স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিচারকাজে স্বচ্ছতা ও যথাযথ ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের আদালতের কার্যতালিকা থেকে জন্মদিন সংক্রান্ত বিষয়ে করা একটি রিভিশন আবেদন বাদ দিতে আবেদন করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। বুধবার খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তাঁর আইনজীবীরা বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের হাইকোর্ট বেঞ্চে গিয়েই আবেদন জমা দেন। আদালত বৃহস্পতিবার এই আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করেছে। ওইদিন রিভিশন আবেদনে রুলের শুনানির দিনও ধার্য রয়েছে।
আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। এ সময় অন্যদের মধ্যে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল উপস্থিত ছিলেন। আবেদনে বলা হয়, ‘আবেদনকারী বাংলাদেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপির নেতা এবং স্বাভাবিকভাবেই এই মামলায় একটি রাজনৈতিক গন্ধ (ফ্লেভার) রয়েছে।’ সাগর-রুনী ও মুফতি আমিনীর মামলায় খালেদা জিয়া সম্পর্কে এই আদালতের করা মন্তব্য সংক্রান্ত বিষয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে আবেদনে বলা হয়, ‘এই দুই মামলায় খালেদা জিয়া কোন পক্ষ না হওয়া সত্ত্বেও তার সম্পর্কে আদালতের করা মন্তব্যের কারণে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, এই আদালতে আবেদনটির শুনানি হলে তিনি ন্যায়বিচার পাবে না।’ এ সব কারণ দেখিয়ে মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিতে আদালতের কাছে আবেদন করা হয়।
১৫ আগস্ট খালেদার জন্মদিন পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে এ্যাডভোকেট মোঃ সোহরাওয়ার্দী (বর্তমানে সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেল) ১৯৯৭ সালের ২০ আগস্ট ঢাকার সহকারী জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। পরের বছরের ১১ আগস্ট খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে মামলাটির আর্জি খারিজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করা হয়। অতিরিক্ত সহকারী বিচারক মোঃ শফিকুর রহমান ১৯৯৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার আবেদন খারিজ করে দেন।
নিম্ন আদালতের এই আদেশের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করা হয়। আদালত ১৯৯৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন। একইসঙ্গে খালেদা জিয়ার আবেদন খারিজ করে দেয়া আদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে হাইকোর্ট।
এই রুলের শুনানির জন্য ২০০৯ সালে কার্যতালিকায় আসে। সর্বশেষ ২০১০ সালের ৪ জানুয়ারি বিচারপতি মোঃ মোমতাজ উদ্দিনের আদালতে শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ আদালতের প্রতি অনাস্থা জানালে আদালত মামলার নথিপত্র প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দেন এবং মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ পড়ে।
পরে প্রধান বিচারপতি মামলাটি শুনানির জন্য ২০১০ সালের ২ অক্টোবর বিচারপতি মিফতাহউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান। এ আদালতে মামলাটি কার্যতালিকাভুক্ত হওয়ার পর ওই বছরের ২৬ অক্টোবর মূল মামলার বাদীপক্ষে সময়ের আবেদন করা হয়। আদালত দুই সপ্তাহ সময় দিয়ে শুনানি মুলতবি করেন। কিন্তু এ আদালতের বিচারিক এখতিয়ার পরিবর্তন হলে মামলাটির আর শুনানি হয়নি।
এ অবস্থায় রিভিশন আবেদনের ওপর জারি করা রুল শুনানির জন্য মূল মামলার আইনজীবী ফরিদুল আলম তালুকদার সোমবার বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বেঞ্চে উপস্থাপন করেন। আদালত মামলাটি শুনানির জন্য মঙ্গলবারের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্তির আদেশ দেন। এ কারণে মঙ্গলবার কার্যতালিকায় আসে। কিন্তু খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতে উপস্থিত হয়ে সময়ের আবেদন করেন। তিনি বলেন, এই মামলার মূল আইনজীবী খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ। তাই আমাদের সময় প্রয়োজন।
আদালত বলেন, তিনি তো অসুস্থ। আদালতে আসেন না। জবাবে ব্যারিস্টার কাজল বলেন, পরামর্শের বিষয় আছে। এছাড়া অন্য আইনজীবীদের মধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন রয়েছেন। তাই সময়ের প্রয়োজন।
আদালত বলেন, ১৯৯৯ সালে রুল হয়েছে। এত বছর একটি মামলা ঝুলে আছে। আর সময় দেয়া ঠিক হবে না। ইন্টারলোকেটরি একটি আদেশের বিষয়ে এত বছর আমরা নিষ্পত্তি না করতে পারলে কিভাবে হবে। শেষ পর্যন্ত ব্যারিস্টার কাজলের আবেদনে আদালত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় আদালত বলে, বৃহস্পতিবার আংশিক শ্রুত হিসাবে কার্যতালিকার শীর্ষে থাকবে। ওইদিন কোন পক্ষ সময় চাইলেও সময় দেয়া হবে না।
উল্লেখ্য, খালেদা জিয়ার শিক্ষা সনদ, বিবাহ নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সময়ের সরকারী কাগজপত্রে একাধিক জন্ম তারিখ থাকায় এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নথিপত্রে অক্টেবরে জন্মদিনের উল্লেখ থাকলেও তিনি তা পালন করে ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালে ওই দিনে ঘাতকের হাতে সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।