মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১২, ১ ভাদ্র ১৪১৯
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ
অজয় রায়
একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাক সামরিক জান্তার লেলিয়ে দেয়া সেনা-বাহিনীর নিরস্ত্র জনগণের ওপর গণহত্যা শুরুর পর পরই বন্দী হওয়ার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ২৫ মার্চের গভীর রাত্রে, বাংলার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বস্তুত দুটি ঘোষণা দেনÑ প্রথমটি পূর্ব-রেকর্ডকৃত যেখানে ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর ওপর পাকসেনাদের ওপর বর্বর হামলার প্রসঙ্গ নেই, দ্বিতীয়টি তিনি ঘোষণা দেন টেলিফোন মারফত টেলিভবনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ পরিচিত উচ্চপদস্থ অফিসারের মাধ্যমে। প্রথমটি প্রচারিত হয় তৎকালীন ইপিআর সম্প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে। দেশের সকল ইপিআর’এর রিসিভিং স্টেশনে ধরা পড়ে এবং ইপিআর-এর সৈনিকরা তা স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের নিকট পৌঁছে দেন। দ্বিতীয়টি টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের মাধ্যমে দেশের সকল এলাকায় প্রচারিত হয়, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ বিভাগের কর্মচারী-অফিসারদের মাধ্যমে। এরই একটি বাণী চট্টগ্রামস্থ আওয়ামী লীগের নেতা জহুর হোসেন চৌধুরীর নিকট পৌঁছায়। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে আমি একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিÑ যা অন্যত্র প্রকাশিত হয়েছে যেখানে এ সম্পর্কে বিশদ তথ্য দেয়া আছে।
প্রথম ঘোষণাটি নিম্নরূপ:

DECLARATION OF INDEPENDENCE
This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistani occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.
(Message embodying Declaration of Independence sent by Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman to Chittagong shortly after midnight of 25th March, i.e. early hours of 26th March, 1971 for transmission throughout Bangladesh over the ex-EPR transmitter)
এই স্বাধীনতার ঘোষণার দলিলটির সূত্র হিসেবে পুরাতন ৩য় খ-ে ঘোষণাটির শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে :
বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতা-ঘোষণার দুটি ভাষ্য পাওয়া যায়। প্রথমটি আমরা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি, যা পুরাতন সংস্করণের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলের ৩য় খ-ে অন্তর্ভুক্ত। পাঠক লক্ষ্য করবেন যে এখানে ২৫শে মার্চের রাতের পাকিস্তানী বাহিনীর ঢাকার ওপর আক্রমণ বা গণহত্যার কোন প্রসঙ্গ নেই। বলা হয়েছে ‘এটি হয়তো আমার শেষ বাণী, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’ ((This may be my last message, from today Bangladesh is independent)। ঘোষণাটি সংক্ষিপ্ত এবং সরাসরি, আর সেজন্যই এর বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি। তাই অনুমান করা যেতে পারে যে বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণাটি ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পূর্বেই বাণীবদ্ধ করা হয়েছিল এবং তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের কোন না কোন ওয়ারলেস ট্রান্সমিশন যন্ত্র ব্যবহার করে সম্প্রচারিত হয়েছিল ২৫শে মার্চের রাতে গণহত্যা শুরু হওয়ার পর পরই। ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত এবং শেখ সাহেবের নির্দেশেই যে বাস্তবায়িত হয়েছিল- এটিও অনুমান করা অযৌক্তিক হবে না। ২৬শে মার্চের পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিগ্রাফ অফিসে এবং বিভিন্ন ওয়ারলেস রিসিভিং স্টেশনে বঙ্গবন্ধুর নামে আর একটি স্বাধীনতার ঘোষণা ধরা পড়েছে। এটির ভাষ্য তাৎপর্যময়ভাবে ভিন্নতর। সামান্য তারতম্যসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর নামে প্রেরিত ঘোষণাটি মোটামুটি এরকম :
Declaration of War of Independence
Pak army suddenly attacked EPR base at Pilkhana and Rajarbag Police line killing citizens. Street battles are going on in every streets of Dacca, Chittagong. I appeal to the nation of the world for help. Our freedom fighters are gallantly fighting with the enemies to free the motherland. I appeal and order you all in the name of Almighty Allah to fight to the last drop of blood to liberate the country. Ask Police, EPR, Bengal Regiment and Ansar to stand by you and to fight, no compromise, victory is ours. Drive out the enemies from the holy soil of the motherland. Convey this message to all Awami league leaders, workers and other patriots and lovers of freedom.

May Allah, bless you.
Joy Bangla
Sheikh Mujibur Rahman

যদিও বিষয়বস্তুতে তারতম্য নেই, তবুুও ভাষাগত বৈসাদৃশ্যে এই ঘোষণাটিরই একটি ভিন্নতর রূপও দেখা যায়, সেটি নিম্নরূপ:
Bangladesh: A New Sovereign State

BROADCAST DECLARING INDEPENDENCE FROM BANGLADESH RADIO ON 26th MARCH, 1971.

On the Morning of March, the following announcement was broadcast by a radio station controlled by the Bangladesh Liberation army:

“Today Bangladesh is a sovereign and independent state. On Thursday night West Pakistani armed forces suddenly attacked the police barracks at Rajarbagh and the EPR Headquarters at Pheelkhana in Dacca. Many innocent and armed people have been killed in Dacca city and other places of Bangladesh. Violent clashes between East Pakistan Rifles and Police on the one hand and the armed forces of Pindi on the other, are going on. The Bengalis are fighting the enemy with great courage for an independent Bangladesh. Resist the treacherous enemy in every corner of Bangladesh. May God aid us in our fight for freedom.”

“JOY BANGLA”
বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত এই ঘোষণার সাথে বাক্য গঠন ও শব্দ নিয়ে তারতম্য লক্ষিত হলেও মূল স্পিরিট এক ও অভিন্ন। আমি দুটো মাত্র উদাহরণ দেব। তবে প্রথমে বলে রাখি উপরিল্লিখিত মর্মে স্বাধীনতার ঘোষণাটি কোথায় ধরা পড়েছিল। উক্ত বাণীটি চট্টগ্রামের সলিমপুর (কোস্টাল) ওয়ারলেস স্টেশনে ধরা পড়ে। উপরে বর্ণিত ব্যক্তিবর্গ চট্টগ্রামের বিভিন্ন ওয়ারলেস স্টেশনের কর্মচারী ছিলেন। এরাই সে সময় বাণীটির গুরুত্ব অনুধাবন করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ও বহির্বিশ্বে প্রেরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

প্রথম উদাহরণ : উপর্যুক্ত একটি প্রচেষ্টার ফল হল কোলকাতায় কোস্টাল রেডিও স্টেশনে (ঠডঈ) এই বাণীটি ধরা পড়ে, যার ভিত্তিতে বার্তাসংস্থা ইউ.এন.আই’র বরাত দিয়ে বিখ্যাত স্টেটসম্যান পত্রিকা শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার সংবাদ সেদিন (২৭শে মার্চ, ১৯৭১) পরিবেশন করে। সেটি ছিল নিম্নরূপ :
Bangladesh Declares Freedom: Rahman’s step follows Army crackdown:

Pakistan’s Eastern wing rechristened the independent state of Bangladesh by Sheikh Mujibur Rahman in a clandestine radio broadcast … …. Speaking over Swadhin Bangla (free Bengal) Betar Kendra. Mr. Rahman later proclaimed the birth of an independent Bangladesh. Mr. Rahman Said: “Pakistan armed forces suddenly attacked the East Pakistan Rifles base of Pilkhana and Rajarbagh police station in Dacca at zero hours on March 26, killing a number of unarmed people. Fierce fighting is going on with East Pakistan Rifles at Dacca; people are fighting gallantly with the enemy for the cause of freedom of Bangladesh. Every section of the people of Bangladesh asked to resist the enemy forces at any cost in every corner of Bangladesh. May Allah bless you and help you in your struggle for freedom from the enemy. Jai Bangla.”
দ্বিতীয় উদাহরণ : ২৫শে মার্চের কালরাত্রির অন্ধকারে পাকিস্তানীরা গণহত্যা শুরু করলে দেশের সর্বস্তরের মানুষ সর্Ÿত্র স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। টাঙ্গাইলেও জনাব লতিফ সিদ্দিকী ও কাদের সিদ্দিকী এবং স্থানীয় অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে গড়ে ওঠে প্রতিরোধ। গড়ে ওঠে কাদের সিদ্দিকের নেতৃত্বে একটি দুর্ধর্ষ সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী কালক্রমে। ২৬শে মার্চ দুপুরে টাঙ্গাইল ওয়ারলেস কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতার বাণী ধরা পড়েছিল, যা কাদের সিদ্দিকী রচিত স্বাধীনতা ’৭১ গ্রন্থটিতে স্থ্ান পেয়েছে এবং গণভবনে রক্ষিত মেসেজটির প্রায় অনুরূপ। জনাব কাদের সিদ্দিকী উল্লেখ করেছেন:

“এই সময় এক পর্যায়ে কাগমারী বেতারে ২৫ শে মার্চ ’৭১ গভীর রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা ধরা পড়ে -

Pak army suddenly attacked EPR base at Pilkhana and Rajar-bag Police Line killing citizens. Street battles are going on in every streets of Dacca, Chittagong. I appeal to the Nation of the world for help. Our freedom fighters are gallantly fighting with the enemies to free the motherland. I appeal and order you all in the name of Almighty Allah to fight to the last drop of blood to liberate the country. Ask Police, EPR, Bengal Regiment and Ansar to stand by you and to fight, no compromise, victory is ours. Drive out the enemies from the holy soil of the motherland. Convey this message to all Awami league leaders, workers and other patriots and lovers of freedom. May Allah, bless you. Joy Bangla

Sheikh Mujibur Rahman.
26.3.71
“এখন আমরা জানি যে ২য় বার্তাটি যেখানে পিলখানা ও পুলিশ লাইন আক্রান্ত হওয়ার কথা রয়েছে মগবাজারস্থ ওয়ারলেস কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রামস্থ সলিমপুর কোস্টাল স্টেশনে ধরা পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হল এই শেষোক্ত বাণীটি বঙ্গবন্ধু কিভাবে ওয়ারলেস স্টেশনে পৌঁছালেন ? সেই ভয়ঙ্কর রাতে তিনি বুঝতে পারছিলেন যে অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং বিভিন্ন টেলিফোন বার্তা থেকে জেনে ফেলেছিলেন যে পিলখানা-ইপিআর প্রধান দপ্তর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন প্রবলভাবে পাক বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছে; সর্বশেষ অবস্থা জানার পর পরই শেখ সাহেব অতি দ্রুত ২য় বার্তাটি তৈরি করেন, এবং প্রথমত, আগে থেকে ব্যবস্থা করা সেন্ট্রাল ‘টি এন্ড টি’ অফিসের এক বিশ্বস্ত বন্ধুর কাছে টেলিফোনে জানিয়ে দিলেন চট্টগ্রামসহ দেশের সর্বত্র পাঠাতে যা বিশ্বস্ততার সাথে প্রেরিত হয়েছিল ‘টি এন্ড টি’ যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে। দ্বিতীয় ব্যবস্থা করেছিলেন ঐ বিভীষিকাময় রাত্রেও লোক মারফৎ লিখিত মেসেজটি পাঠিয়ে মগবাজারস্থ ওয়ারলেস স্টেশনের মাধ্যমে সারা দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দিতে। কি অসীম সাহসিক সিদ্ধান্ত ও দূরদর্শিতা । এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে রবার্ট পেইন তাঁর পুস্তকে লিখেছেন :
“গভীর রাত নাগাদ তিনি বুঝতে পারলেন যে, ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাঁর টেলিফোনটা অবিরাম বেজে চলছে, কামানের গোলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, আর দূর থেকে আর্ত চিৎকার আর শব্দ ভেসে আসছে .. .. তিনি জেনে ফেলেছেন যে পূর্বপাকিস্তান রাইফেলস এর ব্যারাকগুলো ও রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টার আক্রান্ত হয়েছে। এর একমাত্র অর্থ হচ্ছে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত বাঙ্গালী সশস্ত্র বাহিনীর ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। তাই সেই রাত্রে ২৬ শে মার্চ তিনি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন। সর্বত্র বেতার যোগে পাঠাবার জন্য টেলিফোনে নিম্নোক্ত বাণীটি সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসে জনৈক বন্ধুকে ডিক্টেশন দিলেন।” বাণীটি হচ্ছে Ñ
ÒThe Pakistani Army has attacked police at Rajarbagh and East Pakistan Rifles headquarters at Pillkhana at midnight. Gather strength to resist and prepare for a war of Independence. বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার এই বাণীটি পরদিন সকালেই চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতাদের হাতে ও জনগণের কাছে পৌঁছে যায়। চট্টগ্রামের তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি জনাব এম এ হান্নান সেদিনই অর্থাৎ ২৬ শে মার্চ প্রায় দুপুর দুটার দিকে চট্টগ্রাম (আগ্রাবাদ) বেতার থেকে মিনিট পাঁচেকের ভাষণ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ইংরেজীতে ঘোষিত স্বাধীনতার বাণীটির বাংলা অনুবাদ পাঠ করেন। এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। পরবর্তীকালে একটি স্মৃতিচারণে এ সম্পর্কে বলেছেন :
“.. .. সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৬ শে মার্চ কালুরঘাট ট্রান্সমিটার সেন্টার হতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করি। প্রচারে আমাকে সহযোগিতা করেন রেডিও অফিসের রাখাল চন্দ্র বণিক, মীর্জা আবু মনসুর, অতাউর রহমান কায়সার ও মোশাররফ হোসেন প্রমুখ এম, পি, এ ও এম, এন, এ গণ।”
এ সম্পর্কে কালুরঘাটে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা জনাব বেলাল মোহাম্মদ তাঁর পুস্তকে উল্লেখ করেছেন :
.. .. চট্টগাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান। তাঁকে আমি চিনতাম না। ২৬ মার্চ দুপুরে তিনি আঞ্চলিক প্রকৌশলী মীর্জা নাসিরউদ্দিন এবং বেতার প্রকৌশলী আবদুস সোবহান, দেলওয়ার হোসেন ও মোসলেম খানের প্রকৌশলিক সহযোগিতা আদায় করেছিলেন। পাঁচ মিনিট স্থায়ী একটি বিক্ষিপ্ত অধিবেশনে। ওতে তিনি নিজের নাম-পরিচয়সহ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেছিলেন (পৃ ২৯)।
.. .. ঠিক সন্ধে ৭-৪০ মিনিটে আবুল কাসেম সন্দ্বীপের কণ্ঠে প্রচারিত হয়েছিল : স্বাধীন বাংলা ‘বিপ্লবী’ বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি। .. .. .. ডাক্তার আনোয়ার আলীর কাছ থেকে পাওয়া হ্যান্ডবিলটিও বারবার প্রচারিত হয়েছিল বিভিন্ন কণ্ঠে। বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত ‘জরুরী ঘোষণা’। .. ..অধিবেশন চলাকালে আমি স্টুডিওতেই অবস্থানরত ছিলাম।.. .. স্টুডিওর বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন দুজন আগন্তুক। একজন আমার পূর্ব পরিচিত ডাক্তার। অন্যজন এম এ হান্নান। বলেছিলেন : আপনারা মাইকে আমার নাম ঘোষণা করুন। আমি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রচার করব। : জ্বি আচ্ছা। তবে .. .. আপনার নামটা প্রচার করা হবে না। আপনি নিজের কণ্ঠে শুধু এটি পাঠ করবেন। : কেন, দুপুরবেলা আমি তো আমার নামসহ এটি প্রচার করেছিলাম .. .. বলেছিলাম : দুপুরবেলা আপনি চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণাপত্রটি প্রচার করেছিলেন। .. .. এখন থেকে এ হচ্ছে একটি গুপ্ত বেতার কেন্দ্র। এখান থেকে নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। তাই কোথায় এর অবস্থান, তা আমরা শত্রুদেরকে জানাতে চাই না। .. .. এম এ হান্নান মেনে নিয়েছিলেন। এবং নাম ঘোষণা ছাড়াই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রচার করেছিলেন। বেতারে নিজের কণ্ঠে দ্বিতীয়বার। .. .. ।
কিন্তু জনাব হান্নান বঙ্গবন্ধুর দুটি ঘোষণার মধ্যে কোনটি প্রচার করেছিলেন, আমাদের কথিত ১মটি না ২য়টি যেখানে পিলখানা ইপিআর ব্যারাক এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রান্তের কথা বলা হয়েছে। বেলাল মোহাম্মদ তাঁর বইয়ে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ডাক্তার আনোয়ার আলীর কাছ থেকে পাওয়া হ্যান্ডবিলটিও বারবার প্রচারিত হয়েছিল বিভিন্ন কণ্ঠে। বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত ‘জরুরী ঘোষণা’ (পৃ ৩৩)। আবার ৩১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে Ñ ‘আনোয়ার আলী আমার হাতে একটি সাইক্লোস্টাইল-কার ক্ষুদে হ্যান্ডবিল এগিয়ে দিয়েছিলেন। শিরোনাম ‘জরুরী ঘোষণা’। নিচে ‘স্বাক্ষর শেখ মুজিবুর রহমান’। বক্তব্য বিষয় : অদ্য রাত ১২টায় বর্বর পাক-বাহিনী ঢাকার পিলখানা এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনে অতর্কিত হামলা চালায়। লক্ষ লক্ষ বাঙালি শহীদ হয়েছেন। যুদ্ধ চলছে। আমি এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি এবং সমস্ত বিশ্বেও স্বাধীনতাকামী দেশসমূহের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করছি। জয় বাংলা।’ সুতরাং বোঝা যাচ্ছে জনাব হান্নান বঙ্গবন্ধুর ২য় ঘোষণাটি পাঠ করে শুনিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আর এই বাণীটি মগবাজার ওয়ারলেস কেন্দ্র এবং টেলিগ্রাফ, টেলিফোন ও টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যায় এবং চট্টগ্রামের নন্দনকানসহ দেশের বিভিন্ন ওয়ারলেস গ্রহণ কেন্দ্রে ধরা পড়ে। এ সম্বন্ধে আরও বিশদ তথ্য পরিবেশিত হয়েছে জনাব শামসুল হুদা রচিত ‘একাত্তরের রণাঙ্গন’ গ্রন্থটিতে :
“বাংলার বীর সৈনিক ও পুলিশ বাহিনী যখন মরণ যুদ্ধে লিপ্ত তখন সাধারণ মানুষ ছিলেন শোকাকুল, হতবাক এবং স্তব্ধ। ২৬ শে মার্চ ’৭১ এর সকাল সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর জন্য বয়ে এনেছিল এক সাগর রক্ত, হাহাকার আর শোকের কালো ছায়া। এমনি হতাশার মধ্যে চট্টগ্রামে বিলি হ’ল বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ইংরেজী হ্যান্ডবিল। .. .. চট্টগ্রামের স্থানীয় চিকিৎসক ডা. সৈয়দ আনোয়ার আলী এমনি একটি হ্যান্ডবিল হাতে নিয়ে বাসায় এসে স্ত্রী ডা. মনজুলা আনোয়ারের হাতে দিলেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে শুধু এর বাংলা অনুবাদই করেননি, বসে গেলেন কপি করার কাজে। .. .. কাজে লাগিয়ে দিলেন ডা. আনোয়ার আলীর ভাইজি কাজী হোসনে আরাকে। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বেতারের একজন ঘোষিকা। অনুবাদটির কপি চট্টগ্রামের জনগণের কাছে বিলি করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু এমনি আর কত কপিই বা বিলি করা যায়। .. .. স্বাধীনতা ঘোষণর ঐতিহাসিক বাণীটি চট্টগ্রাম বেতার থেকে প্রচারই তো সর্বোত্তম কাজ। ডাক্তার মনজুলা আনোয়ার স্বামী ডা. আনোয়ার আলীকে জানালেন তাঁর মনের কথা। ডা. আনোয়ার আলী তাৎক্ষণিকভাবে স্ত্রীর কথার সমর্থন জানালেন। স্থানীয় ওয়াপদার দু’জন ইঞ্জিনিয়ার জনাব আশিকুল ইসলাম ও মি: দিলীপসহ তাঁরা ছুটে গেলেন চট্টগ্রাম বেতারে। ওদিকে .. জনাব বেলাল মোহাম্মদ ইতিপূর্বেই চট্টগ্রাম বেতার ভবনে এসে পৌঁছে গেছেন কর্তৃপক্ষের কাছে বেতার চালু করার অনুরোধ নিয়ে। .. জনাব আবুল কাশেম সন্দ্বীপও তখন চট্টগ্রাম বেতারে উপস্থিত ছিলেন। .. .. চট্টগ্রাম বেতারের তৎকালীন সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক জনাব আবদুল কাহ্হার প্রস্তাবিত বেতার কেন্দ্রের নিরাপত্তার কারণে টেলিফোনে বেলাল মোহাম্মদকে পরামর্শ দিলেন কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে চলে যাওয়ার জন্য। পরামর্শ অনুযায়ী তাঁরা ইঞ্জিনিয়ার আশিকুল ইসলামের জীপে ছুটলেন চট্টগ্রাম কালুরঘাট ট্রান্সমিটারের উদ্দেশে। সাথে গেলেন আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, কাজী হোসনে আরা, ডাক্তার মনজুলা আনোয়ার, ডাক্তার আনোয়ার আলী, কবি আবদুল সালাম ও ইঞ্জিনিয়ার দিলীপ। জীপ চালিয়ে নিয়ে গেলেন ইঞ্জিনিয়ার আশিকুল ইসলাম। .. .. ”
এই হল কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ। কালুরঘাট সম্প্রচার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারিত অনুষ্ঠান বাংলার সাত কোটি মানুষ শুনতে শুরু করে একাত্তরের ২৬ মার্চ তারিখে সন্ধ্যা ৭-৪০ মিনিট থেকে। প্রাথমিক উদ্যোক্তাদের সে সময়ে এই সাহসী পদক্ষেপ স্বাধীন বাংলার মানুষ চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। আমরা এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতা জনাব জনাব এম আর সিদ্দিকীর কিছু স্মৃতির উদ্ধৃতি অপ্রাসঙ্গিক হবে না :
.. .. At around 7-00 p.m. (25th March) I manage to contact Sheikh Shaheb through his neighbor Mr. Mosharaff Hossain and Mr. Neem Gouhar. He asked them to tell me that talks had failed. Ask Army, EPR and police not to surrender arms and give a call to people to give resistance. After this all communication with Dhaka was cut off.
The Sangram Parishad discussed the situation and decided to into hiding and go into action. On 26th morning at about 6-30 a.m. my wife Latifa received a phone call from Mr. Moinul Alam (Ittefaq correspondent in Chittagong) who gave her a message from Bangabandhu received through wireless operators of Chittagong. The message read “Message to the people of Bangladesh and to the people of the world. Rajarbagh police camp and Peelkhana EPR suddenly attacked by Pak Army at 24-00 hours. Thousands of people killed. Fierce fighting going on. Appeal to the world for help in our freedom struggle. Resist by all your means. May Allah be with you. Joy Bangla. Message from Sheikh Mujibur Rahman.” .. .. The Sangram Parishad immediately discussed the message and decided to announce the appeal over radio. By this time the radio station at Agrabad was already inaccessible because of the presence of Pak Army. We collected Mr. Belal Chowdhury, Mr. Sultan Ali and other staff of Radio Pakistan Chittagong who suggested broadcasting the message from the Kalurghat relay station. A draft of the announcement was made in Bengali by Dr. Abu Jafar and others and it was decided that Mr. M. A. Hannan, General Secretary of district Awami League would read out the announcement. Accordingly on 26th March at 2-30 p.m. Mr. Hannan read out the historical announcement in the name of Sheikh which is known as the Declaration of Independence. Based on this later Bangladesh Government decided to observe 26th as the National Day. Major Zia and his troops were placed to guard the Kaulurghat Radio Station. Next Day on 27th March Major Zia went on the air and declared himself the President and gave a call for freedom fight. This confused the Awami Leaguers and the public. Mr. A. K. Khan who heard the news said that it will be interpreted as an Army coup and there will be no support nationally or internationally. He made out a new draft in English. Major Zia realized the mistake and read out the new draft saying Sheikh Mujibur Rahman was the president and call himself was on his behalf.
শিল্প ও সংগ্রামে
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। বি কে জাহাঙ্গীর নামেও সাধারণ্যে পরিচিত। সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতার জগতে যুগপৎ সাবলীল পরিভ্রমণে সক্ষম মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রমীদের অন্যতম তিনি। শিল্প-সাহিত্যের নানা পথে মেধাবী পদচারণা ছয় দশকের বেশি সময়জুড়ে। কবিতার জন্য গল্পের জন্য আলোচিত হতে শুরু করেছিলেন গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই। দ্বিজাতিতত্ত্বের পাকিস্তানের আচ্ছন্নতা মুক্ত থেকে মুক্তবুদ্ধির চর্চা তথা সমাজ রূপান্তরের বোধসম্পন্ন চিন্তার সংস্পর্শে আসেন বলতে গেলে কিশোর বয়সেই। তারপর থেকে আজ অবধি আমাদের ভূখ-ে মানুষের বাসযোগ্য সমাজ মানুষের বাসযোগ্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা ও কর্মে নিযুক্ত বি কে জাহাঙ্গীর। তবে তাঁর চিন্তা ও কর্ম নিতান্ত নিজ-ভূগোল প্রীতিতে আচ্ছন্ন না থেকে সম্প্রসারিত-ভুবন দৃষ্টিকে পরম-প্রয়োজনীয়তা হিসাবে মান্য করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার দীর্ঘজীবনে তত্ত্বকে ভেঙে দেখানোর দক্ষতা, তত্ত্বকে বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখানোর পারঙ্গমতা আর বৈশ্বিক জ্ঞানকা-ের সর্বশেষ অগ্রগতিগুলোর বিষয়ে অতি সাবলীল পর্যালোচনার সক্ষমতায় ঋদ্ধ করেছেন অগণিত শিক্ষার্থীকে। বিপ্লব, জাতীয়তাবাদ, মৌলবাদ, কৃষক সমাজ, ধনতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্রিক সন্ত্রাস, লড়াই-সংগ্রামে নারীর ভূমিকাসহ প্রাসঙ্গিক নানাবিধ বিষয়ে বি কে জাহাঙ্গীরের প্রজ্ঞাপূর্ণ অবিরাম লেখালেখির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। চিত্রকলা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া বোদ্ধার সংখ্যাও অনেক বড়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা করলেও নৃবিজ্ঞানী হিসেবে বি কে জাহাঙ্গীরের কর্মপরিধি ব্যাপক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগ বলতে গেলে তাঁর হাতেই তৈরি। গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশে তাৎপর্যবাহী জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নিবিড় অবদান রেখে চলেছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্র।’ বলা যায় ‘সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্র’কে ঘিরে তৈরি হয়েছে জ্ঞানচর্চার সুনির্দিষ্ট একটি ধারা। এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত গবেষণা-জার্নাল ‘সমাজ নিরীক্ষণ’ ও ‘জার্নাল অব সোশ্যাল স্টাডিজ’ এ নিয়মিত লেখালেখি করেন দেশ-বিদেশের গবেষক ও প-িতরা।
বি কে জাহাঙ্গীরের তাঁর জীবন ও চিন্তা নিয়ে জুলাই মাসজুড়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক শান্তনু মজুমদারের সঙ্গে। দৈনিক জনকণ্ঠের পাঠকদের জন্য মাস-দীর্ঘ এই আলোচনাটির প্রথম অংশটি ছাপা হচ্ছে। এই অংশে বি কে জাহাঙ্গীরের শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের নানা স্মৃতি, নানা যুক্ততার বিবরণ-বিশ্লেষণ, মানস গঠনে প্রভাব সৃষ্টিকারী ঘটনাবলী স্থান পেয়েছে। বি কে জাহাঙ্গীরের অনবদ্য কথা-শৈলীর বরাতে পাকিস্তানের প্রথম দিকে পূর্ব বাংলায় বুদ্ধিবৃত্তির নয়া-বিন্যাসের উত্থানপর্বেরও হদিস পাওয়া যাবে এখানে।

ঝালকাঠিময় শৈশব স্মৃতি
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের জন্ম চাঁদপুরের কচুয়ার গুলবাহার গ্রামে। ১৯৩৬ সালে। গুলবাহারকে ঘিওে শৈশবের কোন স্মৃতি তাঁর নেই । শৈশব স্মৃতির প্রতি পরতে জড়িয়ে আছে ঝালকাঠি। চাঁদপুরের মানুষ ঝালকাঠিতে কী? জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “বাবা ছিলেন ঝালকাঠি সরকারী স্কুলের শিক্ষক; আসলে উনি ছিলেন স্কুল পরিদর্শক। স্বদেশী আন্দোলনের সময় ঝালকাঠি স্কুলের ছাত্ররা বেশ একটা ভূমিকা রাখে। আন্দোলন শেষ হয়ে গেলে পরে ব্রিটিশরা এই স্কুলকে নানান সমীকরণ থেকে সরকারীকরণ কওে ফেলে। কিন্তু সে সময় আবার মুসলিম শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছিল না চাহিদামতো; তখন আমার আব্বার পরিদর্শকের পদ পালটে ঐ স্কুলের শিক্ষক হিসেবে পাঠানো হয়, যার সুবাদে আমাদের পরিবার ঝালকাঠিতে যায়।” এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের কথা।
বি কে জাহাঙ্গীর এখনো, প্রায় সাত দশক পরেও বিনা আয়াসে স্মরণ করেন ঝালকাঠি। তাঁর মনে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ শাসকদের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের কথা। আম্মা যেদিন আব্বাকে জানান, ‘ঘরে একটুও চাল নেই’ সেদিন প্রথম দুর্ভিক্ষ ব্যাপারটা বুঝতে শুরু করেন। “মণকে মণ চাল আমরা কিনতাম না কিন্তু যখন যা লাগত কেনা হতো। সেবার অন্যরকম দেখা গেলো; আব্বা চাল যোগাড় করতে পারছেন না।” এর কিছুদিনের মধ্যে দুর্ভিক্ষ একেবারে চাক্ষুষ হয়ে ওঠে। ঝালকাঠি বাজারজুড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ আর মানুষ। হাতপাতা মানুষ। সবখানে ‘কিছু দ্যান’ আওয়াজ। ভাত না হোক ভাতের মাড়। তখন প্রাইমারী যাওয়া জাহাঙ্গীরের মন সাংঘাতিক আলোড়িত হতে থাকে। আব্বার ভূমিকা ছিল দারুণ সে সময় “লঙ্গরখানা, চাউল বিতরণ, অনাহারে মৃতের দাফনে কাটাতেন সারাদিন।”
মনে রয়ে গেছে ঝালকাঠিতে গোরা সৈন্যদের তৎপরতা। বাজাওে যেদিকটায় থানা ছিল সেদিকে আস্তানা নিয়েছিল গোরারা। নদীর নৌকাগুলো ফুটো করে দিচ্ছে গোরারা। এ দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে। তখন বিশ্বযুদ্ধ চলছে। বোঝা যায়, জাপানীদের ঢুকে পড়ার আশঙ্কায় ব্রিটিশদের গৃহীত পোড়ামাটি নীতির আওতা থেকে ঝালকাঠির মতো বলতে গেলে প্রত্যন্ত এক এলাকাও বাদ পড়েনি। ঝালকাঠির সঙ্গে দেশভাগের স্মৃতি ওতপ্রোত হয়ে আছে বি কে জাহাঙ্গীরের মধ্যে। তখন দেশভাগের আগের বছরগুলো। নিতান্ত বালক জাহাঙ্গীর সহসা লক্ষ্য করেন “হিন্দু সহপাঠীদের সঙ্গে কেমন যেন একটা দূরত্ব হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা অনবরত হিন্দু বন্ধুদের বাড়ি যেতাম। হিন্দু সহপাঠীরা একটু কম হলেও আমাদের বাড়ি নিয়মিত আসত।” হঠাৎ যেন এসবে ছেদ পড়তে থাকল। সেই যে স্কুলের স্কাউট শিক্ষক রমেশ বাবু স্যার; দারুণ ফুটবল খেলতেন। অকৃতদার রমেশ স্যার মাঝে-মধ্যেই বাড়ি নিয়ে যেতেন; বিধবা বোনটির বানানো খাবার খাওয়াতেন। সেই প্রথম বুঝতে পারা যে হিন্দু বাড়ি আর মুসলিম বাড়ির খাবারে কিছু তফাৎ আছে। দেশভাগের হাওয়ায় সেসব যাওয়া-যাওয়িতে কেমন যেন ভাটা লাগে। ঝালকাঠি নিয়ে কথায় বি কে জাহাঙ্গীরের মনে আসে জ্ঞানবাবুকে। ডাক্তার মানুষ। একটা লঞ্চ ছিল। ওটা নিয়ে গ্রামে-গ্রামে রোগী দেখে বেড়াতেন। ছিলেন আব্বার সহকর্মী হেমবাবু স্যার। “সাইকেলটা চালিয়ে আমাদের বাড়ি এসে বলতেন, তোমার আম্মার কাছ থেকে মুরগির ডিম নিয়ে আস। আমি এনে দিতাম। আম্মা মুরগি পালতেন।”
শৈশবের ঝালকাঠির আরো অনেকের কথা মনে আছে, তবে আজিজ ভাইয়ের মতো আর কাউকে নয়। সেই যেদিন আম্মা আব্বাকে জানিয়েছিলেন ঘরে চাল নেই সেদিন আজিজ ভাই বিষখালী নদীর অপর পাড়ে গিয়ে আধা বস্তা চাল যোগাড় করে এনে দিয়েছিলেন। এমনিতেও বাড়ি থেকে আসার সময় দুধ নিয়ে আসতেন প্রতিদিন। সকালে এসে নাস্তা সেরে জাহাঙ্গীর ও অন্য ভাইবোনদের পড়াতে বসতেন। যেদিন আজিজ ভাইকে থানার বারান্দাতে কোমরে দড়ি অবস্থায় দেখতে পাওয়া গেল সেদিনকার মতো আঘাত এর আগে কখনও পাওয়া হয়নি বালক জাহাঙ্গীরের। করেছেন কী আজিজ ভাই? কী করেছেন আজিজ ভাই? ঘুরে ঘুরে একই প্রশ্ন একে-তাকে। পরে এক কনস্টেবল সাহেব জানান, “আজিজ বড় সাংঘাতিক লোক! সে চুরি-ডাকাতির চেয়েও অধম কাজ করেছে। সে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সে টেলিগ্রাফের লাইন কেটে দিয়েছে।” কনস্টেবল সাহেবের কথা মাথায় ঢুকে না। পরে আব্বা বলেন, ‘আজিজ রাজনীতি করে। সে সোশ্যালিস্ট পার্টি করে।‘ ততদিনে কংগ্রেসের নাম জানা হয়ে গেছে, মুসলিম লীগের কথাও। এদেরকে দেখা যায় ঝালকাঠিতে। কিন্তু সোশ্যালিস্ট? সেটা কী? জিজ্ঞেস করলে আব্বার উত্তর, ‘বড় হও, তখন বুঝবে।’ শব্দটা মাথায় রয়ে যায় কিন্তু কিছুদিনের জন্য হারিয়ে যান আজিজ ভাই। জানা যায় আজিজ ভাইয়ের জেল হয়েছে।
কিছুদিন জেল খেটে প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে আবার ঝালকাঠিতে আসেন আজিজ ভাই। তবে তখন থেকে তিনি থাকতেন বরিশালে। ঝালকাঠি আসার সময় জাহাঙ্গীরদের জন্য নিয়ে আসতেন বই। একটা লাইব্রেরিও গড়ে দিয়েছিলেন। পাঠ্যপুস্তকের নয়, ‘আউট বই’ এর লাইব্রেরি। আব্বার সহায়তায় আজিজ ভাইয়ের গড়া লাইব্রেরি নিয়ে বি কে জাহাঙ্গীর বলেন, “সেখানে ছোটদের রাজনীতি, ছোটদের অর্থনীতির মতো অনেক বই ছিল। আজিজ ভাই যখনই আসতেন তখনই আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে বেড়াতে যেতেন আর আমাদের পড়া বইগুলো নিয়ে আলাপ করতেন।” একটা সময় এসে জানা গেল আজিজ ভাই আরএসপি অর্থাৎ রেভ্যুলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত।
জিজ্ঞাসা করি, আজিজ ভাই কি আপনাকে বা আপনার সহপাঠীদের কাউকে তাঁর পার্টিতে নিতে চেয়েছিলেন?
“না। তেমন কিছু তিনি করেননি। তবে তিনি আমাদের মাথায় কতগুলো প্রশ্ন আর তথ্য ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের লোকেরা গরিব কেন? এর জন্য দায়ী কারা। জানিয়েছেন যে এসবের জন্য দায়ী ইংরেজরা। আমাদের মুক্তির পথে অন্তরায় কট্টর হিন্দু আর কট্টর মুসলিমরা। হিন্দু মহাসভা। মুসলিম লীগ। এরকমসব কথা বলতেন আজিজ ভাই।” আলাপে মনে হয় মুক্তমনা পিতার কথা বাদ দিলে, এই গৃহশিক্ষক মোহাম্মদ আজিজ হচ্ছেন বি কে জাহাঙ্গীরের শৈশবে মানসগঠনে বড় ছাপ রেখে যাওয়া প্রথম মানুষ।
ঝালকাঠি নিয়ে কথাগুলো বলার সময় নিজের অজান্তেই কি গলা একটু ধরে আসে বি কে জাহাঙ্গীরের? কে জানে? দক্ষিণবঙ্গের এই জনপদ নিয়ে তাঁর স্মৃতি মনে হয় অফুরান। যেন দেখতে পাচ্ছেন এখনও ঐ যে নদীর পার ধরে চলতে থাকা রাস্তা; হাওয়াতে শনশন দু’পাশে ঝাউগাছ। রাস্তার মাথাতে সরকারী লাশকাটা ঘর। ওটার আশপাশে পৌঁছলেই কি ভয় কি ভয়। নাক-কান বুজে একদৌড়ে জায়গাটা পার হয় জাহাঙ্গীর ও সাথীরা। ভয় লাগে তবু রাস্তাটা টানে।
ঝালকাঠিতে থাকার সময় মধুর স্মৃতিগুলোর দুয়েকটি শুনতে চাওয়া হলো।
“একবার কলকাতা থেকে নাটকের দল এসেছে। বড় হয়ে বুঝেছিলাম ওরা ছিল কমিউনিস্টপন্থী আইপিটিএ।” ‘ছেঁড়াতার’ নাটক হবে হিন্দুদের সঙ্কীর্তনের থানে। জাহাঙ্গীররা ঘুর ঘুর করে। টিকেট কেনার পয়সা নেই। কিন্তু নাটক দেখা চাই যে। শেষে দলের নাটকের দলের এক কর্তা সবাইকে বসিয়ে দেয় মঞ্চের সামনে বসানো শতরঞ্চিতে। “আমরা সবাই, আমার হিন্দু সহপাঠীরা, আমার মুসলিম সহপাঠীরা, আমরা একেবারে অভিভূত হয়ে যাই নাটক দেখে” সে কোন এক সন্ধ্যার নাটক নিয়ে এখনও মুগ্ধতা ঝরে কণ্ঠে। মনে আছে, ঘাটে ভিড়ে থাকা জাহাজের আলোতে ঝলমলানো সন্ধ্যাগুলোর কথা। ঝালকাঠিতে তখনো বিজলী বাতি আসেনি। জাহাজগুলো ডায়নামো চালিয়ে আলো জ্বালাত। ছোটদের সে যে কি আকর্ষণ। দল বেঁধে উঠে পড়া হতো জাহাজে। সারেঙ-সুখানীরা বকা লাগাতেন না; শুধু জাহাজ ছাড়ার ভেঁপু বাজলেই নেমে যাবার কথা মনে করিয়ে দিতেন। বাজারের কাছাকাছি ভূ-কৈলাসের জমিদার বাবুদের বাড়িখানাও ছিল ‘দেখার মতো।’ সে বাড়ির স্থলপদ্মের বাগানখানি! দুর্ভিক্ষ দেখতে এসে গান্ধীজী একবার ছিলেন এই বাড়িতে।
গান্ধী মানুষটা কে? কি তাঁর গুরুত্ব? খুব স্পষ্ট না হলেও মোটামুটি বুঝতে পারছিলেন তখন। সে আমলে ঝালকাঠি পাঠ-আমোদী মানুষের চাহিদা মেটাত দুটি বইয়ের দোকান। একটি নূর মোহাম্মদ মিয়ার। তাঁর দোকানে আজাদ পত্রিকা পাওয়া যেত। আরেকটি দোকান ছিল কৈলাস বাবু। সে দোকানে থাকত আনন্দবাজার পত্রিকা। দেশ তখন হিন্দু-মুসলিম লাইনে সরে যাচ্ছিল; বোঝাই যাচ্ছে। মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে; এদিকে দেশভাগ চূড়ান্ত হয়ে উঠছে। এমনি সময়ে ঝালকাঠিতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হতে থাকে। জাহাঙ্গীর বুঝতে শেখেন ‘হিন্দু-মুসলমানে ঝগড়া করে। হিন্দু-মুসলমানে কাজিয়া করে।’ চেনা ঝালকাঠি অচেনা হতে থাকে যেন। অবস্থা এমন জায়গায় চলে যায় যে ‘আব্বা বলে দিলেন সন্ধ্যার পর একলা বাজারের দিকে যাওয়া যাবে না।’

১৯৪৬ সাল : কৈশোরে ঢাকাতে
আশেক আলী খান-সুলতানা খানম দম্পতির জ্যেষ্ঠ সন্তান মিসবাহউদ্দীন খান মেট্রিক পাস করলে তাকে ঢাকায় পড়তে পাঠানো হয়। সে ধারাবাহিকতাতে চতুর্থ সন্তান তথা দ্বিতীয় পুত্র বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরকেও ঢাকায় ভর্তি করা হয়; মুসলিম হাইস্কুলে। থাকার জায়গা হয় ডাফরিন হোস্টেলে। লর্ড ডাফরিনের নামে হোস্টেলের নাম। ঢাকাতে এসে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে রায়টের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করতে থাকেন জাহাঙ্গীর। মুসলিম স্কুল ছিল ভিক্টোরিয়া পার্কের (বর্তমানের বাহাদুর শাহ পার্ক) পাশে। এর একদিকে ছিল হিন্দু-বসত; অন্যদিকে মুসলিম। দু’পক্ষের মধ্যে যখন-তখন বেধে যেত। এমনকি স্কুলগুলোতেও ভেদাভেদটা ছিল স্পষ্টÑ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মুসলমানরা মুসলিম হাইস্কুলে আর হিন্দুরা পগোজে।
বিপদ হতো না? মানে কার কোন এলাকা এটা নিখুঁত করে মনে রাখাটা তো স্থানীয় ছাড়া অন্যদের জন্য মুশকিল।
“কখন যে কোন এলাকায় কে ঢুকে পড়ত। বড় বিপদের দিন ছিল সেগুলো। প্রায়ই দাঙ্গা লাগত। স্কুলের কাছাকাছি একটা চার্চ ছিল। হঠাৎ রাস্তায় দাঙ্গা লেগে গেলে কয়েকবার চার্চে ঢুকে পড়েছিলাম। ফাদার আমাদের অভয় দিতেন। তাঁতীবাজারের মোড়ে ধুতি পরা একজন মানুষ আমাকে একদিন বাঁচিয়েছিলেন। ঐ এলাকাটা মুসলমানদের জন্য নিরাপদ নয় এটা মনেও করিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর তিনি দাঁড়িয়ে থেকেছিলেন আর আমি এক দৌড়ে মুসলিম এলাকায় ঢুকে পড়েছিলাম।” অনেক দিন পরে আবার দেখা হলে জানা যায় ভদ্রলোক কমিউনিস্ট পার্টি করেন।
ধর্মের ভিত্তিতে তখন দেশভাগ হবে-হচ্ছে। কিন্তু কিশোর জাহাঙ্গীরের মনোভূমিতে সে ঘটনা প্রধান উপাদান হয়ে উঠেনি। ততদিনে ‘আমি পালটে যাচ্ছি’ এই অনুভূতিটা নিজের কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বামপন্থার প্রতি আকর্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে। লেখালেখির শুরুটাও ঠিক এই সময়টাতেই। ততদিনে সখ্য হয়েছে হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। জাহাঙ্গীরের লেখালেখিতে ব্যাপক উৎসাহ হাসানের। তখন আরো পরিচয় হয়েছে আবদুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দীনের সঙ্গে, যিনি কিনা ‘দারুণ কমিউনিস্ট।’ আরো ছিলেন ‘লম্বা টুপি পরা’ জয়নুদ্দীন স্যার যিনি শোনাতেন রুশ বিপ্লবের কাহিনী। একসময় জানা গেল ‘এই দাঁড়ি-টুপির মানুষটা কমিউনিস্ট।’ আরেকজন শিক্ষকও, আবুদল্লাহ উপন্যাসের লেখক কাজি এমদাদুল হকের ছেলে, ছিলেন বামপন্থী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গরিব মুসলিম পরিবার থেকে আসা ছাত্রদের পড়ানো মুসলিম হাইস্কুলের অনেক শিক্ষকই গোপনে বামপন্থী ছিলেন। আর ছিলেন হোস্টেল সুপার - মৌলানা আম্বর আলী; ইনি লেখক মনজুরে মাওলার বাবা। এঁর আরেক পরিচিতি হচ্ছে, “ইনি একসময় আব্বার কলিগ ছিলেন। তাঁর সুবাদে নানা সুবিধা পেয়েছি। কি বই পড়ছি না পড়ছি তা কেউ দেখতে আসত না। আমি আসলে কপিবুক মুসলিম ছাত্র ছিলাম না; নামাজ পড়তাম না।” বি কে জাহাঙ্গীরের ধারণা এসব লোকজনের সান্নিধ্য আর অবাধে বই পড়তে পারার সুযোগের মধ্য দিয়ে তাঁর মধ্যে বামপন্থার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হতে থাকে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের ব্যাপারটা ঘটে চোখের সামনে। নতুন পতাকা, স্কুলে প্যারেডে ও মিষ্টি বিতরণে নতুন দেশের জন্ম অনুভূত হলো।
কেমন লাগছিল সেদিনগুলোতে? জানতে চাওয়া হলো।
‘আমি দুঃখিত বা আনন্দিত কোনটাই হইনি।’
এটা কি ব্যতিক্রমী নয়?
“আসলে হিন্দু হলেই খারাপ আর মুসলমান হলেই ভালো এরকম মনোভাব আমার মধ্যে গড়ে ওঠেনি। আরেকটা কথা হচ্ছে, ছাত্রদের মধ্যেও তেমন বিপুল কোন উদ্দীপনা দেখিনি। পাকিস্তান হয়েছে ঠিক আছে এরকম একটা ব্যাপার।” ঢাকাতে নবাববাড়ী, ছোট কাটরা, বড় কাটরা, লালবাগের মতো কয়েকটি এলাকাতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বেশ একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল; পুরো শহরে নয়। এর একটা কারণ হচ্ছে তখনকার দিনে মুসলিম পরিবারের ছাত্ররা ম্যাট্রিক পাস করলেই কলকাতা চলে যেতেন; ঢাকায় থাকতেন না। ফলে পাকিস্তান নিয়ে ঢাকাতে মাতামাতি সংঘটিত করার লোক খুব একটা ছিল না। এ সময় বামপন্থার প্রতি আকর্ষণ বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে বামপন্থীদের সঙ্গে যোগাযোগও হতে থাকে।
সে সময়টাতে তো সবকিছু পাকিস্তানময়। তাই না?
“ঠিক আছে। কিন্তু মনে রাখবেন সে সময় আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টি শক্তি অর্জন করছে; মুসলিম ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ছে। হিন্দু কমিউনিস্টদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ছে। একটা বোধ তৈরি হচ্ছে।”
আলোচনার মধ্যে একফাঁকে ঢুকে পড়ে সেকালের ঢাকা। সেকালের সদরঘাট খুব সুন্দর একটা জায়গা ছিল। লোকে বেড়াতে যেত। বি কে জাহাঙ্গীরদের যাওয়া ছিল নিয়মিত। হোস্টেল থেকে দূওে তো নয়। তখন সিনেমা হল ছিল মুকুল, রূপমহল। কাছাকাছি ছিল হিন্দুদের পরিচালিত এক কেবিন। এতদিনে নাম আর মনে নেই। তবে কেবিনে বানানো কাটলেটের স্বাদ মনে আছে। টানাটানির পকেটে প্রায়ই একটা সমস্যায় পড়তে হতোÑ সিনেমা না কাটলেট? একসঙ্গে দুটো হবার নয়। অত পয়সা আসবে কোত্থেকে? এমনিতে হোস্টেলে বাকি পড়ত মাঝেমধ্যে। হোস্টেল সুপার এজন্য কখনো তাড়া দিতেন না। স্কুলের বন্ধুরা সব হারিয়ে গেছে। স্কুলের বেশিরভাগ ছেলে আশপাশের ব্যবসায়িক পরিবারের। এরা মেট্রিকটা পাস করেই ব্যবসা-বাণিজ্যে ঢুকে যেত। বছরখানেক আগে ওয়াসার এক ইঞ্জিনিয়ার রসমালাইয়ের ভা- নিয়ে দেখা করে যান; ইনি মুসলিম হাইস্কুলে সহপাঠী ছিলেন বি কে জাহাঙ্গীরের। অন্যরা কে যে কোথায় আছে জানা নেই।
জাহাঙ্গীরদের স্কুলকালেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দম্ভোক্তি, ‘উর্দু হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ প্রতিবাদের গরম হাওয়াটা গায়ে লাগতে শুরু করে প্রথম থেকে। এই সময়টা গ্রামাঞ্চলে কৃষক আন্দোলনেরও - এটা বি কে জাহাঙ্গীর কখনোই ভুলে যান না। তাই তাঁর সৃষ্টিশীলতা আর মননশীলতার চর্চাতে কৃষক বিদ্রোহ ঘুরে-ফিরে স্থান করে নিয়েছে অবিরত। আলোচনা যত দিন গড়িয়েছে লক্ষ্য করা গেছে একই ব্যাপার। চৈতন্যে কৃষকের লড়াই স্থান করে নেয়ার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আবদুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দীন একদিন সদরঘাটে আমাকে ধরলেন। বর্শাধারী এক হাজংয়ের পোস্টার দিলেন। হাজংদের বিদ্রোহ নিয়ে কথা বললেন। আমি যোগ দেব কিনা জানতে চাইলেন। আমি বললাম, ভেবে দেখি।” পরের দেখা হবার কথা ছিল তা আর হয়নি; পার্টির নির্দেশে মুতি চলে গেছেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। তবে তাঁর বলা কথাগুলো দেয়া পোস্টারটি গভীর ছাপ ফেলে বি কে জাহাঙ্গীরের মনেÑ ‘হাজং বিদ্রোহ’ বা এমন একটা কিছু শিরোনামে একটা গল্প লেখা হয়ে যায়। সে লেখা হারিয়ে গেছে বহুকাল আগে। কিন্তু হারায়নি কৃষকের লড়াই আর কৃষকের জীবন জানার আগ্রহ। মনে পড়ে গেল যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পর্যায়ে ‘সমাজ পরিবর্তন’ বিষয়ক কোর্স আর মাস্টার্সে ‘পাবলিক পলিসি’ পড়ানোর সময়েও আমাদের স্যার অধ্যাপক বি কে জাহাঙ্গীর প্রভূত গুরুত্ব দিয়ে আমাদের সামনে আলোচনা করতেন বাংলার কৃষক বিদ্রোহ, বিদ্রোহের স্বরূপ। ‘বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল ও শ্রেণী সংগ্রাম’ সম্ভবত এপ্রসঙ্গে তাঁর গুরুত্বপূর্ণতম কাজ।
পাকিস্তান তৈরি হয়ে যাওয়াতে কি ধরনের আবেগ-অনুভূতি বোধ করছিলেন এ ব্যাপারটা বার বার কিছুটা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই কয়েকদিন ধরেই জানতে চাওয়া হচ্ছিল। একদিন তিনি বললেন, “শুনুন, পাকিস্তান আন্দোলনের আগে থেকেই চলছিল কৃষক আন্দোলন। আর সে সময় কমিউনিস্ট আন্দোলনের লোকেরা ব্রাইট মুসলিম ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। ফলে আমাদের মতো পড়াশোনাতে আগ্রহী ছেলেরা পাকিস্তান নিয়ে নয় গণআন্দোলন নিয়ে বেশি ভাবিত হতে শিখেছিল।”
ভাষা আন্দোলন সূচনাপর্ব প্রসঙ্গে বি কে জাহাঙ্গীর বলেন, “১৯৪৭ সাল থেকেই একটা বিষয় আমরা টের পেতে থাকি। বাঙালীরা নতুন গঠিত পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অথচ সরকারী পর্যায়ে বাংলা নেই! কিভাবে মানবো?” জিন্নাহর ঘোষণা আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
১৯৫০ : এবার ঢাকা কলেজে
সময় যায় দেখতে-দেখতে। ১৯৫০ সাল। ঝালকাঠির বালক, মুসলিম স্কুলের কিশোর ততদিনে তরুণ তুর্কি বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। স্কুল পাড়ি দিয়ে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা কলেজে। এবারের থাকবার জায়গা বেগম বাজারের নূরপুর ভিলা। তখন ঢাকা কলেজের হোস্টেল আরো দুটি ছিল মোস্তফা হাউস আর ঢাকা কলেজ হোস্টেল। ঢাকা কলেজে এসে শিক্ষক হিসাবে পাওয়া গেল হেমায়েত উদ্দীন সাহেবকে; ইনি প্রকাশ্য কমিউনিস্ট। অর্থনীতি পড়াতেন ন্যাপের মোজাফফর আহমদ। এ সময় আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টির লিফলেট হাতে আসতে শুরু করে। নিয়ে আসতেন পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হিসাবে খ্যাতিমান ওয়াহিদুল হক।
তখন কি পার্টিতে যোগ দেয়ার ডাক পেয়েছিলেন?
“ব্যাপারটা এরকমের নয়। তখন পার্টি আহ্বান জানানোর মতো কিছু করত না। পার্টি পর্যবেক্ষণে রাখত। পরে পার্টি সেল থেকে ওকে করে করা হলে তখন যোগদান করানোর প্রশ্ন আসত।”
এ পর্যায়ে এসে কথা বলতে-বলতে মনে হয় আলোচ্য সময়টিতে সরাসরি রাজনীতি নয় বরং গভীরভাবে রাজনীতিক বোধসম্পন্ন থেকে প্রগতিশীল শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার দিক ঝুঁকছিলেন বি কে জাহাঙ্গীর। কলেজ জীবনে তাঁর বন্ধুরা হচ্ছেন হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, ওয়াহিদুল হক প্রমুখ। ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, একটু চুপচাপ টাইপ আর ভাল গল্প লিখতেন। কলেজের বাইরে আমিনুল ইসলাম, মর্তুজা বশীর এই দু’জনও নিয়ে আসত কমিউনিস্ট পার্টির কাগজপত্র। বইপড়ার নেশা ততদিনে তীব্রতর। বই নিয়ে তুমুল আলোচনা মগ্ন থাকে এই তরুণেরা। কিন্তু ভাল বইপত্র কোথায় পূর্ব পাকিস্তানে? তেমন কোন বইয়ের দোকানও তখন নেই ঢাকা শহরে। আরমানীটোলার ওয়ারসি বুক হাউসে পাওয়া যেত কিছু নতুন বইপত্র। কলকাতা থেকে কচ্চিৎ আসা বইগুলো ‘পাগল হয়ে’ কিনতেন জাহাঙ্গীররা। এর বাইরে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি সামান্য কিছু বই আনত। বই পড়ার সুযোগ পাবার জন্য ওয়ারসি বুকের মালিক আবদুল বারী ওয়ারসির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন বি কে জাহাঙ্গীর ও তাঁর বন্ধুরা।
আপনার এসময়কার বন্ধু আর কারা? বন্ধুত্ব বা ঘনিষ্ঠতা কাদের সঙ্গে?
“বুঝতেই পারছেন আমি তখন মোটামুটি বামের সঙ্গে যুক্ত। একদিন আমার কাছে একটা চিরকুট এলো টক টু জহির। জহির মানে জহির রায়হান। তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার ততদিনে বড় নেতা। এঁদের বাবা ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসার হোস্টেল সুপার আর এই দুইভাই হচ্ছেন বামপন্থী। গোয়েন্দারা জানত কিন্তু কিছু বলত না। ভাবত মাওলানার ছেলে; এরা তো গবর্মেন্টকে ফেলে দিতে চাইছে না Ñ এরকম একটা ব্যাপার আর কি।”
‘ফর আ লাস্টিং পিস ফর আ পিপলস ডেমোক্র্যাসি’ নামের বুখারেস্ট থেকে প্রকাশিত কমিউনিস্টদের একটি পত্রিকা নিয়মিত আসত শহীদুল্লাহ কায়সারের কাছে। একদিন আলাপে-আলাপে পত্রিকার কপিগুলো দেখতে চাইলে জহির আলুর বাজারে তাঁদের আলিয়া মাদ্রাসার বাসায় নিয়ে যান জাহাঙ্গীরকে। সেখানে দেখা হয় কথা হয় শহীদুল্লাহ কায়সারের সঙ্গে, সদ্য পাস দেয়া ডাক্তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে, এঁদের বাবার সঙ্গে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া হয়। তারপর পত্রিকা দেখতে দেন শহীদুল্লাহ কায়সার। যখন খুশি আসার, বই-পত্রিকা নিয়ে যাবার কথা বললেন তিনি। “আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে কেন জহিরের সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়েছিল বুঝতে পারলাম। আসলে তাঁরা আমাকে এভাবে প্রগতিশীল বইপত্র পড়াশোনার সুযোগ করে দিচ্ছিলেন”, বি কে জাহাঙ্গীর জানান। (চলবে)
স্বদেশে কেমন থাকেন বাঙালীরা?
সুলতানা আজীম
শিরোনামটি স্বদেশে হলেও লিখবো আমি প্রধানত ঢাকার কথা। মানে, ঢাকায় কেমন থাকেন বাঙালীরা। প্রাসঙ্গিকভাবে আসতে পারে ঢাকার বাইরের কথা। অন্য অনেক কথা। যা লেখার কোন রকম পরিকল্পনা নেই, থাকতে পারে তেমন বিষয়ও। কারণটি কি? প্রথাগত শৃঙ্খলা মেনে লিখতে পারি না আমি। খুব পরিকল্পিতও নয় আমার লেখা।
বাঙালী বলতে, সচ্ছল এবং ধনী বাঙালীদের সম্পর্কে লিখতে চাচ্ছি প্রথম। এদেশের অধিকাংশ মানুষ, দরিদ্র যারা, মানবেতর জীবন যাদের, তাদের কি বাঙালী মনে করি আমরা? মানুষ কি মনে করি তাদের? করি না। তাঁরা কেমন থাকেন নিজের দেশে, তাতে আমাদের আগ্রহ কতটুকু? সেজন্যেই তাদের জীবনযাপন নিয়ে লিখবো পরে।
বাংলাদেশ একটি জাতি, একটি মাতৃভাষার দেশ হলেও, এর অজস্র চেহারা। সব লিখে বোঝানো অসম্ভব। সব নয়, কিছু কিছু বিষয় নিয়ে লেখার চেষ্টা করবো।
‘বড়লোক’ বলা হয় ধনীদের এদেশে। লেখাও হয়। যুক্তি এবং কারণ কি জানি না। সঠিক অর্থ কি শব্দটির, বুঝতে পারি না। এই শব্দ কোনো মানুষের ওপর প্রজোয্য হতে পারে না বলে মনে করি আমি। তাই ব্যবহার করি না শব্দটি। একইভাবে ‘ছোটলোক’ শব্দটিও নয়।
লিখতে শুরু করেছিলাম এটি দু’হাজার পাঁচ সালে। শেষ করিনি, আমার স্বভাবের নিয়মে। ভুলে গিয়েছিলাম অসমাপ্ত এই লেখাটির কথা। পুরনো অংশ যোগ করতে যেয়ে ঝামেলায় পড়েছি। কারণ হচ্ছে, পরিস্থিতির ব্যবধান। যারা পড়বেন, তাঁরা যদি বোঝেন ব্যাপারটি, তা হলেই হবে।
নিজের দেশে আমার জীবনযাপন কেমন, তা নিয়ে লিখছি শুরুতে। ‘সংক্ষেপ’ শব্দটি মনে রেখে। ধারণা করছি, এটা হবে এ দেশের অধিকাংশ মানুষের অভিজ্ঞতা। আমার দৃষ্টিভঙ্গি চেতনা ও মানসিকতার সাথে একমতও হতে পারেন কেউ কেউ।
অজস্র শ্রেণীতে বিভক্ত মানুষের এই দেশে, কোন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারিনি আমি। শ্রেণীহীন এই আমার, কোন সম্পত্তি নেই বাংলাদেশে। সম্পত্তি, লোভ আর ভোগ বিলাস ব্যাপারগুলো, আগ্রহের বিষয় ছিলো না কখনো। নেই এখনো। জীবন সম্পর্কে নিজের যে দর্শন তা হচ্ছে, এই জীবনটি একটি দৈব। পৃথিবীতে নাও আসতে পারতাম। তাতে কিছুই যেত আসত না কারো। জন্মেছি কোথায়, দৈব সেটাও। রাস্তার নর্দমার পাশে, অথবা কোন প্রাসাদে জন্ম হতে পারতো। হতে পারতো, পৃথিবীর যে কোন স্থানে। যেখানে রয়েছে মানুষের সমাজ। আদিবাসী সমাজেও।
গুরুত্ব কি এই প্রকৃতির কাছে মানুষ হিসেবে আমার? না, কোন গুরুত্বই নেই। প্রকৃতির কাউকে, কোন কিছুকেই চেনে না প্রকৃতি। ‘অন্ধ ঘড়ি নির্মাতা’ বলেছেন তাই বিজ্ঞানী ‘রিচার্ড ডাওকিন্স’ প্রকৃতিকে। বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের ভেতরে দুইশত বছর যদি বেঁচে থাকি, তাও কিছু নয়। জীবন এই মুহূর্তের। পরের মুহূর্তে নাও থাকতে পারে। এক সেকেন্ডের এই জীবনটি, তবুও সুন্দর। ভীষণ সুন্দর। অপরূপ এই জীবনটি পেয়েছি আমি, একবারের জন্যে। প্রকৃতির কারো কোন রকম ক্ষতি না করে, কিভাবে কাটাবো নিজের জীবন, সেই সিদ্ধান্ত শুধুই আমার।
খানিকটা সচ্ছলভাবে চলার মতো টাকা উপার্জন করবো, সততার সাথে। নিয়মিত অভাবের অশান্তি যেনো বিঘিœত করতে না পারে, জীবনের অসীম সৌন্দর্যকে। ভালোবাসবো প্রকৃতির সব কিছুকে, যা সাহায্য করছে বাঁচিয়ে রাখতে আমাকে। রক্ষা করবো প্রকৃতির মর্যাদা এবং সম্মান, সবটুকু দায়িত্ব মেনে। থাকবো সুস্থ, যতটা সম্ভব, শরীরে মনে মগজে। হাসবো দু’ঠোঁট ভরে, যত পারি। ঘুমাবো, নিশ্চিন্তে আর পরিপূর্ণ তৃপ্তিতে। অনুভব করবো প্রতিদিন, সেভাবেই বেঁচে আছি যেভাবে বাঁচতে চাচ্ছি। জীবনের প্রধান সুখ আমার এটা। নিজের ইচ্ছে আর আনন্দে নিজের মতো করে বেঁচে থাকা।
নিজের জন্যে যে বাঁচে, সে আসলে বাঁচে না। অন্যের জন্যে যে বাঁচে, সে কখনো মরে না। মেনে চলবো নিজের এই দর্শন, প্রতিদিনের কর্মকা-ে। চলে যাবার সময় যেনো অনুভব করি, এসেছিলাম মানুষ হিসেবে। ফিরেও যাচ্ছি সেভাবে। নিয়ে আসিনি কোন সম্পত্তি সাথে করে। রেখেও যাচ্ছি না কিছু। যা রইলো, তা আমার কাজগুলো আর আমার দর্শন, যদি তা হয়ে থাকে কল্যাণকর। আর সম্পদ? গেত আমার মগজ, চরিত্র, আর যৌক্তিক চেতনা। এর চেয়ে বড় সম্পদ, কি আর হতে পারে মানুষের?
লোভ ভোগ আর স্বার্থকে সব কিছুর ওপরে মেনে, তা আদায় করতে যেয়েই কি জটিল আর কঠিন করে তুলি না আমরা, খুব ছোট্ট এ জীবন? জীবনের স্বার্থ তো এই, বেঁচে থাকা, যতদিন পারি। স্বার্থ তো এই, বেঁচে থাকা সুস্থভাবে, যতটা সম্ভব। স্বার্থ আরও একটি, নিজে বাঁচি, অন্যকেও বাঁচতে দিই। এসো আমরা সবাই মিলে চমৎকারভাবে বাঁচি। সব মানুষ, প্রাণী এবং প্রকৃতির অধিকার রক্ষা করে যে জীবন, তা-ই সবচেয়ে সুন্দর। সে জীবনে না পাওয়ার অভাব আর বেদনা থাকে না।
‘জীবন অর্থহীন, তাই তাকে অর্থপূর্ণ করার চেষ্টা করে মানুষ বিভিন্নভাবে।’ আলবেয়ার ক্যামোর এই দর্শন মানতে পারিনি আমি। অপূর্ব এই জীবনটি যে যাপন করতে পারছি নিজের ইচ্ছে মতো, এটাই জীবনের অর্থ। তারপর আরও অর্থবহ করার চিন্তা এবং চেষ্টা কেন করবো? সৃষ্টিশীলতার ব্যাপারটি? তা তো মানুষের মগজ এবং মননের অন্তর্ভুক্ত। অন্তর্গত এই সৃষ্টিশীলতার চাপ এবং দায়বদ্ধতা বাধ্য করে তাকে সৃষ্টি করতে। বাধ্য করে, সৃষ্টিশীলতার ধারাবাহিকতায় থাকতে। এটা মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছার ব্যাপার নয়। জীবনকে অর্থপূর্ণ করার প্রচেষ্টাও মনে হয় না আমার। এটা তার ভেতরে থাকা চ্যালেঞ্জ। সৃষ্টিশীলতাই তার আনন্দ। তার সুখ। সৃষ্টিশীলতার যে চাপ, তা-ই তার যন্ত্রণা এবং অসুখ। যন্ত্রণা এবং অসুখ, তবুও সে উপেক্ষা করতে পারে না এই চ্যালেঞ্জ। এড়িয়ে যেতে পারে না, এই আনন্দ আর সুখকে। মানুষ, বেঁচে থাকে না। কিন্তু তার কাজ, সাহায্য সমৃদ্ধ ও সুখী করে অন্যদের। এটাই হতে পারে, সৃষ্টিশীলতার অর্থ।
সম্পত্তিহীন, শ্রেণীহীন এই আমাকে যাদের কাছে থাকতে হয় বাংলাদেশে, তারা শ্রেণীবিহীন নন, আমার মতো। নির্দিষ্ট শ্রেণীর আশ্রয়ে থাকা আমার, অনেক কিছুই থাকে না, নিজের বলে। থাকে না, স্বাধীনতার মতো সবচে জরুরী সম্পদও পুরোপুরি। স্বাধীনতা, জীবনের প্রধান সম্পদ এবং বিলাসিতা আমার। অনুভব করি, প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি, খুব স্বাধীন নই আমি নিজের দেশে। শোষণ করছে আমার স্বাধীনতাকে, এদেশের পরিবার সমাজ রাষ্ট্র এবং প্রায় সব ধরনের ব্যবস্থা। মানে অন্যায় অপব্যবস্থা। এই ব্যাপারগুলো কেমন?
জরুরী কাজে বাইরে যাবার অস্থিরতা মনে রেখে, ভোরে ঘুম থেকে ওঠার পর অধিকাংশ সময় জানতে পারি, সাপ্লাই ওয়াটার, মানে, কলে পানি নেই। নেই কেন? এ প্রশ্নের জবাব, ‘নিচের ট্যাঙ্কের পানি শেষ হয়ে গেছে। মোটর ছাড়তে হবে। প্রথমে পানি জমবে ওখানে। পরে সেই পানি যাবে ওপরের ট্যাঙ্কে। তারপরে তা আসবে কলের পাইপে।’
কতক্ষণ লাগবে এতে, জানে না কেউ। জলের প্রবাহ কম হলে, এটা নেবে দীর্ঘ সময়। ছাড়া হলো মোটর। বন্ধ কেন হয়ে গেলো হঠাৎ জবাব পাই, ‘কারেন্ট মানে বিদ্যুত চলে গেছে।’ কখন আসবে বিদ্যুত? জবাব, ‘কমপক্ষে এক ঘণ্টাতো লাগবেই’।
কি করতে পারি এই সময়ে? আইপিএসের সহযোগিতায় সিলিংফ্যানটি যে চলছে অনবরত, খুব সৌভাগ্য মনে হয় এটা। শান্ত করতে চাই নিজেকে। পড়তে চাই আজকের পত্রিকা। রয়েছে যে খবরগুলো প্রতিটি পাতায়, আর বিজ্ঞাপনগুলো, হজম করতে পারি না তার বেশিরভাগ। পড়তে পারি না, মনোযোগ আর আগ্রহ নিয়ে। রেখে দেই। কোন মানে হয় না সময় অপচয় করার।
বিপুল বাণিজ্যের ধান্দাবাজিতে একনিষ্ঠ, তথাকথিত জনপ্রিয় পত্রিকাগুলোর ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ বোঝে না, এদেশের বিপুল পাঠক। বোঝে না, নির্লজ্জভাবে নকল আর অনুকরণ করার নগ্ন কৌশল। বোঝে না, অনলাইন থেকে নেয়া বিদেশী খবরের তথ্য শব্দ এবং চেতনাগত ভুল অনুবাদ। বোঝে না ‘সেনসেশন’ তৈরির জন্যে খবরের শিরোনামে যা লেখা হয়, নিচের খবরের সঙ্গে অমিল থাকে তার। পড়ার জন্যে প্রবল উত্তেজনা তৈরি করে এমন শিরোনামের খবর, হতে পারে একেবারেই ফালতু কোন বিষয়। কারণটি কি? ‘সেনসেশান’ মানে উত্তেজনা বিক্রি করেই সবচেয়ে ভালো ব্যবসা করা যায়। সুগঠিত সুখপাঠ্য মানসম্মতও নয় এইসব পত্রিকার রিপোর্টিংগুলো।
বুঝে পড়ুক বা না পড়ুক, কেনে পাঠক অভ্যাসের কারণে। কেনে তারা, অধিকাংশ কলামনিস্টদের স্ববিরোধী কলামগুলো টাকার বিনিময়ে। টাকা দিয়ে কেনে, পাতার পর পাতা জুড়ে রাজনীতিবিদদের অনর্গল মিথ্যে, অগণতান্ত্রিক, অযৌক্তিক, আক্রমণাত্মক, মানহীন বক্তব্য, বিবৃতি, ঝগড়া। বছরের পর বছর। যুগের পর যুগ। দেশ ও মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো এবং জরুরী জাতীয় কল্যাণকর্মগুলোর ব্যাপারে, অধিকাংশ বক্তব্যই থাকে, ‘করতে হবে’র পর্যায়ে।
প্রতিদিনের অপরাধ দুর্নীতি সম্পৃক্ত মামলার খবরগুলো এবং অনেক জরুরী খবরের ফলোআপও থাকে না এইসব পত্রিকায়। নিরপরাধী পাঠকের যথেষ্ট আগ্রহ থাকার কথা, কি শাস্তি পেলো অপরাধীগুলো, তা জানার জন্যে। সেনসেশন সৃষ্টি করা খবরগুলো পত্রিকার বিক্রি বাড়ায় অনেক। বিচারের রায় তো বাড়াবে না পত্রিকার বিক্রি। সেটাই কি কারণ? থাকে আরো অনেক অর্থহীন আয়োজন। সবই পাঠক ধরে রাখার জন্যে। পাঠক বাড়ানোর জন্যে। মানে, সবই ব্যবসা।
বিদায় নেয় জীবন থেকে, দেড় অথবা দু’ঘন্টা সময়, কিছু না করে। চাকরিজীবী নই আমি। প্রায় নিয়মিত এই পরিস্থিতিতে কি করেন একজন, যাকে কাজে পৌঁছাতে হয় নির্দিষ্ট সময়ে? বুঝতে পারি না।
জল আসে কলে। আসে দুর্গন্ধময় ময়লা বিবর্ণ তরল প্রবাহ। ছুঁতে পারি না ওই জল। ময়লা ঠেকাতে, ন্যাকড়া দিয়ে বেঁধে রাখে কলের মুখ, অনেক বাড়িতে। সম্ভবত সব বাড়িতে। ঠেকানো কি যায় তাতে কিছু? বসে থাকি, কবে কখন আসবে এক অঞ্জলি বিশুদ্ধ না হোক, কিছুটাও শুদ্ধ জল, তার প্রতীক্ষায়। আসে না, আসে না, আসে না। বাইরে যাবার নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। খুব জরুরী কাজগুলো করা হয় না আমার। ক্ষতি হয় অনেক এবং বিভিন্ন ধরনের। সবচেয়ে বড় ক্ষতি তো, অসহ্য এই অবস্থার অধীনতা। শুরু করতে পারি না দিনটি নিজের মতো করে। জরুরী প্রয়োজনেও। সাপ্লাই ওয়াটার এই বাড়িতে তবুও আসে। রুগ্ন হলেও। যে বাড়িগুলোতে এর চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা, এক ঘন্টা জল এলে পাঁচ ঘণ্টা আসে না, অথবা জলই নেই, কি অবস্থা তাদের?
মনে পড়ে, পেরিয়ে গেছে চল্লিশ বছর। বুঝি, জন্ম থেকে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, কঠিন সমস্যাগুলোকেও সমস্যা মনে হয় না আর। কিন্তু জল ছাড়া জীবন, স্বাভাবিক থাকতে পারে কতক্ষণ? অস্বাভাবিক ব্যাপারগুলোও কেন এতো স্বাভাবিক এদেশে!
ব্রেইকফাস্ট পৌঁছায় টেবিলে। ওই জল দিয়েই কি তৈরি হয়নি তা? বেঁচে থাকার জন্যে যা কিছু প্রয়োজন, খাবার, অন্যতম তার মধ্যে। প্রতিটি খাবার সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রচারিত এদেশে, যদি তা সত্য হয়, তাহলে, মুখে দেয়া উচিত নয় এই খাবারের কোন একটিও। বেঁচে থাকার জন্যে এসব খেয়ে, নিশ্চিত করতে পারি অবিরত অসুস্থতা এবং দ্রুত মৃত্যু।
ফল সকালের খাবার নয়। তুলে নেই হাতে তবুও। জানি এদের জীবন ইতিহাস। দুর্বৃত্তদের হাতে বিষাক্ত হয়ে টেবিল পর্যন্ত আসে কিভাবে, মনে পড়ে। পারি না খেতে। জল খাবো? কোন জল? কেনা জল বোতলের? ফুটিয়ে ফিল্টারে রাখা জল? দেখেছি টেস্ট করে সব ধরনের জল। চমকে উঠেছি। দীর্ঘক্ষণ ফুটালেও স্নানের যোগ্য হয় না যে জল, তাই পান করে এদেশের ৯৮ ভাগ মানুষ।
মহামান্য, মাননীয় আর মহোদয় শব্দগুলো ব্যবহৃত খুব, এদেশের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্যে। সম্মান প্রকাশের জন্যে কতটা জানি না। চাটুকারিতা, স্তাবকতা, চামচামির জন্যে যে শব্দগুলো জরুরী, তা প্রমাণিত। অর্থ কি মাননীয় আর মহামান্য শব্দের? পানের নয়, স্নানের যোগ্য জলও দিতে পারেনি যারা চল্লিশ বছর বয়সি দেশের জনগণকে, কি করে হতে পারেন তারা মাননীয়? যুক্ত কেন করতে হয় তবুও তাদের পদের শুরুতে এসব শব্দ? এটা কি অন্যায় নয়? যুক্ত করে যারা, তারা কারা? এবং কেন করে?
বাড়ে রোদের তাপ, বাড়তেই থাকে দিশেহারা হয়ে। সাহস হয় না বাইরে যাবার। জরুরী একটি কাজ শেষ করার সময় পেরিয়ে যায়নি এখনো। পা রাখতেই রাস্তায়, অসহ্য পরিবেশ। আমি কি পারবো পৌঁছুতে ব্যাংকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে? অসহ্য যানজট, নর্দমা, আবর্জনা, দুর্গন্ধ, ধুলো, অবিরাম গাড়ির হর্ন, পথচারীদের অস্থির চেঁচামেচি, আগুন ছড়ানো রোদ এবং সবকিছু উপভোগ করে তিন কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছি এক ঘন্টায়। পৌঁছুতে পেরেছি ব্যাংকে, বন্ধ হবার আধাঘন্টা আগে। সৌভাগ্য মনে হয় এটা।
দোতলায় উঠতে সিঁড়ির একপাশে খোলা দরজা পথে বের হওয়া দুর্গন্ধে গুলিয়ে ওঠে শরীর। বুঝতে পারি, এটি টয়লেট। মানসিকতা কতটা বিকৃত হলে টয়লেটের অবস্থা এমন হতে পারে, ভাবতে পারি না। সিঁড়ির মধ্যেই রাখা হয়েছে কয়েকশ’ অথবা কয়েক হাজার, জীর্ণ পোকা খাওয়া ফাইল ভর্তি অনেকগুলো নোংরা কার্টুন, যা বন্ধ করার দায়িত্বও নেয়নি এই ব্যাংকে কর্মরতদের কেউ। ফাইলগুলোর শরীরে নিরাপদ ভেবে, ফ্ল্যাট অথবা বাড়ি বানিয়েছে অগণিত মাকড়সা। তার মধ্যে জায়গা খুঁজে ওপরে উঠতে হয়।
ধুলো বিবর্ণ, নোংরা মলিন অসুস্থ দেশীয় ব্যাংকটির, রং নষ্ট হয়ে যাওয়া বহু পুরনো যে টেবিলে আমার ফাইল, সেখানে দাঁড়াতেই, দুটো দাঁতবিহীন পান খাওয়া মুখে হাসেন কর্মরত ব্যক্তি। তার পোশাক, জুতো, বসার ভঙ্গি আচরণে মনে হয় না এটি তার কার্যালয়। পাশের টেবিলে আঙ্গুল চেটে ঠোঁট খুলে শব্দ করে ভাত খাচ্ছেন তার সহকর্মী। ছড়িয়ে রয়েছে টেবিলের ওপর, খাবারের খোলা প্লাস্টিক বাটিগুলো। অন্য টেবিলে নিবিড় মনোযোগে আঙ্গুল দিয়ে নাক পরিষ্কার করছেন আর এক কর্মী। আরামদায়ক ভংগিতে। প্রায় বেরিয়ে আসা বমি ঠেকাই, মুখে হাত চেপে। ইচ্ছে করে বেরিয়ে যাই। অসহ্য হয়ে ওঠে এই অবস্থা। শান্ত করি নিজেকে। শেষ করতে হবে কাজটি। নাহলে আবার আসতে হবে। সে ইচ্ছে নেই। অন্য যে টেবিলগুলোতে কাজ করছেন লোকজন, তাকাতে ইচ্ছে করে না তাদের দিকে আর। এরা কথা বলছেন একে অন্যের সঙ্গে। হাসছেন উচ্ছ্বাসে উল্লাসে। জোরে কথা বলছেন বলেই বোঝা যায়, ব্যক্তিগত কথা বলতে করতে পছন্দ করেন এরা, অফিসের কাজের মাঝে। যত ফালতু বিষয় হোক সেটা। হয়তো এটাও তাদের কাজের অংশ এবং অভ্যেস। কিছু মনে করে না কেউ। কিছু বলেও না কেউ হয়তো। মনে হচ্ছে, কাউকেই কারো কিছু বলার নেই এখানে। এটাই অলিখিত র্শত। তা জানে সবাই।
লুকোতে পারি না স্বভাবের ভদ্রতা। জানতে চাই ভদ্রলোককে, ‘কেমন আছেন?’ ‘বসেন আপা। কেমন আর থাকবো, এই দেশে কি বাইচা থাকা যায়? আপনার ফাইল শেষ করে পাঠায়া দিতেছি ম্যানেজারের রুমে। চা পানি না খাওয়াইলে তো কাজ আগায় না। আপনে এতো উদার মানুষ, আপনার কাছে না চাইলে কার কাছে চাবো বলেন?’
অসংস্কৃত নোংরা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশকে, আরও নোংরা করে তোলে লোকটির মানসিকতা এবং প্রকাশ ভংগি। ‘চা পানির’ অভাবে পিপাসার্ত নয় সে। ক্ষুধার্ত তার নির্লজ্জ দুটো চোখ। ‘চা পানি খাননি কেন? আপনাকে কি বেতন দেয়া হয় না কাজের জন্যে? বুঝতে পারছেন না কাকে কি বলছেন আপনি।’ বলি। ক্ষুধার্ত দু’চোখ হয়ে ওঠে ক্ষুব্ধ। অথবা বিক্ষুব্ধ। আর কিছু বলার সাহস অথবা ইচ্ছে নেই তার।
‘সালামালাইকুম, কখন এসেছেন আপা, আসেন আসেন আমার রুমে চলে আসেন।’ বলেন ম্যানেজার। কোনো কাজে নিজের রুমের বাইরে এসে, আমাকে দেখতে পেয়েছেন। সুবিধাভোগী পর্যায়ের কেউ নই আমি। এদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান সেভাবে বিবেচনা করতে চায় আমাকে, তবুও। অস্বস্তি হয় খুব ওরকম অবস্থায়, অনভ্যস্ত আমার। ম্যানেজারের মাধ্যমেই শেষ হবে কাজটি। তাই যেতে হয় তার রুমে।
রুমটি, ধুলো মলিন আর ছোট হলেও, তুলনায় একটু ভালো। ছিঁড়েটিরে জীর্ণ হয়ে যাওয়া ময়লা একটি সোফা রয়েছে একপাশে। রুমটির জানালায় ঝুলছে পর্দা। লাগানোর পরে কোনদিন যে ধোয়া হয়নি, নিশ্চিত হতে হয় তার শরীরের অবস্থা দেখে। যে গ্রিল রয়েছে জানলায়, কোন মানুষের হাত পড়েনি সেখানে কোনদিন, পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে। পরিষ্কার করাতে বা করতে কত টাকা লাগে? আর লাগে কতটুকু সময়? না সেটা কোন ব্যাপার নয়। ব্যাপারটি হচ্ছে, পরিচ্ছন্নতাবোধ। ঘরে এবং বাইরে। সব জায়গায়। সেটি না থাকলে তো, এ রকমই থাকবে। যেমন রয়েছে।
হাফসিøভ শার্টের কলারে টাই পরে বসেছেন ম্যানেজার, তোয়ালে দিয়ে ঢেকে রাখা চেয়ারে। চেয়ারে তোয়ালে রাখা, এদেশের প্রায় সব ‘বস’দের সমবেত অভ্যেস। অথবা লিখিত নির্দেশ। কারণটি কি? দেখতে কেমন লাগে এটা? এই তোয়ালেটিও কি ধোয়া হয় কখনো? ধুলেও বছরে ক’বার?
ছড়িয়ে রেখেছেন চেয়ারটিতে নিসঙ্কোচে নিজেকে, ভদ্রলোক। নড়ছেন পুরো শরীরে, অকারণে। নাড়াচ্ছেন হাত দুটো অনবরত, তাও অকারণে। জানেন না ইনিও, বসতে হয় কিভাবে একটি অফিসে। বসতে হয় কিভাবে, অতিথি এবং কাস্টমারদের সামনে। বোঝেন না সম্ভবত, অফিসটি যে তার একান্ত গৃহকোণ নয়। টেবিলের একপাশে রয়েছে একটি ফ্লাটস্ক্রিন মনিটর আর কম্পিউটর। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি আধুনিক প্রযুক্তি। বার বার তাকাচ্ছেন সেদিকে, কথা বলার মাঝে। মাউস এবং কিবোর্ডে হাত দিয়েও কিছু করার চেষ্টা করছেন, যার সাথে সামনে বসে থাকা আমার কাজের, কোন সম্পর্ক নেই। এই প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকান্ড, ফাইল এবং কাগজপত্রের যে জীর্ণ অবস্থা, কি সম্পর্ক তার সঙ্গে এই কম্পিউটারটির, বুঝতে চেষ্টা করি। সম্ভব হয় না বোঝা।
‘আচ্ছা, আপনাদের এখানে চাকরি করছেন যারা তাদের কেউ কেউ কাস্টমারের কাছে ঘুষ চান, তা কি আপনি জানেন?’ করতেই হয় প্রশ্নটি ম্যানেজারকে।
‘আপনার কাছে ঘুষ চেয়েছে? কে? কি বলবো বলেন, এই অবস্থাতো দেশের সব জায়গায়। রাষ্ট্র পরিচালকরা হাজার হাজার কোটি চায়। আর এরা পাঁচশ’ বা এক হাজার চায়। আমি জানাবো জায়গা মতো কথাটা। আপনার কাছে চাওয়া উচিত হয়নি।’ জবাব দেন তিনি।
আর কিছু বলি এ ব্যাপারে, তা চাচ্ছেন না ইনি। বুঝতে পারি। বুঝতে পারি, কারণ এর পরে যে বিষয়টি তিনি আনেন, তা, তার লেখা কবিতা। লিখেছেন গত রাতে। পৃথিবীতে প্রথম জন্মানো কবিতাটি, সফল কতটা, শুনতে আগ্রহী তিনি।
কিছুক্ষণের মাঝে প্রবেশ করেন এক ব্যক্তি। ‘স্যরি একটু অপেক্ষা করুন’ বা এ রকম জরুরী ভদ্রতা না দেখিয়ে, ব্যস্ত হয়ে কথা বলতে শুরু করেন তিনি নবাগতের সাথে। বুঝি, এটি হয়ে ওঠেনি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যেস, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত অধিকাংশ মানুষের। হবে কি কখনো?
রুমের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে, আগ্রহী হই বা না হই, শুনি কিছু সংলাপ। বুঝি, বিষয়টি লোন সংক্রান্ত। এড়াতে চান আগত ব্যক্তি আমাকে। ম্যানেজারও।
‘আমার ব্যাগটা এখানেই থাকুক, আমি পনেরো কুড়ি মিনিটের মধ্যে আসতেছি।’ ম্যানেজারের টেবিলের নিচে ব্যাগটি রেখে দ্রুত চলে যান ভদ্রলোক। কাজ সেরে চলে আসি আমিও, কিছুক্ষণের মধ্যে কাউন্টারে। কোন ব্যাংকের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে টাকা নিতে হয় না আমাকে ঢাকায়। বেশিরভাগ সময়। যখন যে ম্যানেজার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার থাকেন, কাউন্টার থেকে আনিয়ে দেন টাকা। সে প্রসঙ্গ ওঠেনি আজ। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করতে চাননি হয়তো ম্যানেজার, এই সুবিধাটুকু দিতে যেয়ে আমাকে।
কত টাকা ঘুষ দিতে হয় এদেশে, কি পরিমাণ লোন অনৈতিকভাবে পেতে চাইলে? দিতে হয় কাকে, কাকে এবং কাকে? প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতির নির্দিষ্ট চেইনের ভেতর থেকে, বাদ কি দেয়া যায় কাউকে? এ বিষয়টি ভেবেই কাটে সময়টুকু, কাউন্টারে। টাকা দেন ক্যাশিয়ার। গুনি ওখানে দাঁড়িয়ে। দু’শ’ টাকা কম। তাকাই ক্যাশিয়ারের দিকে। ভুল করেননি তো? মিষ্টি হাসেন তিনি। খুব পুরনো অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরেছেন যিনি। তার চেয়েও অপরিচ্ছন্ন তার চুল এবং দাঁত। ‘এর চেয়ে বেশি তো চাচ্ছি না আপা। এইটুকু পাবার হক তো আছে আমাদের।’ জবাব দেন তিনি শান্ত কণ্ঠে। পাশেই রয়েছেন কর্মরত আর একজন ক্যাশিয়ার। কোন অসুবিধা হচ্ছে না তাতে। কেন?
‘দু’শ’ টাকা দেন আমাকে, কথা বলতে বাধ্য করবেন না প্লিজ।’ বলি দৃঢ় স্বরে। বেরিয়ে আসি নোট দুটো নিয়ে। মিষ্টি হাসি বিলুপ্ত হয়েছে তার ততক্ষণে। ব্যর্থতার আক্রোশ দখল করে নিয়েছে সে জায়গাটি।
কত টাকা উপার্জন করেন ইনি এবং এরা, এভাবে প্রতিদিন? আর কত টাকা উপার্জন করেন ম্যানেজার এবং এদেশের ম্যানেজাররা? এবং বাকি সবাই? বের করতে কি পারবে সে হিসেব, কোন ক্যালকুলেটর? কোন মানুষ? কোন মহাশক্তি? কোথায় এবং কার কাছে নালিশ করলে, সমাধান হতে পারে, সর্বগ্রাসী এই সর্বনাশা অবস্থার?
ঘুষ চায়নি ক্যাশিয়ার লোকটি। চাইবার মতো অবস্থানে নেই সে। অবস্থানে রয়েছে যারা, ঘুষ চায় না তারাও। টাকা দাবি করে, কাজের বিনিময়ে পাওনা অধিকার অথবা পারিশ্রমিক হিসেবে। প্রচলিত নিয়মে। অভ্যস্ত অভ্যাসে। যে বেতন তারা পায়, তা হয়তো কিছুই মনে হয় না তাদের। শুধুমাত্র বেতন পাবার জন্যে কি চাকরি নেয় তারা?
ক্যাশিয়ার লোকটি চেয়েছে দয়া। অন্যরা ঘুষ দাবি করবে, পাবে, আর সে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, দয়ার দান আদায় করবে না, তা হয় না। তার জীর্ণ পোশাক আর অতিশয় রুগ্ন চেহারার দিকে তাকিয়ে, এই আমি ছাড়া, দয়া করে দান করবে না কে? জনপ্রতি প্রতিদিন পঞ্চাশ থেকে দু’শ’ টাকা করে ভিক্ষে পেলে, কত হয় দিনে, এই হিসেব সে ছাড়া বের করতে পারবে না কেউ।
হাজার হাজার কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে, যে দেশে ঘুষ দেয়া এবং নেয়ার জন্যে, কারোই শাস্তি হয় না, সে দেশে দয়ার দান বা ভিক্ষে নিলে, এদের যে কিছুই হবে না, সে নিশ্চয়তা অবশ্যই আছে। এতো টাকা ভিক্ষে করেও প্রতিদিন, নতুন অথবা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে না সে। স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে, সুস্থও করে না চেহারা। করে কি সে তাহলে টাকা নিয়ে? পরিচ্ছন্ন নতুন পোশাক এবং সুস্থ চেহারা দেখলে কি, দান করবে না কাস্টমাররা তাকে?
কে এবং কারা দেয় ঘুষ? দেয় এদেশেরই জনগণ। তারাই ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ, ঘুষ দেয় যারা। কেন দেয়? দেয় নিজেদের কাজের স্বার্থে, ব্যবসার স্বার্থে। সুবিধার স্বার্থে। সুযোগের স্বার্থে। ঘুষ পেয়ে ধনী হয় মানুষ। ঘুষ দিয়েও ধনী হয়। হতে পারে অনে-ক ধনী।
দুর্নীতির অনেক অনেক ধরনের মধ্যে ঘুষ একটি। ঘুষ নেয় যারা, দুর্নীতিবাজ বলা হয় তাদের। অপরাধী তারা। ঘুষ দেয় যারা, তারা কি? তারাও কি সমান দুর্নীতিবাজ আর অপরাধী নয়? ঘুষ দিয়ে যে কাজ, ব্যবসা, স্বার্থ, সুযোগ, সুবিধা সে আদায় করে, তা থেকে সে উপার্জন বা আদায় করে অনেক অনেক অনেক বেশি।
ঘুষ চায় এবং ঘুষ দেয় যারা, ভয়ঙ্কর লোভী তারা। লজ্জা সম্মান বোধহীন এক প্রজাতি। এদের ধারাবাহিক লোভ এবং চাহিদার লিফটটি মহাকাশগামী। এরা না দিলে ওরা মহাকাশে পৌঁছায় কি করে? ঘুষ দেবার জন্যেও তো দরকার টাকা। পর্যাপ্ত টাকা। তা এরা পায় কোথায়? কিভাবে? দেয়া এবং পাওয়া দুটোর অবস্থান সমান্তরালে। অপরাধও সমান।
এই যে ঘুষদাতা, এবং ঘুষ গ্রহীতা, এদেশে এরাই বলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে, উচ্চ কণ্ঠ। লেখেনও এদেরই অনেকে পত্রিকায়, একই বিষয়ে বার বার। অনেক বার। বলেন এবং লেখেন, কারণ, নিশ্চয়ই দাবি করেন নিজেকে সত হিসেবে। অথবা, পাঠক এবং শ্রোতাকে বোঝাতে, তিনি সৎ। নাহলে, কেন তিনি বলবেন অথবা লিখবেন, এই সব অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে? এইযে নব্বই অথবা পঁচান্নব্বই ভাগ, এরা যদি সৎ হন, তো অসৎ কারা?
দিনের প্রতিটি ঘণ্টায়, চব্বিশ থেকে আটচল্লিশটি, অথবা তারও বেশি অন্যায় কাজ করে, অন্যায়কারী মনে করে না নিজেকে এদেশে কেউ। গড়ে প্রতিদিন অনেক অনেকগুলো অসততা করেও, সৎ মনে করে নিজেকে সবাই। বিলীন হয়ে গেছে এখানে ন্যায় অন্যায়, সত্য মিথ্যা, ভালো মন্দ, সততা অসততার পার্থক্য। স্বামী প্রতারণা করে স্ত্রীকে। স্ত্রী প্রতারণা করে একইভাবে স্বামীকে। গোপনে। সরকার প্রতারণা করে জনগণকে। জনগণ প্রতারণা করে সরকারকে। এবং নিজেরা নিজেদেরকেও। সবচেয়ে বড় কাজটি এদেশে প্রতারণা। এই প্রতারণা দেখা যায় এবং দেখা যায় না। অতি অভ্যস্ত এই প্রতারণা, মনেও হয় না প্রতারণা। মনেও হয় না অপরাধ। সবই হয়ে গেছে স্বাভাবিক। খুব-ই স্বাভাবিক।
(চলবে)
চিডুর মিডুর
সুশান্ত মজুমদার
বাসা থেকে বড় রাস্তায় জুয়েল যখন নামে আকাশে তখন তীব্র আগুন। নিষ্করুণ বাতাসেও গরম হলকা। উহ, ইচ্ছা হয় ঝাঁপিয়ে পড়ে পুকুরের টলটলে পানিতে ভিজতে, দীর্ঘক্ষণ ভিজে নিস্তেজ শরীর ফের নিজের করে ফিরে পেতে। কেন, কে বলেছিল, অজপাড়াগাঁর কোন এক মুক্তিযোদ্ধার মনোভাব গ্রহণের এ্যাসাইনমেন্ট নিতে? সেই তো রাজি হয়, সানন্দে তখন শিস্্ দিতে দিতে বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। উহু, মন ঘুরিয়ে আনে জুয়েল-বিষয়টা মুক্তিযুদ্ধ, বিরূপ হওয়ার আছে কী!
লাখ লাখ মানুষ একাত্তরে জীবন দিতে পারলে আজ এতদিন পর অতি সামান্য একটা কাজ, উল্টাপাল্টা আবহাওয়ার দোষে অনীহা দেখানো ঘোর অন্যায়। ধুর, এ মৌসুমের শহুরে পাজি গরম গ্রামও দখল করেছে। কোথাও ঠা-া নেই, আকাশ বিধবাÑবজ্রগর্ভ মেঘ পুরোপুরি অদৃশ্য। গা জুড়ানো আরামের বাতাস কী গ্রাম ছেড়ে নিখোঁজ মাঠভাঙ্গা দস্যি হাওয়া, গাছপালার কোলাহল, শুকনো পাতার ঘূর্ণি, দীঘির পানির তিরতির কাঁপন, কিছুই কী দেখা যায় না। গরমে চরাচর সিদ্ধ হতে হতে সবুজও যেন ফ্যাকাশে। বাসের ভিড়ের ভেতর মাথার ফাঁকফোকর দিয়ে জুয়েল লক্ষ্য করেছে থানা সদর থেকে পুরো রাস্তা যাচ্ছেতাই, কোথাও কোথাও বিটুমিন উঠে গেছে-দু’পাশের সেই বড় বড় গাছগুলো লোপাট। গরম এতে দ্বিগুণ মনে হয়।
এক সপ্তাহের ছুটিতে জুয়েল বাড়ি যাচ্ছে শুনে চিফ রিপোর্টার মফস্বল শহর লাগোয়া গ্রামের কোন এক মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে সাক্ষাতকার নিতে বলেন। জুয়েল এখন হাড়ে হাড়ে বুঝছে গ্রামে আসতে হবে, খুঁজে পেতে মুক্তিযোদ্ধা ডাকতে হবে-অতি সহজ কাজ না। ঢাকা ছেড়ে আসার সময় পদ্মার ফেরিতে দাঁড়িয়ে সে মোবাইল ফোনে গ্রামে মামার সঙ্গে কথা বলে। একদিন একবেলার জন্য হলেও সে আসছে-ছোট্ট একটা কাজ আছে, এসে সব বলবে, মামার সহায়তা দরকার। হঠাৎ ফোন পেয়ে উল্লাসে মামা তখুনি ভাগ্নেকে উড়াল দিয়ে চলে আসতে বলেন, পারলে ফোনের মধ্যে দিয়ে সে এসে পড়ুক। কত কথা তাঁর ভাগ্নেকে সে অনেক অনেকদিন দেখে না, এদিকে মামীর চোখে ছানি পড়ছে, স্নেহের ভাগ্নের জন্য ভাল ভাল কত পদের রান্না স্থগিত রেখে হাত তাঁর অলস হয়ে গেছে, মামাতো ভাই দুটি জুয়েল ভাইয়া জুয়েল ভাইয়া করে গলার স্বর আগেই ভেঙ্গে রেখেছে। শুনে জুয়েলের সারা শরীরে ত্রাস ছড়িয়ে যায়। মামার কথার মানে-জুয়েল বুঝি কয়েকদিন থাকবে। কিন্তু সময় তাঁর হাতে নেই। একবেলা মামা বাড়ি, পরের বেলা গ্রামের কোন এক মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আলাপ সেরে দিন থাকতে থাকতে সে শহরে ফিরবে। মামা এতেও রাজি; আর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আলাপ, এমনকি কঠিন ব্যাপার, তাঁদের গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা অনেক আছে, খুব সাহসের সঙ্গে একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, সব তাঁর কাছের লোক।
দেখো কা-, মামা মুক্তিযোদ্ধা আফাজ আলীকে তার সামনে রেখে আসছি বলে হনহন পায়ে সেই যে কোথায় গেল এ পর্যন্ত চেহারা, কিসের চেহারা, তাঁর কোন্দল করা খরখরে স্বরও আশপাশের কোন উঠোন বা গাছপালার আড়ালেও শোনা যাচ্ছে না। এ দিকে দিনের বাকি আলো কুড়িয়ে নিয়ে বিকেল ফুরিয়ে আসছে। ডালপালা ধরে নেমে ছায়া আয়তন বাড়িয়ে নিচ্ছে। তাহলে দাঁড়াল কী, নির্ঘুম রাত তার মামাবাড়ির ন্যাপথলিনের গন্ধমাখা বিছানায় কাটবে, শোনা যাবে বাদুরের সাঁই সাঁই ডানার আওয়াজ, ঝিঁঝি আর পোকামাকড়ের কিটির কিটির ক্রমাগত জোগান দিয়ে যাবে কালিবিষ অন্ধকার। ধুর, নিজের উপর নিদারুণ বিরক্ত হয় জুয়েল। কোথায় ভৈরবের পাশঘেঁষা তার নিজস্ব মফস্বলে ইয়ার দোস্তদের সঙ্গে গুলতানি আড্ডায় মশগুল থাকার কথা। কতদিন পর মজার খোসা ছাড়িয়ে ফুর্তি চুষে খাওয়া। সব গুবলেট। আরে গ্রাম বলে নয়। মামাবাড়ি এমনিতেই তার ভাল লাগে না। আগের সেই সেকেলে চলাচল অনুপযোগী কাদা মাটি এলাকায়, সুযোগ-বঞ্চিত এলাকা আর নেই। অনায়াসে শহর ঢুকে পড়েছে ঘরে ঘরে মাঠে মাঠে রাস্তায়। পল্লী বিদ্যুতের কল্যাণে টিভি বলো, ভিসিপি বলো, ডিশলাইনÑকত কিসিমের অশেষ বিনোদন দোচালা, চারচালার দরজা- বেড়া ছাউনি ধরে ধেই ধেই নৃত্য করছে। ছেলেমেয়েদের গায়ে পায়ে এখন হালফ্যাশন। কী নেই, খুঁজলে বুঁদ হয়ে যাওয়ার নেশার পুরিয়াও পাওয়া যেতে পারে। জুয়েলের এসবে আগ্রহ নেই, ঢের দেখছে সে তার ছাব্বিশ বছরে। ঘোর জ্বালা অপেক্ষা করছে সামনে, মামা ভাগ্নেকে সামনে বসিয়ে রাতে যখন তাঁর বাচালতা চালু করবেন। কী থাকে না তাঁর কথার মধ্যে। যত অরান্তর প্রসঙ্গ : ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, কোন পেয়ার মোহাম্মদ না ইয়ার মোহাম্মদ। তাঁর দোস্ত হয়, মামার কাছে নারকেলের দশটা চারা চেয়েছে। এ বাড়ির নারকেলের ফলন নাকি বেশি বেশি। কি করা, মামা দশটা না এক ডজন চারা চেয়ারম্যান বাড়িতে ভ্যানগাড়িতে করে পাঠিয়ে দিলেন। এই অনাবশ্যক ফালতু প্যাঁচল শোনার কী! জুয়েলের প্রয়োজন আছে! দেখো, গ-ার সাইজের দুই মামাতো ভাই জুয়েলের ডানে-বামে সেঁটে বাড়তি তাপের জোগান দিয়ে যাবে-সরিয়ে দিলেও নড়বে না। জুয়েল ভাইয়াকে দেখেও নাকি শান্তি। তাদের ইচ্ছা, আব্বা রাজি হলে ঢাকায় গিয়ে সর্বক্ষণ ভাইয়ার সঙ্গে থাকা। কত মজার মানুষ, দিন দুনিয়ার সব খবর ভাইয়া জানে। শুধু শরীরে না, মাথামোটাও মামাতো ভাই দুটির একজন আগেই বই-পুস্তুক ফেলে দিয়েছে, আরেকজন পঁচানব্বই পার্সেন্ট পাস করা ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এসএসসিতে এবারও ইংরেজী ও অঙ্কে ফেল করেছে। মামার উচিত তাঁর স্নেহের বদল জোড়াকে চাষের কাজে জুড়ে দেয়া। আর মামি; অসুখে ভুগে ভুগে কাহিল মানুষটির জন্য সত্যি জুয়েলের দুঃখ হয়। মামা বাড়ির এই একটি লোক মুখে যার রা নেই, কেবল নিষ্প্রভ নজর জ্বেলে ধরে রাখে। তাঁর অকথিত জমাট বেদনা। জুয়েলের কাছে মামিকে সবসময়ের দুখিনী মনে হয়। কেন, জানার আদৌ চেষ্টা করেনি সে। মায়ের সমান সাদাসিধা এই নারী ছেলের বয়েসী জুয়েলকে দেখে খামখা কেন ঝড় হয়ে থাকে-সে বুঝতে পারে না। কিন্তু মামা যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন- রহস্য কী! চায়ের ছাপড়ার একপাশে আফাজ আলীকে নিয়ে সে ঠায় বসা, দু’জনেরই মুখ বন্ধ, হঠাৎ হঠাৎ এ ওর মুখ পড়া। নতুন মানুষ জুয়েল তার দ্বিধা কাটাতে পারছে না। কোন্্ কথা থেকে কোন্্ কথা সে শুরু করে।
ক্ষয়াটে ইটের উঁচু নিচু পুরনো পথের বাঁ পাশে বুড়ো নারকেল গাছের গোড়ালাগোয়া তুচ্ছ এই চায়ের ছাপড়া। পাড়াগাঁর ভেতর দারুণ আয়োজন বৈকি। জানা গেল, সিডরের প্রলয়ের পর সাহায্য দিতে আসা সাহেব সুবোদের কণ্ঠের পিপাসা মেটাতে এই ছাপড়াটা রাতারাতি চালু হয়। তখন থেকে এটা চলছে। সকালের রোদ চড়ে যাওয়ার আগে আর বিকাল ফুরিয়ে যাওয়ার পর রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত ছাপড়ার মাটির উনুনটা জ্বলে। ভরদুপুরে ছাপড়া বন্ধÑ গ্রামের খাটুয়ে মনুষ্যিরা থাকে মাঠে ঘাটে, এত শখ কার কে খাবে চা। রোদ মরে এলে প্রাণের গ্রামের জোয়ান ছেলেরা হাজিরÑতুমুল কথা চালাচালি হাসি-তামাশার সঙ্গে হাতে ধরা থাকে কাপ। রাতে হেরিকেন একটা জ্বলে। চিমনির ঘষা কাচের ভেতর থেকে আসা আলো এতটাই মরা যে কারও মুখ পরিষ্কার থাকে না। দেখো কা-, অনুমান করা মাত্র বুঝি আফাজ আলীর চেহারা সাফ সাফ ধরা যাচ্ছে না ওই নীরব গম্ভীর বয়স্ক মুখের আড়ালে এমন অনেক স্মৃতি জমা আছে যা ভেদ করে বাইরে টেনে আনা মুশকিল; অত সহজ কাজ না। জুয়েল জেনেছে, মাইলখানেক দূরে গ্রামের উত্তরডাঙ্গায় সামান্য জায়গার উপর এই মুক্তিযোদ্ধার বাস। হরহামেশা আফাজ আলীকে তাই হাতের কাছে বা আলাপের মধ্যে পাওয়া যায় না। সময় খরচ করা ভেরেন্ডাবাজদের মতো হাটে মাঠে পথে খামখা সে ঘুরঘুরও করে না। রীতিমতো বাড়ির কামলা পাঠিয়ে মামার আফাজ আলীকে ডাকতে হয়েছে। পয়লা সে পাত্তা দেয়নি-আসার ব্যাপারে তাঁর গরজ নেই। আসবে কেন? ঢাকা থেকে কোন মামার কোন্্ ভাগ্নে এসেছে এত বছর পর আলাপ জুড়তে, ধুর, তাঁর আসে কী! গ্রামে উচ্ছন্নে যাওয়া নষ্ট মুক্তিযোদ্ধাও দু’চারটা আছে, তাদের মুখের বানিয়ে তোলা কেচ্ছা শুনে গেলে হয়। মামার কামলাটা নাছোড়বান্দা, আফাজ আলীকে কোলে নিয়ে হলেও সে পথ পাড়ি দেবে। এত পীড়াপীড়ি শেষে মন গলে তাঁর। জানা গেছে, মানুষটা এ বয়সেও মাটির ঢেলায় মুগুর মারে, ক্ষেতের আগাছা সাফ করে আঙুল অচল রাখতে নারাজ সে। বড়ই আফসোস, তাঁর খাটুয়ে শক্তি সোমত্ত ছেলেটা এক রাতের অসুখে হঠাৎ মারা যায়। আফাজ আলী নির্বাক তাঁর মনের অতল জায়গা দুঃখ-কষ্টে খাক হয়ে গেলে ভেতরের জোর আলগা হয়ে যায়। মনে ও শরীরে সে আরও কাবু হয়ে পড়ে। ব্যাপার কী, বসে থেকে থেকে সে ঝিমিয়ে পড়েছে নাকি! না, ওই তো আবার চোখ খুলেছেন। তার জোড়া ঘোলা চোখ অপলকে চেয়ে থাকলে খুবই অস্বস্তিতে পড়ে যায় জুয়েল। ওই পানসে কমজোরি দৃষ্টির আড়ালে থাকা সম্বল মনের আলো দিয়ে বুঝি জুয়েলকে সে নিড়িয়ে নিচ্ছে। হয়তো বুঝতে চাইছেন, তাঁকে নিয়ে বাইরের এই যুবকের হঠাৎ আগ্রহের কারণ কী হতে পারে! স্থির চাহনির সামনে জুয়েল দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ছাপড়ার বসার পর সম্ভাবপর চোখ চালিয়ে সে আশপাশ দেখে নিয়েছে। পেছনে নলবন, কাঁটা কোপ, হেজিপেজি লতাপাতার দখলে যাওয়া সরু খাল, তার তলের থিকথিকে কাদার মধ্যে পড়ে আছে বাতিল একটা ডিঙ্গি নৌকো। নৌকোর উঁচু একমাথা এখনও দেখা যায় Ñনিচু অংশ কাদার গভীরে ডুবে গেছে। নৌকোটা বাতিল, আদৌ আর কাজে আসবে না। হয়তো এতদিন কাঠ পচে গেছে। পচে যাওয়ার সম্ভাবনাই ষোলোআনা, মন্দ কাদা পানি শুষে নিয়েছে কাঠের শক্তি, আর বাকি কি, চাপ পড়লেই বডি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। ছাপড়ার চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে হালকা নোনা গন্ধ। আশপাশের কোন বাড়ির উঠোনে জড়ো করা সাতবাসি খড়কুটো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আজ রোদে দিয়েছিল, বাতাসে তারও দুর্ভোগ ভাসছে। জুয়েল গ্লাসের চা শুষে নিতে নিতে মুরুব্বি আফাজ আলীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখেÑ ‘মনে হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টা শুনেছেন?
আফাজ আলী টুঁ শব্দটিও করে না যেন জুয়েলের রাখা প্রশ্নের দিকে ফ্যালফ্যাল সে চেয়ে আছে। মনে হয়, চা পানের অভ্যাস তাঁর নেই। কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে ঝোলটানার মতো করে সে আওয়াজ করছে। সারা মুখময় তাঁর সাদা দাড়িÑভাঁজ পড়া পরিণত গাছ পাথুরে চোয়াল চুপসানো। ওই মুখেও অন্ধকারের সর কমে আছে।
মানুষটা কথা বলতে কি নারাজ? নাকি এতদিন পরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বলাবলি তাঁর মহাঅপছন্দের। পরনের ময়লাধরা পুরনো লুঙ্গি, গায়ের রঙজ্বলা জামা দেখে নিশ্চিত বোঝা যায়Ñতাঁর দিনকাল সুবিধার না, কষ্টেসৃষ্টে গোঁজামিল দিয়ে বয়সটা ফুরিয়ে দিচ্ছেন। এমনও হতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের একচল্লিশ বছরে অভাবের চরম ছোবলে নীল হয়ে নিজেকে সে আড়ালে সরিয়ে নিয়েছেÑ প্রাণ শুকিয়ে খটখটে, কোন কিছুতেই আর উৎসাহ নেই।
জুয়েল থাকে রাজধানীতে, চাকরি সূত্রে পত্রিকায় প্রয়োজনে দু’চার কথার আলাপ বা সাক্ষাতকার যাই হোক গ্রহণ করবে শুনে আফাজ আলীর ভারিক্কি ভাব হয়তো আরও জমাট হয়েছে। আফাজ আলীর কাঁধ হঠাৎ কেঁপে ওঠে। পিঠে মোচড় রেখে এই কাঁপুনি সে সামাল দিতে চায়। ডানহাতের আঙুল দিয়ে দ্রুত বাঁ বাহু, পরে ওই বাঁ হাত উপরে তুলে ঘাড়ের ওপর অংশ চুলকান। খানিক পর ঠা-া যেন কিছুই হয়নি। তার ঠোঁট বেয়ে আলগোছে অস্পষ্ট আওয়াজ খসে পড়ে-চিডুর মিডুর।
বলে কি মুক্তিযোদ্ধা? এমন শব্দ তার অজানা, আগে শোনেনি-তাহলে অর্থোদ্ধার কেমনে করবে! হতে পরে স্থানীয়ভাবে শব্দটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে, এর অর্থ এরাই জানে। জুয়েলের মুখাবয়বে নির্বোধ ভাব দেখে, এই আছে হৈ চৈ ফেলানোর মতো কইরে আছে, আবার নাই, হঠাৎ হঠাৎ কাড়া মাইরে ওডে, বলে, আফাজ আলী চিডুর মিডুর নিয়ে কথার গিঁট এঁটে দেয়। অল্পভাষী এই মানুষটির ছাড়া ছাড়া বাক্যের মধ্যে এতো রহস্য কেন? ধুর এমন মারফতি গুপ্ত কথার চালাচালি তার ভাল লাগে না। সহসা জুয়েলের মাথার মধ্যে খুব গভীরে চকচকে চিকন তারে টোকা পড়ে-আফাজ আলী কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সাময়িক আলোড়নমাত্র মনে করে চিডুর মিডুর বলে সন্দেহ করছেন? আরে মানুষটি হঠাৎ তন্নতন্ন করে দেখার মতো করে অমন চেয়ে আছে কেন? কি দেখছে? বুঝি ভাবখানা, এই উল্টাপাল্টা জামানার ছেলেপেলে সে ঢের দেখেছে, এরা পোকায় খাওয়াÑ জোয়ানী রক্তে দোষ, এদের লাগাম টানবে কে, এদের বাপ-চাচার দলাদলি, অবৈধ উপার্জন ক্ষমতার দম্ভে দেশেরই স্বার্থ উঠেছে।
ভাবতেই জুয়েলের বোধের থেকে ধাক্কা উঠে আসেÑ এ মানুষটা তার মতো করে ভাবতে নাও পারেন। হতে পারে, পলকশূন্য চাহনি উড়ে গেছে পেছনের অমলিন শ্রেষ্ঠ সারি সারি স্মৃতির ওপর, সেই যুদ্ধ দিনে তাঁর কষ্ট ত্যাগ সাহসী লড়াই, সহযোদ্ধাদের মুখ, ক্যাম্প জীবন এই মুহূর্তে খুব বেশি মনে আসছে। ওই তো আফাজ আলী নিজের থেকে তাঁর চুল কমে আসা শুকনো মাথাটা নাড়ছেন। অনেকটা অন্যমনস্ক হয়ে বুঝি চায়ের গ্লাসটা ফিরিয়ে দেন। কোন এক বোধের নাগাল পেয়ে ধীরে ধীরে তিনি জেগে উঠছেন। তাঁর অনুচ্চস্বর ঝরে পড়লে জুয়েল কিছুটা ধরতে পারে।
‘কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু না, কেডা বিচার বিচার করবে?’
জুয়েল জবাব দেখার উৎসাহ নিয়ে বাঁশের তৈরি বেঞ্চে খানিক এগিয়ে বসে ‘ কেন, সরকার তো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
আফাজ আলী ফের চুপ। নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে কি হারিয়ে গেছেন? হয়তো জীবনের তরঙ্গময় সময়ে কথার ভেলায় ভেসে ভেসে ঘাটে মাঠে ঘরে ঘরে মানুষের কাছে গেছেন; এখন ওসব নিরর্থক ভেবে কথার ব্যাপারে তিনি বীতশ্রদ্ধ।
গরমের মধ্যে থাকতে থাকতে গরম সয়ে এসেছে জুয়েলের। মামার এখনও খোঁজ নেই। হোক তার মামা, মানুষটা মানুষ চরাতে ঘাগু, কথার মারপ্যাঁচে ঝানু জুয়েল তো জানে। মামার হামবড়া ভাবের আসন কোনদিনই তার কাছে পোক্ত নয়। আচ্ছা, তার মামার বর্তমান যে বয়স বিয়োগ করলে একাত্তরে হৃষ্টপুষ্ট চোখ কান খোলা যুবকই হওয়ার কথা, ওই চরম সময়ে সে মুক্তিযোদ্ধা কেন হয়নি?
মুক্তিযোদ্ধা হতে তাঁর সমস্যা কি ছিল? এই জিজ্ঞাসা জুয়েলের মধ্যে আজতক কেন ক্রিয়া করেনি? ভাবতেই সামনে বসা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা তার মাথা আর আফাজ আলী প্রতিবেশী বটে, একই ইউনিয়নের মনুষ্যি, পরস্পরের নিবিড় চেনাশোনা, জেনে নেয়ার এই তো মোক্ষম সুযোগ। ও মা, আফাজ আলীর কি ঝিমুনি এসেছে চোখ বুজে আছেন? এমনও হতে পারে, বয়সের ভারে কিংবা কৃশ শরীরের কারণে একটানা কথা বলতে তাঁর কষ্ট হয়। ওই কষ্ট লাঘব করার জন্য তিনি দম নিচ্ছেন। তাঁর কণ্ঠ এবার ধীর, আগের চেয়ে অনুচ্চ।
‘ঢাকায় কয়ডা বুইড়া দালালরে ধরলে হবে ডা কী। গোটা দ্যাশটাই তো গেরাম, সবখানে যুদ্ধাপরাধী আছে। একাত্তরের দালাল শয়তান খুনী গেরামেই বেশি। আমাগো এ গেরামের চ্যায়ারম্যানের বাপ ছিল দালাল-একাত্তরে পাক বাহিনীর দালালী করচে। বুইড়া শয়তানটা এহনো বাঁইচা আচে। এর পোলার পোলা মাইনে দালালের নাতি মহব্বত কইরা এলাকার আওয়ামী নেতার মাইয়ারে বিয়া করচে। সে মহাধুমধামের বিয়া ছিল। কও, বিচার আচার কেমনে হয়? ব্যবসা কও, বাণিজ্য কও, ওঠবস, বিয়া-থাহা কও, এহন এওর কুটুম। ক্যামনে হবে বিচার। আচ্চা, শ্যাখ সাহেবের আত্মীয় আওয়ামী লীগের কোন্্ মন্ত্রী, তার মাইয়ার বলে এমুন বিয়া হইবে?’
জুয়েল নিভে যায়। এই প্রশ্নের সত্য-মিথ্যা কোন উত্তর তার জানা নেই। কাদায় পড়ে থাকা নৌকোর মাথাটা অন্ধকারের কারণে আর দেখা যাচ্ছে না। আশপাশে চোখ ফেললে নজর ফিরে আসে। গাছপালার পাতা কি নড়ছে, না ইশারা করে তাকে ডাকছেÑ বোঝার উপায় নেই। কেবল পাশের নাম না জানা বেটে গাছটাকে মু-ুহীন মনে হচ্ছে।
নীল পাথরের বিষ
আব্দুল মান্নান সরকার
নীল পাথর বসানো সোনার আংটি! পাথরটি যেন সত্যই রহস্যময় আলো বিচ্ছুরিত করছে। সুন্দরী নারীর ওষ্ঠে ফুটে ওঠা একটুখানি হাসির আভা! সে হাসি কুটিল না প্রীতির বোঝা মুশকিল। আখতার আলম সাহেব আংটিটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেন, চোখ দুটো টেনে সরাতে পারেন না। চোখ সরে না রাহেলারও। ‘নাও আংটিটি পর’। আচ্ছা আমিই পরিয়ে দেই। রাহেলার ডান হাত টেনে নেন আখতার সাহেব। আংটিসহ হাত খানা তুলে ধরেন চোখের সামনে। আলতো করে চুমু খান হাতে। অনেক আগেই সহজ হয়েছিল রাহেলা। এখন এসব তার ভালই লাগে। আখতার সাহেবের দিকে তাকিয়ে সে রহস্যময় হাসি হাসে। নীলার রহস্যময় হাসি। আখতার সাহেব মুগ্ধ হন, আর একটু কাছে টেনে নেন রাহেলাকে। দূর থেকে ছুটে আসা ক্লান্ত ঢেউ ভেঙে পড়ে সশব্দে, আর তা দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনায়। জল আর বাতাসের ঝাপটা চোখে মুখে শীতল পরশ বুলিয়ে দেয়। পা ভিজিয়ে হাঁটে দু’জন, আর ভেজা বালুর সোহাগ নিতে নিতে বালিতে ডুবে থাকা রঙিন ঝিনুক খোঁজে। চারদিকে কত পদ ছাপ আর আঁকিবুঁকি। সমুদ্রের মতো বৃহতের সংস্পর্শে এসে মানুষ নিজের ক্ষুদ্রত্বকে অনুভব করতে পারে, আর হয়ত এ কারণে নিজের একটুখানি স্বাক্ষর এঁকে দিতে চায়; মুছে যাবে জেনেও করে তা। কিন্তু এই এক মুহূর্তের আকুতিই কি আর কম কিছু! দুটি কিশোরী ঝিনুকের মালা নিয়ে এগিয়ে আসে।
‘তুমি নেবে?’
রাহেলাকে জিজ্ঞেস করে আখতার সাহেব। রাহেলা এক-দুটো নেয়। কি মনে করে আখতার সাহেব সব কটাই কিনে ফেলে। রাহেলাকে রঙবেরঙের ঝিনুকের মালায় সাজালে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের সৃষ্টি হবে। আদিম কালের কোন নারী। আফ্রিকান অনেক উপজাতির মধ্যে তিনি নারীদের এমন সজ্জায় দেখেছেন। রাহেলাকে নিয়ে কক্সবাজারে এই প্রথম এসেছেন আখতার সাহেব। তবে নিজে তিনি বহুবার এসেছেন, আর তা সস্ত্রীক। বিয়ের প্রথম দিকে জীবনের সেই উচ্ছল দিনগুলোতে দু’হাতে আনন্দ লুটে নিতে ইচ্ছে হতো। স্ত্রী হাসনা বানুকে নিয়ে কত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, চাকরির সুবাদে বিদেশেও গেছেন, থেকেছেন তারকাখচিত সব হোটেলে আর রিসোর্টগুলোতে। সূর্যস্নান, জলকেলিÑ কত কিছু করেছেন বিদেশীদের মতো। শুধু ব্রা-বা বিকিনি পরে একপাল বিদেশীর চোখের সামনে সি বিচে চোখ বুজে শুয়ে থাকা, কি হোটেলের সুইমিং পুলে সাতার কাটতে হাসনা বানুর রুচিতে বাধতো। বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে, তার সংস্কার কি আর সহজে যায়! সে যতই না উচ্চ শিক্ষিত হোক, তাদের আদর্শ তো সেই অশিক্ষিত মা-দাদিরাই। আখতার সাহেব অনুযোগ করেছেন, রাগ করেছেন, না-স্ত্রীর মনোভাব পাল্টানো যায়নি। পাপ! কিসের পাপ! আদম-হাওয়া বেহেশতে উদোম ছিলেন, উদোম! বুঝলে’Ñ এ সব কথা বলেও কোন কাজ হয়নি।
শেষে বিরক্ত হয়ে বলেছেন, ‘তোমাকে নিয়ে আর কোথাও আসব না।’ হাসনা বানু আসতেও চাননি আর, সংসার করেছেন, সন্তানের জনম দিয়েছেন, তাদের প্রতিপালন করেছেন, আর এ সবেই ছিল তার আনন্দ। আখতার সাহেবের স্বপ্নের জগত ফিকে আর বিবর্ণই থেকে গেছে। তাঁর চোখের তিয়াস মেটেনি, মেটেনি দেহ-মনের তৃষ্ণাও। আজ এই ষাটোর্র্ধ্ব বয়সে, রূপতৃষ্ণা আর দেহ-মনের অতৃপ্তি তাঁকে এতটাই বিক্ষুব্ধ আর বুভুক্ষু করে তুলেছে যে, এর বিনিময়ে আত্মা বিক্রি করতেও রাজি আছেন তিনি। আর তাই লুপ্ত যৌবন ফেরাবার তাগাদা থেকে, নানা উত্তেজক জিনিস সংগ্রহ করেন। না, তাঁকে কষ্ট করে এসব জিনিস সংগ্রহ করতে হয় না; এক সময়ের ডাকসাইটে আমলা তিনি, কতজন এসব নিজে থেকে দিয়ে যায়। আর রাজার কোন অপরাধ নেই এ কথা তিনি ভালই জানেন। ড্রেসিং টেবিলের সামনে অনেক সময় নিয়ে সাজে রাহেলা, নিজেকে ঘুরে ফিরে দেখে, দেখে মুগ্ধ হয়। হাসনা বানু এতটা বয়সেও নানাভাবে সাজে দামি শাড়ি, জড়োয়া গহনা পরে, ভালই লাগে; কিন্তু প্রসাধন মেখে কি আর বয়স ঢাকা যায়! একরাশ বেলিফুল পড়ে আছে, আখতার সাহেব কোথা থেকে যেন এসেছেন। রাহেলা ফুলগুলো খোঁপায় জড়িয়ে নেয়। নীল রঙের শাড়ি ব্লাউজ, সায়া ম্যাচ করে পরে। ঠোঁটে, চোখের পাতায় আলতো করে লাগায় নীলরঙ! আবার আয়নায় নিজেকে দেখে। যেন সমুদ্র আছড়ে পড়েছে তার সর্বাঙ্গে। ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে, ‘আখতার খালু দেখে মুগ্ধ হবে।’ নিজের ভাবনায় চমকে ওঠে রাহেলা। এসব কি ভাবছে সে, কিন্তু আর কি সম্বোধন করা যেতে পারে বহু ভেবেও তা স্থির করতে পেরে না উঠলে, সর্বাঙ্গে বৃশ্চিকের জ্বালা কি উত্তাপ পেতে থাকে। কিন্তু পর মুহূর্তে নিজের ওপর ফুঁসে ওঠে, সে নারী, এক রূপমুগ্ধ পুরুষ তাকে আবিষ্কার করেছে; তাকে সে তৃপ্ত করবে। তাদের সম্পর্ক নারী-পুরুষের সম্পর্ক। সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে স্নিগ্ধ নীল আলো। রাহেলা দাঁড়িয়ে আছে, যেন সমুদ্রের নীল জল ঠেলে উঠে এসেছে ভেনাস! আখতার সাহেব অপলক চোখে তাকিয়ে থাকেন। দেখে বুঝি আশ মেটে না।
‘হ্যাঁ, তুমি আমার ভেনাস!’
বত্তি চেলির নগ্ন ভেনাস! না, সে তো কেবল ছবি, কল্পনামাত্র। আমি ভেনাসকে জীবন্ত দেখতে চাই। এক এক করে সব কিছু খসে পড়ে রাহেলার শরীর থেকে; আখতার সাহেব তখন স্বর্গের সেই অনাস্বাদিত ফলের জন্য কাতর হয়ে উঠেছেন। স্বর্গ উদ্যানের সেই প্রথম সীমা লঙ্ঘনকারীর ব্যথা কি আনন্দ নিজ অন্তরে অনুভব করতে পারেন বিমুগ্ধতায়।
সন্ধ্যা উতরে গেছে অনেক আগেই। বাইরে অন্ধকার তখন জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছিল। অন্ধকারে চোখ মেলে দিয়ে বসে আছে রাহেলা, আর তখন তার আর একবার ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল ‘মাতৃজঠরে! ঝোপঝাড়গুলো দেখে মনে হয়, কালো লোমশ কোন জন্ত অদ্ভুত ঠা-া চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে; কিন্তু রাহেলা কাঁপে না। সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যত! ভীতি আর উৎকণ্ঠায় কণ্ঠনালী শুকিয়ে আসতে চায়; বার বার ঢোক গেলে; অস্থির হাতে পানির বোতলের মুখ খুলে দীর্ঘ চুমুকে নিঃশেষ করে বোতলটি। একটুখানি সুস্থির হয়।
নাইট কোচটি শাঁ-শাঁ করে এগিয়ে চলেছে। পাছে যাত্রীদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এ জন্য ড্রাইভার মাথার ওপরকার উজ্জ্বল আলোটি নিভিয়ে দেন। সাইডের ডিম লাইটটি জ্বালিয়ে দিলে গাড়ির ভেতর অপূর্ব স্নিগ্ধ নীল আলো ছড়িয়ে পড়ে। আর তখন কেঁপে ওঠে রাহেলা। তার রক্ত হিম হয়ে আসে। সমুদ্র গর্জন, শিশিরপাতের শব্দ-গন্ধ তাকে বুঝি পাগল করে দেয়।
পিঠে তপ্ত নিঃশ্বাস অনুভব করে, আর তা জ্বালাকর মনে হয়। রাহেলার কান্না পায় কিন্তু কাঁদতে পারে না।
স্বপ্নের এই শহর ছেড়ে আজ তাকে পালিয়ে যেতে হচ্ছে। অথচ এই শহরে একদিন সে এসেছিল কত না স্বপ্ন নিয়ে। আসা-যাওয়ার দিন দুটোর কতই না তফাত! এ শহরে যেদিন সে প্রথম আসে সেদিন তার হাতে ছিল মেহেদির রঙ। আর আজ যখন সে শহর ছেড়ে যাচ্ছে তখন তার সেই হাত দুটোই খুনের রক্তে রঞ্জিত।
রাহেলা চমকে উঠে হাতের দিকে তাকায়। হাত দুটো ধোয়া-মোছা, পরিষ্কার। সে আশ্বস্ত হয়। কিন্তু পরমুহূর্তে আর কিছু ভেবে বিচলিত হয়। কাল পত্রিকায় তার ছবি ছাপা হবে; জোড়া খুনের আসামি-পুলিশ তাকে খুঁজবে; কে জানে আজকেই তারা খুঁজতে শুরু করেছে কিনা! বাড়ি যাওয়া নিরাপদ হবে না, গ্রামের বাড়িতেই প্রথম খোঁজ করবে পুলিশ। আর জানাজানি হলে গ্রামের লোকজন তাকে কোন চোখে দেখবে। বলবে, ‘ওই যে রহিম বখশের মাইয়া জোড়া খুন কইরা আইছে।’
যমুনার চরে দূর সম্পর্কের এক বোন আছে এখন তার বাড়িতেই আত্মগোপন করে থাকতে হবে। তবে দীর্ঘকাল আত্মগোপন করে কি আর থাকা যাবে? এ কি রুল করল সে। আর তখন দৈবের আশ্রয় নিয়ে আশ্বস্ত হতে চায়। পুলিশ তাকে সন্দেহ নাও করতে পারে। রক্ত মাখা মেঝে, জামা-কাপড় সব কিছু পরিষ্কার করে এসেছে, এমনকি খুনের জন্য ব্যবহার করা সেই বঁটিটি পর্যন্ত। খোদাকে স্মরণ করে, তার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চায়।
বাসা থেকে বের হবার সময় বুড়ো দারোয়ান তাকে দেখেছে, তবে সে কোন সন্দেহ করে নাই, করলে তার হাতের পোটলা খুলে দেখত। একটু শুধু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কই যাও।’
সে কথার উত্তরে রাহেলা হেসে জানিয়ে ছিল, ‘বুনের বাড়ি বেড়াইতে যাইতাছি।’
এখন মনে হচ্ছে এটা বলাটাও ভুল হয়ে গেছে। পুলিশের কাছে দারোয়ান কথাটা বলবে।
মাথা ঠিক রেখে এখন একটু ভাবার চেষ্টা করে রাহেলা। খুন দুটো না করলে তাকে পালাতে হতো না, আর তার নিরাপত্তা বিঘিœত হতো না। পালিয়ে যে শেষ রক্ষা হবে না তাও বুঝতে পারে না। কাউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিল তার। মায়ের কথাই মনে পড়ছিল বার বার। ডেইজি, আহা! কী প্রাণবন্তুই না ছিল সে। হাসনা বানুর একমাত্র মেয়ে, মায়ের মতোই ছিল দেখতে, সুশ্রী আর মিষ্টি; চেহারার আর তার ভেতরটা? বড় লোকের মেয়ে, গরীব মানুষদের সে মানুষই মনে করত না। ছেলে বন্ধুদের নিয়ে বাড়িতে পার্টি দিত, নেশা করত, কত রকমের নেশার জিনিস তাকে খেতে দেখেছে। বিদেশী ব্যান্ডের তালে তালে নাচত আর এক সময় শরীর থেকে একে একে খসে পড়ত সব, দেখে মনে হতো বুঝি পাতা ঝরা শীতার্ত বৃক্ষ! ডেইজিকে এ দেশের মানুষ বলেই কখনও মনে হয়নি রাহেলার। আর শুধু ডেইজি একাই তো নয়, এমন অনেককে সে দেখছে এবং পরে এসব দোষের কিছুও বলে মনে হয়নি। চুলোয় যাক ডেইজির ভাবনা। নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠে রাহেলা। কেন সে খুন করতে গেল তাকে! আর খুন করা কি সত্যই আবশ্যক কিছু ছিল? হঠাৎ উত্তেজনা বশে সে খুনটা করে, যা সে না করলেও পারত; তবে এও ঠিক ডেইজির ওপর আক্রোশ ছিল তার; আক্রোশ ছিল হাসনা বানুরও ওপর; আর প্রকৃত খুনটা সে করতে চেয়েছিল তাকেই। দিনের পর দিন কি নির্মম অত্যাচারই না করেছে মা-মেয়ে তার ওপর! উঠতে বসতে শুনতে হয়েছে গঞ্জনা, আর এ জন্য অনেক সময় মাথা বিগড়ে যেত তার। হাসনা বানুকে খালা ডাকত রাহেলা, আর সে সম্বোধনও ঠিক করে দিয়েছিল হাসনা বানু নিজেই। খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল সে! কিন্তু দুটো খেয়ে পরে বাঁচাই যে সব নয়, এ কথা সে বুঝতে পেরেছিল, আর তা তাকে শিখিয়েছিল এই শহর। আলো ঝলমল এ শহর; চারদিকে এত আলো, সেই বা তবে কেন আঁধার পড়ে থাকবে।
কতটা কতটা অত্যাচার করা হয়েছিল তার ওপর। কতবার তাকে ক্ষত-বিক্ষত হতে হয়েছিল; তবে দেহের সে ক্ষত মিলিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মনের ক্ষত শুকায়নি।
হাসনা বানু প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত তাকে, যদিও তার বোঝা উচিত ছিল, একজন কাজের মেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা রাখে না; আর যদি তাই হয় তবে সে সুযোগটাও করে দিয়েছিল সে নিজেই। নিজের স্বামীকে কোনদিন বোঝার চেষ্টা করেনি হাসনা বানু, একটি গ-ীর মধ্যেই বাস করে গেল সারা জীবন। অত্যন্ত ছক বাঁধা সে জীবন; কলেজে পড়িয়েছে, অবসরে সাজ-সজ্জা করেছে। হাসনা বানু সাজতে বড় ভালবাসত, নিমন্ত্রণ রক্ষা আর পার্টিতে যেত বেশ ঘটা করে সেজে। কিন্তু স্বামীর জন্য তাকে কখনো সাজতে দেখেনি রাহেলা। কত সময় তাকে করুণা করতে ইচ্ছে হয়েছে। এতটা সাহস সে পেয়েছিল কোথা থেকে, এখন সে কথা ভেবে অবাক হয় রাহেলা। কিন্তু সে তো ছিল একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত নারী! তাকে সবাই শুধু অপমান করেছে। আর তার নারিত্বের অপমান! রাহেলার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, তোমাদের মতো এই ভাল মানুষগুলোকে আমি চিনি; হ্যাঁ আমি চিনেছি। কিন্তু আমার কথা তো কেউ শুনবে না। সমাজ তাকে দোষী সাব্যস্ত করবে। তার দোষটাই চোখে পড়বে সবার।
বাসা থেকে এক কাপড়ে বের হতে চেয়েছিল, আর তখন মনে হয়েছিল ভবিষ্যতের চিন্তা। বাঁচতে হলে টাকা পয়সার দরকার হবে।
এতটা মনের জোর থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় বেরিয়ে মনে হয়েছিল, গোটা শহরের লোকজন বুঝি জেনে গেছে সে জোড়াখুন করে এসেছে। পুলিশের গাড়ি দেখলেই বুকে কাঁপন ধরে যেত, গলা শুকিয়ে আসত। মাত্র ঘণ্টা দুয়ের ব্যবধানে দুটো খুন। এতটা মনের জোর কিভাবে পেল সে। কেন রাগ সামাল দিতে পারে নাই?
নিজের ওপর রাগে, দুঃখে মাথা কুটতে ইচ্ছে করে রাহেলার। খুনের যৌক্তিকতা নিয়ে নানা কিছু ভাবে, হাসনা বানুকে খুন করতে হয়েছিল নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে। না হলে সে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিত। হাসনা বানু তখন কলেজ থেকে ফিরেছিল, প্রতিদিনের দুপুরের খাবার মা-মেয়ে এক সাথে খেত। হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিং রুমের দিকে যেতে যেতে রাহেলাকে সে টেবিলে ভাত দিতে বলে। তারপর মেয়ের খোঁজ নেয়। মেয়ের সাড়া শব্দ না পেয়ে বেশ কয়েকবার নাম ধরে ডাকে। আর এ সময় তার নজর যায় মেঝের ওপর। কী দেখেছিল মেঝেতে কে জানে? চিৎকার করে উঠেছিল, রাক্ষুসী! তুই আমার ডেইজিকে খুন করেছিস?’
তেড়ে এসেছিল, তোকে আমি ছাড়বো না। খুন করব তোকে। পুলিশে দেব।’
উত্তেজিত হয়ে হাসনা বানু শোবার ঘরের দিকে ছুটে যাচ্ছিল তখন, রাহেলার বুঝতে বাকি থাকেনি, হাসনা খালা টেলিফোন করতে যাচ্ছে। আর এক মুহূর্তও নষ্ট করা যাবে না, রাহেলা কিচেন থেকে বঁটি-দা খানা নিয়ে এসেছিল, আর হাসনা বানু কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঘাড়ের পেছনে কোপ বসিয়ে দিয়েছিল। হাসনা বানু ভয়ে, বিস্ময়ে অদ্ভুত চোখে তাকিয়েছিল, একবার প্রতিরোধের চেষ্টাও করেছিল। রাহেলা তুই!’ মাত্র এই একটি কথাই উচ্চারণ করতে পেরেছিল সে। হাসনা বানুকে এলোপাতাড়ি কুপিয়েছিল রাহেলা। দ্রুত কাজ শেষ করতে চেয়েছিল সে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে। জবাই করা পশুর মতো হাসনা বানু গোঙাচ্ছিল তখন। কিছুটা বিচলিত হয়েছিল রাহেলা। পর মুহূর্তে সামলে নিয়েছিল নিজেকে। ঠা-া মাথায় করেছিল সব, মেঝে ধুয়ে-মুছে সাফ করেছিল, রক্তাক্ত জামা কাপড় পরিষ্কার করেছিল। লাশ দুটো খাটের নিচে লুকিয়ে ফেলেছিল। অনেক সময় নিয়ে গোসল করেছিল। তারপর নিশ্চিন্ত হতে পেরেছিল। বাসায় সে ছাড়া আর দ্বিতীয় কেউ নেই। আহসান ভাই ফিরবে অনেক রাত করে।
আহসান আখতার হাসনা বানুর একমাত্র ছেলে। মা-বোনকে দেখতে না পেয়ে অবাক হয়ে খোঁজাখুঁজি করবে। আর মা-বোনের লাশ দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়বে।
প্রথমে হয়ত চিটাগাংয়ে বাবার কাছে ফোন করবে। ছেলের ফোন পেয়ে, মেয়ে-বউয়ের মৃত্যুর সে সংবাদ শুনে কেমন অবস্থা হবে আখতার খালুর? শোকে-দুঃখে পাগল হয়ে যাবে? তাই তো হওয়া উচিত! অথচ রাহেলা তো জানে, স্বামী হিসেবে কতটা অবিশ্বাসী মানুষটা। কত সময় স্ত্রীর মৃত্যু কামনা করেছে।
এ কথা ঠিক, রাহেলার ওপর সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে। পুলিশকে কি বলবে না, রাহেলা খারাপ চরিত্রের মেয়ে মানুষ। আর এমন একজন স্ত্রী লোকের পক্ষে খুন-ডাকাতি কত কিছু করা সম্ভব। আখতার খালু কি তাকে ঘৃণা করবে? তাও করবে নিশ্চয়! কথাটা ভেবে হাসি পায় রাহেলার। ঘৃণা করে কত কিছু শোনাবে লোকজনকে, সমাজকে।
একবারও কি তার কথা ভেবে বিচলিত হবে, দুঃখ করবে আখতার খালু? না, করবে না। সে তো কেবল তার শরীরটাই চেয়েছিল আর কিছু তো চায়নি। আর সেও তো শুধু শরীরই দিয়েছিল, তাও নিজের ইচ্ছায় নয়, একটুখানি স্বচ্ছলতার আশায়।
পাশের সিটের মহিলা ঘুমন্ত বাচ্চাকে খাবার জন্য পীড়াপীড়ি করছে। তখনও ঘুমের রেশ কাটেনি বলে শিশুটি বার বার ঢুলে ঢুলে পড়ছে। সারারাত না খেয়ে কষ্ট পাবে ছেলে, এ জন্যই মায়ের এত সাধাসাধি। শৈশবের কথা মনে পড়ে; হাট থেকে ফিরতে বাপের রাত হয়ে যেত, আর বাপের অপেক্ষায় থেকে তারা ভাই-বোন দুটি ঘুমিয়ে পড়ত। মা-তখন এভাবেই তাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে খাওয়াতো। মেয়ে খুন করে এসেছে এখন একথা শুনে তার বাপ-মায়ের অবস্থা কেমন হবে। তারাও কি ঘৃণা করবে তাকে। বাপ যে তাকে ঘৃণা করবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। মেয়ে এত বেশি টাকা কি করে পায়, কি ভাবে দেয় এ নিয়ে বাপ তাকে সন্দেহ করত। অনেক সময় প্রতিবাদ করে বলেছে, ‘এইডা তর পাপের কামাই! তর পাপের কামাই খাইয়া দোযখে যাবার কস!’
বাপের কথা শুনে দুঃখ পেয়েছে, নিজেকে হীন আর ছোট মনেও হয়েছে। কিন্তু পর মুহূর্তে মনে মনে জ্বলে উঠেছে। ‘পাপের কামাই! সারা জীবন পুণ্য করে তুমি কি পাইছো?’ না সে কথা বাপকে জিজ্ঞেস করতে পারেনি। মা-ভাই তার অর্থ-কড়ি গ্রহণ করেছে অম্লান বদনে। লোভে দু’চোখ তাদের চকচক করে উঠতে দেখেছে। চিরকাল মানুষের অবহেলা আর ঘৃণা কুড়িয়ে বাঁচা, এই বাঁচা কি বাঁচা গো! মা-ভাইয়ের আর দোষ কি! কিন্তু এখন তাকে সেই মা-ভাই তাকে কোন চোখে দেখবে কে জানে! রাহেলার মনে হয়, এ মুহূর্তেই সে ছুটে গিয়ে তাদের মনোভাব জেনে আসে।
সারাদিন কিছু মুখে দেওয়া হয়নি, এখন বেশ ক্ষুধা পাচ্ছে। বাসে ওঠার আগে রুটি-কলা কিনেছিল, ব্যাগ থেকে রুটি কলা বের করে রাহেলা। একবার একটুখানি ছিঁড়ে মুখে দেয়, তারপর ছুড়ে ফেরে দিয়ে ঢকঢক করে পানি খায়।
বাবুকে দিয়ে তাকে খুন করাতে চেয়েছিল হাসনা বানু; আর সে চক্রান্তটি ছিল ডেইজির। বাবুকে সেই বলেছিল, ‘বাবু আমার অনুরোধ তোমাকে আমার একটি কাজ করে দিতে হবে। রাহেলা এই নষ্টা মেয়ে মানুষটাকে যে কোন উপায়ে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। আমাদের ফ্যামিলির প্রেস্টিজের কথা ভেবেই তা করতে হবে। ও-আমার ড্যাডকে নষ্ট করেছে।
আর এ জন্য যা চাও তা পাবে।
বলে বড় অর্থপূর্ণ হাসি হেসেছিল ডেইজি। কথাটা স্পষ্টই শুনতে পেরেছিল রাহেলা। সে তখন বাবুর জন্য চা নিয়ে ফিরছিল। বাবু ডেইজির গালে টোকা দিয়ে বলেছিল, ‘তোমাকে পেলে এ আর আমার জন্য কঠিন কাজ কি!’
ধনী শিল্পপতির সন্তান বাবু, তার ওপর রাজনীতি করে। সত্যই তো তার কাছে অসাধ্য বলে কি কিছু আছে। ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাহেলা। হাত থেকে কাপপিরিচ পড়ে ভেঙে যায়, আর তাতে আরও ক্ষিপ্ত হয় দু’জন। বাবু তাকে লাথি-গুঁতো মারে, বেদম প্রহার করে, আর সিগারেটের আগুন দিয়ে শরীরের নানা স্থানে ক্ষত সৃষ্টি করে। এতটা করেও সে শান্ত হয়নি, ডেইজির সামনে তাকে উলঙ্গ করে তার নিম্নাঙ্গেও ক্ষতি করে। আর উল্লাসে ফেটে পড়ে ডেইজি; হ্যাঁ ওটাই কর; ওটাই তো ওর নষ্টামির মূলধন।
আর সে মুহূর্তে দেহের যন্ত্রণার চাইতে মনের যন্ত্রণাই হয়েছিল বেশি। রাহেলা বুঝি পাগল হয়ে উঠেছিল। ‘নষ্টা, কুলটাÑশব্দগুলো বড় অস্থির করে তুলেছিল তাকে। বাবু বেরিয়ে যেতেই পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিল কিচেনে। বঁটি-দা খানাই নজরে এসেছিল প্রথমে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডেইজির ওপর চড়াও হয়েছিল সে। কোপ দিয়েছিল ঘাড়ে, পেটে। পেট চিড়ে নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে পড়ে। আর ফিনকি দিয়ে ছোটে রক্ত। একবার একটুখানি হাতও কাঁপেনি তার। এখন এ কথা ভেবে সে অবাক হয়, এতটা সাহস সে কিভাবে পেয়েছিল!
সাথে করে আনা কাপড়ের পোটলাটি কোলের ওপর থেকে নামিয়ে পায়ের কাছে রাখে, আবার কি মনে করে সেটা কোলের ওপর তুলে আনে। পোটলাটায় কম কিছু নাই, নগদ লক্ষাধিক টাকা ছাড়াও, হাসনা বানুর সব গহনা আর কয়েকটি দামি শাড়ি আছে। পোটলাটা কেউ হাতিয়ে দেখলেই সে ধরা পড়ে যাবে। এখন কে আর তা দেখতে আসছে। পাশের মহিলাটি অকাতরে ঘুমুচ্ছে, সে দিকে তাকিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয় রাহেলা। এসব সে এনেছে কার জন্য? ভাইকে দিবে! না, নিজের জন্যই লাগবে। ধরা না পড়লে, সে একটুখানি জমি কিনে বাড়ি করবে। ছোটখাটো একটা দোকানও দিবে। আবার নতুন করে তো সংসারও পেতে পারে সে। জমি-বাড়ি, দোকানÑএত কিছু পেলে কতজন তাকে বিয়ে করতে রাজি হবে। আর তার সেই স্বামী যে তাকে বিনা দোষ তালাক দিয়েছিল, সেও তাকে নিতে চাইবে এখন। ভবিষ্যতের একটুখানি সুখের ছবি আঁকতে চাইলেও, তা স্থায়ী হয় না। দূর সম্পর্কের যে বোনের বাড়িতে সে আশ্রয় নিতে যাচ্ছে সেখানে সে কতটা নিরাপদ? বোন-বোনের জামাই টাকা-আর অলংকারের লোভেই ধরিয়ে দিবে তাকে।
হাসনা বানুর সাড়ে তিন ভরি ওজনের সোনার হারটি গলায় শৃঙ্খলের মতো চেপে বসে রাহেলার। এক সময় ওটা পাবার জন্য কত না লোভ হতো তার! ক্ষুধার্ত ককুরের মতো তাকিয়ে থাকত, হাসনা বানু যখন ওটা পরে সাজতে বসত। হারটি বড় প্রিয় ছিল হাসনা খালার! নিজের অজান্তেই ছোট একটা শ্বাস ফেলে রাহেলা। তারপর সিদ্ধান্ত পাল্টায় আগে বাড়িতেই যাবে, মা-ভাইয়ের কাছে জিনিসগুলো রেখে তারপর অন্য কোথাও যাবে। রাতারাতি নিশ্চিয় পুলিশ তাকে খুঁজবে না।
পাশের মহিলাটি কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। সুখ আর পরিতৃপ্তির ছোঁয়া তার সর্ব অবয়বে। কেমন সাধারণ একখানা শাড়ি পরেছে, গলায় সরু একখানা চেন, কানের মটর দানা দুটোও ছোট। বোঝাই যায়, ধনী পরিবারের কেউ নয়। হয়ত স্বামী ছোটখাটো কোন ব্যবসা বা চাকরি করে তারপরও মেয়েটা যে সুখী তা বোঝা যায়। তার জীবনও কি আর অমন কিছু হতে পারত না! তার জন্মের জন্য কে দায়ী? তার বাপ! না-তার অদৃষ্ট! খোদাতালা! গরীব বাপের ঘরে দু-সন্ধ্যা পেট পুরে খেতে পারেনি, অর্থলোভী স্বামী যৌতুকের জন্য কত অত্যাচার করেছে তার ওপর। আর তার নারিত্বের চরম অবমাননা করেছে আখতার খালু, আর যে কিনা এ দেশের সমাজের সব থেকে সম্মানিত মানুষদের একজন। সরকারের বড় চাকুরে, ধনী, শহরের অভিজাত মানুষ। আর তো সেই শুধু নয়, তার ছেলে, হ্যাঁ একমাত্র ছেলে। উচ্চশিক্ষিত, ইঞ্জিনিয়ার বড় চাকুরে।
পিতা-পুত্র একই দেহে পরিতৃপ্ত হতে চেয়েছে। পিতা-পুত্রকে এক সাথে গ্রহণ করতে মনের সায় পায়নি রাহেলা, সে বাধা দিয়েছে, আর ক্ষেপে উঠেছে আহসান।
কী কারণ?
রাহেলা নিশ্চুপ থেকেছে; কী বলবে সে, যে কথা বলার মতো নয়।
‘পুতের মতো! না-কথাটা মুখ ফুটে বলা যায়নি, অথচ বুক ফেটে গেছে তার।
‘ও, বুঝেছি বাবা তোমার কাছে আসে এ জন্য! তুমি তো একটা বেশ্যা! তোমার আবার বাপ-ছেলে কি!’ লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছে তখন। কিন্তু পর মুহূর্তে জেদ চেপে বসেছে; হ্যাঁ, বেশ্যাই যখন তখন বাপ-ছেলে দু’জনকেই সে মজিয়ে ছাড়বে।
রাহেলার প্রতি স্বামী-পুত্রের এই অবৈধ আসক্তির কথা হাসনা বানুর অজানা ছিল না। অনেক সময় রিডিং রুমে রাত কাটাতেন আখতার সাহেব। আর গভীর রাতে সে রুমে রাহেলার উপস্থিতি দেখে হয়ত অবাক হতো, কষ্ট হতো, আর ঘৃণাও করত নিশ্চয়; কিন্তু তারপরেও স্বামীকে সে কিছু বলত না, একটুখানি তিরস্কারও নয়। অথচ এ জন্য রাহেলাকেই এককভাবে দায়ী করত সে। এবং অত্যাচারও। পুরুষের তৃষ্ণার্ত শরীর মন যে পড়তে জানে না, সে আবার কেমন মেয়ে মানুষ! হাসনা বানুকে মনে মনে বিদ্রƒপ করেছে রাহেলা। সে কেন ফিরিয়ে দিবে, একজন সক্ষম নারী হয়ে ফিরিয়ে দেওয়াই হতো তার ব্যর্থতা! লোভ আর স্বার্থপরতা তাকে এগিয়ে দিয়েছিল আরও বেশি করে। ভাইকে একটা দোকান করে দেওয়া, বাপ-মায়ের মাথা গোঁজার ভাল একটু ব্যবস্থা করা এই তো চেয়েছিল সে। না, এর থেকে বেশি কিছু সে চায়নি। হাসনা বানু তাকে হিংসে করতে শুরু করেছিল, তাহলে সে কি তাকে প্রতিপক্ষ বলে ভাবত। আখতার সাহেবের কাছে স্ত্রীর কোন প্রয়োজনীয়তা আর ছিল না, আর এই সুযোগটাই নিয়েছিল রাহেলা। মা-আর ভাইয়েকে সে মুঠো ভরেই দিতে পেরেছিল। কিন্তু খুন করে এসেছে শুনে যদি তারা আশ্রয় না দেয়! এখন সব কিছুই ভুল মনে হয় রাহেলার কার জন্য কি করেছে সে! আর কেনই বা করেছিল। যে গ্রামে যে সমাজে জন্ম তার, সেখানে মেয়েরা বড় হয় অবহেলায়; আর একটু বয়সে হলেই বাপ মা বিয়ে দিয়ে বিদেয় করে। তারপর একগাদা সন্তান-সন্তুতি প্রতি পালন করতে করতেই বুড়িয়ে যেতে হয়। কোন সুখ নেই, আহ্লাদ নেই, বড় বিবর্ণ, পানসে জীবন! আর কী এক বেপরোয়া জীনকেই না চিনেছিল শহরে এসে। এরা যে শুধু বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায়, তা নয়, নিজেরাও চলে ওভাবেই। একদিন ডেইজি তার জন্মদাগ দেখতে চেয়েছিল। লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারে রাহেলা, সে কথা শুনে। আর তাকে অবাক করে দিয়ে, তার সামনে উদোম হয়েছিল ডেইজি। ‘দেখো এই আমার জন্ম দাগ’।
তারপর রাহেলার মুখ তুলে ধরে বলেছিল, ‘এত কি লজ্জা তোর। মেয়ে মানুষের সামনে মেয়ে মানুষের কাপড় খুলতে আবার লজ্জা কিরে!’
তোর তো বিয়ে হয়েছিল, একজন পুরুষের সামনে তুই কাপড় খুলিস নাই?
সেদিন ডেইজিকে তার পাগল মনে হয়েছিল। বড় লোকের মেয়ের পাগলামি!
অল্প দিনেই বুঝতে পেরেছিল, ডেইজি মাদকাসক্ত, আর যৌন বিকারগ্রস্ত। কী সব ট্যাবলেট খেয়ে নেশা করত সে। পার্টির নামে বন্ধুদের নিয়ে মদ-মাংসের আড্ডা বসত, আর তা পরিণত হতো বেলেল্লাপনায়। প্রতিরাতে মাতাল হয়ে ফিরত আহসান ভাই। তাই মনে কী যেন এক কষ্ট ছিল। মা-বোনকে সে সহ্য করতে পারত না। ছেলের আচরণে ক্ষুব্ধ ছিল হাসনা বানু। ফলে আহসান ভাইয়ের জন্য ভাত-তরকারি বেড়ে বসে থাকতে হতো রাহেলার নিজেকেই। তার জন্য ভাত-তরকারি গরম করে দেওয়া, বালিশ-বিছানা ঠিক করে দেওয়া সব কিছু করতে হতো তাকে। কোন কোন রাতে বেশি করে বেসামাল হয়ে ফিরলে, তাকে সামলাতে হাতে। আর এভাবেই আহসানের সাথে জড়িয়ে যায় সে। বেহুঁস অবস্থায় কত সময় কাছে টানার চেষ্টা করেছে। আহসান; কিন্তু নিজেকে সঁপে দিতে মনের সায় পায়নি রাহেলা। কিন্তু যেদিন তাকে বেশ্যা বলে অধিকারে পেতে চেয়েছিল সেদিন আর বাধা দেয়নি। প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, সে শুধু একাই নষ্ট হবে কেন! আর সেদিন হতে আহসান সাহেবের যৌন সঙ্গী হতে যেমন কোন সংকোচ হয়নি, তেমনি তার পুত্রের বিকৃত কামলালসাও পূরণ করেছে কোন রকম দ্বিধা ছাড়াই। স্বামী-সন্তানের স্খলন নয়, মুন ভিলার মর্যাদা রক্ষার জন্য এক ভয়ঙ্কর পথ বেছে নিতে যাচ্ছিল হাসনা বানু। যে মুন ভিলা হয়ে উঠেছিল পাপের স্বর্গ! মা চলে গেলেই বাবুকে নিয়ে রুমে দরোজা দিত ডেউজি। বাইরে থেকে শোনা যেত তাদের ডিসকো নাচের শব্দ।
মুন ভিলা কি অপূর্বই না ছিল বাড়িটা। ওবাড়ি তার আগেই ছাড়া উচিত ছিল। এখন আর এ কথা ভেবে কোন লাভ নেই। বাড়ি পৌঁছুতে ভোর হবে।
এত সকালে তাকে দেখে বাড়ির সবাই নিশ্চয়ই অবাক হয়ে যাবে। সে কিছু না বললেও, এই পুটলিটাই বলে দিবে সব। একবার মনে হয় পুটলিটা সে ফেলে দেয় জানালা গলিয়ে। আর পর মুহূর্তেই আঁকড়ে ধরে সেটা।
একটি অসমাপ্ত গল্প
হেনা সুলতানা
বাঁশীর দুই মেয়ে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলেন, প্রথমটি মেয়ে, পরেরটি কন্যা। তার ধারণা এ রকম বললে মানুষের কান একটু স্বস্তি পায়। মেয়ে দুটোই বাপের ধারা পেয়েছে। একবার একটা আচারের বয়াম ভেঙ্গেছিল বলে পাঁচ বছরের ছোট মেয়েটাকে খুব বকেছিল তার মা। বকাঝকা শুনে মেয়েটা না উত্তর দিয়েছিল অমন করে বকছ কেন, তার চাইতে আমাকে কেটে কুটে রান্না করে আচার দিয়ে খেয়ে ফেল। কী ভয়াবহ ব্যাপার। বড় ভাবি চা খাচ্ছিলেন। ব্যস, এই শুনেই হাসতে হাসতে চায়ের কাপ থেকে চা ছলকে পড়ে তার সুন্দর শাড়িটার বারোটা বেজে গেল। ভাবি হাসতে হাসতে গিয়ে শাড়ি পাল্টে এলেন।
তখন আর এক দফা চায়ের সঙ্গে আড্ডা জমে উঠেছে। টিভি চলছে আপন মনে। জনসংখ্যা বিষয়ে প্রামাণ্যচিত্র। পর্দাজুড়ে মানুষজন কেঁচোর মতো কিলবিল করছে। খুব সম্ভব রিমোটটা হাতের কাছে নেই। আড্ডার চোখ এসে থমকে গেছে এই অদ্ভুত দৃশ্যের ওপর। আমি ছিলাম পাশের ঘরে। এক কাপ চা নিতে এসে ব্যাপারটা আমারও দেখা হলো। একেকজন নিজস্ব মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছে। উঃ! এরা কী মানুষ, কীভাবে বেঁচে আছে? বাঁচা বলছ কাদের আর মানুষই বা বলছ কাদের? দেখ, এই তো সোনার বাংলার চেহারা। দেশ কীভাবে চলবে? এত মানুষ থাকলে কারো পক্ষেই দেশ চালানো সম্ভব নয়। ঠিক বলেছ। দেশ কি আর আছে, দেশ তো গোল্লায় গেছে। দেখছ না কী সব কা- ঘটছে? না বাবা এসব চোখে দেখা যায় না। এই জন্যই তো আমার দেশে থাকতে ইচ্ছে করে না। আমি মনে মনে বললাম দেশে তোমরা থাকোই ক’দিন।
মেজভাইয়া হৈচৈ করে পটলকে ডাকল। ওর আসল নাম হাসান আলী। এ বাড়িতে যেই কাজ করতে আসে তার নাম পটল হয়ে যায়। আসল পটল যে ছিল সে কাজে খুব পটু ছিল। বিশ্বস্তও ছিল। সে চলে যাওয়ার পর থেকেই এই নিয়ম হয়েছে। বর্তমান পটল বিশ্বস্ত বটে কিন্তু কোন কথা মনে রাখতে পারে না। ফলে কাজকর্ম প্রায়ই উল্টোপাল্টা হয়ে যায়। পটল এলে তাকে বলা হলো ড্রাইভারকে খবর দিতে। শুক্রবার হলেই বাড়ি ছোটে ছেলেটা। আমরা কাল সাভারে বেড়াতে যাব। নির্দেশ পেয়ে পটল চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো। বড় ভাইয়া জিজ্ঞেস করলেন কি রে খবর দিয়েছিস? তেলটেল ভরে গাড়িটা ওকে আছে কি না জানিয়ে ও যেখানে খুশি সেখানে যাক।
পরদিন সকালের নাস্তা সেরে আমরা সাভার যাওয়ার জন্য তৈরি হলাম। সাভারে বড় ফুফুর বাড়িতে পিকনিকের জম্পেশ আয়োজন হয়েছে। বেড়াতে যাওয়ার সময় নিজে ড্রাইভ করতে ভালবাসেন বড় ভাইয়া।
গাড়ি গেট পেরিয়ে আসতেই ভাবির মনে পড়ল পানির বোতল আনা হয়নি। ভাইয়া নিজেই নেমে গেলেন। যেতে যেতে বললেন ক্যামেরাটাও নিশ্চয় ফেলে এসেছো। যা ভুলো মন তোমাদের। বাঁশীদা এই ফাঁকে ভুলো মন নিয়ে একটা রসিকতা করে ফেললেন। শুনে সবাই হেসে লুটোপুটি।
হাতে বোতল কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে ভাইয়া আটকে গেলেন গেটের কাছে। দু’জন তাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। একজন পুরুষ, অন্যজন মহিলা। দু’জনারই গায়ের কাপড়চোপড় বড় মলিন। মহিলার মুখটি দেখা যায় না, ঘোমটা টানা। হাতে একটা কাপড়ের পুঁটলি। দেখেই বোঝা যায় গ্রাম থেকে এসেছে। কী কথা হলো গাড়ির ভেতর থেকে ঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে ভাইয়া তার ব্যস্ততা বোঝাতে পেরেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। মানিব্যাগ বের করে লোকটির হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে দ্রুত পায়ে গাড়িতে এসে বসলেন ভাইয়া। গাড়ি চলছে হু হু করে। আবার আড্ডা জমে উঠল। বাঁশীদা রাজনীতি, মিছিল, ভাংচুর হরতাল এই সব নিয়ে কৌতুক বলছেন।
ছাগলের পাল
যায় রাম পাল
পথে বাধে হরতাল
হয়ে যায় গোলমাল।Ñমুখে মুখে ছড়া বানিয়ে ফেলল মেজভাবি। শুনে হাসির তুফান উঠল। ছোট ভাবি খুব চুপচাপ ধরনের। সেও শব্দ করে হেসে উঠল। আমাদের গ্রামের বাড়ি রামপাল। এ কারণেই ছড়াটা বাজার পেল।
শহর থেকে বেরিয়ে এসে গাড়ি চলছে একেবারে ফাঁকা রাস্তায়। দু’ধারে অবারিত ধানের মাঠ। সে দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এ ধরনের নরম শান্তিতে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে আমার। ঘন নীল আকাশ জমিতে একঝাঁক বালিহাঁস উড়ে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে কে জানে? মনটা হঠাৎ খারাপ ঠিক হঠাৎ নয়। মন খারাপ হয়েছিল আমার সেই যাত্রা শুরুতেই। চেষ্টা করা সত্ত্বেও কারো চেহারা মনে করতে না পারলে আমার খুব মন খারাপ হয়ে যায়। গেটের কাছে একজন পুরুষ একজন মহিলা বড় ভাইয়ার পা ছুঁয়ে সালাম করল। মহিলাটির মুখ ছিল ঘোমটার আড়ালে। ওরা হয়ত স্বামী-স্ত্রী। লোকটিকে মনে হচ্ছে কোথায় যেন দেখেছি। গাড়িটা দ্রুত ছেড়ে দেয়াতে চেহারা ভাল দেখা গেল না। কিন্তু খুব চেনা চেনা লাগছিল। কিছুতেই মনে করতে পারছি না। যে কোন ব্যর্থতার সঙ্গে মন খারাপ হয়ে যাওয়ার একটা সম্পর্ক আছে। মেজ ভাবির রসিকতায় সবাই হাসলেও আমি হাসতে পারিনি। এ ধরনের রসিকতা আমার একদম ভাল লাগে না। রামপাল শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুকটা আরো বেশি ঢিপ ঢিপ করতে থাকল। আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র আমি ছাড়া সবারই জন্ম রামপালে। ওরা কেউ গ্রামের বাড়িতে যেতে চায় না। কারণে অকারণে গ্রামে আসা যাওয়া কেবল আমারই। মার কবর আছে ওখানে। বছর কয়েক আগে একবার বড় ভাইয়া নিজের ইচ্ছেতেই গ্রামে গিয়েছিলেন আমার সঙ্গে। তার অবশ্যি উদ্দেশ্য ছিল ফেরার পথে সুন্দরবন বেড়ানো। পাখি শিকারÑ এই সব আর কি। ভাবলাম বেশ মজা হবে। কিন্তু মজা করা মাথায় থাকল, দেখা গেল শেষটায় জীবন নিয়ে টানাটানি।
গ্রামে পৌঁছেই রাস্তায় দেখা হয়ে গেল নূর আলীর সঙ্গে। নূর আলী আমাদের গ্রামের বাড়ি দেখাশোনা করে। সঙ্গে তার শ্যালক নয়ন মিয়া। থাকে কাঁটাখালি। বাড়ি যেতে যেতে কাঁটাখালির গায়ে কাঁটা দেয়ার মতো সব গল্প বলতে লাগল নূর আলী আর নয়ন মিয়া। বড় ভাইয়া হাসতে হাসতে উড়িয়ে দিচ্ছিলেন সেসব।
Ñকি যে সব আষাঢ়ে গল্প কর নূর আলী। বাঘ গ্রামে ঢুকে মানুষ ধরে নিয়ে যায়Ñ আজকের দিনে এটা কোন কথা হলো?
Ñগল্প কতিছি না মিয়া ভাই। এক্কেবারে সত্যি কথা কলাম। প্রতিবাদ করে ওঠে নূর আলী।
Ñসভ্যতা মানুষকে কোথায় নিয়ে গেছে তা কি জান? আকাশ, পাতাল, স্বর্গমর্ত যাই বল সবই এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। আর এই যুগে বাস করে তুমি কিনা বলছ বাঘের ভয়ে মানুষ গ্রামে টিকতে পারছে না!
নূর আলীর ঘোর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ভাইয়া গোঁ ধরলেন কাঁটাখালি যাবেন। কাঁটাখালির কাছেই হলদে বুনিয়া, বরইতলা, সুন্দরবন। আমাকেও যেতে হলো তার সঙ্গে। নূর আলীর শ্বশুরবাড়ি কাঁটাখালি। নয়ন মিয়া কিছুতেই শুনবে না, আমাদের নিয়ে তুলল তার বাড়িতে। রাস্তায় দেখলাম দল বেঁধে কিছু লোক সদাইপাতি নিয়ে হাট থেকে ফিরছে বাড়ির দিকে।
এ অঞ্চলের মানুষ বড় একটা একা চলাফেরা করে না। কিন্তু ধেড়ুমাঝির ছিল বড় সাহস। গায়ে গতরে অসীম বল। বিশাল দেহটা তমাল গাছের মতো শক্ত সমর্থ আর কালো। সেই কালো দেহটা ঘামে চক চক করত জাল মেরে মাছ ধরে যখন সে বাড়ি ফিরত। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলো যেমন সামনের দিকে ঝুঁকে চলে ধেড়ুমাঝি তেমন ছিল না। বুক-পিঠ টান করে হাঁটত। সবাই তাকে একটু সমঝেই চলত। একবার তার সামনে এক বাঘ এসে পড়েছিল। বাঘ গর্জন করবার আগেই ধেড়ুমাঝি গর্জে উঠেছিল এমনভাবে যে সেই গর্জন শুনে বাঘ চুপচাপ নিজের ঠিকানায় চলে গিয়েছিল। তো সেই ধেড়ুমাঝি আক্রান্ত হলো এক সন্ধ্যায়। এ এলাকায় সন্ধ্যা মানেই রাত। জমাট বাঁধা রাত। হাট থেকে ফিরছিল। চেনা পথ। আপন মনে হন হন করে হাঁটছিল সে। হঠাৎ কী একটা শব্দে চকিত হয়ে ওঠে। খানিক থেমে আবার হাঁটা ধরে। এবার স্পষ্ট একটা ভারি নিশ্বাসের শব্দ। রাস্তার দু’ধারে বনেবাদাড়ে কত রকমেরই তো শব্দ হয়, কিন্তু না এবার কিছু বুঝে ওঠবার আগেই দমকা এক ধাক্কায় রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সে। চলে মানুষ আর অসুরের ধস্তাধস্তি। আততায়ী পারবে কেন ধেড়ুমাঝির সঙ্গে। সমানে সমান। আচমকা ঝলসে ওঠে ছয় ব্যাটারির টর্চ লাইট। ধেড়ুমাঝি মুহূর্তের জন্য বেখেয়ালী হয়ে পড়ে। এই সুযোগে আততায়ী তাকে কুপোকাত করে ফেলে। কিন্তু শেষপর্যন্ত লড়ে যায় সে। ততক্ষণে ছয় ব্যাটারি লাইটের দল এসে পড়ে সেখানে। দেখে ধেড়ুমাঝি ও একটা বাঘ রক্তারক্তি অবস্থায় জড়াজড়ি করে পড়ে আছে। চিৎকার চেঁচামেচিতে সমস্ত গ্রাম ভেঙ্গে পড়ল সেখানে। সেবার গ্রামের লোক দেখল ধেড়ুমাঝি বাঘকে ছাড়েনি, বাঘও ধেড়ুমাঝিকে ছাড়েনি। গ্রামের লোক দেখল দুটো লাশ পড়ে আছে এমনভাবে অন্তিম মুহূর্তে দুজনে দুজনের কাছ থেকে যেন মুক্তি পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। লোকে এখনও বলাবলি করে ধেড়ুমাঝির রক্তে নাকি বিষ ছিল।
আর একবার কী হলো, নদী পার হয়ে বাঘ ঢুকল একেবারে ভরা বাজারের মধ্যে। একবাজার লোকের মধ্যে থাবা মেরে মেরে ফেলল তিন মানুষ। তারপর গ্রামের মধ্যে ঘুরঘুর করছিল বাঘটা গ্রামবাসী কি আর এমনি এমনি ছেড়ে দেবে? পরদিন ভোরে ফাঁদ পেতে বাঘটাকে ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলল। বাঘ মারার পর শুরু হলো আর এক বিপদ। তা নিয়ে কত যে হুলস্থ’ূল সরকারের লোকের সঙ্গে। নয়ন মিয়া বলল, বুঝলেন ভাইজান, সরকারের লোকজন সব বাঘের পক্ষে। আমাদের পক্ষে কেউ নেই।
এইসব গল্প শুনতে শুনতে আমরা এসে উঠলাম নয়ন মিয়ার বাড়িতে। একেবারে সুনসান গ্রাম। তার উপর সুন্দরবন কাছেই। হাঁটা পথের দূরত্ব। গায়ে গায়ে গাছপালা। খর খরে দুপুরেই মনে হচ্ছে সব ঝিম মেরে আছে। ভারি অদ্ভুত সুরে ঘুঘু ডাকছে থেকে থেকে। তাতেই ছম ছম করছে চারদিক। খাওয়া-দাওয়ার পর নয়ন মিয়া আমাদের নিয়ে গেল গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাতে। সারাগ্রাম ঘুরেও একটা ইটের বাড়ি দেখা গেল না। সবই কাঁচাঘর। হোগলার বেড়া, গোল পাতার চাল। এই গ্রামে নয়ন মিয়াদেরই যা একটু অবস্থা ভাল।
আচ্ছা নয়ন মিয়া! তুমি বলছিলে এখানে একটা নদী আছে?
Ñহ’ভাইজান। ঐ যে খালের মতো দেখতিছেন। খড়মা নদী। খুব সোরত ছিল এক সময়। নদী এত বড় ছিল যে এপার থেকে ওপার দেখা যেত না। আর এখন সেই নদীর এই হাল। কলি তো বিশ্বাস যাবেন না।
Ñমানুষজন তো দেখলাম না তেমন।
Ñদেখবেন কি! মানুষজন দুপুরে খাওয়ার পর আর তেমন বের হয় না। যদিও এ গ্রামে এখন পর্যন্ত বাঘ ঢোকেনি। আশপাশের গ্রামে বাঘ ঢুকে গরু, ছাগল, মানুষ নিয়ে গেছে। আমরা মাঝে মাঝে চিৎকার হট্টগোল শুনি। তখন সবাই মিলে চিৎকার করি। থালা বাসন পিটাই, টিন পিটাই। মশাল জ্বালাই। টিন পিটানির শব্দ শুনলি বাঘ ভয়ে চলে যায়।
বড় ভাইয়ার মুখ বেশ শুকনো দেখাচ্ছে। কাঁটাখালি আসার আগে তার ভেতরে যে একটা তেজী স্রোত দেখেছিলাম তা একেবারে থিতিয়ে গেছে। নয়ন মিয়ার কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল আমরা যেন সেই আদিম যুগে ফিরে গেছি। সন্ধ্যা লাগার অনেক আগেই আমরা বাড়ি ফিরে এলাম।
নয়ন মিয়ার মা ঘরে পোষা মুরগি জবাই করে ভাটেল চালের ভাত রান্না করেছে। ভাটেল চালের ভাতের সুগন্ধে সারাবাড়ি ম ম করছে। নয়নের মা নিজে পরিবেশন করে আমাদের খাওয়ালো। বয়সের তুলনায় তাকে একটু বেশি বয়সী দেখায়। মহিলার স্বামী ছিল গুণীন। লোকে বড় মানতো তাকে। কিন্তু সেই এত বড় গুণীনই বাঘের পেটে চলে গেল। খেতে খেতে সেই সব গল্পই শুনলাম। এইসব শুনতে শুনতে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসছে।
আগে তারা থাকত বৈদ্যমারি। সেইখানে তখন খুব বাঘের উৎপাত চলছিল। ধুলোপড়া দিয়ে বাড়ি বন্ধ করে পরিবার নিয়ে গুণীন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিল। রাতের বেলা বাঘ এসে থাবা মারল গুণীনের কাঁধে। কিছু বুঝে উঠবার আগে কলজের ওপর পড়ল আর এক থাবা। জোয়ান তাগড়া মানুষটা ছটফট করতে লাগল বাঁচার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। নয়নের মা সেই থেকে বাঘবিধবা। সুন্দরবনে মাছ ধরতে অথবা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে যারা বাঘের কবলে পড়ে মারা যায় তাদের স্ত্রীদের ‘বাঘবিধবা’ বলে। সুন্দরবনের আশপাশের গ্রামগুলোতে অসংখ্য বাঘবিধবা পরিবার বাস করে।
এদিকে রাত যতই বাড়তে লাগল ততই ভয়ে আমার হাত-পা পেটের ভেতরে ঢুকে যেতে লাগল। নয়ন মিয়া বলেছে, এখন পর্যন্ত এ গ্রামে বাঘ ঢোকেনি। কিন্তু তাতে কী! ঢুকতে কতক্ষণ! এখানে আসার পেছনে এ রকম সাহস দেখানোর জন্য বড় ভাইয়ার ওপর আমার ভীষণ রাগ হতে লাগল।
ঘুম আসছে না কিছুতেই। এমনিতেই আমার অচেনা জায়গায় ঘুম আসতে চায় না। তার ওপর চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঘরে অবশ্যি একটা হারিকেন জ্বলছে টিম টিম করে। সেই টিম টিমে আলোতেই পরিবেশটা আরো ভৌতিক হয়ে উঠেছে। পেঁচা ডাকছে খুব কাছ থেকে কোথাও। ভয়ে চোখের পাতা বন্ধ করতে পারছি না। আমার শরীর ক্রমশ শক্ত হয়ে আসছে আর থেকে থেকে মেরুদ- দিয়ে শির শির করে কী যেন নেমে যাচ্ছে।
আমার পাশেই শুয়ে আছে বড় ভাইয়া। ঘুম এসেছে তার অনেকক্ষণ। এখন নাক ডাকছে ভীষণভাবে। তাতেই রাতটা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। পাশেই লম্বা করে রেখে দিয়েছে তার পাখি শিকার করা ইয়ারগানটা। রাত কত ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে রাত যে বেশ ভারি হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। এক সময় চোখের পাতা একটু ভারি হয়ে আসে, বুঝি তন্দ্রা আসে। এমন সময় দূর থেকে একটা তীক্ষè শব্দে দ্রুত তন্দ্রাটা ছুটে গেল। চোখের পাতা খুলতেই মনে হলো হাজারটা জোনাকি জ্বলছে চোখের ভেতর। কানে আসছে লক্ষ ঢ্যাটরার শব্দ। ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। ভাইয়াকে ধাক্কা দিয়ে তুললাম। কিছু না বুঝেই গলা দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ বেরুতে লাগল তার। প্রচ- ভয়ে হয়ত এ রকম করছেন। বিকেল বেলায় চোখমুখ শুকনো দেখা গেলেও কোথায় যেন একটু ভরসা দেখেছিলাম তার চেহারায়। অকারণে হাতের ইয়ারগানটা নাড়াচাড়া করছিলেন তখন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সত্যিই অকূল দরিয়ার মধ্যে পড়েছেন। ছটফট করতে করতে হঠাৎ পাশে রাখা ইয়ারগানটার ওপর হাত পড়তেই মুহূর্তে তিনি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ হয়ে গেলেন। এর ভেতরেই নয়নের মা ঘরে ঢুকেছে। হারিকেনের আলো সতেজ করে দিয়েছে। নয়ন এসে জাপটে ধরেছে বড় ভাইয়াকে। আর পাগলের মতো চিৎকার করছেÑ ভাইজান আপনে বন্দুক নিছেন ক্যান হাতে? ঘরে চলেন, ঘরের ভিতরে চলেন। বলতে বলতে ঘরের ভেতরে টেনে-হিঁচড়ে ভাইয়াকে নিয়ে আসে।
Ñআরে পাগল হলে না কি? এ রকম করছ কেন? ছেড়ে দাও আমাকে। কোন ভয় নেই। আমার হাতে বন্দুক আছে।
নয়ন মিয়া সে কথায় কান দেয় না। ভাইয়াকে জাপটে ধরে বিছানায় বসাল। হারিকেনের আলোয় দেখা গেল নয়নের মা ভাইয়ার একটা হাত চেপে ধরে বসে আছে আর ঠক ঠক করে কাঁপছে। আমি ভয়ে জড়সড়, এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছি। ততক্ষণে চিৎকার, কান্নার শব্দ, কাঁসার থালা, টিন পিটানোর সম্মিলিত বিকট আওয়াজ কিছুটা দূরে সরে গেছে।
Ñতোমরা এ রকম করছ কেন? বড় ভাইয়া ধমকে উঠল। দরজায় আরও একটা খিল এঁটে নয়ন মিয়া বলল, ফুলি এক ঘটি পানি খাওয়া।
পানি নিয়ে এলো একটি মেয়েÑ অল্প বয়স, নথ পরা মুখে ছোট একটা ঘোমটা। ঘোমটার ভেতর থেকে তার আধখানা মুখ যেন রক্তশূন্য এক টুকরো ছেঁড়া কাগজ। খুব ভয় পেয়েছে মেয়েটা। নয়ন মিয়ার বৌ ফুলি। গোলগাল দেখতে। পেটে বোধহয় সন্তান আছে। নয়ন মিয়ার যে বৌ আছে, বৌ এই বাড়িতেই থাকেÑ এতটা সময় তার কোন আভাসই পাওয়া যায়নি। গ- গ্রামের বৌঝিরা অচেনা মানুষের সামনে সহজে বের হয় না। কিন্তু আজ এই রাতের মুহূর্তের ঘটনা সব পর্দা টেনে তুলে ফেল দিল।
পানি খেয়ে সবাই কিছুটা ঠা-া হলো। নয়নের বৌ ফুলি অন্য ঘরে চলে গেল না। গায়ে মাথায় আরো বেশি করে কাপড় টানার প্রয়োজন বোধটাও যেন লোপ পেয়েছে তার। ঘরে দু’জন অপরিচিত মানুষ কিন্তু সে নির্লিপ্ত।
Ñভাইজান বন্দুক দিয়া কী করবেন? বাঘ মারবেন? বাঘ মারা নিষেধ আছে। সরকারের কড়া নিষেধ। বাঘ মারা দ-নীয় অপরাধ। কিন্তু মানুষের জীবনের কী কোন মূল্য নাই? বাঘ যে মানুষ মারছে সেটা কেউ দেখবে না? বড় ভাইয়া রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। Ñনা, এইটা কোন অপরাধ না। বন বিভাগের সাহেবরা কইছে গ্রামে বাঘ ঢুকলি তাড়ায়ে দিতি হবে। মারা চলবে না। মারলি কোর্ট কাছারি হবে। শাস্তি হবে। শাস্তির ভয়ে আমরা হাত-পা গুটায়ে থাকি।
কটমট করে তাকিয়ে আছেন বড় ভাইয়া নয়ন মিয়ার দিকে যেন সব দোষ তার।
পরদিন স্থানীয় বনকর্তাদের সঙ্গে কথা হলো এই নিয়ে। তারা অবলীলায় জানাল বনে হরিণ, শূকর বা অন্য পশু শিকার করার চাইতে লোকালয়ে মানুষ ও গরু-ছাগল শিকার করা অনেক সহজ। খাওয়ার অভাবেই সহজ শিকারের লোভেই শুকনো নদী পার হয়ে বাঘ গ্রামে চলে আসে।
আর একজন জানালেন খুব আয়েশি ভঙ্গিতে সুন্দরবনের বাঘ সারাবিশ্বে আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগার নামে পরিচিত করেছে। এই টাইগার তো আমাদের সংরক্ষণ করতেই হবে যে কোন মূল্যে।
Ñবাঘ মূল্যবান কোন সন্দেহ নেই কিন্তু তার মূল্যটা কী মানুষের জীবন দিয়ে দিতে হবে? দিনের পর দিন জনপদ কী এইভাবে নিরাপদহীন হয়ে পড়বে? এর কি কোন প্রতিকার নেই? সরকার কোন ব্যবস্থা নেবে না? বড় ভাইয়ার শরীরের প্রায় অর্ধেকটাই ঝুঁকে আছে টেবিলের ওপর।
একজন অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বললেন, সরকার ব্যবস্থা নেয়নি কে বলল? সরকার তো ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে সেই ব্যবস্থা কাজে লাগানোর উপযুক্ত মানুষ নেই। সরকারী ভাষায় যাকে বলে ‘দক্ষ জনবল।’ বলতে বলতে ভদ্রলোক হেসে ফেললেন। হাসবারই কথা।
গ্রামে বাঘ ঢুকলে বাঘ অচেতন করার জন্য সেই মান্ধাতার আমলের দুইটা ট্রাংকুলাইজার গান আছে। কিন্তু তা চালানোর মতো দক্ষ মানুষ নেই। বুঝলেন ভাই সেই গান চালানোও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বনকর্তা ভদ্রলোক আমাদের চা অফার করলেন। চা খেতে খেতে আমরা জানতে চাইলাম কেমন ঝুঁকিপূর্ণ? এই ধরেন গিয়ে ৫০ ফুট দূরত্ব থেকে এই গান ব্যবহার করতে হয়। তা ছাড়া বাঘের বয়স, শক্তি, ওজন অনুমান করে এ্যাম্পুলের ডোজ ব্যবহার করতে হয়। তা না হলে বাঘের জ্ঞান ফিরবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। বুঝলেন ভাই সাহেব এই এ্যাম্পুলের দামও খুব চড়া। সবচেয়ে বড় কথা, এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা আর কাজে লাগে না। আমরা সরকারী লোক, আমাদেরও তো হাত-পা বাঁধা। তাই গ্রামের লোকদের বলিÑ বাঘ আসার আলামত পাইলে সবাই মিলে টিন, থালা-বাসন পিটিয়ে মশাল জ্বালিয়ে বাঘকে বনে পাঠাতে সাধ্যমতো চেষ্টা করতে হবে।
আমরা বনকর্তার অফিস থেকে যখন বের হলাম, দেখি সূর্য মাথার ওপর। অফিসের সামনে অনেকটা জায়গা মাঠের মতো পড়ে আছে। তার এক দিকে একটা কালো বড় সাইনবোর্ডে লেখা ‘জঙ্গলের বাঘকে স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির সুযোগ দানই আইন। অহেতুক তাকে মারা বা বিরক্ত করা সম্পূর্ণ বেআইনী ও দ-নীয় অপরাধ।’ চমৎকার আইন। মানুষের অসহায়ত্বের কী প্রতিকার জানি না।
বাঘের কবলে পড়ে গত রাতে এক মা ও তার শিশু মারা গেছে। এই দৃশ্য দেখার জন্য গ্রাম ভেঙ্গে পড়েছে সেই বাড়িতে। পিতৃহারা অপর শিশু দুটি এবার মা হারা হলো। সরকার থেকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আছে কিন্তু কোথায় কীভাবে তা পাওয়া যায় এদের জানা নেই। একটা মানুষের শূন্যতা কোন্ ক্ষতিপূরণে পূর্ণতা পায় তা আমার জানা নেই। একটা ভারি দীর্ঘশ্বাস বুকটাকে আরো ভারি করে তুলল।
সব দেখেশুনে বড় ভাইয়া সহ্য করতে পারছিল না। পারলে এখনই নয়ন মিয়াকে সাথে নিয়ে চলে আসে ঢাকায়। নয়নের কাঁধে হাত রেখে বললেন, এভাবে বেঁচে থাকার কোন মানে হয় না। তুমি মা বৌকে নিয়ে চলে আসো। আমি তোমার ব্যবস্থা করব। কোন চিন্তা করো না। আমাদের ঢাকার বাড়ির ঠিকানা দেয়া হলো তাকে। ১৯৯৯ সাল, সে আজ কত দিন হলো। তারপর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে। কাঁটাখালির আর কোন খবর পাইনি। না কি নেইনি!
সকালে দুটো মানুষ বড় ভাইয়ার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। তিনি হয়ত ভাল করে ওদের মুখের দিকে তাকানওনি। মনে হয় পোশাক-আশাক, গ্রাম থেকে আসা চেহারা দেখেই চট করে কিছু টাকা বের করে দিয়েছে পকেট থেকে সাহায্য হিসেবে।
কারণ ওরা তো সাহায্য মানে টাকা ছাড়া আর কিছু চায় না। এর চেয়ে বেশি ভাববার সময়ও তখন তার হাতে ছিল না তখন তার প্রচ- তাড়া। কথা বলবার সময় নেই। যেতে হবে সাভার। সেখানে পিকনিক, হৈহল্লা, আড্ডা, আনন্দ এইসব অপেক্ষা করছে।
আমাদের গাড়িটা একটা বাজে জায়গায় এসে জ্যামে আটকে গেল। সামনের সিট পকেট থেকে আজকের পেপারটা বের করলাম। দৃশ্যটা কিছুতেই চোখ থেকে সরাতে পারছি না। লোকটার চেহারা এক ঝলক দেখলেও খুব চেনা চেনা লাগছিল। কোথায় যেন দেখেছি। হ্যাঁ মনে পড়ছে। নয়ন মিয়া। সঙ্গে নিশ্চয় তার বৌ ফুলি। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে তাদের। একটা শুকিয়ে যাওয়া কলাগাছে কাপড় পেঁচানো। গোলগাল চেহারার যে ফুটফুটে বৌটির হাতের পানি খেয়ে এক ভয়াল রাতে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া আমাদের বুকে আবার প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল। এই কী সেই মেয়েটি! আমি আর ভাবতে পারছি না।
বড় ভাইয়া ওদের কথা দিয়ে এসেছিলেন কোন চিন্তা করো না। চলে এসো ওরা এসেছে। সেই কাঁটাখালি থেকে শহরের ঠিকানা খুঁজে খুঁজে। আমার ভেতরের অস্থিরতা কাটানোর জন্য খবরের কাগজটা মেলে ধরলাম চোখের সামনে। এলোমেলো চোখ বুলাতে লাগালাম কাগজের ওপর। একটা জায়গায় নিজের অজান্তেই চোখ স্থির হয়ে গেল। ‘গত সন্ধ্যায় সুন্দরবনের বাঘ নদীপার হয়ে বনসংলগ্ন শ্যামনগরে চলে আসে। বাঘের আক্রমণে এক গৃহবধূসহ তিনজন নিহত ও একজন আহত হন। ক্ষিপ্ত গ্রামবাসী বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যা করে।’
ধিকিধিকি
মনি হায়দার
মেয়েটা লোকটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে একটা কিছু বলে। অমায়িক হাসিতে লোকটার মুখ থৈথৈ করে ওঠেÑ বাজান, আমার সঙ্গে মাইয়াটা আমার ছোট ভাইয়ের মাইয়া। ওর বাপ নাই। মাইয়াটার নাম দরদী। ও আমার লগে থাকে। দরদী মুরগির সালুন দিয়া সাদা ভাত খাইতে চায়। আপনের কি খুব অসুবিদা অইবে?


আমি, আমজাদ আর সুমন প্রায়ই সুমনের রড ইট সিমেন্টের দোকান সোনার বাংলা এন্টারপ্রাইজে আড্ডা দিই। আজও দিচ্ছি। উঠব উঠব করছিÑ ঠিক এ সময়ে সোনার বাংলা এন্টারপ্রাইজের সামনে দশাসই চেহারার একজন ভিক্ষুক আসে। স্বাস্থ্যবান, গায়ের রং হালকা ফর্সা, মুখে বেশ লম্বা কাঁচাপাকা দাড়ি, মাথার ওপর ময়লা টুপি, ডান হাতে তসবি। তার বাম হাত ধরে এগোচ্ছে সাত-আট বছরের একটি মেয়ে। মেয়েটির হাতে এ্যালুমিনিয়ামের একটি বাটি। বাটিতে বেশ কয়েকটা এক টাকার কয়েন এবং দু-তিনটি ছেঁড়া দুই টাকার নোট।
বাজান, ভিক্ষা দেনÑ লোকটা খুব সাবলীলভাবে বলে দাঁড়িয়ে হাতের তসবিহ টিপতে থাকে। সঙ্গের মেয়েটা হাতের বাটি বাড়িয়ে ধরে। সুমন ড্রয়ার খুলে একটা দুই টাকার নোট বের করে মেয়েটির বাটিতে রাখে।
চাচা লওÑ মেয়েটি সামনে হাঁটতে শুরু করে। লোকটিও মেয়েটির পেছনে হাঁটতে শুরু করে। সুমন লোকটির দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে পলকহীন চোখে।
কিরে সুমন? ধাক্কা দেয় আমজাদÑ লোকটির দিকে অমন করে তাকিয়ে আছিস কেন? আমজাদের ধাক্কায়ও সুমন লোকটির দিকে তাকিয়েই থাকে। মনে হচ্ছে সুমন গভীর কোন স্মৃতি খুঁজে ফিরছে। আমাদের মনের ভাবনা শেষ হতে পারে না, সুমন ডাক দেয়Ñ চাচা? শোনেন তো একটু...
কিন্তু ভিখেরিকে কেউ চাচা সম্বোধন করতে পারে বা করে হয়ত সে অভিজ্ঞতা ভিখেরির নেই বা ছিল না। সুতরাং সে বারেক না তাকিয়েই হন হন করে মেয়েটির সঙ্গে হাঁটতে থাকে। সুমন গদি ছেড়ে স্প্রিং দেয়া পুতুলের মতো লাফিয়ে ওঠে এবং পলকে লোকটির কাছে ছুটে যায়। আমরা অবাক চোখে তাকিয়ে আছি, তাকিয়ে ঘটনার তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করছি। লোকটি কি সুমনদের আত্মীয়? কিংবা খুব পরিচিত? অথবা প্রতিবেশী? সুমনের এত আগ্রহ কেন ভিখেরি লোকটার প্রতি? আমাদের ভাবনার মধ্যে সুমন লোকটাকে খুব যতেœর সঙ্গে এনে বসায় আমাদের সামনে একটা খালি চেয়ারে। নিজেও বসে। সুমন এখন আমাদের চেনে না। ওর সব মনোযোগ ভিখেরির প্রতি। ভিখেরির সঙ্গের মেয়েটিকেও বসতে দেয় আর একটি চেয়ারে। হঠাৎ অভাবনীয় সম্মানে ভিখেরি এবং মেয়েটি খানিকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলেও তারা এটাকে উপভোগ করতেও শুরু করে।
কি খাবেন চাচা? সুমন জিজ্ঞেস করে লোকটাকে।
লোকটা প্রাণ খুলে হাসতে শুরু করেÑ বাজান আমি ভিখেরি মানুষ, যা পাই খাই। কোন কিছু চাইয়া খাই না।
তারপরও বলুন, আজ আপনি যা খেতে চাইবেন আমি খাওয়াব। এখানে মুরগির বিরানি পাওয়া যায়। গরুর মাংসের ভুনা খিচুড়িও আছেÑ সাদা ভাত আছেÑ কোন্টা খাবেন? সুমন খুব সম্মানের সঙ্গে জানতে চায়।
মেয়েটা লোকটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে একটা কিছু বলে। অমায়িক হাসিতে লোকটার মুখ থৈথৈ করে ওঠেÑ বাজান, আমার সঙ্গে মাইয়াটা আমার ছোট ভাইয়ের মাইয়া। ওর বাপ নাই। মাইয়াটার নাম দরদী। ও আমার লগে থাকে। দরদী মুরগির সালুন দিয়া সাদা ভাত খাইতে চায়। আপনের কি খুব অসুবিদা অইবে?
আরে না, দু-তিন মিনিটের কারবারÑ সুমন দাঁড়ায়Ñ আপনারা বসুন, আমি আসছি।
সুুমন আবার গদি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। মেসার্স সোনারবাংলা এন্টারপ্রাইজের ঠিক উল্টোদিকে হোটেল মধুমিতায় ঢোকে সুমন। সাধারণত এমনটা ঘটে না। কোন কিছুর প্রয়োজন হলে এপার থেকে ডাক বা ইশারা দিলে হোটেল মধুমিতার কোন একজন মেসিয়ার ছুটে আসে। কারণÑ ভাল সেলামি মেলে এখানে। আবার অনেক সময় আমরা নিজেরাই হোটেল মধুমিতায় প্রবেশ করি।
বাজানের মনে গরিবের লাইগা অনেক দরদÑ ভিখেরি লোকটা আপন মনে না কি আমাদের শুনিয়ে কথাটা বলে ঠিক ঠাহর করতে পারি না আমরা। কিন্তু একটা বিষাদ বিরক্তিতে আমাদের মন ভরে গেছে। সুমন কি আমাদের ওর সংবেদনশীল মনের পরিচয় দেখানোর জন্য হঠাৎ এই আয়োজনে নেমেছে? ও তো এমন মানুষ নয়। হঠাৎ কি কারণে এই ভিখেরি লোকটা ওর কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হলো?
রাহাত? আমার কাঁধ খাঁমচে ধরে আমজাদ।
আমি ওর দিকে তাকাই। ও ইশারা করলে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাই এবং তাকিয়েই হতবাক। সুমন নিজেই ভাতের প্লেট নিয়ে আসছে দু’হাতে। পেছনে হোটেলের বয়। বয়ের হাতে মুরগির মাংসের বাটি, পানির জগ ও গ্লাস। সব এনে টেবিলের ওপর রাখে।
চাচা, শুরু করুন।
দরদী চটপট টাইপের মেয়ে। সে দ্রুত তার চাচার হাত ধুইয়ে প্লেট টেনে ধরিয়ে দেয়। নিজেও হাত ধুয়ে অন্য প্লেট টেনে মুরগির সালুন পাতে নিয়ে দ্রুত খেতে আরম্ভ করে খুব সাবলীলভাবে। আমরা যে কয়েকজন মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে আছি, এ নিয়ে কোন ভাবান্তর দেখলাম না। আমাদের নাকে মুরগির মাংসের গন্ধ এসে ধাক্কা দেয়। পুরো পরিবেশটা কেমন অসহ্য হয়ে উঠল। আমজাদ তাকায় আমার দিকেÑ রাহাত, চল।
চল, আমি দাঁড়াই।
খপ করে হাত ধরে সুমনÑ আর একটু বস।
তাহলে আমি যাই? আমজাদ বলেÑ আমার একটা জরুরী কাজ আছে।
যাবি না তোরা কেউ। তোদের সঙ্গে আমার জরুরী কথা আছেÑ খুব সিরিয়াসভাবে বলে সুমন।
আমজাদ অসহায়ভাবে কাঁধ ঝাঁকায়। আমি ওদের খাওয়ার দৃশ্য থেকে চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাস্তায় চলাচলরত যানবাহন দেখতে থাকি। যানবাহন দেখতে আমার খুব ভাল লাগে। একটা বাসের মধ্যে হরেক রকম মানুষ গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে একে অপরের সঙ্গে গুঁতোগুঁতির দাপটে ছুটে চলে উর্ধশ্বাসে। যেন সে না গেলে পৃথিবীর এক প্রান্ত অতলে হারিয়ে যাবে। কোথায় যায় এত মানুষ? আমার ভাবনা আমার ভেতর বেশিক্ষণ ক্রিয়া করতে পারে না সুমনের সংলাপের কারণে।
চাচা? ডাকে সুমন।
সুুরুৎ সুরুৎ ঝোল টেনে খেতে খেতে কথা বলে লোকটাÑ বলেন বাজান।
আপনার নাম কি?
বাজান নাম দিয়া কি করবেন? আমি রাস্তার সামান্য ফকির মানুষ। ভিক্ষা কইরা খাই।
কিন্তু আমি আপনার নাম জানি। লোকটার ছলাৎ ছলাৎ খাওয়ার গতি হঠাৎ থেমে যায়Ñ আপনে আমার নাম জানেন?
জানি। আপনার নাম তোবারক। লোকে আপনাকে জবাই তোবারক বলত। কি আমি ঠিক বলেছি?
তোবারক খাওয়া থামিয়ে তাকায় সুমনের দিকেÑ আপনে যহন খুব যতœ কইরা বসাইতেছিলেন তহনই আমার মনে কেমন সন্দেহ হইতেছিল। বাজান, যা হবার হইয়া গেছে, আগের কথা আর সামনে টানতে চাই নাÑ লোকটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার খাওয়ায় মন দেয়।
আমরা অন্য রকমের ঘটনার সন্ধান পাই। সুমন লোকটার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। লোকটাকেÑ তোবারককে অনেক স্মৃতির ওপার থেকে চিনবার চেষ্টা করছে মনে হচ্ছে।
সুুমন? ডাকে আমজাদ। এই লোকটা কে?
খুব শৈশবে নানা মুখে শুনতাম তোবারক ডাকাতের নানা লোমহর্ষক ঘটনা। যে বাড়িতে তোবারক ডাকাত ঢোকে সে বাড়িতে একটা দুটো মানুষ খুন হবেই। খুন বললে ভুল বলা হবেÑ জবাই করে হত্যা এবং এই জবাই করার কাজটা করত ডাকাত সরদার তোবারক নিজে। কারণÑ মানুষ জবাই করে হত্যা করতে সে খুব পছন্দ করত। জবাই হয়ে যাওয়া মানুষটির আর্তি ও আর্তনাদ ডাকাত সরদার তোবারকের খুব ভাল লাগত। মানুষকে জবাই করার সময় নিজেকে তার বিধাতার মতো শক্তিশালী মনে হতো।
সুুমন বলছে আর আমরা তোবারকের দিকে তাকিয়েই আছি। লোকটা নির্বিকার। যেন শুনতে পাচ্ছে না কিছুই। তার একমাত্র কাজ খেয়ে যাওয়া- সে খেয়ে যাচ্ছে। কথার ফাঁকে সুমন আর এক প্লেট ভাত তোবারকের পাতে ঢেলে দেয়। তোবারক মুরগির মাংসের সালুন আর পাতলা ডালের সঙ্গে ভাত মেখে মেখে মুখে দিতে থাকে। মনে হয় তার পেটে অনন্তের ক্ষুধা।
আমরা তখন সিক্সে কিংবা সেভেনে পড়িÑ এই সময় আমাদের বাড়িতে ডাকাত সরদার তোবারক চিঠি পাঠায়। লোকটা চিঠি দিয়ে ডাকাতি করত? প্রশ্ন আমজাদের।
হ্যাঁÑ বড় বড় ডাকাত চিঠি দিয়ে ডাকাতি করত এক সময়। তখন দেশ সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে। চারদিকে পাকিস্তানীদের ধ্বংসযজ্ঞ। আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ ততটা মজবুত হয়ে বসতে পারেনি। এই সুযোগটাই গ্রহণ করেছিল কিছু মানুষরূপী হায়েনার দল। শোনা যায় তারা মুক্তিযুদ্ধের নামে অপকর্ম করে বেড়াত। বলা যায় এরা ছিল রাজাকার আল বদরদের একটি শাখা সংগঠন। তাদেরই একটি শাখা দলের প্রধান ছিল এই তোবারক ডাকাত। তার দলের নৃশংসতার খবর লোকের মুখে মুখে ফিরত। শুনেছিÑ ছোট ছোট বাচ্চাকে ঘুম পাড়াতে কিংবা ভাত খাওয়াতে তোবারক ডাকাতের ভয় দেখাত মা-চাচিরা।
তোদের বাড়িতে তোবারক ডাকাত এসেছিল? সামনে বসে তোবারক ডাকাতকে দেখতে দেখতে প্রশ্ন করি আমি। আমার কেমন যেন সন্দেহ জাগেÑ সুমন আমাদের সম্মোহিত করতে চাইছে। একজন খুনে রক্তপিপাসু ডাকাতকে সামনে বসিয়ে আদর-যতেœ মুরগির সালুন দিয়ে সাদা ভাত খাওয়াতে খাওয়াতে আমাদের কোন এক বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছে ও?
মৃদু হাসে সুমনÑ এসেছিল মানে? না আসলে এই তোবারক ডাকাতকে চিনলাম কি করে?
তোর শৈশবের ঘটনা মনে আছে? মৃদু সংশয় প্রকাশ করে আমজাদ।
কেবল আমার নয় যে কোন মানুষেরই মনে থাকবে সেই লোমহর্ষক ঘটনা ও ঘটনার মানুষকে।
বল, অনুমতি দেয় আমজাদ।
আমাদের বাড়িটা অনেক বড়। এগারোটা ছোটবড় ঘর। প্রত্যেক ঘরে যদি দু’জন করে তরুণও থাকেÑ সর্বমোট বাইশজন। কিন্তু ছিল আরও অনেক বেশি তরুণ, চাচাত মামাত ভাই মিলে। এলাকার লোকজন আমাদের বাড়ির কারও সঙ্গে পারতপক্ষে ঝগড়া ফ্যাসাদ করতে যেত নাÑ এক ডাকে আমাদের বাড়ি থেকে বিশ পঁচিশজন লোক বের হয়ে আসত। আবার ভেতরের ব্যাপার ছিল ভিন্নÑ বাইরে একতা থাকলেও ভেতরে ভেতরে কিন্তু একে অন্যের শত্রু ছিল। কেউ কারও চেয়ে খেয়ে পরে ভাল থাকুক অন্যরা চাইত না। কিংবা ধর কারও ছেলেমেয়ে পড়াশোনায় ভাল করলÑ এটা নিয়েও ঈর্ষা হতো।
ইন্টাংরেস্টি তো! আমি ফোড়ন কাটি।
যেখানে বেশি মানুষ সেখানেই বেশি সংঘাত, ঈর্ষা আর মানুষের ঠুনকো বড়াই থাকবেই।
ধমক দেয় আমজাদÑ তোর তত্ত্ব কথা রাখ। সামনে বাড়Ñ
তোবারক ডাকাতের খাওয়ার গতি কমে গেছে। সে খেতে পারছে না। মনে হচ্ছেÑ মেসার্স সোনারবাংলা এন্টারপ্রাইজের দোকান থেকে পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। বার বার পানি খাচ্ছে। গলায় মুরগির সালুন আর সাদা ভাত আটকে যাচ্ছে। দরদী নির্বিকারভাবে হাপুস হুপুস খেয়ে যাচ্ছে। হয়ত জানেও না একজন লোমহর্ষক ডাকাতের সঙ্গে সে ভিক্ষার ব্যবসা করে।
অতবড় বাড়ি, প্রচুর লোক। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক সবাই ছিল নাÑ কেউ কেউ ইসলামের নামে পৃথিবীর অবাস্তব রাষ্ট্র পাকিস্তানকেও সমর্থন দিয়েছিল। আমাদের বড় চাচা সরাসরি পাকিস্তানের দালাল ছিল। তার ধারণা ছিলÑ পাকিস্তান না থাকলে দুনিয়াতে ইসলাম থাকবে না। অথচ তথাকথিত পাকিস্তান জন্মানোর কয়েক শ’ বছর আগে ইসলাম পৃথিবীতে এসেছিল। আরও কয়েকজন ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। আমরা পুরো পরিবার স্বাধীন বাংলার পক্ষে। আমার বড় ভাই মাসুদ ভাইকে তো তোরা চিনিসÑ সে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। থাকত ইকবাল হলেÑ এখন যেটা সার্জেন্ট জহুরুল হক হল। ছাত্রলীগের মাঝারি সাইজের নেতা। শেখ মুজিবের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ফলে একটা বাড়িতে অনেক ফ্যাক্টর কাজ করছিল। আমরা যারা ছোট অত না বুঝলেও পরিবারের সেই সৌহার্দ যে নেই বুঝতাম। (এরপর ২১-এর পাতায়)

(২২-এর পাতার পর)

সবাই পাশাপাশি থাকলেও সুযোগ বুঝে রাজনৈতিক স্বার্থ বুননের চেষ্টাও ছিল। এত কিছুর পরও মুক্তিযোদ্ধা ছিল প্রায় আঠারো-উনিশ জন সারা বাড়িতে। তোবারক ডাকাতের চিঠি পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের লুকিয়ে রাখা অস্ত্র বের করে আনে।
বাহ এ তো দেখছি রীতিমতো যুদ্ধ! বিস্ময় প্রকাশ করে আমজাদ।
সেটা সত্যি একটা যুদ্ধ ছিলÑ সুমন সমর্থন করে আমজাদকে। বাড়ির পেছনে ট্রেঞ্চ করা হয়েছিল। যে রাতে ডাকাত আসার কথাÑ সেখানে শিশু ও নারীরা সন্ধ্যা থেকেই লুকিয়েছিল। মাঝরাতে আমরা শুনেছিলাম কান ফাটা অজস্র গুলির শব্দ। এক সময়ে আর কিছু মনে নেই আমরা ঘুমিয়ে যাই। খুব সকালে ঘুম ভাঙলে দেখিÑ বাড়ির সামনে হাজার হাজার মানুষ। মানুষের সেই মিছিল আর শোরগোল লক্ষ্য করে এগিয়ে দেখিÑ অনেক মানুষ হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আর ছেলে-বুড়ো যে যেভাবে পারছে লাথি কিল গুঁতো দিচ্ছে। কেউ কেউ লাঠি দিয়ে আচ্ছা করে পেটাচ্ছে। লোকগুলো নির্বিকারভাবে মুখ বুঝে সব সহ্য করে যাচ্ছে আর ফ্যাল ফ্যাল করে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। সেদিন না বুঝলেও আজ বুঝতে পারিÑ কি ছিল সেই দৃষ্টিতে?
বলত কি ছিল তাদের দৃষ্টিতে? জিজ্ঞেস করে আমজাদ।
তাদের দৃষ্টিতে ছিল নিখাঁদ বিস্ময়। যারা এতদিন মানুষ মেরেছে, মানুষের সংসার লুট করেছে আজ সেই তারা লুটের শিকার? বসে বসে মার খেয়েও সেটা মানতে পারছিল না তারা।
মৃৃদ হাসে আমজাদÑ তোর মধ্যে এক সাংঘাতিক দার্শনিক বাস করে রে সুমন, এতদিন জানতে পারিনি।
তোর সেই লোকগুলোই তো এই তোবারক ডাকাত দলের সদস্য? আমি জানতে চাই।
হ্যাঁ, সুমন তাকায় আমার দিকে। তোরা আমাকে বোকা ভাবতে পারিসÑ কিন্তু আমি সত্যি বলছি ডাকাত যে মানুষ, আমি এদের না দেখা পর্যন্ত জানতাম না সেই কিশোর বয়সে। আমি ভাবতামÑ যারা মানুষকে এমন নিপীড়ন করে, আনন্দের সঙ্গে জবাই করে তারা ভিন্ন জাতের কোন প্রাণী। মানুষ হয়ে মানুষকে এমন নির্দয়ভাবে খুন করে কিভাবে? যেমন ধরÑ মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার আলবদর জামায়াতের নির্মম খুনোখুনির ঘটনা যখন শুনতামÑ এরাও যে মানুষ জানতাম না। ভেবেছি এরা এক ধরনের জন্তু বা জানোয়ার। কিন্তু বড় হয়ে যখন বুঝতে পারলাম এই খুনীরাও মানুষ তখন বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি। যারা কেবল চিন্তার পার্থক্যের জন্য একই ধর্মের মানুষ হয়েও হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে প্রতিবেশী বা স্বদেশের মেধাবী মানুষদের হত্যা করতেÑ তারা কেমনে মানুষ হয়? এই প্রশ্নের উত্তর আজও পাইনি।
সুমনের ভেতর যে এমন চিন্তার বিস্তার আছে আমরা সত্যি জানতাম না। ওকে দেখতাম ভাসমান পদ্মর মতো সদাহাস্য মুখ। দিনরাত হাসি আনন্দের স্রোতে গা লাগিয়ে থাকে। আসলে প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব একটা ভুবন থাকেÑ যে ভুবন একান্ত তার নিজের। আজকে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো তোবারক ডাকাতের মুখোমুখি না হলে সুমনের গভীর
অন্তরলোকের মানবিক ভাবনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হতো না।
চাচাজান? দরদী ডাকে তোবারক ডাকাতকে। দরদীর খাওয়া শেষ। সে খুব যতেœর সঙ্গে ডান হাতের সালুন মাখা আঙ্গুলগুলো চাটছে।
তোবারক ডাকাতের খাওয়াও শেষ। তার ডান হাতখানা চেটেপুটে খাওয়া ভাতের থালার মাঝখানে ছিন্ন জামরুলের মতো স্থির। মুখ ভাবলেশহীন। তার শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে গেছে। শব্দ করে শ্বাস নিচ্ছে সে। ইতোমধ্যে মেসার্স সোনারবাংলা এন্টারপ্রাইজের টেবিল ঘিরে একটা ছোটখাটো জটলা জমেছে। আশপাশের দোকানের লোকজন এসে সুমনের মুখে তোবারক ডাকাতের ঘটনা শোনে আর বিস্ফোরিত চোখে সামনে বসা জলজ্যান্ত তোবারককে দেখে। তোবারকও বুঝে গেছে সে এক চিড়িয়াখানার জন্তু বনে গেছে।
হ্যাশে আপনেরা তোবারক ডাকাইতরে কি করলেন? পাশের দোকানের এক কর্মচারী জানতে চায়।
আমার তো কিছু করার ছিল না। যা করার বড়রাই করেছে। আমি এবং আমার বয়সের ছেলেমেয়েরা দেখেছি। এখন আপনাদের যা বলছিÑ আমার সেই সময়ের দেখা দৃশ্যাবলী থেকেই বলছি এবং পরবর্তীতে বড় ভাইদের বলা ঘটনা থেকেÑ সুমন যেন উপস্থিত জনতাকে একটা কৈফিয়ত দিচ্ছে।
এতক্ষণ আমজাদ চুপ থাকার পর মুখ খোলেÑ তোর বড় ভাইয়েরা খুব খারাপ একটা কাজ করেছে রে সুমন। ওর কণ্ঠে খানিকটা ক্ষোভ।
কিভাবে?
এই খুনে রক্তপিপাসু ডাকাতটাকে বাঁচিয়ে রেখে মস্ত অন্যায় করেছে তারা।
সেটা তাদের ব্যাপার ছিল। তবে তাদের বিচারটা মনে হয় ভালই হয়েছেÑ তাকায় তোবারক ডাকাতের দিকেÑ আপনি কি বলেন তোবারক সাহেব?
হঠাৎ তোবারক ডাকাত তার দশাসই শরীর কাঁপিয়ে টেবিলে মাথা রেখে হাহাকার করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। উপস্থিত লোকসকল হঠাৎ কান্নার জন্য প্রস্তুত ছিল না। যে ডাকাত নিজের হাতে মানুষ জবাই করার সময় নিজেকে বিধাতা ভাবতÑ জবাই করে মানুষের টাটকা রক্তে হাত ডুবিয়ে দেয়ালে দেয়ালে ছবি আঁকত, সেই তোবারক ডাকাতের এমন সকরুণ আত্মসমর্পণ কেউ আশা করেনি। তারা ভেবেছিল সুমনের কথা শেষ হবার আগেই তোবারক ডাকাত রাগে ক্ষোভে চিৎকারে ফেটে পড়বেÑ সুমনকে কেটে টুকরো টুকরো করে মহাসড়কের কংক্রিটে বিছিয়ে সুনামির সর্বনাশে অবাক অট্টহাসিতে নাচবে। সেখানে সে কি নির্বিকার! তার এই নির্মম নির্বিকারত্ব উপস্থিত লোকসকল মানতে পারছে না। তারা চায় তোবারক ডাকাত একটা ভয়ঙ্কর হুঙ্কার দিয়ে আবার মাঠে নামুক। দেখিয়ে দিক তার প্রবল প্রতাব আর ...
দরদী এইবার বিচলিতবোধ করে। সে তার এতদিনের পরিচিত চাচাকে অপরিচিত আঙ্গিকে কাঁদতে দেখে হতবাক। দরদী তার চাচার পিঠে হাত রাখে। তোবারক তার উচ্চস্বরের কান্না থামায় এবং থেতলানো মিহি সুরে কাঁদতে থাকে। তার কাঁদার সঙ্গে সঙ্গে শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে।
বিচারে কি হয়েছিল? প্রতিবেশী দোকানদারদের একজন জানতে চায়।
আমাদের এলাকা থেকে ভান্ডারিয়া থানা প্রায় আট-নয় কিলোমিটার দূরে। সকালেই থানায় খবর দেয়ার জন্য লোক পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই ফাঁকে ডাকাতের হাতে অত্যাচারিত লোকজন হামলে পড়ে। কয়েকজন ডাকাতকে পিটিয়ে মেরে ফেলে উন্মত্ত জনতা। কিন্তু সব মানুষের ক্ষোভ এই তোবারক ডাকাতের ওপর। তাকে নিয়ে কি করা যায়Ñ ভাবছে সবাই। থানা থেকে পুলিশ এলে ওকে নিয়ে যাবে, পুলিশ ওকে জেলে পাঠাবে এবং কয়েক বছর জেল খেটে বের হয়ে এসে আবার দ্বিগুণ উৎসাহে প্রতিশোধ নেবে। পুলিশ আসার আগে ওকে চিরকাল মনে রাখার মতো একটা শাস্তি দিতে চায় সবাই। কেউ বলে একটা হাত কেটে দিতে, কেউ বলে একটা পা কেটে দিতে। তখন আমাদের হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক গৌরকিশোর ঘোষ একটা পরামর্শ দেনÑ যা সবার মনে লাগে। এখানে একটা কথা বলা দরকারÑ গৌরকিশোর ঘোষ স্যারের তিন ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যান এবং তিনজনই শহীদ হন।
উপস্থিত লোকজনের মনে তৎক্ষণাৎ না দেখা শিক্ষক গৌরকিশোর ঘোষের জন্য গভীর সহানুভূতি ও সম্মান অনুরণিত হয়।
তোবারক ডাকাতের কান্না থেমে গেছে। বুঝে গেছে জীবনের গল্প তাকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে এভাবে। গৌর বাবু কি সিদ্ধান্ত দিলেন? আমার প্রশ্ন।
তিনি বললেনÑ তোবারককে মেরে ফেলা অন্যায় হবে। ওকে এমন একটা শাস্তি দিতে হবে যাতে বুঝতে পারেÑ অন্য মানুষকে কষ্ট দেয়া কত অন্যায় ছিল। তিনি বললেন ওর চোখ দুটো তুলে ওকে মুক্তি দাও। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত লোকজন জয় বাংলা সেøাগান দিয়ে স্যারের ঘোষণাকে স্বাগত জানাল। একটু থামে সুমনÑ সেই সকাল, সেই দিনটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি হয়ে আছে। আমাদের এলাকার কসাই হাবিবুরকে দায়িত্ব দেয়া হলো ওর চোখ তোলার। হাবিবুরের ছোট বোনের বাড়িতে মাস তিনেক আগে ডাকাতি করেছে তোবারক ডাকাতের দল। লোকমুখে জানা গেছে হাবিবুরের ছোট বোনকে ডাকাতরা ধর্ষণও করেছে। এই কারণেÑ বোনটা এখন হাবিবুরদের বাড়িতেÑ জামাই নিতে চায় না। সুতরাং হাবিবুরের ক্ষোভ ছিল ভয়ঙ্কর রকম। অল্প সময়ের মধ্যে গরু বাঁধার দড়ি যোগাড় করে ওকে চোখের পলকের মধ্যে বেঁধে ফেলা হলো। হাতে সময় নেই, কারণ পুলিশ আসতে পারে যে কোন সময়। পুলিশ এলে চোখ তোলা যাবে না। দ্রুত তাকে আমাদের গ্রামের খেলার মাঠে নিয়ে গেল সবাই ধরাধরি করে। হাজার হাজার লোক চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুক্তিযোদ্ধারা পাহার দিচ্ছেন। ওকে চিৎ করে সবুজ ঘাসের ওপর শোয়ানো হলো। যদিও হাত দুটো পিছমোড়া বাঁধাÑ তারপরও চার-পাঁচজনে মিলে হাত ও পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে গেল। যাতে সে একচুল পরিমাণ নড়াচড়া করতে না পারে। হাবিবুর তার গরুর মাংস বানানো বিশেষ কায়দায় তৈরি তীক্ষè চাকু নিয়ে দাঁড়ায় ওর বুকের ওপর। তাকায় উপস্থিত জনতার দিকে। জনতার ভেতর একটা সাড়া পড়ে যায়।
হাবিবুর মৃদু হেসে হাতের ছুরিটা নাচাতে নাচাতে হঠাৎ ঢুকিয়ে দেয় ডান চোখে। ফিনকি দিয়ে রক্তের একটা ধারা উঠল এবং কানে এলো একটি সকরুণ বিলাপধ্বনিÑ আমি সেই আর্তধ্বনি আর কখনও কোথাও শুনিনি। বাতাসে কান পাতলে আমি এখনও একজন মানুষের অতিমানবিক বিলাপধ্বনি শুনতে পাই। উপস্থিত হাজার হাজার লোকের মধ্যে নেমে এলো অবাক নীরবতা। মনে হলো সেই মাঠে কোন মানুষ নেই। হাবিবুর হাতে ওর চোখটা নিয়ে একটু পরখ করে দেখে জনতার দিকে ছুড়ে মারে। জনতা দূরে সরে যায়। চোখটা বিপুল ঘাসের সবুজ রঙের মধ্যে ডুব দেয়। তার কয়েক মুহূর্ত পর হাবিবুর দ্বিতীয় চোখ তুলে আনে এক লহমায় এবং বাতাসে ভেসে আসে আগের চেয়েও করুণ বর্ণনাতীত বিলাপধ্বনি। দ্বিতীয় চোখ হাতে নিয়ে হাবিবুর নেমে আসে তোবারকের বুকের ওপর থেকে। অন্যরাও নামে। শরীরের ওপর থেকে লোক সরে গেলে তোবারক সাহেব উঠে বসার চেষ্টা করেÑ কিন্তু হাত বাঁধা থাকায় পারে না। তখন আপনি কি করেছিলেন আপনার মনে আছে? সামনে বসা তোবারক ডাকতকে খুব আলতোভাবে জিজ্ঞেস করে সুমন। যেন অনেকদিনের পরিচয় ওদের দু’জনের।
তোবারক নিরুত্তর থাকে। দরদীর কাঁধে হাত রাখে। সে এখান থেকে চলে যেতে চায়। এখানে থাকা মানে দ্বিতীয়বার তার হত্যা দৃশ্য তাকেই উপভোগ করতে হবে।
আপনার মনে না থাকলেও আমার মনে আছেÑ সুমনকে আজ স্মৃতি তাড়িত কথায় পেয়েছে এবং সেই সঙ্গে পেয়েছে নিষ্ঠাবান শ্রোতা, সামনে পেয়েছে প্রধান চরিত্র তোবারককেÑ সুতরাং কথা তো বলবেইÑ আপনি দড়ি পাকানোর মতো করে সারাটা মাঠে গড়িয়ে যেতে যেতে হাহাকার করে কাঁদছিলেন। মাঠে ছিল লম্বা ঘাসÑ আপনি সেই ঘাসের ওপর দিয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে যখন শরীরে দড়ি পাকাচ্ছিলেন, যদিও আপনি অনেক মানুষকে নিজের হাতে হাসতে হাসতে খুন করেছিলেন, সেই সকালে আমাদের খেলার মাঠে উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষের চোখে আপনি ছিলেন গণশত্রু কিন্তু কি আশ্চার্যÑ আপনার চোখ দুটো উপড়ে ফেলার পর সকরুণ বিলাপ ও আর্তনাদে অনেকের চোখে আমি পানি দেখেছি। এমনকি আমি নিজেও কেঁদেছি আপনার জন্য... বিশ্বাস করুন, সুমন হাত ধরে তোবারক ডাকাতেরÑ
আমি অহন যেতে চাইÑ গলায় অসহায় ক্ষোভ।
আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে ভাবি নাই তোবারক সাহেবÑ আপনাকে না পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল! শুনেছিলাম আপনার যাবজ্জীবন কারাদ- হয়েছে। ছাড়া পেলেন কিভাবে?
অন্ধ মানুষরে জেলেও রাখতে চায় না। আমারে কয়েক বছর পর ছাইড়া দিয়াছেÑ দাঁড়ায় তোবারকÑ আমারে যাইতে দেন।
যান আপনে, আপনাকে কেউ কিছু বলবে না। সুমন কথা বলতে বলতে মানিব্যাগ বের করে দরদীর হাতে দুটো পাঁচ শ’ টাকার নোট ধরিয়ে দেয়। দরদীর চোখে-মুখে উল্লাস। যেতে যেতে তোবারক ফিরে তাকায়Ñ বাজান, আপনেরে একটা কথা কই?
বলুন।
আপনেরা যদি আমারে অন্ধ না কইরা মাইরা হালাইতেন, অনেক ভাল অইত।
তার কণ্ঠ ভারি হয়ে আসেÑ পথে পথে ভিক্ষা কইরা কুকুরের মতো আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না। কত দিন মরতে চাইছি কিন্তু হেইসব মানুষের মরণের কষ্ট মনে পইড়া যায়... মনে পইড়া যায়Ñ আর মরতে পারি না।
লোকটা ধিকি ধিকি আগুনের মধ্যে হেঁটে হেঁটে চলে যায়। আমরা তার পথের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকি।
চিলেকোঠার রাতপ্রহরী
ঝর্ণা রহমান
মতিয়ারকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো সাত্তার মিয়া। লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলে, ম্ মতি ভাই, ত্ তুমি? ত্ তুমি ক্ কইত্থেইকা ক্ কেমনে.... তোতলাতে থাকে সাত্তার মিয়া। কিন্তু মতি সাত্তার মিয়ার কথার উত্তর না দিয়ে বলে, সাত্তার ভাই, ঘরে দাও আছে? গাছ কাটা দাও?
মতি মাথাটা অস্থিরভাবে এদিক ওদিক ঘোরায়Ñ যেন ঘরের দেয়ালে একটা গাছকাটা দা ঝুলে থাকবার কথা। ছাদের ওপর দুটো বাঁশের সাথে ঝোলানো তারের মধ্যে একটা ষাট পাওয়ারের বাতি জ্বলছে। খোলা দরজা দিয়ে সেই আলো এসে ঢুকেছে ঘরের ভেতরে। তাতে হাল্কা একটা আলো আঁধারী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। দরজা জুড়ে দাঁড়ানো মতিয়ারকে দেখে সাত্তার কী বলবে বুঝতে পারে না।
সে বারবার আড় চোখে ঘরের ভেতরের একমাত্র আসবাবÑ কাঁঠাল কাঠের চৌকিটিতে পেতে রাখা বিছানাটা দেখে, যেখানে চাদর মুড়ি দিয়ে আর একজন মতিয়ার এতক্ষণ তার পাশে শুয়ে ঘুমিয়েছে এবং এখনও ঘুমোচ্ছে। দরজায় দাঁড়ানো মতিয়ারের চোখ কেমন জ্বলজ্বল করছে। বড় বড় মনি দুটো অস্বাভাবিকভাবে ঘুরছে। এ কে?
সাত্তার মিয়া দিশাহারা হয়ে ঘুমন্ত মতিয়ারকে একটা ঠেলা দিয়ে ফিসফিস করে বলে, মতি ভাই, মতিয়ার ভাই, অ মতি ভাই...।
মতিয়ার কম্বলের তলা থেকে অস্পষ্ট একটা ঘুম জড়ানো গোঙানি দিয়ে আবার চুপ মেরে যায়।
দরজায় দাঁড়ানো মতিয়ার তখন আধখোলা পাল্লাটা দু’পাশে হাট করে ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়েছে। সাত্তার ভালো করে দেখে মতিয়ারের গায়ে গত রাতের সেই নীল ফতুয়া। গালে মুখে কদিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কদিন ধরেই তো মতিয়ার অসুস্থ। দাড়ি কামাবে কী! সবই তো ঠিক আছে! তাহলে?
সাত্তার ভয়ার্ত চোখ ঘুরিয়ে দুই মতিয়ারকে দেখে। বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে অসুস্থ মতিয়ার আর সাত্তার মিয়ার পাঁচ বছরের সহকর্মী, তার প্রতিদিনের চেনা সঙ্গী সেই মতিয়ারই এখন ঘরের দেয়ালে বড় বড় ছায়া ফেলে গাছ কাটা দা খুঁজে বেড়াচ্ছে।
সাত্তার মিয়া কি স্বপ্ন দেখছে? চোখ ডলে ঘরের চারদিকে তাকায় সে।
হ্যাঁ, এই তো তাদের থাকার ঘর! দশ ফিট বাই দশ ফিটের দেয়াল ঘেরা একটা ছোট্ট কোঠা। দেয়ালে প্লাস্টার দেয়া হয়নি এখনও। পশ্চিম দিকে ছোট্ট একটা গ্রিলের জানালা বসানো। সেখান দিয়ে হাতির ঘাটের বড় মসজিদের উঁচু মিনারের চূড়াটা দেখা যাচ্ছে। মিনারের চারপাশে মিশমিশে কালো আকাশ ঝিম মেরে আছে। ছাদের দিকে বের হবার জন্য একটা দরজা। যে দরজাটা সাত্তার মিয়া আজ রাত চারটায় নিজের হাতে ভালো করে ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে তারপর শুতে এসেছে। সেই দরজার দুই পাল্লা এখন হাট করে খোলা। সেই খোলা দরজা দিয়ে দ্বিতীয় আর একজন মতিয়ার ঘরে ঢুকে দাও খুঁজছে। অবশ্য কোনটা যে প্রথম আর কোনটা দ্বিতীয় মতিয়ার তা সাত্তার মিয়া বুঝতে পারে না। তবু মনে হয় চৌকির ওপর এখনো নিঝুম শুয়ে আছে যে মতিয়ার, তাকেই রাতে শোবার আগে এক গেলাশ গ্লুকোজে গোলানো শরবত খাইয়ে দিয়েছিলো সাত্তার। কাজেই দাও-খুঁজন্তি মতিয়ারই দ্বিতীয়। কিন্তু নীল ফতুয়া? যে মতিয়ার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে তার গায়ে যদি অন্য কোনো জামা থাকে? যা কোনোদিন সাত্তার দেখেনি! তা হলে সে কি আসল মতিয়ার হবে না ভুয়া? সাত্তারের শীত লাগতে থাকে। ঘরটা যেন সাত্তারকেসহ দুই মতিয়ার দুদিক থেকে ধরে ঝাঁকাতে লেগেছে। কাঁপুনিও লাগে।
সাত্তারদের থাকার এই ঘরটা হলো সাত তলার ওপরের সিঁড়িঘর। দি ইউনিক ইন্টারন্যাশনাল কলেজের মাল্টিপারপাস ভবনের এই সিঁড়িটি অপরিসর। মূলত: ওঠানামার জন্য এ ভবনে থাকবে লিফট। ভবনটির নির্মাণকাজ সবেমাত্র শেষ হয়েছে। তবে ক্লাস ল্যাবরেটরি, কমনরুম টিচার্সরুম ইত্যাদি চালু হলেও লিফট এখনও লাগেনি। তাই আপাতত সিঁড়িই ভরসা।
মতিয়ার আর সাত্তার মিয়া এই কলেজের রাতপ্রহরী। মাল্টিপারপাস ভবনের অপরিসর চিলেকোঠায় তাদের দু’জনের সংসার। দু’জন পুরুষ মানুষের তো আর স্ত্রীপুত্রকন্যা মিলিয়ে যে সংসার তা হয় না! তবে তাদের দু’জনেরই পরিবারপরিজন থাকে গ্রামে। সাত্তার মিয়ার বাড়ি নোয়াখালীর ছাগলনাইয়াতে। সেখানে তার বউ আর দুটো ছেলে মেয়ে আছে। ছেলের বয়স বারো, স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়ে। থাকেও সেখানে। মেয়ের বয়স সাত। তাকে একটা এনজিও স্কুলে ভরতি করিয়ে দিয়েছে। সাত্তার মিয়ার মোবাইলে তার মেয়ে হাস্নাহেনার একটা হাসিমুখের ছবি আছে। মাথার চুলে একটা লাল প্রজাপতি ক্লিপ বসানো। সাত্তার সময় পেলেই মোবাইলে আলো জ্বালিয়ে মেয়ের ছবি দেখে। মতিয়ারের বাড়ি পটুয়াখালীর আমতলিতে। মতিয়ারের বউ বাক প্রতিবন্ধী। কথা বলতে পারে না। তবে মতিয়ার বউকে খুব ভালোবাসে। মতিয়ারের বাড়ির সমস্ত কাজ তার বউ করে। গাই পালে। খেত কোপায়। তরিতরকারি ফলায়। ঘরের বেড়া বাঁধে। মতিয়ারের মা নেই। তিনজন ছোট ছোট ভাই-বোন আছে। দেবর ননদদের মতিয়ারের বউই রেঁধেবেড়ে দেয়। তারও দুটি সন্তান। চার আর ছয় বছরের দুটি মেয়ে। মেয়েরা কেউ বোবা না। মাঝে মাঝে মতিয়ার মোবাইল করে ছোট মেয়ে প্রিয়ার সাথে কথা বলে। হিন্দি ফিল্ম দেখে মতিয়ার তার মেয়েদের নাম রেখেছে প্রীতি আর প্রিয়া। মতিয়ারের ইচ্ছা দু’ মেয়েকে সে লেখাপড়া শেখাবে। কিন্তু নিজের কাছে পরিবারকে এনে রাখতে না পারলে তো ছেলেমেয়ের লেখাপড়া হবে না।
দূরদূরান্তে নিজেদের পরিবার থাকাতে সাত্তার মিয়া আর মতিয়ার নিজেদের মধ্যে এক ধরনের সুখদুঃখের মিল খুঁজে পেয়েছে। কাজও তাদের একই। নাইট গার্ড। পাঁচতলা ছয়তলা সাততলা তিনদিকে তিনটি ভবন, মাঝখানে বিশাল এক মাঠ, পশ্চিমে একটা বাঁধানো ঝিল, তার পেছনে কলেজের অধ্যক্ষের কোয়ার্টারÑ এইসব মিলিয়ে কলেজটির বিশাল ক্যাম্পাস। তাতে দু’জন নাইট গার্ড তো বটেই তিনজন হলে আরও ভালো হয়। তবে মতিয়ার আর সাত্তার মনে করে আর কোনো নাইট গার্ড না আসাই ভালো। অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট। আর একজন এসে হয়তো তাদের দু’জনের মধ্যে সুঁই হয়ে ঢুকবে ফাল হয়ে বেরুবে। তাদের দোস্তি দেখে চোখ টাটাবে আর নানাভাবে ঝামেলা ঘটাতে চেষ্টা করবে। তার চেয়ে দু’জনই ভালো। ক্যাম্পাসটাকে দু’ভাগ করে তারা দু’জন পাহারা দেয়। মাঠের উত্তর দিকে পাঁচতলা আর ছয়তলা ভবন, দক্ষিণ দিকে সাততলা ভবন, গ্যারেজ, অধ্যক্ষের কোয়ার্টার, ঝিল ইত্যাদি। রাত একটা থেকে পাঁচটার মধ্যে ঘণ্টাখানেক পালা করে ঘুমিয়েও নেয় তারা। এক ধাপে মতিয়ার ঘুমায় সাত্তার জাগে আর এক ধাপে সাত্তার ঘুমায় মতিয়ার জাগে।
আজ অবশ্য মতিয়ার বারটার আগেই ঘুমিয়েছে। সাত্তার একলাই ডিউটি দিয়েছে।
কদিন ধরে মতিয়ারের গা ঘুষঘুষে জ্বর। মুখে রুচি নেই। সব কিছুতে গন্ধ লাগছে। গত রাতে ডালের সাথে একটুকরো এলাচি লেবু ডলে নিয়ে কয়েক লোকমা ভাত মুখে দিয়ে আবার তা বমি করে ফেলে দিয়েছে। সাত্তারের ধারণা, মতিয়ারের জন্ডিস হয়েছে। সাত্তার মিয়া মতিয়ারের চোখের পাতা টেনে দেখেছে ভেতরে সাদা অংশ হলুদ হয়েছে কি না। হাতের পাতা মেলে নখগুলো পরীক্ষা করেছে, কোনো রঙ বদল হলো কি না। যদিও কিছুই বুঝতে পারেনি, তবুও মতিয়ারকে ডাক্তারের কাছে যেতে আর সাবধানে থাকতে পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু এখন মাসের শেষ। বেতন পাওয়ার আগে মতিয়ারের ডাক্তার দেখাবার উপায় নেই। গতকাল থেকে মতিয়ারের জ্বরও বাড়তির দিকে। জন্ডিসের একমাত্র ঔষধ বিশ্রাম Ñ সাত্তার তা জানে। তাই গত দু’ তিন রাত ধরে সাত্তার একাই ডিউটি দিচ্ছে। শুধু ডিউটিই না, মতিয়ারকে দেখাশোনাও সে-ই করেছে। প্যারাসিটামল কিনে দিয়েছে। পুরোনো পাঁচতলা বিল্ডিঙের ছাদে পানির ট্যাংকির চারপাশে ভেজা জায়গায় একটা থানকুনি পাতার ঝুপি হয়েছে, সেখান থেকে কয়েকটা ছিঁড়ে এনে মতিয়ারের জন্য হলুদ ছাড়া মলা মাছের ঝোল রান্না করে দিয়েছে। জন্ডিস হলে তেল-হলুদ খেতে হয় না। তখন তো এমনিতেই শরীরে হলুদের পরিমাণ বেড়ে যায়। গ্লুকোজের শরবতটা খেয়ে হাতের পাতায় মুখ মুছে মতিয়ার যখন সাত্তারের দিকে তাকিয়ে বলল, সাত্তার ভাই, কেমুন জানি বমি বমি লাগতাছে। তখন মতিয়ারের চোখ দুটো হলুদ না হলেও কেমন যেন জ্বলজ্বল করছিলো। মনে হয় আর দু’একদিনের মধ্যেই হলুদ রঙ ধরবে।
তবে শেষ পর্যন্ত মতিয়ার আর বমি করেনি। কতক্ষণ কোঁ কোঁ করে কোঁকানো দিয়ে তারপর শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। এরপর বেরিয়ে এসছিলো সাত্তার। কলেজের চারপাশটা একবার চক্কর দিয়েছে। রাত একটায় ও তিনটায় দু’বার হুইসেল বাজিয়ে দিয়েছে। তারপর আজ একটু আগেই চিলেকোঠায় চলে এসেছিলো। যেহেতু মতিয়ার অসুস্থ। জন্ডিসের রোগী। এসে দেখে তখনও ঘুমাচ্ছে মতিয়ার। গায়ের জামাকাপড় বদলে একপাশে শুয়ে পড়ে সাত্তার। সঙ্গে সঙ্গে ঘুমে বুজে এসেছিলো দুচোখের পাতা। তাই মতিয়ারের উঠে যাওয়াটা টের পায়নি। হয়তো বাথরুম পেয়েছিলো মতিয়ারের। বাথরুমে যেতে হলে ওদের চিলে কোঠা থেকে এক তলা নিচে নেমে যেতে হয়। ছাদের ওপরে কোনো বাথরুম নেই। বাথরুম ছাড়া ছাদের কোনো কোনা টোনায় বসে অবশ্য রাতের পেচ্ছাপ টেচ্ছাপ সেরে ফেলা যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে। তার পরেও একদিন মতিয়ার মাঝরাতে উঠে আলসেমি করে আর সাত তলায় না নেমে ছাদের একপাশে, যেখানে বৃষ্টির পানি বেরিয়ে যাওয়ার পাইপ আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে পেশাপ করছিল, মাঝামাঝি পর্যায়ে তার চোখ পড়ে শাহসাব বাড়ির মসজিদের বিশাল উঁচু মিনারটির দিকে। মতিয়ার দেখতে পায় মিনারের মাথা থেকে একটা আগুনের গোলা সাঁ করে তার দিকে ছুটে আসছে। মতিয়ার ভয় পেয়ে আল্লার নাম নিতে নিতে মাঝপথে পেশাপ থামিয়ে ঝাড়া দৌড়। তখন তার খেয়াল হয় সে পশ্চিম দিকে মুখ করে পেচ্ছাপ করছিলো।
সেদিন ঘরে ফিরে এসে মতিয়ার লোহা পোড়া পানি খেয়েছিলো। লোহা মানে তাদের একটা ঠ্যাং ভাঙা বঁটি আছে। সেটারই আগাটা আগুনে লাল করে পুড়িয়ে লবণ গোলা পানিতে তিনবার কুলহু আল্লা পড়ে ছ্যাক দিয়ে খেয়ে নিয়েছিল। মতিয়ার ছোটবেলায় নাকি খুব ডরপুক ছিলো। রাত্তিরে গাছের পাতা ঝরে পড়লেও সে ভয় পেতো। ভয় পেলেই মতিয়ারের মা লোহার দা বঁটি খুন্তি যা-ই পেতো পুড়িয়ে নুনগোলা পানিতে ছ্যাক দিয়ে খাইয়ে দিতো।
সেই মতিয়ার এখন গাছ কাটার দা চাইছে বাইরে থেকে এসে! নিশ্চয়ই কিছু দেখে ভয় পেয়েছে। দা পুড়িয়ে পানি খাবে। কিন্তু দা কোথায় পাবে সাত্তার! তা-ও আবার গাছ কাটার ছ্যান দাও! ওদের গাছি বংশ নাকি? গাঁয়ে থাকতে শীতের কালে গাছিদের দেখা পাওয়া যেতো। কোমরে একটা ঘট আর একটা ছ্যান দা ঝুলিয়ে তরতর করে খেজুর গাছে উঠে যেতো। আগায় গিয়ে গাছের সাথে একটা লাঠি আড়াআড়ি দড়ি দিয়ে বেঁধে তার ওপর দাঁড়িয়ে ঘ্যাচঘ্যাচ করে খেজুর গাছের ছাল কাটতো গাছি। কয়েকটা পরত ছাল কাটা হলেই টুপটুপ করে রস পড়তে শুরু করতো। তারপর একটা মুলি বাঁশের ফাল গেঁথে তাতে মাটির ঘট ঝুলিয়ে দিয়ে কাঠবিড়ালীর মতো তুরতুর করে নেমে আসতো গাছি।
তো সেই কুট্টিকালে গাছির দা-খানা সাত্তারের বড় ভালো লাগতো। ঝকঝকে রুপার মতো লম্বা একখান দাও। গাছের ছালে ছোঁয়া দেবার সাথে সাথে ক্যাচ করে কেটে আসতো। সেই ছ্যান দা চাইছে এখন মতিয়ার! কিন্তু মতিয়ার তো জানেই তাদের ঘরে রান্নাবান্নার জন্য একটা ঠ্যাঙ ভাঙা বঁটি আর একটা কাগজ কাটার পাতলা ব্লেড ছাড়া কোনো দা-টা নেই।
সাত্তার হাল্কা অন্ধকারে চোখের মনি দুটো আরও তীক্ষè করে তাকায়। ও কি সত্যিই মতিয়ার?

মতিয়ার তো বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে!
ছাদের ওপর জ্বালিয়ে রাখা বাতির আলোয় সাত্তার দেখতে পায় একটা আস্ত মতিয়ার মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে ঘরের দেয়ালে দা খুঁজছে, আর একটা মতিয়ার দিব্যি কম্বলের তলায় ঘুম পাড়ছে। এমন কি ঘুমন্ত মতিয়ারের নাক ডাকার মৃদু শব্দও শোনা যাচ্ছে। সাত্তারের গা শিউরে ওঠে। বুকের ভেতর কলজেটা ধাম ধাম লাফ মারতে থাকে।
সাত্তার এখন কী করবে?
ঘর থেকে বের হয়ে দৌড় মারবে?
কোনদিকে? সিঁড়ি দিয়ে পটকন খেতে খেতে সোজা নিচতলায়, না যে দরজা দিয়ে বেরিয়ে ছাদে যাওয়া যায় সে দিকে!
কিন্তু ওর ভয় পাওয়া টের পেয়ে যদি ভূত-মতিয়ার পেছনে ধেয়ে আসে!
সাত্তার মনে মনে দ্রুত মন্ত্র পড়েÑ ভূত আমার পুত, পেতœী আমার ঝি, আল্লার নাম বুকে আছে ভয়টা আবার কী। সেই সঙ্গে কলেমা তৈয়ব। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ....।
ভূত মতিয়ার [না কি এটাই আসল মতিয়ার!] তখন উবু হয়ে ঘরের জিনিসপত্র এটা ওটা সরিয়ে দা খুঁজতে লেগেছে। জিনিসপত্র অবশ্য ঘরের ভেতর অনেক কিছুই আছে। সিমেন্টের বস্তা, রঙের বালতি, কৌটা, ব্রাশ, বস্তা হাবিজাবি!
একটা কাঠের টুকরো খুঁজে পায় মতিয়ার।
সেটা হাতে নিয়ে বলে, থাউক, লাঠিতেই চলবো। শালার চোরের ঘরের চোর! মাথা ফাটায়া আইজ যদি তর ঘিলু দিয়া আমি পাটিসাপটা পিঠা না বানায়া খাইছি তাইলে আমি বাপের ব্যাটাই না। তয় দাও হইলে ভালো হইতো, যেই না ছাদের কার্নিশে চান্দুর হাত দুইখান উইঠা আসতো, লগে লগে এক কোপে দশ আঙ্গুল টুকরা কইরা ফালাইতাম, তার বাদে আঙ্গুলগুলা ত্যালে ভাইজা মচমচা কইরা কাটলেট বানায়া খায়া ফালাইতাম।
এ কী কথা! মানুষের মগজ দিয়ে পিঠা খাবে, মানুষের আঙুলের কড়া ভাজা কাটলেট খাবে! এ তো আসলেই ভূত! পা দুটো কাঁপতে থাকে সাত্তারের। ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিতে চায় সাত্তার। কিন্তু কে যেন পায়ের পাতা ফ্লোরের সাথে সুপার গ্লু দিয়ে আটকে রেখেছে। আসল মতিয়ার কেন জেগে উঠছে না! সাত্তার গলা কাঁপিয়ে ভাঙাচোরা স্বরে জান দিয়ে চিৎকার করে, মতি ভাই, ঐ মতিয়ার ভাই!
ভূত মতিয়ার তার দিকে চেয়ে বলে, আরে, সাত্তার ভাই, কী হইল? তোমারে ভূতে পাইছে না কি? আমি তো সামেনই খাড়া। উঠ তো, শালার চোরের ব্যাটা চোররে পাকিস্তান দেহাইয়া দিয়া আসি। চাইর তলার ব্যালকনিতে পশ্চিম দিকের কার্নিশে উইঠা আসছে শালার চোর। ইলেকট্রিকের তার চুরি করার মতলব! আমারে দেখতে পায় নাই। লও, লও, যাই।
সাত্তার চৌকি থেকে নেমে দাঁড়ায়। কিন্তু এক পাও আগাতে পারে না। হতভম্বের মতো মতিয়ারের দিকে চেয়ে থাকে।
হ্যাঁ, মতিয়ারই তো! ও-ই তো কথায় কথায় বলে, ‘পাকিস্তান দেহাইয়া দিমু।’
ঘুমন্ত মতিয়ার এবার একটু নড়েচড়ে ওঠে। ঘুমের ঘোরে জড়ানো একটু শব্দ উঠেই আবার ছন্দে ছন্দে শ্বাস পড়তে শুরু করে। হঠাৎ কম্বলের তলা থেকে ঘুমন্ত মতিয়ারের একটা হাত বেরিয়ে আসে। হাতটা বেরিয়ে সাঁ করে চৌকির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাত্তারের পা চেপে ধরে। প্রায় ছ’ সাত হাত লম্বা একটা হাত। ঠা-া হিম! মনে হচ্ছে বরফের একটা চওড়া ফিতে দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে তার পা বাঁধা হচ্ছে। সাত্তারের আর দিকদিশা জ্ঞান থাকে না। বাবা গো মাগো, ভূত ভূতÑ বলে সে অন্ধের মতো সিঁড়ি বেয়ে সাততলার দিকে দৌড়াতে শুরু করে। পেছন পেছন মনে হয় মতিয়ারও আসছে। আর এক জোড়া পায়ের দৌড়ানোর শব্দ। কোন মতিয়ার আসছে পেছনে কে জানে! অন্ধকার হাতড়ে ছ’ তলায় নেমে আসে সাত্তার। ছ’ তলায় কোনো আলো নেই। সব ফ্লোরে রাতে লাইট জ্বালিয়ে রাখার কথা আছে। সাত্তার জ্বালিয়েই রেখেছিলো। স্পষ্ট মনে আছে তার। নিশ্চয়ই চোরের কা-। না কি মতি ভূতের কা-!
সাত্তার বেদিশার মতো ছ’ তলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এদিক সেদিক তাকায়। তার হঠাৎ মনে হয় এখুনি একটা লম্বা ঠা-া হাত আবার তার দুই পা ঠেসে ধরবে। পায়ে পায়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে সাত্তারের।
একটা শি শি আওয়াজ উঠতে থাকে, মনে হচ্ছে মাঠের ভেতর থেকে। কলেজের মাঝখানে বহু পুরোনো একটা রেনট্রি গাছ ছিল। মাসখানেক আগে সেই গাছ কাটা হয়েছে। গাছ নেই হয়ে যাওয়াতে সে জায়গাটা যেন কেমন ধক ধক করে জ্বলছে। সেই ধকধকানির মধ্যে সাত্তার মিয়া আচমকা দেখতে পায় নীল ফতুয়া পরা ইয়া লম্বা এক মতিয়ার মাল্টিপারপাস ভবনের সাত তলার ব্যালকনিতে এক পা রেখে মাঠের উল্টো দিকের পাঁচ তলা বিজ্ঞান ভবনের ছাদে আর এক পা দিয়ে লাফ মেরে উঠে যাচ্ছে। তার ডান হাতে ধরা একটা লম্বা লাঠি। মাথার খোলা চুল লম্বা লম্বা সাপের মতো উড়াল দিতে দিতে ঝুলতে থাকে। সাপের শিশের মতো একটা হিস হিস হিহিহি হাসির হাল্কা রেশ বাতাসে মিলিয়ে যায়। আর সেই সঙ্গে উড়ে আসে দুরন্ত শীত.....!
সকালে মতিয়ারই সাত্তারকে আবিষ্কার করে। ছ’ তলার ব্যালকনিতে সিঁড়ির সামনে পড়ে আছে সাত্তার।
মতিয়ার নাকি পানি খাওয়ার জন্য সাত্তারকে ডাকতে গিয়ে দেখে ঘরের দরজা খোলা। সাত্তারের একটা স্যান্ডেল পড়ে আছে দরজার বাইরে। আর একটা নেই। তখন ধলপহরের আলো ফুটছে। মতিয়ার গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে সাত্তারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। সাততলার সিঁড়িতে নেমে মতিয়ার একটা গন্ধ পায়। তীব্র কর্পূরের গন্ধ। গন্ধের উৎস আবিষ্কার করতে পারে না মতিয়ার। হয়তা লোহা বা কাঠের রঙ বা অন্য কোনো কেমিক্যালের গন্ধ। একটু পরেই সেই গন্ধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। হঠাৎ মতিয়ার দেখতে পায় সাত্তার হাতে একটা কাঠের টুকরা নিয়ে দুলতে দুলতে ছ’ তলার কার্নিশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তার গায়ে রাতপ্রহরীর খাকি ইউনিফর্ম।
মতিয়ার অবাক হয়ে বলে, সাত্তার ভাই, লাঠি লইয়া ঐখানে কী কর?
সাত্তার কোনো কথা না বলে লাফ দিয়ে ছতলার কার্নিশ থেকে পাঁচ তলায় তারপর চারতলায় নেমে কোথায় মিলিয়ে যায়। মতিয়ার কতক্ষণ বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকে। সাত্তার মিয়া কি প্রতিষ্ঠানের কোনো কিছু চুরি করে লুকিয়ে রাখতে যাচ্ছে? পুবের আকাশে তখন হাল্কা আলো ফুটছে। মতিয়ার সাত্তারের কা-কীর্তি ভালো করে বুঝবার জন্য ছ’তলার ব্যালকনিতে নেমে আসতেই দেখে ল্যান্ডিং-এ পড়ে আছে সাত্তার। মুখ দিয়ে গাঁজলা বেরুনো। চোখ উল্টে আছে। দম আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। মতিয়ার ঝুঁকে পড়ে ওর গায়ে হাত রাখতেই দেখে সাত্তারের শরীর সাপের মতো ঠা-া আর সারা গা দিয়ে যেন কর্পূরের ধোঁয়া বেরুচ্ছে। আর কী আশ্চর্য! সাত্তারের গায়ে রাত্তিরে ছেড়ে রাখা মতিয়ারের জ্বোরো গায়ের সেই নীল ফতুয়া! কিন্তু মতিয়ার স্পষ্ট দেখেছে ইউনিফর্ম পরা সাত্তার লাফিয়ে কার্নিশ পার হচ্ছে? আসল সাত্তার তবে কোনটা? ভয়ে কলিজা কাঁপানো চিৎকার দিয়ে ওঠে মতিয়ার।
ঈদের কেনাকাটায় প্রযুক্তিপণ্য
রেজা নওফল হায়দার
মানছুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার দুই ছেলের জন্য এবারের ঈদে জামাকাপড়ের পাশাপাশি যে জিনিসটা কিনে দেবার জন্য প্রবল ইচ্ছা জাগছে, সেটা হলো, একটা ল্যাপটপ। আর এমনি করে আমাদের তরুণ প্রজন্মের ছাত্রছাত্রী অফিস কর্মকর্তা অথবা সে যে কোন পেশার মানুষ হোক না কেন। প্রযুক্তি পণ্যের দিকে লোভনীয় একটা দৃষ্টি আমাদের রবাবরই থেকেছে। বাজেটে পুষিয়ে গেলে। কিনে ফেলতে নেই কোন ভাবনা। যেমনটা এবারের আনন্দ করেছে। তার এবারের আবদার আমি ঈদে জামাকাপড় চাই না। আমার টাকাটা আমাকে দাও, আমি এবার স্কিনটাচ মোবাইল কিনব। এমন আনন্দ অনেকের বাসায় আছে। আর থাকবে না কেন। ঈদের নতুন জামাকাপড় নেবার ধারণাটা অনেকটা ফিকে হয়ে যাচ্ছে। মানুষ এখন হাতে টাকা পেলেই কিনতে ছুটে যায়। প্রযুক্তি পণ্যের দিকে কেউ কিনবে ডিজিটাল ক্যামেরা। কেউবা ভাল একটা ল্যাপটপ, অথবা বহুল অপশন যুক্ত মোবাইল, ক্যামেরার আর মনের পর্দায় যদি লাগে দোলা তা হলে তো কথায় নেই। সোজাসুজি ইলেক্ট্রনিক্সের দোকানে কিনবে হয়ত ফ্ল্যাটটিভি না হয়ত থ্রিজি টিভি। আর এখন তো ওয়াল টিভির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। যাই হোক নিশ্চিয়ই পাঠক অপেক্ষা করে আছেন, এবারের প্রযুক্তি পণ্যের বাজারদরটা কেমন। আর তা আপনার সুবিধার্থে বলা প্রয়োজন, বাজেটে যাই-ই রাখুক না কেন। প্রযুক্তি পণ্যগুলো এখনও রয়েছে আপনার হাতের নাগালে। এছাড়া দেশী ব্র্যান্ড ওয়ালটন তাদের পণ্য সমাহারে নিয়ে এসেছে থ্রিজি টিভি আর ফ্ল্যাট টিভি। আর ফ্রিজ আর টিভির দাম বরাবরই রয়েছে বিশ হাজার টাকা থেকে পঞ্চান্ন হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে সনি কোম্পানির ব্রাভিয়া অথবা প্যানাসনিকের ফ্রিজ ইন্টারনেট টিভি কিনতে গেলে আপনাকে বেশ কত টাকা গুনতে হবে। আর ভ্যাট দিতে হবে আরো বেশ কত টাকা। এই টিভিগুলোকে বর্তমান সময়ে বলা হচ্ছে ইন্টেলিজেন্স টিভি। আর দাম পড়বে ষাট হাজার টাকা থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত।
অন্যদিকে ডিভিডি অথবা ভিসিডি প্লেয়ারের দাম এবার বাড়তির দিকে। ব্রান্ডের গিটার কিনতে গেলে প্রথমে আপনাকে চার হাজার টাকা থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত দামের কথা মাথায় রাখতে হবে। আর এবারের ঈদের বাজারে লক্ষ্য করা গেছে ডিজিটাল ক্যামেরার বাড়তি চাহিদা। যে যখনই পারছে ডিজিটাল ক্যামেরা কিনতে ছুটে যাচ্ছে। এর পিছনে কারণ হলো, বেশ কিছু কোম্পানি তাদের নতুন প্রোডাক্টকে মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য বিভিন্ন ডিসকাউন্ড দিয়ে রেখেছে বছরজুড়ে। আর তাই সর্বনিম্ন ছয় হাজার টাকার মিলবে একটা স্টাইলিশ ডিজিটাল ক্যামেরা। আর এমনি করে আপনি যদি একটা ল্যাপটপ কিনতে চান তবে চটজলদি কিনে ফেলুন কারণ এই ঈদে প্রতিযোগিতার বাজারে বেশ নামী দামী ব্রান্ডগুলো তাদের ডিসকাউন্ট দিচ্ছে। তবে পাঠক ইদানীং ল্যাপটপ না কিনে নেটবুক কেনার জন্য অনুরোধ করব। তার কারণ বহন সহজ ওজন কম নেটবুকের। আর সব কাজ করা যায় নিমেষেই। আপনি একটা নেটবুক কিনতে পারবেন একুশ হাজার টাকা সর্বোচ্চে। তাছাড়া ল্যাপটপ কেনা যাবে একত্রিশ হাজার টাকা থেকে ষাট হাজার টাকার মধ্যে।
ঈদে দেখতাম স্পিকার অথবা সাউন্ডবক্স দিয়ে রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে উঠতি বয়সের ছেলেরা বিভিন্ন খোশগল্পে মেতে উঠেছে। যদি বলি এখন এই সাউন্ডবক্স আপনার ঘরের একটি অংশ। পোটেবল সাউন্ডবক্স আর হোম বেইজড সাউন্ডবক্স মানুষের মনের বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে ছিল। তেমনিভাবেই আপনি মাত্র দু’হাজার টাকায় নামকরা এবং ভাল গুণগতমানসম্পন্ন সাউন্ডবক্স পাবেন খুব সহজেই। টিনএজদের সর্বদাই মনের চাহিদা ছিল এমপি থ্রি অথবা ফোর। আর মোবাইল ফোনের বাজার দর এখন সবাই জানে। রাখে তার খোঁজখবর। তার একটা বিশেষ কারণ আছে। যেটা হলো প্রিয় জিনিসটার কত সহজে আরো এপ্লিকেশনসহ কোন ব্রান্ড কি অফার করছে।
আর বাজেট আর মনের চাহিদা মিললেই কিনে ফেলতে নেই সময়ের অপচয়। নকিয়া এবার নতুন একটা সেট নিয়ে এসেছে ‘আশা’ যার দাম আপনার হাতের নাগালেই। আর রয়েছে সব এপ্লিকেশন। এছাড়া স্যামসাং নিয়ে এসেছে স্বল্পমূল্যের গ্যালাক্সি ফোন। যার দাম হলো দশ হাজার টাকার উপরে। ডেক্সটপ দাম বলছি যা এই কারণে যে ডেক্সটপের দিকে খুব কম মানুষ ঝুঁকছে। তাহলে পাঠক এবার আপনার ঈদ কাটুক সুন্দর আর নিরাপদ।


ঈদে চাই ফ্যাশনেবল
সু



ড্রেসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঈদে সময়োপযোগী ফ্যাশনেবল জুতা মার্কেটে ও শপিংমলে সরবরাহ করে থাকে। এরই মধ্য থেকে তরুণ-তরুণীরা বিশেষ কিছু জুতা পছন্দ করে থাকে পোশাকের মতো করে। জুতা ব্যবসায়ীরা খেয়াল রাখে শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রডাক্ট সরবরাহ করতে। অনেক সময় দেখা যায় প্রিয় সিনেমার নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, লেখক বা বিশেষ ব্যক্তিত্বের অনুকরণে সুন্দর আঙ্গিকে ফ্যাশনটা বাজারে ছড়িয়ে দিয়ে থাকে। যেমন গতবার ছিল প্রিয় জুতা সাকিরা। এবার আওয়ারা, বিপাশা, শিলা, মুন্নী বিভিন্ন ফিল্ম স্টারের অনুকরণে জমকালো জুতা তরুণীদের চাহিদা বেশি। তরুণরা ঈদে পাঞ্জাবির সঙ্গে দুই ফিতার স্যান্ডেল, স্যান্ডেল সু এবং সাইকেল সু-এর চাহিদা বেশি। ঈদের জুতা হওয়া চাই ঈদ পোশাকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন থ্রিপিস-শাড়ি যদি জমকালো, কাতান, পাতর পুঁতি-চুমকির কাজ করা থাকে তাহলে জুতা জোড়ায় পাথর-পুঁতির কাজ করা হলে মানায় ভাল। আর সুতির মধ্যে শৈল্পিক ডিজাইনের জামাকাপড়ের সঙ্গের জুতায় জমকালো ভাব বর্জন করা অতি আবশ্যক। এসব ড্রেসের মাল্টিকালারের ফিতার জুতা বা বড় জোড় কাঠের বোতাম পুঁতি বসানো জুতা মানানসই। ছেলেদের পাঞ্জাবির সঙ্গে চিকন ফিতা বা নকশি ফিতার স্যান্ডেল, সু, পরে ঈদ উৎসবের পুরোদিন কাটিয়ে দেয়া যায়। এছাড়া ছেলেদের শার্ট-প্যান্টের সঙ্গে পার্টি সু, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের খুব মানানসই। পুরুষদের ফ্যাশন জগতে হাসপাপিস (ঐটঝঐ চটচওঊঝ) সব সময় এগিয়ে। পাশাপাশি কলিজন (ঈড়ষবুরড়হব) সু এবং এক্সক্লুসিভ সু তরুণ ও মধ্যবয়সীদের পছন্দের। এলিফ্যান্ট রোডের ফ্যালকন ও স্প্যারোসহ রাজধানীর হাতেগোনা কয়েকটি শোরুমে দেশী জুতার চমৎকার সমাহার রয়েছে। চামড়ার জুতার বাহারি ডিজাইন পাবেন এলিফ্যান্ট রোডের লিবার্টিতে। এখানে সম্পূর্ণ চামড়াজাত জুতার বিপুল সমাহার। পুরুষদের পার্টি সু এবং ক্যাজুয়েল সু পাবেন কয়েকটি রঙে বিভিন্ন ডিজাইনে। দাম পড়বে ২৫০০-৩৫০০ টাকার মধ্যে।
সাইকেল সু এবং স্যান্ডেল সু খাঁটি চামড়ার মধ্যে ২/৩ রঙের পাবেন। দাম পড়বে ১৪৫০-১৬৫০ টাকার মধ্যে। মেয়েদের সেমিহিল ৬৫০-৯৫০ টাকার মধ্যে। পেন্সিলহিল ১৪৫০-২৫০০ টাকার মধ্যে। শিশুদের ক্যাডস ও স্যান্ডেল সু ৪০০-১০৫০ টাকার মধ্যে। মেয়েদের চটিজুতা, সিøপার চিকন ফিতায় জড়ানো ছাত্রীদের জন্য চমৎকার। ঈদ উৎসব শেষ হওয়ার পর জুতার যতœ যেন শেষ না হয়। শখের জুতা জোড়া সাইনিং দিয়ে শো আলমিরা বা বক্সে তুলে রাখুন। পারিবারিক বা সামাজিক উৎসবে যাওয়ার সময় মনে হবে সদ্য সংগ্রহ। কোন জুতা ভিজে গেল বা বৃষ্টির ছাট লাগলে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে বা বাতাসে দিয়ে দ্রুত শুকিয়ে নিন। ঈদের পথ চলা আরামদায়ক করতে বেছে নিতে হবে পছন্দসই জুতো। যা আপনার ব্যক্তিত্ব এবং ফ্যাশন দুটোকেই প্রকাশ করবে।
ঈদে তারুণ্যের পোশাক
তৌফিক অপু
উৎসব মানেই আনন্দ। আর এ উৎসব যদি হয় সার্বজনীন তাহলে তো কথাই নেই। উৎসবকে আনন্দঘন করে তুলতে থাকে পরিকল্পনা। বাঙালী মুসলমানের সবচেয়ে বড় আনন্দ উৎসব ঈদ। ঈদ-উল-ফিতরকে ঘিরে বাঙালী মুসলমান আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। একমাস সিয়াম সাধনার পর আসে ঈদ-উল-ফিতর। দীর্ঘ সিয়াম সাধনার পর যে উৎসব তাকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ বেশি। আর যেহেতু এই ঈদ-উল-ফিতর আমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব, তাই মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনাও বেশি। সেই উৎসাহ ছড়িয়ে পড়ে কেনাকাটায়। শুধু পরনের পোশাকে নয়, এই কেনাকাটা ছড়িয়ে পরে তৈজসপত্র থেকে শুরু করে আসবাবপত্রেও। তবে রমজানের ঈদে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে কাপড়ের বাজারে। এ সময় রীতিমতো কেনার হিড়িক পড়ে যায়। পাড়ার ছোট ছোট শপিংমল থেকে শুরু করে অভিজাত বিপণীবিতান সবখানেই নামে মানুষের ঢল। মানুষের এই আগ্রহ এবং আস্থার প্রতিদান দিতেই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোও রুচি, চাহিদা এবং সাধ্যের মধ্যে সমন্বয় করে নিয়ে আসে নতুন নতুন পোশাক। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস, বুটিক শপের ডিজাইনাররা মানুষের চাহিদা এবং আগ্রহের কথা বিবেচনা করে নিত্যনতুন ডিজাইন তৈরিতে মনোযোগী হয়।
এই সময়ের এমনি একটি জনপ্রিয় পোশাক শর্ট পাঞ্জাবি। এর প্রচলন খুব বেশিদিনের নয়। খুব অল্প সময়েই জয় করে নিয়েছে তারুণ্যের হৃদয়। সাধারণ পাঞ্জাবির তুলনায় একটু শর্ট বিধায় এর নাম শর্ট পাঞ্জাবি। বাকি সব বৈশিষ্ট্য সাধারণ পাঞ্জাবির মতোই। শর্ট পাঞ্জাবির দামও হাতের নাগালেই। শর্ট পাঞ্জাবি ৬৫০ থেকে শুরু করে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যের রয়েছে। ছেলেদের যেমন শর্ট পাঞ্জাবি তেমনি মেয়েদের বেলায় এখন চলছে শর্ট কামিজ। এবারের ঈদে মেয়েদের পছন্দের পোশাকের তালিকায় রয়েছে শর্ট কামিজ। এই গরমে সবচেয়ে মানানসই পোশাক শর্ট কামিজ। শর্ট কামিজ এখন হয়ে উঠেছে তারুণ্যের প্রতীক। রং, ডিজাইন এবং কাপড়ের মানের ওপর ভিত্তি করে শর্ট কামিজের দাম পড়বে ১,০৫০ টাকা থেকে ৩,২০০ টাকার মধ্যে। শর্ট পাঞ্জাবি এবং শর্ট কামিজের মতো ফতুয়ারও কদর তরুণ-তরুণীর কাছে। ফতুয়া এখন বেশ জনপ্রিয়। ঘরে-বাইরে এমনকি উৎসব অনুষ্ঠানের হরহামেশা ফতুয়া পরিহিত তরুণ-তরুণীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। ডিজাইন এবং কাপড় ভেদে লেডিস এবং জেন্টস ফতুয়ার মূল্য পড়বে ৪৫০ টাকা থেকে ১,২৫০ টাকা। তবে শর্ট পাঞ্জাবি, শর্ট কামিজ বা ফতুয়া যাই কিনুন না কেন, ভাদ্র মাসের এই গরমে উৎসবের আনন্দ যেন ম্লান না হয়ে যায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে পোশাক নির্বাচন করতে হবে। এ সময়টায় ভাপসা গরম, সে কারণে যাই কেনা হোক না কেন কাপড়ের ক্ষেত্রে সুতি এবং এন্ডিকটনকেই প্রাধান্য দেয়া উচিত।
তরুণদের শার্ট এবং টি শার্টের পসরা সাজানো হয়েছে ব্যাপকভাবে। বর্তমান সময়ে তরুণরা একেবারে ভিন্নতা চায়। তারা শর্ট শার্ট পরতে খুবই স্বাচ্ছন্দ্য পায়। বিভিন্ন ধরনের চেক, স্টাইপ, কলারের আলাদা ধরন, হাতায় বাড়তি কাজ এবং ভিন্ন রংয়ের বা সুতির মাধ্যমে পুরো শার্টে আলাদা শেড তৈরি করা হয়েছে। নতুন মাত্রায় এই শর্ট শার্টগুলো ক্রেতার বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। শর্ট শার্টগুলো ফুল হাতা এবং হাফ হাতা দুই ধরনের আছে। যাতে ডিজাইন ৭০টির বেশি করা হয়েছে। নতুন মাত্রার যে শার্টগুলো বাজারে এসেছে তার প্রত্যেকটিতেই পকেটের ডিজাইন একটু ভিন্ন রকম। সম্পূর্ণ সুতির ওপর তৈরি এ শার্টগুলো এই গরমে পরতে বেশি আরাম পাওয়া যাবে। বাজার ঘুরে বিভিন্ন মার্কেটে গিয়ে দেখা যায় বিভিন্ন স্টাইলের শার্ট একেক ব্র্যান্ড বাজারে এনেছে। শার্টগুলো কিনতে ক্রেতার বেশি বেগ পেতে হবে না। শর্ট শার্টের পাশাপাশি পলো ও টি-শার্টেও এসেছে নতুন আঙ্গিক। বাহারি রং এবং ডিজাইনের জন্য আলাদা করে কষ্ট করতে হবে না। এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শার্ট যেখানে প্রচুর পাওয়া যাচ্ছে ঠিক সেখানেই পলো এবং টি-শার্টও পাওয়া যাবে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তরুণদের মন, রুচি। তাই তাদের কথা মাথায় রেখেই আমরা নতুন ডিজাইনের পলো ও টি-শার্টের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
কোথায় যাওয়া যাবেÑশর্ট শার্ট, পলো এবং টি-শার্ট? পাওয়া যাবে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তলায়। মালিবাগ, মগবাজার রোডের বিভিন্ন শো-রুমে। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স, নিউমার্কেট, গ্লোব শপিং সেন্টার, মিরপুর-১০, এলিফ্যান্ট রোড এবং বিভিন্ন অভিজাত শপিং মলগুলোতে।
দাম- নিউমার্কেটে শর্ট শার্ট হাফ হাতা এবং ফুল হাতার দাম পড়বে যথাক্রমে ৩৫০-৭০০ টাকা। ইজি-৬৫০-৯০০ টাকা। ক্রে-ক্যাফ্ট ৬০০-১২০০ টাকা। প্লাস পয়েন্ট নির্ধারণ করেছে ৭০০-১০০০ টাকা। ক্যাটস আই-১২০০ টাকা। টি শার্টগুলো বিভিন্ন জায়গায় বা শো-রুমে কম বেশি ১৮০ টাকা থেকে ২৮০ টাকায় পাওয়া যাবে। পলো শার্ট ৩৫০ টাকা থেকে ১২৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে।
ঈদের কেনাকাটার আগে অবশ্য আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন। আর শিশুদের পোশাক নির্বাচনের বেলায় এ বিষয়টি তো আরও জরুরী। ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। এই খুশি যেন ম্লান না হয়ে যায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই পোশাক নির্বাচন জরুরী। ঈদের আনন্দ রঙিন পোশাকের সঙ্গে সঙ্গে ঝলমলে হয়ে উঠুক সেই প্রত্যাশা।
মডেল : নায়লা, আরেফিন শুভ, শেখ মিলন ও সোহাগ
জমকালো শাড়ি ও পাঞ্জাবি
রেজা ফারুক
ঈদের তুমুল উৎসবমুখর গুঞ্জরণ এখন চারিদিকে। কারও যেন দম ফেলার ফুসরত নেই। যে যার মতো সেরে নিচ্ছে শেষ মূহুর্তের প্রস্তুতি। বিশেষ করে কেনাকাটার ধুম লেগেছে ফ্যাশন হাউস থেকে শুরু করে বিভিন্ন শপ হাউসে। এই ধুম চলবে চাঁদরাত পর্যন্ত। ঈদের কেনাকাটায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় পোশাক আর এই পোশাকের মধ্যে শাড়ি হলো অন্যতম। বাঙালী নারীর কাছে শাড়ির কদর সব থেকে বেশি। অন্যান্য ড্রেসের সঙ্গে শাড়ি থাকবেই। শাড়ি না হলে যেন নারীর ঈদটাই থেকে যায় অপূর্ণ। তাই শপিংমলসহ বিভিন্ন মার্কেটের শাড়ির দোকানে যেন এখন পা ফেলারও যায়গা নেই। দেশীয় শাড়ির পাশাপাশি বিদেশী শাড়িও ঈদের কেনাকাটার তালিকায় স্থান পায়।
দেশীয় শাড়ির মধ্যে সর্বাধিক চাহিদা হলো টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ও জামদানি শাড়ির। এর পাশাপাশি মিরপুরের বেনারসি, কাতানের রয়েছে বিপুল সমাদর। জর্জেট, অর্গেসুতা, কামিতভরমসহ অভিজাত নামের সব বাহারি শাড়ি ও বিভিন্ন ড্রেস হাউসে। তবে এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। টাঙ্গাইলের শাড়িতে সাম্প্রতিক ডিজাইনের বৈচিত্র্য এবং সহনীয় দাম নারীদের এই শাড়ির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার অন্যতম মূল কারণ। সুতি, সিল্ক, হাফসিল্কসহ নানা নামের টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ঈদের সময় থাকে নারীর কালেকশন লিস্টের শীর্ষে। এর পরই থাকে জামদানি এবং মিরপুরের বেনারসি-কাতান। জামদানি কিছুটা বেশি দামের হলেও মিরপুরের বেনারসি-কাতানের দামটাও রয়েছে নাগালের মধ্যে। যার ফলে টাঙ্গাইলের তাঁত পল্লী, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ তাঁত পল্লীসহ সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনার গাঁয়ের জামদানি ফ্যাক্টরি এবং মিরপুরের বেনারসি পল্লীতে চলছে তাঁত শিল্পীদের অবিশ্রান্ত ব্যস্ততা। ঈদের মাস কয়েক আগে থেকেই দেশীয় শাড়ির এই চেনা অঞ্চলগুলোতে গিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে তাই অনর্গল তাঁতের খটাংখট শব্দের মুখরতা কানে আসাটা স্বাভাবিক। যার তরঙ্গ-বীথি এই ঈদে এসে ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীসহ বিভাগীয় জেলা এবং উপজেলা শহরের শাড়ি সমৃদ্ধ শপিং হাউসগুলোতে। সুতির আটপৌরে শাড়ি থেকে শুরু করে জমকালো শাড়ি-সবই ডিসপ্লেতে সাজিয়ে বসেছে শাড়ি হাউসগুলো। আর সেখানে নারীদের ভিড়টাও লক্ষণীয়। সামর্থ্য অনুযায়ী পছন্দের শাড়িটি কিনে-তার পর যেন পরিতৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে ঘরে ফেরার পালা। রোজার শুরু থেকে ঈদের পূর্বরাত পর্যন্ত চলবে এই মহা কেনাকাটা।
ঈদের উৎসবকে ঘিরে শপিংমল থেকে শপিংমলে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা চলে প্রতি ঈদেই। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বাঙালী মুসলমানদের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ এই ধর্মীয় উৎসবে মনের আনন্দটা যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসে চোখে মুখের অভিব্যক্তিতে। নারীদের মধ্যে এই অভিব্যক্তিটা আরও উজ্জ¦লতা পায় মনের মতো শাড়ি কেনার পর-যার আনন্দঘন রেশটা অবশ্যই অভূতপূর্ব। ৮০০ থেকে ৫০০০ হাজারের মধ্যে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। ৩০০০ হাজার থেকে ২০,০০০ হাজারের মধ্যে জামদানি শাড়ি এবং মিরপুরের বেনারসি-কাতানও সহনীয় দামে কিনতে পাওয়া যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন দামের অন্যান্য শাড়িও সংগ্রহ করা যাবে শপিং হাউসগুলো থেকে।
ফ্যাশন হাউসগুলো পিছিয়ে নেই এক্সক্লুসিভ পাঞ্জাবি তৈরিতে। ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস যে সব পাঞ্জাবি প্রস্তুত করেছে এর মধ্যে সিল্ক, এ্যান্ডি সিল্ক, সূতি, জয়সিল্ক, এবং এ্যান্ডি কটন অন্যতম। এবারে একেক টি ফ্যাশন হাউস ৭০ থেকে ৭৫ টি ডিজাইনের পাঞ্জাবি এসেছে বাজারে। রয়েছে রঙের ভেরিয়েশন। শর্ট এবং সেমি লং পাঞ্জাবির আধিক্যতা রয়েছে এবার। লং পাঞ্জাবির চাহিদা তুলনামূলক কম। ঈদ আয়োজনে আড়ংও তাদের ডিজাইনের ঝুলিতে যোগ করেছে ২০-২৫ টি নতুন ডিজাইন। সিল্ক, এ্যান্ডি সিল্ক, সুতি এবং মসলিনকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এবারে প্রায় প্রতিটি শো রুমেই চোখে পড়বে এক্সক্লুসিভ পাঞ্জাবির। আড়ং, অঞ্জন’স, কে ক্র্যাফট, রঙ, নগরদোলা, নিপুন, লুবনান, ইনফিনিটি, রেক্স, ভাসাবি এবং জারা তে চোখে পড়বে এক্সক্লুসিভ পাঞ্জাবি। এছাড়া আজিজ সুপার মার্কেট সেজেছে আপন মহিমায়। সাধ ও সাধ্যের এক্সক্লুসিভ পাঞ্জাবি সহজেই খুজে পাওয়া যাবে। আড়ং এর পাঞ্জাবির দাম পড়বে ৯০০ টাকা থেকে ৮৫০০ টাকা। লুবনান, ইনফিনিটিতে পাওয়া যাবে ১২৫০ টাকা থেকে ৯০৫০ টাকা। ভাসাবি কিংবা জারা তে পাওয়া যাবে ১৮০০ টাকা থেকে ২৫০০০ টাকার মধ্যে। আজিজ সুপার মার্কেটে পাঞ্জাবি পাওয়া যাবে ৬৫০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে।
মডেল : রাসেল, জোয়েনা ও নাদিয়া নদী
পোশাক : হোয়াইট কার্ড ও ডিজাইন মেলা
উৎসবে সালোয়ার কামিজ
অপরূপ সুন্দর আমাদের এই বাংলাদেশ। এই সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে ষড়ঋতুর ছোঁয়ায়, ঋতুভিত্তিক বাংলাদেশ অনেক বেশি বর্ণিল। কতই না রং। কি অনবদ্য শিল্পীর ছোঁয়া, রং রূপের যেন এক মহাসম্মিলন ঘটে এই দেশে। যে দেখে সেই ভালোবেসে ফেলে এই দেশটাকে। সেই সাথে যদি যোগ হয় কোন উৎসব তাহলে তো কথাই নেই। উৎসবের রঙিন আকাশের বর্ণিল আভা যেন ছড়িয়ে পরে চারদিকে। তেমনি এক উৎসব হচ্ছে ঈদ-উল-ফিতর, মুসলমানপ্রধান ধর্মীয় উৎসব। যে কারণে মুসলিমপ্রধান এই দেশে এ উৎসবের মাত্রা যেন বহু গুণে বৃদ্ধি পায়, এ উৎসবে একে অপরকে উপহার দেয়াটাও একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। আর এ উপহারের তালিকায় পোশাক হচ্ছে অন্যতম। আর ক্ষেত্রে নিত্য ব্যবহার্য পোশাক সালোয়ার কামিজে রয়েছে বৈচিত্র্যতা। শুধু যে সালোয়ার কামিজে তা নয় নামেও রয়েছে বৈচিত্রতা। নামগুলোও বেশ মজার। খুশি, আওয়ারা, এজেন্ট বিনোদ, সারিকা, কারিশমা ইত্যাদি মজার মজার সব নাম। পাজামা, ওড়না ও কামিজের ভিন্নধর্মী নকশা সালোয়ার কামিজকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে যা সহজেই দৃষ্টি কাড়ে ক্রেতাদের । ভয়েল, পপলিন, প্রিন্ট, আদ্দি কটন, কটন জর্জেট, টিসি সিনথেটিক কালার ইত্যাদি কাপড়ের সমন্বয়ে এবার প্রস্তুত হয়েছে সালোয়ার কামিজ। আবহাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে সালোয়ার কামিজের কাপড় সিলেকশন করা হয়েছে।
সালোয়ার কামিজের পাশাপাশি ওড়নার বৈচিত্র্য এবার লক্ষণীয়, এর কাটিং ডিজাইন এবং লেআউটে রয়েছে ভিন্নতা। সুতার কাজ, ক্রিস্টাল, মেটাল আইটেম এবং কড়ি দিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে সালোয়ার কামিজ এবং ওড়নায়। তাছাড়া শিপন জর্জেটের স্ট্রাইপ পাঠানের হেভি কাজের সালোয়ার কামিজ প্রচুর উঠেছে বাজারে। স্টোন এবং স্ট্রিং পাইপের ডিজাইনের সালোয়ার কামিজ এবার বাজারে বেশ। সুতি কাপড়ের চাহিদাও এবার বেশ রয়েছে। পাইপিন এবং টারসোলর সমন্বয়ে কটন এবং এন্ডি কটনের ডিজাইন করা হয়েছে। এ সম্বন্ধে ডিজাইনার হৃদি হাসান বলেন, সব বয়সী মেয়েদের জন্য সালোয়ার কামিজ প্রস্তত হলেও নতুন নতুন ডিজাইনের সালোয়ার কামিজ মূলত তরুণীদের কথা মাথায় রেখে করা হয়। সেভাবেই কাপড় এবং ডিজাইন প্রস্তত করে থাকি। তাছাড়া প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে হলে ডিজাইন ভেরিয়েশনের কোন বিকল্প নেই, এবারের ঈদেও নতুন কিছু ডিজাইনের ড্রেস এসেছে যা খুবই আকর্ষণীয় এবং ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় এবং বেচাকেনাও বেশ ভালো বলে বিক্রেতারাও সন্তুষ্ট।
কটন ও তাঁত কাপড়ে তৈরি সালোয়ার কামিজের মূল্য পড়বে ৮৫০ টাকা থেকে ১৮৫০ টাকা, জর্জেট এবং শিপনের মাঝারি সাইজের সালোয়ার কামিজ পড়বে ১১০০ টাকা থেকে ২৮০০ টাকা এবং হেভি কাজ পড়বে ১৬০০ টাকা থেকে ৪২০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়াও আদ্দি ভয়েল, এপ্লিক মোটা সুতার কাজ পড়বে ১০০০ থেকে ১৬০০ টাকা। দেশীয় ফ্যাশন হাউজ থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি শপিং মলেই বিক্রি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সমন্বয় করেই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে সালোয়ার কামিজের।
মাসুদ রানা
শপিং মলের খোঁজখবর
দুয়ারে ঈদ। কেনাকাটার ধুম পড়েছে বাজারে। এমন কোন মার্কেট বা দোকান নেই, যেখানে ক্রেতার ভিড় লক্ষ্য করা যায় না। সবকিছুই অবশ্য চাহিদা এবং রুচির পরিবর্তন। এক বছর ঘুরে আসে ঈদ। এর মধ্যে আবার এক মাস সিয়াম সাধনা। তাই ঈদের আনন্দ যেন চোখে মুখে লেগে থাকে সবার। কিভাবে এই স্বপ্নময় ঈদকে রাঙিয়ে তোলা যায় বাস্তবে সে পাঁয়তারা চলতে থাকে ছোট বড় সবার মধ্যে। কেনাকাটা করা নাকি নারীদের পছন্দীয় কাজের মধ্যে একটি। আর সে কেনাকাটা যদি হয় কোন উৎসবকেন্দ্রিক তাহলে তো কথাই নেই। সে আনন্দের মাত্রা বেড়ে যেন আরও দ্বিগুণ হয়। এ কারণেই হয়ত শপিং মলগুলাতে নারী ক্রেতার সংখ্যাই বেশি। তাছাড়া ফ্যামিলি ম্যানেজমেন্টের মতো গুরুদায়িত্ব নারীরা ভাল বোঝেন বলেই হয়ত নিজ থেকেই কেনাকাটার কোন তুলনাই হয় না। যার ফলে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-ফিতরকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে শপিং মলগুলো। পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী শপিং সেন্টার ছাড়াও নতুন নতুন শপিংমলেও ক্রেতাদের আনাগোনা এবার লক্ষণীয়।
বেশ কবছর ধরেই প্রচুর ক্রেতার সমাগম এবং সমাদৃত মার্কেট গাউচিয়া, চাঁদনী চক, নিউমার্কেট, মৌচাক ছাড়াও ক্রেতারা একটু স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিং কমপ্লেক্সগুলোতে ঝুঁকছে। এর মধ্যে ইস্টার্ন প্লাজা, বসুন্ধরা সিটি, কনকর্ড টুইন টাওয়ার, ইস্টার্ন প্লাস, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, প্রিন্স প্লাজা, রাপা প্লাজা, মেট্রো শপিং মল, জিনেটিক প্লাজা, হ্যাপি আর্কেড, ফ্যামিলি ওয়ার্ল্ড অন্যতম। এছাড়া বিভিন্ন দেশীয় প্রোডাকশন হাউজগুলো যেমন আড়ং, অঞ্জন’স, কে-ক্র্যাফট, ওজি, নাগরদোলা, রঙ, নিপুণ, সুতি, সাদাকালো দেশাল, আরও অনেকে তাদের নিজ নিজ শো-রুমগুলো শীতাপত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ইন্টোরিয়র ডিজাইনে এনেছে ভেরিয়েশন, যা ক্রেতাদের খুবই আকৃষ্ট করেছে। তাছাড়া ঈদ উপলক্ষে শপিং মলগুলো সেজেছে আপন মহিমায়। বিদ্যুত সাশ্রয়ের কারণে আলোকসজ্জা থেকে বিরত রয়েছে সবাই। তার পরেও শপিং মলগুলোর সৌন্দর্য যেন উপচে পড়েছে। তাছাড়া রোজার ঈদ উপলক্ষে রাতের বেলায় কোন ধরা বাধা সময়ের বেড়া নেই।
নিজস্ব বিদ্যুত ব্যবস্থাপনায় যতক্ষণ ক্রেতা সাধারণ মার্কেটে থাকবে ততক্ষণ মার্কেট খোলা রাখা যাবে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মার্কেটের প্রতি ক্রেতাদের ঝুঁকেপড়া নিয়ে শান্তিনগরে ইস্টার্ন প্লাস শপিং কমপ্লেক্সের দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসিবুর রহমান শাকিল জানান, আজকাল অনেকেই ভিড় ভাট্টা এবং গরমকে এড়াতে চান, সে তাগিদেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মলে ঝুঁকে পড়া, তাছাড়া আমরা ক্রেতাদের সর্বাধিক সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করি।
কেনাটাকার সুবিধার জন্য ফ্লোরভিত্তিক ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন শাড়ি, জুতো, গয়না, জামা-কাপড়, মোবাইল ইত্যাদির জন্য ফ্লোর ভাগ করা রয়েছে। সেই সাথে রয়েছে সুবিশাল পার্কিং ব্যবস্থা। সর্বক্ষণিক লিফট এবং এক্সেলেটরের সুবিধা তো রয়েছেই। তাছাড়া ক্রেতাদের যে কোন অভিযোগ গুরুত্বের সাথে দেখা হয়।
ঈদ উপলক্ষে আকর্ষণীয় র‌্যাফেল ড্র তো রয়েছেই। ঢাকার প্রায় প্রতিটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মলে প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার জন্য ক্রেতাদের সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। যে কারণেই হয়ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মল বা বুটিক হাউজে দিন দিন বাড়ছে ক্রেতার সংখ্যা। দেশীয় এবং ওয়েস্টার্ন সব প্যাটার্নের ড্রেস পাওয়া যাচ্ছে শপিং মলগুলোতে, দামও সাধ্যের মধ্যে।