর্মাহত। দুঃখ পেয়েছি। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে আশা করছিলেন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আপীল বিভাগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া মৃত্যুদ-াদেশ বহাল রাখবেন। কিন্তু বুধবার জনাকীর্ণ আদালতে পিনপতন নীরবতার মধ্যে প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ প্রদান করেন। এর পর পরই তাঁরা এ রায়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এমনকি দেশের আইনমন্ত্রী ও প্রধান আইন কর্মকর্তাও বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালতের যে কোন আদেশ ও রায়ের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে মানবতাবিরোধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি আমরা আশা করি, সেটা না হওয়ায় আমরা মর্মাহত। দুঃখ পেয়েছি।
জাতির পাশাপাশি আইনজীবীরাও আশা করেছিলেন, সাঈদীর দ- আপীল বিভাগ বহাল রাখবেন। কিন্তু আপীল বিভাগ থেকে সাঈদীর আমৃত্যুকারাদ- প্রদান করা হয়।
আপীল বিভাগে রায় ঘোষণার পর আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক জনকণ্ঠকে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, আমি যেহেতু বাংলাদেশী নাগরিক এবং সরকারের একজন সদস্য সেজন্য উচ্চ আদালত কেন- যে কোন আদালতকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমাকে যদি এর প্রতিক্রিয়া জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে বলব, মর্মাহত। এটা আমার প্রত্যাশার মধ্যে ছিল না। দ- কমিয়ে রায় দেয়া হয়েছে। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যেটা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে.. আমি শুনেছি তিনি পিস কমিটির মেম্বার ছিলেন এবং এ বিষয়ে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। স্বেচ্ছায় যারা পিস কমিটির মেম্বার হয়েছিলেন তারাতো সচেতনভাবেই স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। সেটাও অপরাধ।
মামলার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কোন দুর্বলতা ছিল কিনা জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, আমি রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি না দেখে কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। তবে প্রসিকিউশন টিমের যা অবস্থা, সেখানে পরিবর্তন আসা উচিত। তিনি আরও বলেন, ট্রাইব্যুনালে কিছু কিছু মামলা চলছে, কিছু রায় অপেক্ষমাণ আছে। প্রসিকিউশন টিমের যেন কোন অসুবিধা না হয় এজন্য আমি কোন পরিবর্তন আনিনি। তবে দ্রুত এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
আপীল বিভাগের এই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হবে কিনা জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, ‘আগামীতে রিভিউ করতে পারা যাবে কিনা তা রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার আগ পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না। কারণ আবদুল কাদের মোল্লার রায় রিভিউ করার জন্য আসামিপক্ষ আবেদন করেছিল। তার পুরো রায় এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম জনকণ্ঠকে বলেছেন, এ রায় আশানুরূপ হয়নি, তাই খারাপ লাগছে। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম তার রায়ে মৃত্যুদ- বহাল থাকবে। কিন্তু আদালত মামলা সাক্ষ্য বিবেচনা করে তাকে আমৃতু দ-াদেশ দিয়েছেন। আপীলের এই রায়ের মাধ্যমে আদালত আসামিপক্ষ এবং রাষ্ট্রপক্ষের করা আপীলের আংশিক মঞ্জুর হয়েছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এটা একটা বিশেষ আইন, যেখানে রিভিউর কোন সুযোগ নেই।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মামলা পরিচালনায় আমাদের কোন ঘাটতি ছিল না। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ঠিকমতো তদন্ত কাজ করেছেন কিনা তা পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরে বোঝা যাবে।
সুপ্রীমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদিন মালিক বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের দ- শুধু মৃত্যুদ-ই নয়, ট্রাইব্যুনাল মনে করলে অন্যান্য দ-ও প্রদান করতে পারেন। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালত সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে রায় দিয়েছেন। আপীল বিভাগের রায় সবাইকে মেনে নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী বলেছেন, আইনজীবী হিসেবে সাক্ষ্য-প্রমাণে ভিত্তি সঠিকভাবে পরিচালনা করা। সেটা করেছি। মামলা প্রমাণ হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদ- প্রদান করেছেন। দুই পক্ষই আপীল করেছে। দুটি আপীল আংশিক মঞ্জুর হয়েছে। যেখানে ট্রাইব্যুনাল দ-াদেশ দেয়নি সেখানে আপীল বিভাগ দিয়েছে। আইনজীবী হিসেবে খুশি বা অখুশি থাকার কোন সুযোগ নেই।
সুপ্রীমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেছেন, আমার মতামত হলো জাস্ট গোঁজামিল। আমরা নিকট অতীতেই ভুলি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি মর্মাহত। ৪৩ বছরের ঘটনা আমরা কেন অতি নিকট ভুলি তা বুঝতে হবে। সেক্টর কামান্ডার্স ফোরামের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান কেএম শফিউল্লাহ বলেছেন, ‘এ রায়ে আমরা হতাশ। এতে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি।
প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, ট্রাইব্যুনালে আইনে পরিষ্কার করে রাখা আছে আন্তর্জাতিক অপরাধের আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি হবে মৃত্যুদ-। অথবা ট্রাইব্যুনাল মামলার অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে ন্যায়বিচারের স্বার্থে অন্য কোন শাস্তি দেয়া বাঞ্ছনীয় মনে করেন- সেটাই দিতে পারবেন। সঙ্গত কারণেই, আপীল বিভাগে মামলা হলে সেটা ট্রাইব্যুনাল আইন ও ট্রাইব্যুনালের রায় পর্যালোচনা করেই দিয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে শাস্তি কমিয়ে সেখানে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করেছেন। আপীল বিভাগ সব কিছুর ক্ষমতা রাখে। কাজেই রায় সম্পর্কে কোন মন্তব্য করা ঠিক হবে না। ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসি আদেশ বহাল থাকত গোটা জাতির সঙ্গে খুশি হতে পারতাম। সে প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই করতে পারি।
ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যে রায় আদালত দিয়েছেন তার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। তবে ফাঁসির রায় বহাল থাকলে ব্যক্তিগতভাবে বেশি খুশি হতাম। তিনি আরও বলেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ হলে বোঝা যাবে প্রসিকিউশনের কোন দুর্বলতা ছিল কিনা।
সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক এএম আমিন উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেছেন, আইন আছে, বিধান আছে সে কারণেই আপীল বিভাগ সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করেছেন। আদালত তার সব সাক্ষী ও সরকার আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনেই আমৃত্যুকারাদ- প্রদান করেছেন। উচ্চ আদালত যে আদেশ দিয়েছে তা আমাদের মানতে বাধ্য।
সাঈদীর আমৃত্যু জেল-গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণ করেনি
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
স্টাফ রিপোর্টার ॥ জামায়াতের নায়েবে আমির সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। রায়ে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি বলে মনে করেন রাজনৈতিক, সামাজিকসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। বুধবার দেয়া বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, এ রায় মুক্তিযোদ্ধাসহ শহীদ পরিবারের সদস্যদের হতাশ করেছে। অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে সংবিধান সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম (আইসিএসএফ)। এদিকে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে দুর্বলতার কারণে সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকেনি বলে মনে করে ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি।
তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে দুর্বলতা-ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি ॥ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদ- দিলেও আপীলে তা বহাল না থাকার কারণ হিসেবে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি। বুধবার আপীল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ে সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ- দেয়ার পর এই প্রতিক্রিয়া জানায় একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহকারী সংগঠনটি। আপীল বিভাগের রায়ে হতাশা প্রকাশ করে কমিটির আহ্বায়ক ডাঃ এমএ হাসান সাংবাদিকদের বলেন, এ রায় জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের ভিত্তিতে আদালত তার রায় দিয়ে থাকে উল্লেখ করে তিনি জানান, এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। এ বিচারের ক্ষেত্রে তথ্য উপস্থাপনের দুর্বলতা আমাদের ক্ষুব্ধ করেছে। সঠিকভাবে তারা আমাদের সাহায্যও নেয়নি। তথ্য উপস্থাপনে দুর্বলতার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সরাসরি কিছু না বললেও জানিয়েছেন, প্রসিকিউশন টিমে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকমানের বিচারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি উপস্থাপনে সাক্ষী সুরক্ষা ও নিশ্চিত করার আহ্বান জানান জনাব হাসান। একাত্তরে যারা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা দ্বিতীয়বার সাক্ষ্য দিতে এসে সুরক্ষা পাচ্ছে না। তাদের ব্যবহার করে একটি শ্রেণী লাভবান হবে, আর সাক্ষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা হতে পারে না। প্রয়োজনীয় দলিলাদি উপস্থাপনে দুর্বলতা, সাক্ষী সুরক্ষা না হওয়া ও আঁতাতের গুজবে মানুষের মধ্যে এক ধরনের পারসেপশন তৈরি হয়েছে। যেটা কখনও ভাল নয়, বলেন হাসান।
হতাশ আইসিএসএফ, ৪৯ ধারা সংশোধন দাবি ॥ আপীলের রায়ে সাঈদীর মৃত্যুদ-ের সাজা কমে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম (আইসিএসএফ)। সাঈদীর দ- মওকুফের সুযোগ বন্ধ করতে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ সংশোধনের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি, যে অনুচ্ছেদবলে রাষ্ট্রপতি যে কাউকে ক্ষমা করতে পারেন। আইসিএসএফ সদস্য রায়হান রশিদ, আহমেদ জিয়াউদ্দিন ও এম সানজীব হোসেন এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, আইসিএসএফ এই রায়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করছে। এই প্রেক্ষিতে আইসিএসএফ সরকারের কাছে অনতিবিলম্বে বাংলাদেশ সংবিধানের ধারা ৪৯ সংশোধনের দাবি জানাচ্ছে। ৪৯ ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রতি কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দেয়া যে কোন দ-ের মার্জনা বা মওকুফ করার ক্ষমতা রাখেন।
বিবৃতিতে বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, প্রবীণ সাংবাদিক কামাল লোহানী, অধ্যাপক অজয় রায়, কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, লে. কর্নেল (অব) আবু ওসমান চৌধুরী, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুন্তাসীর মামুন, ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন, অধ্যাপক হামিদা বানু, স্থপতি রবিউল হুসাইন, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, কলামিস্ট মমতাজ লতিফ, সমাজকর্মী কাজল দেবনাথ, চলচ্চিত্র নির্মাতা শামীম আখতার, শহীদ জায়া সালমা হক, সমাজকর্মী আরমা দত্ত, শিল্পী আবুল বারক আলভী, মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল, কাজী মুকুল, সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিক, সাংবাদিক ফজলুর রহমান, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, সাব্বির রহমান খান, কলামিস্ট সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ, সমাজকর্মী কাজী লুৎফর রহমান, লেখক আলী আকবর টাবি, অধ্যাপক গাজী সালাহউদ্দীন আহমেদ, ডাঃ শাফিকুল আলম, ডাঃ শেখ বাহারুল আলম, মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রব, ডাঃ নুজহাত চৌধুরী, এ্যাডভোকেট বায়েজিদ আক্কাস, সাংবাদিক মহেন্দ্রনাথ সেন, মহব্বত হোসেন খান, প্রভাষক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ও শওকত বাঙালী প্রমুখ স্বাক্ষর করেছেন।
দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান সিপিবির ॥ সাঈদীর সাজা কমিয়ে আজীবন কারাদ- দেয়ায় হতাশা জানিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিশ্চিতে দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। একইসঙ্গে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের ওপর পুলিশের কাঁদুনে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহারে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে দলটি। এছাড়াও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাদসের পক্ষ থেকেও একই ধরনের বিবৃতি দেয়া হয়েছে।
রায় প্রত্যাখ্যান করেছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ॥ সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুজ্জামান সাকন ও সাধারণ সম্পাাদক স্নেহাদ্রী চক্রবর্ত্তী রিন্টু এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, ’৭১ সালে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা সাঈদীর রায়ে জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। একজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাঈদীর মৃত্যুদ- ছাড়া ভিন্ন অন্য কোন রায় তার অপরাধের মাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। যুব মৈত্রীর পক্ষ থেকেও রায় প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। রায় প্রত্যাখ্যান করে জাসদ ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল-সমাবেশ করেছে।
আমরা সংক্ষুব্ধ ও অপমানিত- সাংস্কৃতিক জোট ॥ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, কুখ্যাত রাজাকার সাঈদীর মৃত্যুদ- বহাল না থাকায় আমরা সংক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করছি। ৩০ লাখ শহীদের রক্তস্নাত মাটিতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। কোন শহীদ পরিবারের সদস্যের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের এই গ্লানিময় জীবন দেখা আমাদের কাম্য ছিল না।
জামায়াতের সঙ্গে গোপন আঁতাত ॥ বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এক বিবৃতিতে একাত্তরের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর মৃত্যুদ-াদেশ প্রত্যাহার করে আমৃত্যু কারাদ- প্রদানের রায় প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, সরকারের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামির গোপন আঁতাতের ব্যাপারে দেশবাসীর সন্দেহই আজ সত্য বলে প্রমাণিত। এই রায় যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যাপারে দেশবাসীর আকাক্সক্ষা ও মনোভাবের পরিপন্থী।
জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি- ওয়ার্কার্স পার্টি ॥ রাজাকার শিরোমনি সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদ-ের শাস্তির রায়ে জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। রায়ে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধকে সর্বোচ্চ অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তিই জনগণ প্রত্যাশা করেছিল। যুদ্ধাপরাধী সাঈদীকে দেয়া রায়ের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি একথা বলেন।
সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের হতাশা ॥ সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি অজয় রায় ও সাধারণ সম্পাদক তবারক হোসাইন এক বিবৃতিতে সাঈদীর আপীলের রায় ঘোষণায় দেশের মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, সকলের প্রত্যাশা ছিল সাঈদীর মৃত্যুদ-ের রায় বহাল থাকবে। এ রায়ে শহীদদের মর্যাদা ও জাতীয় চেতনা, আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। রায়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গীবাদবিরোধী মঞ্চের সমন্বয়ক অজয় রায় ও জিয়াউদ্দিন তারেক ও ড. নূর মোহাম্মদ তালুকদার। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে।
ধর্ষণ হত্যা ধর্মান্তরের অভিযোগ সুপ্রীম কোর্টেও প্রমাণিত
সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড আপীল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে
জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। নামের আগে ‘আল্লামা,’ ‘মাওলানা’সহ নানা ধরনের বিশেষণ ব্যবহার করেছেন তিনি। ধর্মের নামে ব্যবসাও করেছেন অনেক। এসব তাঁর লেবাস মাত্র। তিনি আসলে নারী ধর্ষক, হত্যাকারী। এসব বিষয় বহু আগেই প্রমাণ হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। বুধবার আপীল বিভাগের রায়েও তা চূড়ান্তই থাকল। ধর্ষণের অভিযোগে এই ধর্ম ব্যবসায়ী দেইল্লা রাজাকার খ্যাত রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছেন সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ। এছাড়া জোর করে ধর্মান্তরিত করা এবং হত্যার অভিযোগেও এই রাজাকারকে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছেন সুপ্রীম কোর্ট।
তাঁর বিরুদ্ধে থাকা ২০টি অভিযোগের মধ্যে ১৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জন সশস্ত্র রাজাকার দল পারেরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ চন্দ্র সাহার বাড়ি থেকে তার তিন বোনকে অপহরণ করে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে তুলে দেয়। সেখানে তাদের আটকে রেখে তিন দিন ধরে ধর্ষণ করে পরে ছেড়ে দেয়। তার বিরুদ্ধে থাকা ১৯ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সাঈদী জোর করে মধুসূদন ঘরামী, কেষ্ট সাহা, ডা. গণেশ সাহা, অজিত কুমার শীল, বিপদ সাহা, নারায়ণ সাহা, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, নারায়ণ পাল, অমূল্য হাওলাদার, শান্তি রায়, হরি রায় জুরান, ফকির দাস, টোনা দাস, গৌরাঙ্গ সাহা, হরিদাস, গৌরাঙ্গ সাহার মা ও তিন বোন মহামায়া, অন্ন রানী ও কামাল রানীসহ ১০০/১৫০ জন হিন্দুকে ধর্মান্তর করেন।
এ অভিযোগের বিষয়ে গৌরাঙ্গ চন্দ্র সাহা নিজেই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তার সেই সাক্ষ্যের উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ জনকণ্ঠের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দীতে গৌরাঙ্গ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘১৯৭১ সালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কিছু রাজাকার নিয়ে আমাদের বাড়িতে যায়। তারপর কিছু রাজাকার আসে। রাজাকারদের নিয়ে আমার তিন বোনকে ধরে নিয়ে যায়। যে তিন বোনকে ধরে নিয়ে যায় তাদের মধ্যে বড় জনের নাম মহামায়া, মেজ জনের নাম অন্ন রানী এবং তৃতীয় বোনের নাম কমলা রানী।’ জবানবন্দীতে গৌরাঙ্গ সাহা বলেন, ‘আমার তিন বোনকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও রাজাকার বাহিনী পিরোজপুরে পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে সাঈদীসহ পকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদের তিন দিন আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে এবং তিন দিন পর তাদের ফেরৎ পাঠায়। গৌরাঙ্গ সাহা আরও বলেন, আমার বোনেরা বাসায় আসার কিছুদিন পর দেলাওয়ার সাঈদী আমার মা-বাবা, ভাই-বোনসহ আমাদের বাড়ি সকলকে কলেমা পড়িয়ে মুসলমান বানায়, মসজিদে নিয়া নামাজ পড়ায়। এই লজ্জায় আমার মা-বাবা, ভাই-বোন সকলে ভরতে চলে যায়। আমি একা এ দেশে আছি।’
জবানবন্দীতে গৌরাঙ্গ সাহা আরও বলেন, ‘আরও অনেক হিন্দুকে অনুমান ১০০/১৫০ জনকে জোর করে মুসলমান বানায় দেলাওয়ার সাঈদী। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আমাকে মুসলমান বানানোর পরে আমার নাম দিয়েছিল আঃ গণি। আমাদের সাঈদী টুপি ও তজবি দিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হবার পর আমি নিজ ধর্মে ফিরে আসি।’ গৌরাঙ্গ সাহা বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আমাদের বাড়ির পাশে ভাড়া থাকত। সে যাদের মুসলমান বানায় তাদের মধ্যে ছিল নারায়ন সাহা, নিখিল পাল, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, হারান ভৌমিকসহ আরও অনেকে।
এছাড়া জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে থাকা ১০ নম্বর অভিযোগে হত্যার ইন্ধনদাতা হিসেবে তাকে আমৃত্যু কারাদ- দেয়া হয়েছে। এ অভিযোগে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে একদিন ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে তার সশস্ত্র সহযোগীরা ইন্দুরকানি থানার উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার হানা দিয়ে ২৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। যার মধ্যে চিত্তরঞ্জন তালুকদার, হরেণ ঠাকুর, অনিল ম-ল, বিসাবালি, সুকাবালি, সতিশবালা। সাঈদীর ইন্ধনে তার সহযোগীরা বিসাবালীকে নারকেলগাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে। বেসামরিক মানুষের বসবাসের বাড়িতে আগুন দেয়া নিপীড়নের শামিল। সাঈদী বাড়িঘর পোড়ানো, বিসাবালিকে হত্যা মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন, যা ৩(২)(এ) ধারায় অপরাধ।
এছাড়া ইব্রাহিমকে হত্যায় প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগেও সাঈদীকে ১২ বছরের কারাদ- দিয়েছে সুপ্রীম কোর্ট। এটি তার বিরুদ্ধে থাকা ৮ নম্বর অভিযোগ। এ অভিযোগে বলা হয়েছে, একই দিন বেলা ৩টায় সাঈদীর নেতৃত্বে তার সাঙ্গোপাঙ্গরা পাকবাহিনীর সহায়তায় সদর থানার চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারীর বাড়িতে হানা দিয়ে তার ভাই মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহিমসহ দুই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে পাঁচটি বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া। সেনাক্যাম্পে ফেরার পথে সাঈদীর প্ররোচনায় ইব্রাহিমকে হত্যা করে লাশ ব্রিজের কাছে ফেলে দেয়া হয়। মফিজকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে সাঈদী ও অন্যদের আগুনে পারের হাট বন্দরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সাঈদী সরাসরি অপহরণ, খুন, যন্ত্রণদানের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিলেন। যার আইনের ৩(২)(এ) ধারা অনুসারে অপরাধ।
এছাড়া যুদ্ধ চলাকালীন লুটপাট অগ্নি সংযোগ ইত্যাদি অপরাধে এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর সাজা হয়েছে ১০ বছর। এটি তার বিরুদ্ধে থাকা ২০টি অভিযোগের মধ্যে সপ্তম। এ অভিযোগে বলা হয়েছে, ৮ মে বেলা দেড়টায় সাঈদীর নেতৃত্বে তার সশস্ত্র সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে নিয়ে সদর থানার ভাদুরিয়া গ্রামের নুরুল ইসলাম খানের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে হানা দেন। সেখানে নুরুল ইসলাম খানকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসাবে চিনিয়ে দেন সাঈদী। পরে তিনি তাকে আটক করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন। যারা তাকে নির্যাতন করে। বাড়ি লুটপাট করার পর যাওয়ার পূর্বে আগুন লাগিয়ে বাড়িটাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। এটা আইনের ৩(২)(এ) এবং ৩(২)(জি) ধারা অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সাঈদীর ফাঁসি থেকে ॥ আমৃত্যু কারাদণ্ড
০ আপীল বিভাগের রায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে
০ রায়ে ১০, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড, ৮ নম্বরের একাংশের জন্য ১২ ও ৭ নম্বরের জন্য ১০ বছর জেল
০ যুদ্ধাপরাধের ২০ অভিযোগের পাঁচটি প্রমাণিত
আরাফাত মুন্না ॥ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেও চূড়ান্ত রায়ে একাত্তরের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ‘দেইল্লা রাজাকার’ খ্যাত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে সুপ্রীমকোর্ট। বুধবার প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এ রায় ঘোষণা করে। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা, বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।
এ মামলায় সাঈদী ও রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক দুটি আপীল আবেদন দায়ের করেছিল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাজা ঘোষিত না হওয়া ছয়টি অভিযোগে শাস্তির আর্জি জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আর সাঈদীর ফাঁসির আদেশ থেকে খালাস চেয়ে আসামিপক্ষ আপীল করে। আদালত উভয় আবেদনের আংশিক মঞ্জুর করেন। রায়ে ১০, ১৬, ১৯ নম্বর অভিযোগে জামায়াতের এই নায়েবে আমিরকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদ- দেয়া হয়। আর ৮ নম্বর অভিযোগের একাংশের জন্য সাঈদীকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদ- এবং ৭ নম্বরের জন্য ১০ বছর কারাদ- দেয় আপীল বিভাগ। এছাড়া ৮ নম্বর অভিযোগের অপর অংশসহ ৬, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালী হত্যা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে আগুন দেয়ার দুটি অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই কুখ্যাত রাজাকার সাঈদীকে ফাঁসির সাজা দিয়েছিল। এই যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে ২০ অভিযোগ থাকলেও চূড়ান্ত রায়ে তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হলো পাঁচটি অভিযোগ।
গত ১৬ এপ্রিল উভয় পক্ষে আপীল শুনানি শেষ হলে রায় সিএভি (রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ) রাখে আপীল বিভাগ। এর পর সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের ১ নম্বর বেঞ্চের বুধবারের আপীল দুটি রায় ঘোষণার জন্য কার্য তালিকার ১ নম্বরে রাখা হয়। মঙ্গলবার বিকেলেই সুপ্রীমকোর্টের ওয়েবসাইটে তা প্রকাশ করা হয়।
একাত্তরে ভূমিকার কারণে ‘দেইল্যা রাজাকার’ নামে খ্যাত এই জামায়াত নেতার সাজা কমানোর রায় আসায় তাৎক্ষণিকভাবে আদালতের বাইরে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল ও শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। শাহবাগে স্লোগান ওঠে-‘আঁতাতের এই রায় মানি না, প্রহসনের এই রায় মানি না।’
এ রায়ে আশাপূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেন, আমরা আশা করেছিলাম ট্রাইব্যুনালের রায়ই বহাল থাকবে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে দেয়ায় প্রত্যাশা পূরণ না হলেও এতে ‘ধর্মীয় নেতা’ হিসেবে তার মুখোশ খুলে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
রায়ের পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল মৃত্যুদ-। ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছিল তা বহাল থাকবে- এটাই ছিল প্রত্যাশা। সেটা থাকেনি, আমার খুব খারাপ লাগছে।
তবে আপীলের রায়ে সাঈদীর নারী নির্যাতন ও ধর্মান্তরে বাধ্য করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে জানিয়ে এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই রায়ে একটি বিষয় জনগণ বুঝতে পেরেছে। ধর্মীয় নেতা হিসেবে সাঈদীর যে পরিচিতি ছিল, তার মুখোশ আজ জনগণের সামনে উন্মোচিত হলো। এখন থেকে তিনি জনগণের সামনে নারী নির্যাতনকারী এবং ধর্ষণকারী হিসেবে পরিচিত হবেন। রাষ্ট্রপক্ষ এই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করবে কিনা, জানতে চাইলে মাহবুবে আলম বলেন, আমি আগেই বলেছি এখানে রিভিউ চলবে না। এখন তো অন্য কথা বলতে পারি না। একটি বিশেষ আইনের অধীনে এ রায় হয়েছে। এখানে রিভিউয়ের কোন সুযোগ নেই। তবে আদালত পুনর্বিবেচনার সুযোগ দিলে রাষ্ট্রপক্ষ তা করবে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের আগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
মামলা পরিচালনায় প্রসিকিউশনের কোন ধরনের দুর্বলতা বা গাফিলতি ছিল কিনা, জানতে চাইলে এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তদন্ত ঠিকমতো হয়েছে কিনা কিংবা চার্জগুলো তদন্তকারীরা ঠিকঠাক উপস্থাপন করতে পেরেছেন কিনা- সেটা পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে বোঝা যাবে।
সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ-ের সাজা কমিয়ে আপীল বিভাগের আমৃত্যু কারাদ- দেয়ায় রায়ে সংক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী এ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও ছেলে মাসুদ সাঈদী। তাঁরা এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করবেন বলেও জানিয়েছেন। এ বিষয়ে তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, এ মামলায় স্কাইপে কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা ঘটেছে। সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণ করা হয়েছে। ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যার অভিযোগে যেখানে তাঁর স্ত্রী সাঈদীকে আসামি করেননি, সেই অভিযোগেও কারাদ-ের সাজা দেয়া হয়েছে। এ জন্য আমরা ন্যায়বিচারের জন্য পুনর্বিবেচনার আবেদন করব।
এ বিষয়ে সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট নই। আমরা আপীল করার পর আশা করেছিলাম এখানে ন্যায়বিচার হবে। আমার বাবা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাবেন, তা হয়নি।’ তাঁরা এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করবেন বলে জানান মাসুদ সাঈদী।
এই ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীর চূড়ান্ত রায় কেন্দ্র করে বুধবার সুপ্রীমকোর্ট এলাকায় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। সকাল থেকেই র‌্যাব পুলিশের একাধিক দল সুপ্রীমকোর্ট এলাকায় মহড়া দিতে থাকে। উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশের সময় সকলকেই তল্লাশি করেছে তারা। রায় নিয়ে মিডিয়াকর্মীরাও ভিড় করেন উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে। রায় ঘোষণার সময় আপীল বিভাগের ১ নম্বর এজলাস কক্ষে আইনজীবী ও সাংবাদিক মিলিয়ে অন্তত ১২শ’ জন উপস্থিত ছিলেন।
আপীল শুনানির কার্যক্রম ॥ ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর গত বছরের ২৮ মার্চ দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপীল করে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ। তবে ওই সময় কাদের মোল্লার আপীল মামলা বিচারাধীন থাকায় সাঈদীর মামলার শুনানি শুরু হয়নি। ট্রাইব্যুনালের রায়ে ২০ অভিযোগের মধ্যে আটটিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় সাঈদীকে। এর মধ্যে একাত্তরে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যার দায়ে তাকে সর্বোচ্চ সাজা দেয়া হয়। ওই সাজা থেকে খালাস চেয়ে আপীল করেন এই জামায়াত নেতা। আর রাষ্ট্রপক্ষ অন্য ছয়টি অভিযোগে সাজা চেয়ে আপীল করে, যেগুলোতে দোষী সাব্যস্ত হলেও ট্রাইব্যুনাল সাজা দেয়নি। গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর সাঈদীর দ-াদেশের বিরুদ্ধে আপীল মামলার কার্যক্রম শুরু হয়, যা ৫০ কার্যদিবসে গত ১৬ এপ্রিল দুই পক্ষের আপীলের শুনানি শেষে রায় অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
আপীলে আসামিপক্ষ দাবি করে, ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদ- দিয়েছে। অথচ ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম তাঁর স্বামীকে হত্যার অভিযোগে ১৯৭২ সালে যে মামলা করেছিলেন তাঁর সেই এজাহারে (এফআইআর) আসামি হিসেবে সাঈদীর নাম ছিল না। পরে পুলিশ ওই মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশীট) দাখিল করে, তাতেও সাঈদী আসামি ছিলেন না। ওই অভিযোগপত্রের অনুলিপি আসামি পক্ষ অতিরিক্ত নথি হিসেবে আপীল বিভাগে দাখিল করেছে। পক্ষান্তরে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি- ইব্রাহিম কুট্টি হত্যাসংক্রান্ত যে নথির কথা আসামি পক্ষ বলেছে, তা জাল ও মিথ্যা। বরিশাল ও পিরোজপুরের জেলা জজ আদালতে ওই ধরনের কোন নথির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মামলার প্রয়োজনে আসামি পক্ষ ওই নথি তৈরি করেছে, এ জন্য সেগুলো বিবেচনা না করার আর্জি জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। আসামিপক্ষ আরও দাবি করেছে, বিসাবালী হত্যাকা-ের দায়ে সাঈদীকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। অথচ বিসাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়া সত্ত্বেও আসামি পক্ষে সাক্ষ্য দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে অপহরণ করা হয়। এ বিষয়ে আপীল শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণের ঘটনাও আসামিপক্ষের তৈরি করা। কারণ ওই ধরনের কোন ঘটনাই ঘটেনি।
ট্রাইব্যুনালে মামলার ধারাবাহিক কার্যক্রম ॥ বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর দায়ের করা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে একটি মামলায় সাঈদীকে ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
২০১০ সালের ২১ জুলাই থেকে ২০১১ সালের ৩০ মে পর্যন্ত মোট ৩১৩ দিন তদন্ত করে ১১ জুলাই সাঈদীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগের বিষয়ে শুনানি শেষে ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে মুক্তিযুদ্ধকালে পিরোজপুর জেলায় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ এবং এ ধরনের অপরাধে সাহায্য করা ও জড়িত থাকার ঘটনায় ২০ অভিযোগ আনা হয়। একই বছরের ২০ ও ২১ নবেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উত্থাপন করেন চীফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু ও প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান। এ মামলায় সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২০১১ সালের ৭ ডিসেম্বর, শেষ হয় ২০১২ সালের ১৩ আগস্ট। তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৭ সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জন ঘটনার বিষয়ে এবং সাতজন জব্দ তালিকার বিষয়ে সাক্ষ্য দেন। এছাড়াও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া ১৫ সাক্ষীর জবানবন্দী ট্রাইব্যুনালের আদেশে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
উভয় পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০১২ সালের ৫ নবেম্বর শুরু হয় প্রথম দফার যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন। রাষ্ট্রপক্ষে ৫ থেকে ১৫ নবেম্বর ও ৪ থেকে ৬ ডিসেম্বর মোট ১২ কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী। অন্যদিকে ১৮ নবেম্বর শুরু করে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ কার্যদিবসে আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন সাঈদীর প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও অপর আইনজীবী এ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম। এরপরই স্কাইপি কথোপকথনের জের ধরে মামলার কার্যক্রম মুলতবি হয়ে যায়। ফলে ১ মাস ১৭ দিন বিলম্বিত হয় এ বিচারিক প্রক্রিয়া।
ট্রাইব্যুনাল ফের উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শোনার সিদ্ধান্ত নিলে গত বছরের ১৩ থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এবং ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৫ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী। অন্যদিকে ২০ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭ কার্যদিবসে আসামি পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও এ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম। সে দিন মামলাটির রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে ট্রাইব্যুনাল। এর পর ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় চার মামলা ॥ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত দুই ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত নয়টি মামলার রায় দিয়েছে। এ সব মামলায় আসামির সংখ্যা ১০। তাঁদের মধ্যে আবুল কালাম আযাদ এবং চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান পলাতক থাকায় আপীল করেননি। দ-প্রাপ্ত অপর সাতজন আপীল করেছেন।
এদের মধ্যে আপীল নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয়েছে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার। মৃত্যু হওয়ায় আপীল অকার্যকর হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা আব্দুল আলীমের। বুধবার সাঈদীর রায় হওয়ায় আরও চারটি মামলা আপীল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকছে।
এগুলো হলো- জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম (৯০ বছর কারাদ-), সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ (মৃত্যুদ-), সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (মৃত্যুদ-) ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর (মৃত্যুদ-) আপীল। এর মধ্যে কামারুজ্জামানের করা আপীলের শুনানি শেষে সিএভি রাখা হয়েছে তাঁর রায়।