মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০১২, ১৫ মাঘ ১৪১৮
এ্যাকোয়াপনিক্স প্রযুক্তিতে মাছ-সবজি চাষ
বর্তমানে ভেজাল ফলমূল আর শাকসবজিতে সয়লাব সারাদেশ। আর এসব ভেজাল আহার করার ফলে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে মারাত্মক সব প্রাণঘাতী ব্যাধিতে। রোগবালাই মোকাবিলার জন্য চাষীরা পেস্টিসাইড, হারবিসাইড ও এন্টিবায়োটিক্সের প্রয়োগও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ সমস্ত কেমিক্যাল দিয়ে উৎপাদিত শাক-সবজি আহারের ফলে মানুষের ¯^াস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। আর এসব থেকে মুক্ত থেকে কিভাবে ¯^াস্থ্যসম্মত উপায়ে শাকসবজি উৎপাদন করা যায় সে জন্য গবেষণা করে যাচ্ছেন গবেষকরা। বাড়ির ছাদে এ্যাকোয়াপনিক্সের মাধ্যমে মাছ ও সবজির সমšি^ত চাষ নামের সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এমনই এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এ্যাকোয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. এম.এ. সালাম। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত সাংবাদিকদের সামনে অবহিত করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ড.এম এ সালাম।
ড. সালাম জানান, এ্যাকোয়াপনিক্স হচ্ছে হাইড্রোপনিক্স ও এ্যাকোয়াকালচারের সমš^য়ে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যেখানে মাছ ও সবজির সমšি^ত চাষ করা যায়। প্রয়োজন পড়ে না কোনো মাটির। অল্প জায়গায় শুধুমাত্র সামান্য পানি ব্যবহার করে একইসঙ্গে প্রচুর শাক-সবজি ও মাছ উৎপাদন করা যায়। উৎপাদনও প্রায় তিনগুণ।
এ পদ্ধতি খরা ও উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলের জন্য খুবই উপযোগী কারণ এতে প্রায় ৯৭ শতাংশ পানি কম লাগে। মাছ চাষের জন্য ব্যবহৃত ট্যাঙ্কের অ্যামোনিয়া সমৃদ্ধ পানি গাছের শিকড়ে অবস্থিত ডি-নাইট্রি ফাইং ব্যাকটেরিয়া ভেঙ্গে গাছের খাদ্য উপযোগী নাইট্রেটে পরিণত করে ফলে গাছের জন্য আলাদা কোন খাবার বা সারের প্রয়োজন হয় না। অপরদিকে গাছ মাছের ট্যাঙ্কের পানিকে দূষণমুক্ত করে পুনরায় মাছের ট্যাঙ্কে ব্যবহার উপযোগী করে তোলে ফলে মাছের উৎপাদনও বেড়ে যায় অনেক। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র মাছের খাবার সরবরাহ করা প্রয়োজন পড়ে। তবে কেউ ইচ্ছা করলে বিনা খরচেই সেই খাবারও তৈরি করতে পারে ঘরে বসে।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়ির ছাদে কাজ শুরু করেন ড. সালাম। এ লক্ষ্যে এক টনের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্লাস্টিকের ট্যাঙ্কে ৮০০ লিটার পানিতে ৬০টি তেলাপিয়া ছাড়েন তিনি। পাশাপাশি সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি কাঠের আলনা তৈরি করে তাতে তিন সারিতে মোট ৩৬টি প্লাস্টিকের পানির বোতল যুক্ত করেন। বোতলগুলোর তলার কাছাকাছি দুই পাশ দিয়ে কেটে জানালার মতো রাখা হয়। বোতলগুলোকে উল্টাটা করে ভেতরে এক টুকরা স্পঞ্জ দিয়ে তার ওপর নুড়ি পাথর স্থাপন করে বোতল প্রতি দুটি করে গাছ লাগান। এতে একটি আলনায় ৩৬টি বোতলে ৭২টি গাছ লাগানো সম্ভব হয়। এবার মাছের ট্যাঙ্কের পানি ৭ ফুট উঁচুতে একটি ৩০ লিটারের বালতিতে তুলে সেখান থেকে সাইফোন প্রক্রিয়ায় ফোটাফোটা করে ওপরের ১২টি বোতলে পানি দেয়া হয়। এ পানি পর্যায়ক্রমে ওপর থেকে নিচে আরও দু’টি বোতলের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে একটি পাত্রে এসে জমা হয় যা পুনরায় মাছের ট্যাঙ্কে ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতিতে প্রতি দিন ১৬-১৮ ঘণ্টা পানি প্রবাহের প্রয়োজন।
এছাড়া, এ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে সবজি চাষের জন্য কোন প্রকার সার বা মাটির প্রয়োজন হয় না। তবে মাছকে নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ করতে হয়। বাজার থেকে কিনে মাছকে যাতে খাদ্য দিতে না হয় তার জন্য কালো সৈনিক (ইষধপশ ঝড়ষফরবৎ ঋষু) পোকার লার্ভার উৎপাদন প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছেন তিনি যা মাছের খুব প্রিয় খাদ্য। এ পোকা পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় মাত্র ৫-৮ দিন বাঁচে। পূর্ণবয়স্ক পোকার কোন মুখ থাকে না এবং এরা কোন রোগ জীবাণুর বাহক হিসাবেও কাজ করে না। প্রাপ্ত বয়স্ক পোকা শুধুমাত্র প্রজননে অংশগ্রহণ করে তার জীবন শেষ করে ফলে মানুষের জন্যও এটি ক্ষতিকর নয়।
খুব সহজেই এ পদ্ধতি অবলম্বন করে গ্রামবাংলার বেকার যুবক-যুবতীরা সহজেই আতœকর্ম সংস্থান করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে খুব কম খরচে বাড়ির আঙ্গিনায় মাছ ও শাকসবজির চাষ করে পারিবারিক প্রোটিনের চাহিদাও মেটানো সম্ভব। তাছাড়া এ পদ্ধতিতে কোন রাসায়নিক সার বা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না বলে এটি মানব দেহের জন্য সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতি। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি আগ্রহী কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন অধ্যাপক ড.এম এ সালাম।
সোহেল রানা, বাকৃবি