এম শাহজাহান ॥ বীজ অঙ্কুরোদগম হওয়ার আগে ঢাকার আড়ত মালিকদের কাছে আগাম বিক্রি হয়ে যায় কৃষকের সবজি। আড়ত মালিকদের দাদন ব্যবসায়ের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সবজি চাষীরা। আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে ভোক্তাদের। শাক-সবজির আগাম বিক্রিতে কৃষক সাময়িক উপকৃত হলেও লাভের মুখ দেখার সৌভাগ্য তাদের হয় না। শীতকালীন আগাম সবজি ওঠায় কাঁচাবাজার এখন ভরপুর। কিন্তু সাধারণ ভোক্তাদের বেশি দাম দিয়েই কিনতে হচ্ছে সবজি। দাদন ব্যবসায়ের পাশাপাশি এর মূলে রয়েছে, ব্যাপারী ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কয়েলি বা কমিশন বন্ধ না হওয়া, কৃষিঋণ সহজ না হওয়া এবং বিভিন্ন স্তরে চাঁদবাজি। একাধিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এ তথ্য।
জানা গেছে, সবজি ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ করতে আড়ত মালিকরা সহজ শর্তে চাষীদের দাদন দিয়ে থাকেন। শর্ত থাকে সবজি তাদের কাছে বিক্রি করতে হবে। দাদন পেতে সহায়তা করে থাকে স্থানীয় ছোট ও বড় ব্যাপারীরা। এখানে কৃষককে ১০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন দেয়া হয়ে থাকে। এ বছর নরসিংদী, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, যশোর, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জসহ শাক-সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলের কৃষকদের বিপুল পরিমাণ দাদন দেয়া হয়েছে। কাওরান বাজারের যে আড়তদার যত বেশি দাদন দিয়েছেন তার ব্যবসা তত জমজমাট। ক্ষেতের সবজি আগাম কিনতে আড়তদারদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও রয়েছে। কারণ আড়তে বেশি পরিমাণে সবজি এলে কমিশন বা কয়েলিও বেশি আদায় হয়ে থাকে।
এ প্রসঙ্গে কাওরান বাজারের আড়ত মালিক মোঃ জসিমউদ্দিন মিয়া জনকণ্ঠকে বলেন, বীজ বপনের আগে চাষীরা তাঁদের সবজি বিক্রি করে থাকে। আর এর ফলে আড়তে সবজি আসার পর ব্যাপারী বা ওই কৃষকের কিছু করার থাকে না। তিনি বলেন, কাওরান বাজারের ওই আড়ত মালিকের ব্যবসা ভাল যিনি সবচেয়ে বেশি টাকা কৃষকদের দাদন দিতে সক্ষম হয়েছেন। দাদন ছাড়া কাওরান বাজারে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। অনেক আড়ত মালিক কোটি টাকা দাদন হিসেবে বিনিয়োগ করেছেন। দাদন প্রথা আগে ছিল এখনও আছে। তবে সবজি চাষীদের মধ্যে দাদনের টাকা বিনিয়োগ করার প্রবণতা এখন অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, এ ব্যবস্থায় কৃষকরাও লাভবান হচ্ছেন। কারণ ব্যাংক টাকা না দিলেও আড়ত মালিকরা টাকা দিয়ে সবজি চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করছেন।
এদিকে গত কয়েক মাস ধরে শাক-সবজির বাজার উর্ধমুখী হলেও অনুসন্ধানে জানা যায়, দাম বাড়ার যৌক্তিক কোন কারণ নেই। উৎপাদন ও সরবরাহ ভাল হওয়ার পরও এ বছর সবজির দাম চড়া। বিশেষ করে গত রমজানের পর থেকেই দাম বাড়তির দিকে। খুচরা পর্যায়ে বাজার ভেদে শসা বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকা পর্যন্ত। করল্লা, ঢেঁড়স, কাঁকরোল, বেগুন, ধুন্দল, চিচিঙ্গা এবং পটোলসহ কোন সবজিই ৪০-৫০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।
জানা গেছে, কৃষক পণ্য বিক্রি করার পর থেকে কয়েক স্তরের ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে সেই পণ্য আসে খুচরা বাজারে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি শুরু হয় মাঠ পর্যায় থেকেই। আর এভাবে চলছে বছরের পর বছর। কাওরান বাজারে কথা হয়, বাগেরহাটের চিতলমারীর ব্যাপারী আলম শিকদারের সঙ্গে। কৃষক পর্যায় থেকে সবজি এনে পাইকারি মার্কেটে বিক্রি করা তার ব্যবসা। তিনি বলেন, কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি শসা বিক্রি হচ্ছে ১৫-২০ টাকা আর করল্লা মিলছে ১২-১৫ টাকায়। কিন্তু রাজধানীর খুচরা বাজারে এই করল্লা বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকা। এভাবে প্রতিটি সবজির দাম দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।
তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারের তুলনায় খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বেশি হওয়ার পেছনে রয়েছে পাইকারি ব্যবসায়ীদের ওজন কম দেয়া, আড়তদের কয়েলি বা কমিশন বন্ধ না হওয়া, চাঁদাবাজি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং দোকানভাড়া বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খরচ বেড়ে যাওয়া। খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনেকটা একমত পোষণ করে এফবিসিসিআইয়ের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং কমিটির চেয়ারম্যান মোঃ হেলালউদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, বাজার থেকে আগে মধ্যস্বত্বভোগীদের তাড়াতে হবে। সরাসরি কৃষক যাতে তার পণ্য বাজারে এনে বিক্রি করতে পারে সরকারের সে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, পণ্য পরিবহনে মিটারিং সিস্টেম বাস্তবায়নসহ প্রত্যেকটি পাইকারি মার্কেটের প্রবেশপথে কৃষি মার্কেট চালু করা প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ নিতে এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু সরকার বাস্তবায়ন করছে না। ন্যায্যমূল্যে পণ্য সামগ্রী পেতে অবশ্যই মধ্যস্বত্বভোগীদের বিতাড়িত করার কোন বিকল্প নেই।
জানা গেছে, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কয়েলি বা কমিশনবাণিজ্য বন্ধ করার একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েলি প্রথা চালু করার পক্ষে বিভিন্ন মহলের চাপ থাকার কারণে শেষপর্যন্ত তা আর এগোতে পারেনি। বরং আগে এক জায়গায় কয়েলি নেয়া হলেও এখন চার জায়গায় কয়েলি নেয়া হচ্ছে। ফলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর মাছ ও কাঁচাবাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, কয়েলি প্রথা বন্ধ হয়নি, বরং বেড়েছে। এছাড়া পরিবহন খরচ ও চাঁদাবাজি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিনিয়ত শাক-সবজির দাম বেড়ে যাচ্ছে। এগুলো বন্ধ না হলে জিনিসপত্রের দাম কমবে না।