মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৩, ৭ বৈশাখ ১৪২০
নাশকতার আশঙ্কায় শেরপুরে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা
কামারুজ্জামানের রায় ॥ যে কোন দিন ॥ জেলা শহর অচল করার চেষ্টা হতে পারে, প্রস্তুত র‌্যাব-পুলিশ
নিজস্ব সংবাদদাতা, শেরপুর, ১৯ এপ্রিল ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলার রায়কে সামনে রেখে শেরপুরে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা আরোপ করা হয়েছে। ওই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়ায় যে কোন দিন রায় হতে পারে এবং ওই রায় বিরুদ্ধে গেলে কামারুজ্জামানের নিজ এলাকা শেরপুরে বড় ধরনের জঙ্গী মিছিল, ভাংচুর, লুটপাটসহ নাশকতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র ধারণা করছে। সূত্র মতে, রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে জঙ্গী মিছিল জেলা সদরে প্রবেশ করে শহর অচল এবং অবরোধ সৃষ্টি করে আন্তঃজেলাসহ রাজধানীর সঙ্গে যে কোন পথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই একটি গণহত্যা মামলায় হাইকোর্ট এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আলবদর কমান্ডার ছিলেন। ওই সময়ে তিনি নিজ জেলা শেরপুরসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল এবং ঢাকায় গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দেন। ২১ জুলাই থেকে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় এবং ২ আগস্ট তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর থেকেই তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন। ট্রাইব্যুনালে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্ষণে সহায়তা, নির্যাতন ও দেশান্তরসহ ৭টি অভিযোগ গঠন করা হয়, যার প্রতিটি অভিযোগেরই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-। মঙ্গলবার উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ায় এখন মামলাটি রায়ের জন্য রয়েছে। সরকারী বন্ধ ছাড়া যে কোন দিন তাঁর রায় হতে পারে। এদিকে কামারুজ্জামানের মামলায় রায় সামনে রেখে তাঁর জন্মস্থান জামায়াত অধ্যুষিত বাজিতখিলা ইউনিয়নসহ শেরপুর সদর এবং অন্যান্য উপজেলা পর্যায়ে জামায়াতের নেতাকর্মীরা তটস্থ রয়েছেন। শেরপুরের পুলিশ সুপার মোঃ আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর বিশেষ তৎপরতায় শেরপুরে রাজনীতির মাঠে জামায়াতের অংশগ্রহণ খুব একটা না থাকলেও দলের শীর্ষ দুই নেতাসহ কামারুজ্জামানের মামলার রায়কে সামনে রেখে তারা শঙ্কিত হয়ে পড়লেও তাদের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি থেমে নেই। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সুবাদে তাদের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে জেলা-উপজেলা থেকে তৃণমূল পর্যন্ত। একাধিক মামলায় দলের ৮/১০ জন নেতা জেলা কারাগারে আটক থাকলেও এখনও অনেক নেতাকর্মীসহ প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে এদের একটি অংশ শেরপুরকে অচল করতে ২৮ ফেব্রুয়ারি বাজিতখিলা এলাকা থেকে দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জঙ্গী মিছিল বের করে সড়ক অবরোধসহ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর ও লুটপাট শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে তারা পুলিশের ওপরও হামলা চালায়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও ওই ঘটনাটি জামায়াত-শিবির টেস্ট কেস হিসেবেই নিয়েছিল বলে সূত্রের ধারণা। এখন কামারুজ্জামানসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতার মামলার রায় কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবির চক্র ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করে বড় ধরনের নাশকতা চালানোর পরিকল্পনায় রয়েছে। আর ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জামায়াতের আর্থিক প্রতিষ্ঠান একটি ব্যাংকসহ জামায়াত ঘরানার প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক যোগান দিচ্ছে বলেও খবর রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুবাদে সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নে একটি অংশ বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে নীরবতা পালনসহ ক্ষমতাসীনদের আশপাশে বিচরণ করলেও সদর উপজেলাসহ সমগ্র জেলা থেকে অর্ধশতাধিক মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কামারুজ্জামানের রায়-পরবর্তী দলীয় কর্মসূচীতে শরিক হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। আর এমন অবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা মাথায় রেখেই শেরপুরে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী বিশেষ তৎপর রয়েছে। এ ব্যাপারে শেরপুরের পুলিশ সুপার মোঃ আনিসুর রহমান পিপিএম জনকণ্ঠকে জানান, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের রায়কে কেন্দ্র করে উদ্ভূত অবস্থা চিন্তায় রেখেই পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, যে কোন ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্বাসী ও শান্তিকামী জনগণকেও সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া শেরপুর-জামালপুর অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা র‌্যাব-১২এর অধিনায়ক আহমাদ মাইনুল হাসানও একই সুরে বলেন, কামারুজ্জামানের মামলায় রায় ঘোষণার পর তার নিজ এলাকা শেরপুরে সম্ভাব্য যে কোন ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় র‌্যাব প্রস্তুত রয়েছে। এজন্য জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে। এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট চন্দন কুমার পাল বলেন, শেরপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী লোকজন সবসময়ই যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে রয়েছে। কামারুজ্জামানের রায়কে কেন্দ্র করে কোন বিশেষ অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা হলে তারা অবশ্যই রুখে দাঁড়াবে।